গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ : কিছু ভাবনা
দেবব্রত শ্যামরায়

ভারতবিদ ওয়েণ্ডি ডনিগার তাঁর নতুন বই ‘Beyond Dharma: Dissent in the Ancient Indian Sciences of Sex and Plitics’ শুরু করেছেন স্বভাবসিদ্ধ ইঙ্গিতময় কৌতুকের মধ্য দিয়ে। বইয়ের শুরুতেই আছে ভারতেতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন যা শুরু হচ্ছে ঋগ্বেদ রচনার সময়কাল থেকে, আর তারপর তা এ দেশের ইতিহাসের প্রধান প্রধান মাইলপাথরগুলিকে ছুঁয়ে শেষ হচ্ছে ২০১৪-এ, নরেন্দ্র মোদির ভারতজয়ে এসে। শুধু তাই নয়, বইয়ের শেষে একটি গোটা অধ্যায়ে ডনিগার দেখিয়েছেন মোদি জমানায় কীভাবে শাসক ও তার সেনানী বৈজ্ঞানিক সত্যের বিপরীতে অসত্য, অর্ধসত্য এমনকি মিথকে সুপরিকল্পিতভাবে দাঁড় করাতে চাইছেন। সুপ্রাচীন যুগে কিছু চিন্তাশীল মানুষ তাঁদের অধীত জ্ঞান ও উপলব্ধ দর্শনকে লিপিবদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে এসে মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করে দিয়ে তারই এক অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সে এসে পৌঁছনো হল যেন। তাই এই ২০১৪ সালটি ভারত ও শ্রী মোদির জন্য যেমন অতি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ডনিগারের কাছেও; এবং ঘটনাক্রমের অনিবার্যতায় প্রায় একই সূত্রে বাঁধা।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, লোকসভা ভোট আসতে আরও কিছুদিন বাকি, কিন্তু এর মধ্যেই ক্ষমতার অলিন্দে ‘হিন্দুহৃদয় সম্রাট’-এর নির্ভুল পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে… ঠিক এমন সময়ে প্রকাশক পেঙ্গুইন ইণ্ডিয়া ডনিগারের আরেকটি বই- ‘দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্টরি’ বাজার থেকে পুরোপুরি তুলে নিয়ে কাগজের মণ্ড করে ফেলার কথা ঘোষণা করলেন। অভিযোগ সেই একই বস্তাপচা চর্বিতচর্বণ- ডনিগার নাকি এই বইয়ে হিন্দুদের অপমান করেছেন। মূল অভিযোগকারী ছিলেন ‘শিক্ষা বাঁচাও আন্দোলন সমিতির’ প্রতিষ্ঠাতা দীননাথ বাত্রা। ভদ্রলোকের অন্যান্য পরিচয়গুলি হল তিনি একজন আর এস এস প্রচারক, ১৯৬৬ সালে দেশে আর এস এস প্রতিষ্ঠিত প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গীতা সিনিয়র স্কুলের প্রধান শিক্ষক, এবং ১৯৯০-এ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পরিচালিত বিদ্যালয় নেটওয়ার্ক বিদ্যা ভারতী-তে নিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক। দীননাথের মতাদর্শ নিয়ে এরপর একটিও মন্তব্য অপ্রয়োজনীয়। বরং ইন্টারনেট ঘেঁটে বাত্রা মশাইয়ের কর্মকাণ্ডের শীর্ষবিন্দুগুলিকে (যার মধ্যে অধ্যাপক এ কে রামানুজনের লেখা, দেশজুড়ে প্রচলিত রামায়ণের বহুস্তর ভাষ্যের পুণর্নির্মাণ ‘থ্রি হানড্রেড রামায়ণাস’ প্রবন্ধটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে সরিয়ে দেবার অপচেষ্টা উল্লেখযোগ্য) ভালো করে পরীক্ষা করলেই এই দেশে দক্ষিণপন্থী ধর্মবাদী শক্তির ধাপে ধাপে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সুর চড়ানোর রূপরেখাটিও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে যাবে।

কাট টু ২০১৮। এই মুহূর্তে ফ্যাসিবাদের দামামা আরও তীব্র হয়ে বাজছে দেশের কোণে কোণে। শিক্ষাক্ষেত্রে গৈরিকীকরণ ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানগুলিকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, ছাত্র আন্দোলনের ক্রমসংকুচিত পরিসর, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সূচকে দেশ হিসেবে ক্রমশ নেমে যাওয়া, ভাষাসম্প্রদায় ও কৌমগুলির দাবি ও অধিকারকে ক্রমাগত খর্ব করে চলা, সাংবাদিক-স্বাধীন চিন্তক-লেখক-শিল্পীদের ওপর বাচিক ও শারীরিক নিগ্রহ নামিয়ে আনা এমনকি হত্যাও, গোমাংস সংক্রান্ত ইস্যুতে মুসলিমদের ওপর ক্রমবর্ধমান হিংসা ইত্যাদি ঘটনা বিগত ক’বছরেই আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক পরিসরকে একটা বিরাট প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে যখন লেখাটি তৈরি করছি, খবর পৌঁছল- আসামে প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য-এর বিরুদ্ধে থানায় এফ আই আর দায়ের করা হয়েছে। তপোধীর আসামের যে নাগরিকপঞ্জির বিরোধীতায় গলা তুলেছেন, সেই পঞ্জিটি ত্রুটিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, আসাম থেকে বাঙালিকে উচ্ছেদ করার চক্রান্তে রচিত। অবশ্য তপোধীরবাবু এক্ষেত্রে ভাগ্যবান, অন্তত এখনও, তাঁর বিরোধীতা এখনও আইনি পথেই চলছে, তপোধীরকে রুখতে এখনও কেউ হাতে অস্ত্র তুলে নেয়নি। সাংবাদিক শুজাত বুখারি বা গৌরী লঙ্কেশ অবশ্য এতখানি ভাগ্যবান ছিলেন না।

গত সেপ্টেম্বরে গৌরী লঙ্কেশ যখন নিজের বাড়ির দরজায় গুলিবিদ্ধ হন, দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। একইরকম ঝড় উঠেছিল তার কিছুদিন আগেও, যখন বামপন্থী চিন্তক কালবুর্গি ও পানসারেকে হত্যা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি, বরং খারাপ হয়ে চলেছে। অতি সম্প্রতি লঙ্কেশ হত্যা তদন্তে কর্নাটক থেকে আটক একজনের কাছে একটি ‘হিট লিস্ট’ উদ্ধার হয়েছে, যেখানে প্রখ্যাত নাট্যকার-অভিনেতা গিরীশ কারনাড-সহ এমন ২৬ জনের নাম রয়েছে, যাঁরা সকলেই কোনও না কোনও সময়ে দেশজোড়া এই কট্টর হিন্দুত্ববাদের উত্থানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। গত বছর আমাদের দেশে মোট ১১ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন ও ৪৮ জনকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস’ (RSF) দ্বারা নথিবদ্ধ ‘ওয়র্ল্ড প্রেস ফ্রিডম’ তালিকা যা কিনা সারা বিশ্বে তুলনামূলক গণতান্ত্রিক পরিসরের এক সূচক, তাতে ভারতের স্থান এ বছর নিন্দনীয়ভাবে ১৩৮ তম, যা পাকিস্তানের চেয়ে মাত্র এক ধাপ ওপরে। সংবাদ-শহীদের এই তালিকায় সর্বশেষ নামটি শুজাত বুখারির, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের লেখালেখির মাধ্যমে কাশ্মীরে সরকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে একটি আলাপ-আলোচনার পরিসর গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। এমন একজন মানুষ ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতির দালালদের কাছে সমান বিপজ্জনক, কারণ তারা সমস্যা জিইয়ে রেখেই ফায়দা তুলতে চায়, তাই গত ১৪ই জুন শুজাতকে সরিয়ে দেওয়া হল।

একটি ন্যায্য প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই লেখায় আক্রমণের সবক’টি অভিমুখ শুধুমাত্র বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কেন? ২০১৪ এর আগে অবধি ভারতবর্ষ কি বাকস্বাধীনতার স্বর্গরাজ্য ছিল? অবশ্যই নয়৷ আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত বাকস্বাধীনতা হরণের সবচেয়ে উজ্জ্বল সরকারি রেকর্ডটি ইন্দিরা গান্ধী সরকারের। কংগ্রেসের আদর্শেই জারিত আমাদের রাজ্যের বর্তমান শাসকের তুঘলকির কথা আমরা সবাই জানি, গত সাত বছর ধরে বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের একের পর এক দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি, দেখে চলেছি। ভোটভিক্ষার স্বার্থে ও ‘মতাদর্শগত’ প্রয়োজনে বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘনে বিন্দুমাত্র আপোষ করেননি আগের তথাকথিত বামপন্থী সরকার। তসলিমা নাসরিনকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছেন। লেনিনের পশ্চাদ্দেশ থাকা উচিত নয়- বিবেচনায় চলচ্চিত্র উৎসবে ‘টরাস’ ছবির প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছেন। আসলে পুরো দোষটা তাদেরও নয়। যে দেশে সংবাদপত্রে শার্লি এবদো-র সংবাদ ও ছবি পুনর্মুদ্রণের ‘অপরাধে’ সম্পাদককে নিজের শিশুসন্তানকে নিয়ে পরিচয় গোপন করে শহর থেকে শহরে পালিয়ে বাঁচতে হয়, একজন শিল্পীর আঁকা আধুনিক ধারার ছবিতে দেবী সরস্বতী নগ্ন হলে সেই শিল্পী প্রাণ নিয়ে সুস্থভাবে আর যে দেশে থাকতে পারেন না, সেই দেশ নিজের জন্য এদের চেয়ে বেশি সহিষ্ণু, সংবেদনশীল শাসক দাবি করতে পারে না। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ধারে ও ভারে, গণতান্ত্রিক অধিকারের উল্লঙ্ঘনে বর্তমান সরকার তার সমস্ত পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে গেছে। এত বিশাল ও নিরেট অনুভূতিহীন ছাতি হিন্দুস্তান এর আগে পায়নি।

ফিরে আসি ডনিগারের প্রসঙ্গে। ‘বিয়ণ্ড ধর্মা..’ বইটিতে ‘হিন্দু’ ভারতের দুই সুপ্রাচীন টেক্সট অর্থশাস্ত্র ও কামসূত্র খুঁড়ে তিনি খুঁজে বার করেছেন এক অন্তর্ঘাতের স্বর, দেখতে পেয়েছেন মান্য বৈদিক রীতিনীতি বা প্রচলিত ‘ধর্ম’পথের পাশেই তথাকথিত ‘অধর্ম’ বা বিরুদ্ধ মতের সাহসী প্রকাশ ও সহাবস্থানকে। এই বই তাই এক ধরনের জোরালো প্রত্যুত্তর। না, ২০১০ থেকে হিন্দুত্ববাদী শক্তি যে লাগাতার ডনিগারের চিন্তাভাবনার প্রতি বিরক্তি ও অসূয়া প্রকাশ করে আসছে, এ শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত হিসেবনিকেশ নয়। এখানে লেখক আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে ভারতের বৌদ্ধিক ইতিহাস আসলে বহুমাত্রিক আইডিয়ার সংঘর্ষের ইতিহাস, আদিকাল থেকে পরস্পরবিরোধী শ্রেণিস্বার্থগুলির ঘাতপ্রতিঘাতের ইতিহাস। অধীত বিদ্যা বা অধিকারকে যখনই শাসক বা শাসক-ঘনিষ্ঠরা কুক্ষিগত করে রাখতে চেয়েছে, আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে, শোষিতের চেতনায় সেই শাস্ত্রের প্রত্যাখান বা বিনির্মান ঘটে গেছে প্রতিরোধের এক অনিবার্য অঙ্গ হিসেবেই। ঘটনাচক্রে আজও সেই সময় উপস্থিত, যখন কায়েমি স্বার্থ অটুট রাখতে প্রতিদিন বিরোধী স্বরকে খুন করা হচ্ছে, দিনের আলোয়, প্রতীকী ও আক্ষরিক, দুই অর্থেই। আর আমরা কে না জানি, রাজা যখন চারণকবির টুঁটি টিপে ধরেন, গলা ছেড়ে গান গাওয়ার সেটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়!

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)