সোমশংকর রায়- এর গল্প

সোমশংকর রায়- এর গল্প

সুবর্ণধেনু

 

বর্ধিষ্ণু বন্দর সপ্তগ্রাম থেকে খানিকদূরে বর্ধমানভুক্তির ভিতরে একটি নাম-না-জানা ছোট গ্রাম। আপাতদৃষ্টিতে গ্রামটির কোন বিশেষত্ব নেই, রাঢ় অঞ্চলের আর পাঁচটি গ্রামের মতই। সেখানে আড়ম্বর নেই, আবার ঘোর অভাবও নেই। রাষ্ট্রীয় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখানকার মানুষের সহজ, নিস্তরঙ্গ জীবন বেশী বিপর্যস্ত হয় না। গ্রামের বেশীরভাগ বাড়িই অতি সাধারণ। বাঁশ, বেত, ও মাটির তৈরি, খড় ছাওয়া চাল। গ্রামের বাড়িগুলির মধ্যে একটি বাকিগুলির থেকে খানিক আলাদা। এটি মাটির পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, আয়তনেও বড়। বাড়িটি গ্রামপাল বলরাম দাসের। ভিতরে একটি প্রশস্ত ঘরে দুটি কাঠের আসনে বলরাম ও বৌদ্ধ তন্ত্রসাধক সিংহগিরি বসে। সিংহগিরির বয়স সত্তরের উপরে, দীর্ঘ নির্মেদ দেহ, মুন্ডিত মস্তক, উজ্জ্বল দৃষ্টি, শীর্ণ মুখে বুদ্ধি ও কঠিন ব্যক্তিত্বের তীক্ষ্ণতা। পরনে রক্তাম্বর। তিনি অনুচ্চস্বরে বলরামকে বললেন, ‘এতদিনে সময় হয়েছে বলরাম, দুষ্টের পাপের ঘড়াও পূর্ণ হয়ে এসেছে।’ বলরাম বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, ‘আপনার উদ্দেশ্য নিশ্চয় সফল হবে আচার্য।’ সেই সময়ই ঘরে একটি তরুণী প্রবেশ করল, শ্যামবর্ণা, একহারা গড়ন, দীর্ঘাঙ্গী, মুখশ্রী বেশ মিষ্টি। তার চোখ দুটি বড়, ভাসা ভাসা, মুখমন্ডলে বুদ্ধি ও শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তার সঙ্গে চাপা বিষণ্নতার ভাব। পরনে তার সাধারণ তাঁতের শাড়ি, কানে তালপাতার অলংকার। সে ঘরে ঢুকে সিংহগিরি ও বলরামকে ভক্তিভরে প্রণাম করল। আচার্য আশীর্বাদের ভঙ্গি করে তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন ‘আশা করি আমার শিক্ষা সার্থক হবে। সবই তথাগতের ইচ্ছা।’ তারপর তরুণীটিকে বললেন ‘মা হিরণ্ময়ী, এবার তোমাকে এখানকার পাট সাঙ্গ করে আমার সঙ্গে যেতে হবে। যে কাজের জন্য তোমাকে এতদিন প্রস্তুত করেছি, তা এখন শুরু করতে হবে।’

বঙ্গদেশের ইতিহাসে সে এক ক্রান্তিকাল। সমস্ত আর্যাবর্ত্ত ব্যাপী পাল সাম্রাজ্য ক্রমশ ভেঙ্গে পড়ছে। গোপাল থেকে মহীপালের রাজত্ব পর্যন্ত কয়েক শতাব্দী ধরে বঙ্গদেশ যে শান্তি সমৃদ্ধি ভোগ করেছে তার অবসান ঘটছে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দিক থেকে বহিঃশত্রু আক্রমণ করছে, এবং তাদের সঙ্গে এ অঞ্চলে প্রবেশ করছে নানা ভিনদেশী মানুষ। তারা আর ফিরে যাচ্ছে না, থেকে যাচ্ছে বাংলার উর্বর শস্য-শ্যামলা ভূমি ও বাণিজ্যলব্ধ মণিকাঞ্চনের টানে। সেই রকম একদল সুদূর কর্নাটবাসী যোদ্ধা তখন গৌড়, বঙ্গ ও মগধে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকে। মহারাজ রামপালের পর বঙ্গদেশে পাল বংশের অধিকার দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে আসে, আর পূর্ববঙ্গে সেই সময় ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে থাকে কর্ণাটদেশ থেকে আগত ক্ষত্রিয় সেন বংশ। সেন রাজা বিজয় সেন পাল বংশকে গৌড়-বঙ্গ থেকে প্রায় বিতাড়িত করেন এবং তাঁরা মগধে কোনক্রমে অধিকার বজায় রাখেন। বাংলার মানুষ বুঝতে পারে কালের নিয়মে তাদের শাসন করতে এক নতূন রাজশক্তির আর্বিভাব ঘটেছে। কিছুদিন বাদেই বোঝা যায় যে শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও বাংলায় বড় রকমের পট পরিবর্তন ঘটে গেছে। পাল রাজগণ ছিলেন বৌদ্ধ, তবে পরধর্ম সহিষ্ণু। বৌদ্ধ ধর্ম সামাজিক সাম্য ও ঐক্যকে গুরুত্ব দেয়, তার মধ্যে বাংলার স্থানীয় লৌকিক ধর্মও জাতিভেদকে প্রশ্রয় দেয়নি। যার ফলে পাল যুগে বঙ্গদেশে জাতিবর্ণভেদ খুব প্রাসঙ্গিক ছিল না। দেশে ব্রাহ্মণ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা সমাজের সর্বময় কর্তা ছিলেন না, বরং বণিকদের সম্মান ছিল অত্যন্ত কারণ বঙ্গদেশের কিংবদন্তি তুল্য ধনসম্পদের বেশীরভাগই তাঁরা নিয়ে আসতেন দূর দূরান্ত থেকে। বাঙ্গালী বণিকের বহিত্র বঙ্গসাগর ও দক্ষিণ জলনিধি ধরে পৌছে যেত সিংহল, সুবর্ণভূমি,  শ্যামদেশ, যবদ্বীপ, মহাচীন প্রভৃতি অঞ্চলে। স্থলপথে পায়ে হেঁটেও বাঙ্গালী বণিক পৌছে যেত তিব্বত ও তুরানে। কৃষক ও কারিগররাও সমাজে নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে থাকতে পারত। কেউ তাদের উপর অবিচার করলে তারা বীরত্বের সঙ্গে বিদ্রোহ করত, যেমন দ্বিতীয় মহীপালের সময় কৈবর্তরা। আবার রাজা সুশাসক হলে তারা তাকে হৃদয়ে স্থান দিত, যেমন প্রথম মহীপাল ও রামপালকে নিয়ে তাঁরা গান বেঁধেছিল। রাজা ও প্রজার মধ্যে মানসিক ও সাংস্কৃতিক একাত্ববোধ ছিল যথেষ্ট।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে সেন রাজগণ ক্ষমতায় আসার পর থেকে। তাঁরা বাঙ্গালী নন, সুদূর কর্ণাটবাসী, গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা কোনও নতূন অঞ্চলে সনাতন সংস্কৃতি প্রচার করাকে পরম কর্তব্য বলে মনে করতেন। তার মধ্যে বিজয়সেন বিবাহও করেছিলেন পালেদের থেকে অনেক বেশী রক্ষণশীল শূর রাজপরিবারে। বিজয়সেন যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যাস্ততার মধ্যে ধর্ম সংস্কৃতি প্রচার করার খুব বেশী সময় পাননি, কিন্তু তার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেছেন তাঁর পুত্র বল্লালসেন। অদ্ভুত মানুষ এই বল্লাল। তাঁর জন্ম নিয়েও নানারকম কথা শোনা যায়। বিজয়সেনের দীর্ঘদিন কোনও সন্তান হয়নি। তারপর রাজধানী থেকে বহুদূরে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে রাণী প্রভাবতী এক পুত্রের জন্ম দেন। কেউ বলে মহাদেবের বরে এর জন্ম, কেউ বলে ব্রহ্মপুত্র নদই এর পিতা। বিজয়সেন তাঁর রহস্যময় ভাবে প্রাপ্ত সেই সন্তানটিকে কখনই সহজ ভাবে গ্রহণ করেননি। সবসময়ই তাকে দূরে দূরে রাখতেন। অথচ বেশী বয়সের পুত্র সন্তান, তার প্রতি পিতার অত্যধিক টান থাকাটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বিজয়সেন কুমার বল্লালের প্রতি শুধু মাত্র কর্তব্য করে গেছেন। সিংহাসনের জন্য এক যোগ্য উত্তরাধিকারী প্রয়োজন, সেই লক্ষ্যে তিনি বল্লালকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছেন, কোনও স্নেহ প্রদর্শন করেননি। বল্লালও ছোট থেকেই বুঝে যান যে সবাই তাঁকে নিয়ে কেমন আড়ষ্ট হয়ে থাকেন। তাঁর মা তাঁকে ভালবাসেন ঠিকই কিন্তু পিতার কারণে প্রকাশ্যে কাছে টেনে নিতে পারেন না। সেই কারণে বল্লাল চাপা স্বভাবের, তাঁর মনের চাবিকাঠি সহজে কেউ পায় না। তিনি অসামান্য বীর, কূটনীতিক ও সুশাসক। গৌড়-বঙ্গ সহ দ্বাদশ রাজ্যের অধিপতি তিনি। বল্লাল সকলের সঙ্গেই আদর্শ আচরণ করেন। লোকে বলে, তিনি গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্যপরায়ণ, বিদ্বানদের পৃষ্ঠপোষক, ধর্মকর্মে নিষ্ঠাবান আবার শত্রুদমনে চতুর প্রবঞ্চক, অবসর সময়ে প্রমোদ কাননে লম্পট মাতাল। একেবারে নিখুঁত রাজচরিত্র, কিন্তু তাঁর সমস্ত আচরণই যেন কেমন নিষ্প্রাণ। তাঁর শরীর সর্বত্রই দৃশ্যমান, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের নাগাল পাওয়া যায় না। এরকম মানুষের মনে স্থান পাওয়া বড় কঠিন।

‘আচার্য, আচার্য…….’ হিরণ্ময়ীর সরল ডাকে সিংহগিরির সম্বিত ফেরে। চিন্তা করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এবার দ্রুত বাস্তবে ফিরে তিনি হিরণ্ময়ীর দিকে তাকালেন। সে মিষ্টি হেসে একটি কাঁসার পাত্র এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আপনার জন্য জল এনেছি।’ কদিন হলো তাঁরা বঙ্গদেশের রাজধানী গৌড় নগরে এসে উঠেছেন। বসবাস করছেন নগরের মধ্যবিত্ত এলাকার একটি সাধারণ গৃহে। আচার্য পাত্রটি নিয়ে হিরণ্ময়ীর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তার সহজ নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, ‘যে বয়সে কোন সাধারণ মেয়ের সুখে শান্তিতে সংসার করার কথা, ঠিক যে সময়ে স্বামী ও শিশুসন্তান নিয়ে আনন্দে মেতে থাকার কথা, জীবনের সেই সবচেয়ে সুখপ্রদ সময়েই আমি তোকে নিদারুণ এক পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি মা, এতে নিশ্চিতভাবে তোর বাকি জীবন নষ্ট হবে। কি জানি ঠিক করছি কি না? সবই তথাগতের ইচ্ছা।’ হিরণ্ময়ীর মুখের ভাব ক্রমশ দৃঢ় হয়ে উঠছিল। এবার সে শান্তভাবে বলল, ‘আপনি কখনই ভুল করতে পারেন না আচার্য। আর আমার জীবনের আছেই বা কী যা নষ্ট হবে?’ সিংহগিরি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তা ঠিক, তুই তো সবই জানিস’।

বল্লালসেনের সঙ্গে বণিকদের সম্পর্ক কখনই মধুর ছিল না, তিনি ক্ষত্রিয় রাজা, ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষক। বণিকরা তাঁর চোখে ব্যাপারী, শুধু প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করা যায়। স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গদেশের বণিকদের সামাজিক আচরণ ও স্বাধীন মনোভাব তাঁর চোখে স্পর্ধা বলে মনে হয়েছিল। তিনি ভিনদেশী ও নিজ পরিবারেও একা। তিনি বুঝেছিলেন যে একটি বিজাতীয় রাজ্যে নিজের ও বংশের শাসনকে স্থায়ী করতে হলে রণাঙ্গনে শত্রু দমনই যথেষ্ট নয়, সমাজকেও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তার সহজ উপায় হলো সমাজে ভেদ সৃষ্টি করা ও কিছু অংশকে বশীভূত করা। সেই লক্ষ্যে এগোলেন তিনি, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও পুরোহিতদের প্রচুর দান-দক্ষিণা দিয়ে উৎসাহিত করতে লাগলেন। বঙ্গসমাজে জাতিবর্ণ প্রথা প্রচার করলেন। তাতেও ক্ষান্ত হলেন না তিনি, বরং উচ্চবর্ণীয়দের মধ্যে সূক্ষ্মতর ভেদ তৈরি করতে চাইলেন। আগের কয়েক শতাব্দী ধরেই আর্যাবর্ত্ত থেকে আসা ব্রাহ্মণরা, চিকিৎসক বৈদ্যরা ও প্রশাসক মসীজীবি কায়স্থরা বঙ্গসমাজে প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। বল্লাল তাদের মধ্যে যারা সর্বাংশে উত্তম, যাদের মধ্যে নয়টি উল্লেখযোগ্য গুণ আছে তাদেরকে কুলীন বা সেই জাতির শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করলেন। অন্যান্য সৎশূদ্র গোষ্ঠীগুলির মধ্যেও যারা বিশিষ্ট তাদেরকে বল্লাল, ‘মানী’ বা ‘পরামানিক’ উপাধি দিলেন। রাজা যাঁদেরকে কুল মর্যাদা দিয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই ছিলেন নিঃসন্দেহে যোগ্য ব্যক্তি, তবে পুরোপুরি ভাবে রাজার অনুগত। যোগ্য কিন্তু স্পষ্টবাদী ও বল্লালের ভেদ নীতির সমর্থক নন এরকম ব্যক্তিদের তিনি কোন সম্মান দিলেন না। স্বাভাবিক ভাবেই কৌলিন্য প্রথা চালু হওয়ার ফলে সমাজে তীব্র অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দিল। বল্লাল অবশ্য তাতে দমলেন না, ছলে বলে কৌশলে প্রতিবাদীদের দমন করতে লাগলেন।

এরকম পরিস্থিতিতে বল্লাল এক বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করলেন। প্রাসাদের প্রশস্ত আঙিনায় দান-ধ্যান ভোজনের ব্যবস্থা। যজ্ঞের কর্মকর্তা রাজার আত্মীয় ভীমসেন। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতির মানুষ এসে জড়ো হয়েছেন যজ্ঞস্থানে। ভোজনের সময় জাতিবর্ণের সংস্কার মেনে এক এক জাতির সদস্যকে আলাদা স্থানে বসানো হলো। রাজার কাছাকাছি সবচেয়ে সম্মানের আসনে রইলেন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় সামন্তরা, বৈদ্য ও কায়স্থ আধিকারিকরা। কিন্তু বণিকদের ঠেলে দেওয়া হলো প্রাঙ্গণের একেবারে প্রান্তে কৃষক কারিগরদের সঙ্গে। এই অবহেলায়, বণিকরা বিশেষ করে সুবর্ণবণিকরা অত্যন্ত রুষ্ট হলেন। তাঁরা ধনে মানে প্রতিপত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের সম্মানিত নাগরিক। বহু বৌদ্ধ শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে তাঁরা প্রতিপালন করেছেন। তাঁরা নির্দিষ্ট স্থানে বসতে ও ভোজন করতে অস্বীকার করলেন। স্বাভবিকভাবেই কর্মকর্তা ভীমসেনের সঙ্গে তাঁদের উত্তপ্ত বাক্যালাপ হয় ও শেষ পর্যন্ত তাঁরা ভোজন না করেই সভা ত্যাগ করলেন। সুবর্ণবণিকদের আচরণে যজ্ঞের পরিবেশ অনেকটাই নষ্ট হয়, চতুর্দিকে তুমুল কোলাহল ও বাদানুবাদ হতে লাগল। বল্লাল উদবিগ্নভাবে পরিস্থিতি লক্ষ্য করছিলেন। ভীমসেনের মুখে সব শুনে বল্লাল বেরোতে থাকা সুবর্ণবণিকদের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এক রক্ত হিম করা কঠিন দৃষ্টি ফুটে উঠল। তিনি শুধু বললেন, ‘এত বড় স্পর্ধা!’ এরকম দৃষ্টি তাঁর চোখে আগে দেখা গিয়েছিল যখন তিনি অনেকদিনের বিশ্বস্ত মন্ত্রী উত্তররাঢ়ী কায়স্থ ব্যাসসিংহ ও বারেন্দ্র কায়স্থ ভৃগুনন্দীকে নির্মম দণ্ড দিয়েছিলেন কৌলীন্যপ্রথা প্রচলনের প্রতিবাদ করার জন্য। ব্যাসসিংহ কে করাত দিয়ে চিরে ফেলা হয়েছিল। এবার অবশ্য বল্লাল সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে সাথে থাকা সভাসদদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন।

যজ্ঞ শেষ হবার কিছুদিন পরের কথা। বল্লালসেনের প্রাসাদের একটি নির্জন প্রকোষ্ঠ। এখানে তিনি একান্ত বিশ্বাসভাজন পরামর্শদাতাদের সঙ্গে গোপন জরুরী মন্ত্রণা করেন। বল্লাল একটি সোনার কারুকার্য করা আসনে বসে। তিনি মধ্যম উচ্চতার, বলিষ্ঠ মধ্যবয়স্ক সুপুরুষ। তার চোখে মুখে বুদ্ধির সঙ্গে অহংকারের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তিনি মিষ্টভাষী ও শিষ্টাচারী। ভদ্র আচরণের আড়ালে তিনি মনোভাব গোপন করতে পটু। তাঁর সামনে আর একটি আসনে বসে শ্রেষ্ঠী বল্লভানন্দ। মধ্যমবর্ণ, ঈষৎ স্থূলকায় পুরুষ তিনি। চোখে মুখে স্থৈর্য ও আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট । তাঁর মাথয় উষ্ণীষ, গায়ে রেশমের উত্তরীয়, পরনে ধুতি। বস্ত্র অলংকার সবই খুব দামী, যেন নিজের পদ ও অর্থের গৌরব রাজার সামনে বেশী করে তুলে ধরতে চান। বল্লাল একবার চাপা বিরূপতার সঙ্গে তাঁর দিকে তাকালেন, তারপর গলার সুর যথাসম্ভব নরম করে বললেন, ‘শ্রেষ্ঠীবর আপনার সঙ্গে আমার বিশেষ প্রয়োজন আছে।’ বল্লভানন্দ গম্ভীর মুখে বললেন, ‘একজন সামান্য বণিকের সঙ্গে আপনার কি প্রয়োজন থাকতে পারে মহারাজ? সেদিন যজ্ঞস্থলেই তো আপনি আমাদের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন!’ দৃপ্ত উত্তর শুনে বল্লাল একটু থমকে গেলেন, তাঁর মুখে হাল্কা রোষের আভা ফুটে উঠল। তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘বর্ণাশ্রম ধর্মপালন করা যে কোনো সুশাসকের কর্তব্য। আপনারা ধনের উৎপাদক। আপনাদের গুরুত্ব আমি জানি। যা হোক, আমার এই মুহূর্তে দেড় কোটি রৌপ্য মুদ্রার প্রয়োজন। তাই আপনাকে কষ্ট দিলাম।’

বিজয়সেন পাল রাজাদের বঙ্গদেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের শক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়নি। মগধের কিছু অংশে, বিশেষ করে বৌদ্ধ বিহারগুলি কেন্দ্র করে পাল বংশ নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিলেন। চতুর বল্লাল বুঝতে পেরেছিলেন পাল রাজারা যতদিন লোকচক্ষুর সামনে থাকবেন, ততদিন গৌড়বঙ্গের জনগণ কখনই সেন বংশকে মন থেকে মেনে নেবে না। তারা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও ভুলে যাবে না। বল্লাল তাই বারবার চেষ্টা করতে লাগলেন পাল শক্তির শেষ দীপটিকেও নিভিয়ে দিতে। কিন্তু তাঁর ছল-বল-কৌশল সবই ব্যর্থ হতে লাগল। পাল রাজারা তাঁর আক্রমণ প্রতিহত করতে লাগলেন। এদিকে যুদ্ধের কারণে তাঁর প্রচুর অর্থ ব্যয় হতে থাকল। বল্লাল এমনিতেই যাগ যজ্ঞ, অপ্রয়োজনীয় দান, রাজকীয় বিলাস ইত্যাদিতে অর্থ অপচয় করতেন। কাজেই তাঁর আয় মাসে একলক্ষ স্বর্ণ নিষ্ক (দশ রৌপ্য মুদ্রায় এক নিষ্ক) হলেও শীঘ্রই রাজার অর্থাভাব দেখা দিলো। তিনি বাধ্য হলেন বণিকদের কাছ থেকে নিয়মিত ঋণ নিতে। তা তিনি শোধ দিতে পারতেন না। বল্লাল এমনিতেও বণিকদের পছন্দ করতেন না, তার মধ্যে তাদের ঋণের জালে জড়িয়ে গিয়ে তাঁর ক্রোধ আরও বাড়তে লাগল, যদিও তা তিনি বাইরে প্রকাশ করলেন না। এবার তিনি বিরাট উদ্যোগ নিচ্ছেন যাতে পাল রাজ্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেন। তার জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন, এবং তা একমাত্র বল্লভানন্দই দিতে পারেন।

শ্রেষ্ঠী বল্লভানন্দের সঙ্গে পাল বংশের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। পাল রাজারা বণিকদের পৃষ্ঠপোষক, তাছাড়া যুবক পাল নরপতি গোবিন্দপালের সঙ্গে বল্লভানন্দ তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা কাঞ্চনমালার বিবাহ দিয়েছেন। গোবিন্দপাল সুদর্শন, ব্যক্তিত্ববান, শ্রেষ্ঠীর তাঁকে প্রথম দর্শনেই ভাল লেগেছিল, সেইজন্য তিনি রাজনৈতিক ভাবে হীনবল হলেও তাঁকে বল্লভানন্দ কন্যা দান করেন। এতে বল্লালসেন রুষ্ট হতে পারেন তা তিনি জানতেন, কিন্তু শ্রেষ্ঠী ঋজু ব্যক্তিত্বের মানুষ, তাই নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। আবার বল্লালকে তিনি গোবিন্দপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ঋণও দিয়েছেন। তিনি গৌড়ের নাগরিক তাই যুদ্ধের সময় রাজাকে সাহায্য করা তাঁর কর্তব্য, ঋণ না দিলে ক্ষুব্ধ বল্লাল সমস্ত বণিকদের বিপদ ঘটাতে পারেন, সমাজপতি হিসেবে তাঁর সেটি হতে দেওয়া উচিত নয়, আবার তাঁর মনে এ আশাও রয়েছে যে তাঁর ঋণ পেলে বল্লাল যুদ্ধে বিজয়ী হলেও গোবিন্দপালের প্রতি কঠোর ব্যবহার করবেন না। সেই কারণে তিনি বল্লালকে ঋণ দিয়েছেন, কিন্তু আজ বল্লাল যে অর্থ চাইছেন…… এ যে অসম্ভব।

তিনি দ্বিধাগ্রস্তভাবে বললেন, ‘মহারাজ, আপনি যে অংক চাইছেন তা এককালীন দেওয়া আমার সাধ্যাতীত। তাছাড়া আগের ঋণগুলি যার পরিমাণ এক কোটি মুদ্রা, এখনও শোধ হয়নি।’ তাঁর অমিতব্যায়িতার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে বুঝে বল্লাল চাপা ক্রুদ্ধ স্বরে বলেন, ‘আপনি কি আমাকে সন্দেহ করেন? আপনার কি ধারণা আমি আপনার অর্থ ফেরত দেব না ?’ তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘দেখুন, এই অর্থ আমার একান্ত প্রয়োজন, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আপনার সমস্ত অর্থই আমি দ্রুত ফিরিয়ে দেব।’ বল্লভানন্দ রাজার স্বরূপ জানেন, তিনি একটু চিন্তা করে বললেন, ‘খুবই কষ্টসাধ্য, তাও আমি এই অর্থ আপনাকে সংগ্রহ করে দেবো। তবে হরিকেল প্রদেশটি আমার কাছে বন্ধক রাখতে হবে।’ বল্লাল হতচকিত হয়ে বললেন, ‘রাজ্য বন্ধক রাখতে হবে? এ কাজ কোন রাজার পক্ষে করা সম্ভব?’ বল্লভানন্দ দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘যথেষ্ট সম্পত্তি বন্ধক না পেলে এই অর্থ দেওয়া যাবে না মহারাজ। কারণ যদি আপনি এই বিপুল অংক পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে? বা যদি যুদ্ধে আপনার পরাজয় হয়?’ বল্লাল উঠে দাঁড়িয়ে গর্জে ওঠেন, ‘নিজের সীমা ছাড়াবেন না শ্রেষ্ঠী। আসলে আপনি চান না যে আমি এই যুদ্ধে সফল হই। আপনি রাজদ্রোহী। মনে রাখবেন আপনার সাহায্য ছাড়াই আমি যুদ্ধ করতে ও আপনার জামাতাকে ধ্বংস করতে সক্ষম।’ বল্লভানন্দও উঠে পড়েছিলেন, বল্লালের কথা শুনে একটু থমকালেন, তারপর বললেন, ‘বেশ তো। তবে ব্যক্তিগত মান অভিমানকে গুরুত্ব না দিয়ে রাজার উচিত সুশাসন করা।’

বল্লভানন্দ অর্থ না দেওয়ায় বল্লালের পক্ষে যুদ্ধের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি মনে মনে প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলেছেন, কিন্তু আর্থিক বিপর্যয়ের ভয়ে সুবর্ণ বণিকদের কোন ক্ষতি করতে পারেননি। কুটিল বল্লাল বাইরে স্বাভাবিক থেকেছেন, ভিতরে প্রতীক্ষায় থেকেছেন শুধুমাত্র একটি সুযোগের, যা পাওয়া মাত্রই তিনি সুবর্ণ বণিকদের নির্মূল করবেন। মানুষ খুব আন্তরিক ভাবে কিছু চাইলে অনেক সময় তা পায়, বল্লালেরও সুযোগ এসে গেল।

গৌড় নগরে কুন্দন আচার্যের বাড়ি। তিনি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, তাঁর বিদ্যা আছে কিন্তু, অর্থ নেই। বল্লাল তাঁকে কুল দিয়েছেন এবং অন্য বাহ্মণ পণ্ডিত যারা কৌলিন্য পেয়েছেন, তাঁদের মত তাঁকেও উপহার দিয়েছেন একটি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি ধেনুর মূর্তি। কুন্দন দরিদ্র হলেও, তাঁর কুল মর্যাদার প্রতীক এই ধেনুটিকে বিক্রয় করেননি। একদিন কুন্দন গ্রামে এক শিষ্যের বাড়ি গেছেন, বাড়িতে বাহ্মণী একা। গভীর রাতে এক বাহ্মণ অতিথি দরজায় কড়া নাড়লেন। দূরদেশ থেকে গৌড় নগরে এসেছেন বিশেষ প্রয়োজনে। রাতটুকুর জন্য আশ্রয় ও কিছু আহার চাই। অতিথি নারায়ণ, তাঁকে ফেরানো যায় না, কিন্তু ব্রাহ্মণীর অবস্থা তখন সত্যিই করুণ, তাঁর ঘরে অর্থ বা আহার্য কিছুই নেই। কুন্দন অর্থ সংগ্রহের চেষ্টাতেই শিষ্যবাড়ি গেছেন। এই অসহায় অবস্থায় ব্রাহ্মণীর মনে পড়ল সুবর্ণ ধেনুটির কথা। ওটিকে কোথাও বন্ধক রেখে সামান্য অর্থ নিয়ে অতিথি সেবা করা যায়। বাড়ি থেকে খানিক দূরেই বিখ্যাত স্বর্ণকার মণিদত্তের দোকান। তার আরেকটি পরিচয়, সে বল্লভানন্দের ভাগিনেয়। ব্রাহ্মণী এক প্রতিবেশীকে দিয়ে ধেনুটি মণিদত্তের দোকানে পাঠালেন, সেখানে রাতে যে কর্মচারীটি থাকত সে ওটি নিয়ে একটি তাম্র মুদ্রা ধার দিল। তা দিয়ে ব্রাহ্মণী বিধিমতে অতিথিসেবা করলেন। পরদিন বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পর কুন্দন ফিরলেন প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে। সব শুনে তাঁর মন শংকিত হয়ে উঠল। ধূর্ত স্বর্ণকারের হাতে সুবর্ণধেনু পড়েছে, তা ফেরত পাওয়া যাবে তো? তখনই একটি তাম্রমুদ্রা নিয়ে তিনি ছুটলেন মণিদত্তের দোকানে।

মণিদত্ত সকালে এসেই সুবর্ণধেনুটি দেখেছে। এও বুঝেছে যে সরল ব্রাহ্মণের কাছে কোন প্রমাণ নেই যে ধেনুটি তার কাছে আছে, আর দেরি না করে সে ধেনুটি গলিয়ে ফেলে একটি গোলক তৈরি করে। পরে যখন কুন্দন এসে ধেনুটি ফেরত চান, মণিদত্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে তাঁর কাছে ওরকম সুবর্ণধেনু নেই, কোনদিন ছিলও না। বরং সে কুন্দনকে মিথ্যাবাদী বলে চোখ রাঙায়। কুন্দন আচার্যও ছাড়বার পাত্র নন। এই তঞ্চকতা তিনি সহ্য করতে পারলেন না, সরাসরি রাজদ্বারে অভিযোগ জানালেন। বল্লালের দ্বার ব্রাহ্মণ পন্ডিতের কাছে সবসময়ই অবারিত, কাজেই অভিযোগ সোজা তাঁর কানেই পৌঁছল। চতুর বল্লাল বুঝলেন তাঁর সামনে সুযোগ এসেছে বল্লভানন্দ ও সমস্ত সুবর্ণবণিক দের অপদস্থ করার। তিনি নিজে ব্রাহ্মণের অভিযোগের তদন্ত করতে লাগলেন। মণিদত্তের দোকান তল্লাশি করে যা পাওয়া গেল তার মধ্যে সেই গোলকটি ছিল। কুন্দনকে যখন জিনিসগুলো দেখানো হলো, তাঁরও চোখ পড়লো ওই গোলকটির দিকে। কিরকম সন্দেহ হলো তাঁর। ওজন করে দেখা গেল গোলকটির ওজন ১০৮ তোলা। সুবর্ণধেনুটিরও ওজন ১০৮ তোলা, তাই কুন্দন দাবী করলেন, মণিদত্ত প্রমাণ লোপের জন্য ধেনুটিকে গলিয়ে গোলক তৈরি করেছে। কিন্তু মণিদত্তও অতি চতুর। সুবর্ণধেনুটি তৈরির সময় স্বাভাবিক ভাবেই তাতে কিছু খাদ মেশাতে হয়েছিল, কাজেই সেটি গলিয়ে গোলক তৈরি করলে তাতেও খাদ থাকবে। মণিদত্ত দাবী করল গোলকটিতে কোন খাদ নেই, সেটি একদম খাঁটি সোনা। মণিদত্তের কথা ঠিক কিনা সেটি কোন দক্ষ সুবর্ণবণিক বা স্বর্ণকারই বলতে পারে। বল্লাল এক ঢিলে বহু পাখি মারার জন্য ও তাঁকে চরম পরীক্ষায় ফেলবার জন্য বল্লভানন্দকেই মণিদত্তের দাবীর সত্যাসত্য নির্ধারণের জন্য ডাকলেন।

বল্লভানন্দ বুঝলেন নিদারুণ বিপদ আসন্ন। মণিদত্ত যে অন্যায় করেছে তা তিনি ভালই বুঝতে পেরেছেন। বল্লভানন্দ জীবনে কখনই অন্যায়কে প্রশয় দেননি বা মিথ্যা বলেননি। কিন্তু তিনি এবার যদি সত্যি বলেন, তাহলে মণিদত্ত দোষী প্রমাণিত হবে ও বল্লাল সেই সুযোগে সমস্ত সুবর্ণবণিক সমাজকে অপদস্থ করবেন।……….রাজপ্রাসাদের মন্ত্রণা কক্ষ। সেখানে বল্লাল ও তাঁর মুখ্য অমাত্যরা বসে। বল্লালের সামনে গোলকটি রাখা রয়েছে। বল্লভানন্দ প্রধান কয়েকজন বণিক ও স্বর্ণকারকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। বল্লাল গোলকটির দিকে ইঙ্গিত করলেন। বল্লভানন্দ ওটি হাতে তুলে নিয়ে একমনে পরীক্ষা করলেন, তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, ‘মণিদত্ত ঠিকই বলেছে মহারাজ, এটি খাঁটি সোনা।’ তারপর তিনি গোলকটি তাঁর সঙ্গীদের দিকে এগিয়ে দিলেন। তাঁরাও দলপতির মনোভাব বুঝে ওটি দেখে বললেন, ‘হাঁ মহারাজ, এটি খাঁটি সোনা।’ বল্লালের মুখে চাপা সন্দেহ ও বিরক্তি ফুটে উঠল, তারপর অবশ্য তিনি সংযত ভাবে বললেন, ‘ঠিক আছে শ্রেষ্ঠীবর, আপনি যখন বলছেন নিশ্চয় তাই।’ …………..রাজসভা থেকে খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরেছিলেন বল্লভানন্দ। ভেবেছিলেন একটি মিথ্যা বলে তিনি পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি বল্লালকে চিনতেই পারেননি, বুঝতে পারেননি তিনি কত কূট ও হিংস্র। বল্লাল রাজসভায় শ্রেষ্ঠীর মুখের ভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি মিথ্যা বলছেন। সুবর্ণবণিকদের মধ্যে গুপ্তচর পাঠিয়ে তাঁর ধারণা আরও দৃঢ় হয়।

তিনি মামলার বিচার বন্ধ করলেন না। বরং বঙ্গদেশের বাইরে কাশী থেকে একদল স্বর্ণকার আনালেন গোলকটিকে পরীক্ষা করার জন্য। তাদের এমনভাবে প্রহরীবেষ্টিত করে রাখলেন, যাতে বল্লভানন্দ তাঁদের সঙ্গে কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে না পারেন। রাজসভায় গোলকটি পরীক্ষা করে কাশীর স্বর্ণকারেরা নিদ্ধিধায় সবার সামনে ঘোষণা করলেন যে ওটি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি নয়, ওটিতে খাদ মেশানো আছে, যে পরিমাণ খাদ সুবর্ণধেনুটি করতে লেগেছিল। সেদিন বল্লালের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন সসাগরা ধরণী জয় করেছেন।

সেদিন চরম সর্বনাশের জন্য প্রস্তুত হয়েই রাজসভায় গিয়েছিলেন বল্লভানন্দ। বল্লাল প্রমাণ করতে পেরেছেন যে তিনি মিথ্যাবাদী ও তাঁর ভাগিনেয় চোর। নিঃসন্দেহে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেবেন তিনি। বিস্তীর্ণ রাজসভাস্থল, তার উত্তরে শ্বেত পাথরের উঁচু বেদী, তার উপর মণিরত্ন খচিত সিংহাসন, তাতে সম্রাট বল্লালসেন বসে। মাথায় হীরকখচিত মুকুট, অঙ্গে মহার্ঘ রাজবেশ ও অলংকার, তাঁর উপর রক্তবর্ণ রাজছত্র ধারণ করে এক সেবক পিছনে দাঁড়িয়ে। সিংহাসনের একপাশে সৌম্যদর্শন স্তিতধী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা বসে, অপরপাশে মহামাত্য, মহাসামন্ত, উপরিক ইত্যাদি সভাসদেরা। রাজার সামনে বল্লভানন্দ, মণিদত্ত ও অন্য কয়েকজন সুবর্ণবণিক প্রধান সাধারণ বেশে দীনভাবে দাঁড়িয়ে। বল্লাল মমত্বহীন কঠোর সুরে ব্রাহ্মণদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই চোর ও মিথ্যাবাদী বণিকদের কী শাস্তি হওয়া উচিত?’ সভাপণ্ডিত অনিরুদ্ধ ভট্ট গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘মহারাজ, এই সুবর্ণবণিকরা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে আসছে, আজ তারা ব্রাহ্মণের ধন পর্যন্ত অপহরণ করেছে। এদেরকে মৃত্যুদন্ডই দেওয়া উচিত। তবে আমি মহারাজকে বলব ক্ষমাশীল হতে, মৃত্যুদন্ড না দিয়ে সমস্ত সুবর্ণবণিক জাতিকে সমাজচ্যুত করে তাদের ধন রাজকোষে ক্রোক করতে। আর দুই প্রধান অভিযুক্ত শ্রেষ্ঠী বল্লভানন্দ ও তার ভাগিনেয় মণিদত্তকে আজীবন কারাবাস দিতে।’ মহারাজের মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল, তিনি বললেন, ‘আপনাদের পরামর্শ শিরোধার্য।’………….বল্লভানন্দ নিজের মনকে প্রস্তুত রেখেছিলেন, তাও রাজার শাস্তি শুনে চমকে গেলেন, এতো মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর, সমস্ত সুবর্ণবণিক সমাজ চিরদিনের জন্য বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। তিনি বলতে গেলেন, ‘মহারাজ……’ ততক্ষণে নিঃশব্দে প্রহরীরা এসে তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের ঘিরে ধরেছে। বল্লাল ক্রুর হেসে বললেন, ‘আজ আপনার আর কিছু বলার থাকতে পারে না শ্রেষ্ঠী।’

গৌড় নগরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দিনের কোলাহল স্থিমিত হয়ে আসে। জানালা দিয়ে মন খারাপ করা গোলাপী আলো ঘরে প্রবেশ করছে। ঘরে সিংহগিরি ও হিরন্ময়ী চুপ করে বসে। হিরন্ময়ী স্তব্ধতা ভেঙে বলে, ‘হ্যাঁ আমার মনে আছে আচার্য, সেই দিনের কথা, পিতা আর গৃহে ফিরতে পারেননি, রাজসভা থেকেই তাঁকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনে রাজসৈন্য প্রবেশ করে আমাদের সম্পত্তি অধিকার করার জন্য। তাদের দেখে ও পিতার খবর শুনে মাতা জ্ঞান হারান। কয়েকদিন মাত্র আর জীবিত ছিলেন তিনি। ভবনও প্রশাসন দখল করে নেয়।’ সিংহগিরি উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ মা, সেই সময় আমি তোমাকে ওখান থেকে কোনওক্রমে নিয়ে আসি। তোমার পিতা ও মাতা আমাকে বড় শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু আমি তাঁদের জন্য কিছু করতে পারিনি। তবু আমি চেয়েছিলাম অন্তত তোমাকে নিরাপদে রাখতে, বড় করে তুলতে। সেইজন্য সুদূর গ্রামে শিষ্যের বাড়িতে তোমাকে লুকিয়ে রেখেছি বারো বছর। আজ তুমি বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছ, এখন তোমাকে এক ভীষণ কর্তব্যের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বল্লভানন্দের পুত্র ছিল না, কাজেই তোমাকেই তোমার পিতার বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে হবে। বঙ্গবাসীর উপর সে যে অত্যাচার করছে, তার শাস্তি বল্লালকে দিতেই হবে।’ হিরন্ময়ী বলে, ‘কিন্তু আচার্য, আপনি যা বলছেন তা অসম্ভব। বল্লাল সেন এখন অপ্রতিদ্বন্দী সম্রাট। সুবর্ণবণিকদের কাছ থেকে সে যে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে  তা দিয়ে সে ভীষণ যুদ্ধের উদ্যোগ নেয় এবং গোবিন্দপালকে পরাজিত ও মগধ থেকে বিতাড়িত করে। তিনি ও আমার দিদি কোথায় তা কেউ জানেনা। পিতাও কারাগারে এক বছরের মধ্যে মারা যান। এখন আমি, এক অসহায় দুর্বল তরুণী সম্রাটের বিরুদ্ধে কী করবো? আমি তাঁর কাছে পৌঁছতেই পারব না!’ হতাশভাবে বলে হিরণ্ময়ী। ‘পারবে’, ভরসা দেন আচার্য, ‘আমি সেই ব্যবস্থা করবো। দেখো, এই কবছরে বল্লাল বাইরে যতখানি শক্তিশালী হয়েছে, ভিতর থেকে ততখানিই দুর্বল। সে জানে যে যুদ্ধে জয়ী হলেও কেউ তাকে শ্রদ্ধা করে না বা ভালবাসে না। তাই কাউকে সে বিশ্বাস করে না, সর্বক্ষণ সে ভয়ে ভয়ে থাকে। নিজের স্ত্রী-পুত্রদেরকেও সে সন্দেহের চোখে দেখে, কাজেই তারাও তাকে অপছন্দ করে। অতএব সর্বশক্তিমান হয়েও সে ভীষণভাবে একা। এছাড়া তার বয়স হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক ক্ষয় শুরু হয়েছে। বল্লাল বুঝতে পারছে যে সে হীনবল হয়ে পড়ছে, তাই সে এখন অলৌকিকত্বের সাহায্যে নিজের শক্তি ধরে রাখতে চাইছে। তার দুর্বলতার কথা বুঝতে পেরে আমি তাঁর কাছে যাই। তান্ত্রিক সাধক হিসেবে আমার খ্যাতি সে জানত, কাজেই তার বিশ্বাস অর্জন করতে আমার দেরি হয়নি। তাকে আমি বোঝাতে পেরেছি যে আমার নির্দেশ অনুযায়ী তন্ত্রসাধনা করলে সে চিরযৌবনের অধিকারী হবে। সে এখন ওই পথেই চলছে। আমি তাকে বুঝিয়েছি যে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে হলে তাকে আমার নির্বাচিত এক সুলক্ষণা তরুণী কুমারীর সঙ্গে বেশ কিছুদিন সহবাস করতে হবে। বল্লাল চিরদিনই সুন্দরীদের প্রতি দুর্বল, সে সহজেই রাজি হয়েছে।’ হিরন্ময়ী চুপ করে থাকে, সিংহগিরি তার মাথায় হাত রেখে স্নেহের সুরে বলেন, ‘এছাড়া যে আর উপায় নেই, মা, পরিবারের সবার কথা মনে রেখে একাজ তোমাকে করতেই হবে।’ হিরন্ময়ী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।

গৌড়নগরের এক প্রান্তে নির্জনে বল্লালসেনের উদ্যানবাটি। সাদা রঙের ছোট কিন্তু সুন্দর বাড়ি, তাকে ঘিরে নানারকম রঙের ফুলের বাগান, একটি স্বচ্ছ নির্মল জলাশয়ও আছে। সবমিলিয়ে পরিবেশটি ভারি মনোরম, তবে পাঁচিলের বাইরে কড়া পাহারা, অচেনা কারও প্রবেশ নিষেধ। আজকাল সম্রাট বল্লালসেন এখানেই থাকেন, প্রাসাদের কোলাহল, ব্যস্ততা, আর তাঁর ভালো লাগে না। প্রত্যেকটি মানুষকেই মনে হয় স্বার্থাণ্বেষী। তাছাড়া সিংহগিরির নির্দেশে তিনি গোপন তন্ত্রসাধনা করছেন, সেই বিষয়েও কাউকে জানতে দিতে চান না। ভবনের ভিতরে একটি কক্ষে বল্লাল বসে, সিংহগিরির আগমনের অপেক্ষায়। তিনি হিরন্ময়ীকে নিয়ে প্রবেশ করতেই বল্লাল তাড়াতাড়ি উঠে জোড় হাতে বললেন, ‘নমস্কার আচার্য। আপনি এতদিন ছিলেন না, আমি উদবিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।’ বল্লালের চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে, নিয়মিত মদ্যপানের ফলে চোখদুটি একটু লাল। সিংহগিরি মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনার কাজেই তো গিয়েছিলাম মহারাজ। তথাগতের ইচ্ছায় উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।’ বলে হিরন্ময়ীর দিকে ইঙ্গিত করলেন। বল্লাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সে দিকে তাকালেন। সিংহগিরি হিরন্ময়ীর মুখের উপর থেকে অবগুণ্ঠন সরিয়ে নিলেন। বল্লাল অভিজ্ঞ পুরুষের দৃষ্টিতে তন্বী সুমুখশ্রী হিরন্ময়ীকে মাপতে লাগলেন। সে কিন্তু লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল না, বরং সহজভাবে রাজার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তার লাবণ্যমাখা সরল চাহনিটি ভাল লাগল বল্লালের। তিনি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন ‘তোমার নাম কি?’ সে চাপা সুরে বলল, ‘পদ্মিনী।।…….. আমি ব্রাহ্মণ নই।’

বল্লালের ভালো লাগার অনুভূতিটি ক্রমশ বাড়তে থাকে। আচার্য তাঁকে বলেছেন মেয়েটিকে সর্বক্ষণের সঙ্গী করে নিতে, এটি সাধনায় বিশেষ প্রয়োজনীয়। কাজেই পদ্মিনী কাছে থাকে, কথাবার্তা বলে, সেবা যত্ন করে। বল্লালের পদ্মিনীকে প্রথম দর্শনেই ভাল লেগেছিল,এখন তাকে আরও কাছে টেনে নিতে থাকেন। তাঁর সবচেয়ে ভাল লাগে মেয়েটির সারল্য আর রুচি। পদ্মিনী গ্রামের মেয়ে কিন্তু তাঁর কথাবার্তা স্পষ্ট ও পরিশীলিত, তাতে শিক্ষার ছাপ পরিষ্কার, সে রাজার সঙ্গেও নিঃসংকোচে কথা বলে কিন্তু দুর্বিনীত বা প্রগলভ হয় না। তার আচরণ জড়তাহীন কিন্তু নম্র। বল্লাল নারীসঙ্গ কম করেননি জীবনে, ছজন মহিষী তাঁর, এছাড়া উপপত্নী, বা নটী তো অজস্র, কিন্তু তাদের কথা ভাবলেই এখন বিরক্তি আসে। কেউ উগ্র, কেউ বাচাল, কেউ বা নির্বোধ, আর প্রতেকেই শরীরসর্বস্ব স্বার্থপর। মানসিক ভাবে কেউই তাঁকে সঙ্গ দিতে পারেনি। অবশ্য মানসিক সঙ্গের কথা কি তিনি কোনও দিন ভেবেছেন সেভাবে? যুবরাজ লক্ষণসেনের মাতা পাটরানী তন্দ্রাদেবীর সঙ্গে তাঁর একপ্রকার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো, দুজনের বয়সও কাছাকাছি। কিন্তু এখন তিনি প্রৌঢ় হয়েছেন, বল্লালও আর আকর্ষণ বোধ করেন না তাঁর প্রতি। পদ্মিনীকে পেয়ে যেন তিনি জীবন নদীতে কুল পেয়েছেন। রাজকন্যার মিথ্যা অহংকার নেই, অহেতুক শরীরী উগ্রতা নেই, পদ্মিনী সহজ ও স্নিগ্ধ। বল্লালের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে নারীর সঙ্গে প্রকৃত বন্ধুত্বের যে আকুতি ছিল, তা পদ্মিনীকে দেখে পূর্ণরূপে ফুটে উঠল।

একদিন বল্লাল সায়মাশ গ্রহণের সময় পদ্মিনীকে পরিবেশন করতে বললেন। তাঁর মনে হলো পদ্মিনী তাঁর যত্ন নিলেও কখনও নিজের হাতে খেতে দেয় না। তাঁর অনুরোধ শুনে পদ্মিনী কিরকম আড়ষ্ট হয়ে গেল। মাথা নিচু করে বলল, ‘তা হয় না মহারাজ।’ বল্লাল ঈষৎ বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘কেন?’ সে মাথা নত করে মৃদু স্বরে বলল, ‘মহারাজ, আমি হড্ডিকা।’ রাজা সচকিত হয়ে বললেন, ‘কি’? পদ্মিনী ব্রাহ্মণ নয়, গ্রাম্য মেয়ে, কাজেই কোন সাধারণ জাতির হতে পারে, সেটি বল্লাল ভেবেছিলেন। কিন্তু তাই বলে হাড়ি, যাদের কাজ মড়া পোড়ানো? আচার্য এ কী করলেন? রীতিমত বিব্রত হয়ে পড়েছেন রাজা, তখনই সজল চোখে পদ্মিনী বলল , ‘আপনি কি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন মহারাজ?’ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন বল্লাল, ধীরে ধীরে তাঁর চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে আসে। জীবনে প্রথমবার কাউকে মন দিয়ে ফেলেছেন তিনি, আর তাকে দূরে সরিয়ে দিতে ইচ্ছা হয় না। মেয়েটি এত ভাল, কি এসে যায় তার জাতে? বরং ওর সততা মুগ্ধ করার মত, নিজের বিপদ জেনেও যাতে তাঁর সামাজিক কলঙ্ক না হয় সে জন্য সে খাদ্য পরিবেশনের আগেই তাঁকে সাবধান করেছে। তাছাড়া আচার্য তো বলেইছেন যে তন্ত্রসাধনার সার্থক সঙ্গীনি হল ডোমকন্যা। এসব ভেবে নিজেকে প্রবোধ দেন বল্লাল, ভুলে যান যে কিছুদিন আগেও রাজসভায় তিনি সদম্ভে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছেন। তাঁর উৎসাহেই গৌড় বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতিভেদের প্রাচীর উঠেছে, নিপীড়িত হচ্ছে অনেক সাধারণ মানুষ। স্থবির ক্লান্ত মনের দুর্বলতার কাছে হার মানে কৃত্রিম সংস্কার। বল্লাল সস্নেহে বলেন, ‘তুমি খাদ্য পরিবেশন করো।’

এই ঘটনার পর থেকে বল্লাল মানসিক ভাবে আরও বেশী করে পদ্মিনীর উপর নির্ভর করতে থাকেন। তার সঙ্গে রাজ্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তাকে দুহাত ভরে বস্ত্র, অলংকার ও অন্যান্য উপহার দেন,পদ্মিনীর কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখতে চান না তিনি। মনে মনে স্থির করেছেন কিছুদিন বাদে পদ্মিনীকে বিবাহ করবেন, সে হবে তাঁর সপ্তম রাণী। আর তার পুত্র সন্তান হলে তাকে দেবেন অর্ধেক রাজ্য। সেদিন সন্ধ্যা বেলায় পদ্মিনীর কক্ষে প্রবেশ করেন বল্লাল। মদ্যপানের ফলে পা ঈষৎ টলমল, মন অতি প্রফুল্ল। পদ্মিনী সাজসজ্জাও করেছে জমকালো উগ্রভাবে। অনেকগুলি দীপের আলোয় তার গা ভর্তি অলংকার ঝলমল করে বল্লালের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, পদ্মিনীকে আজ দেখাচ্ছেও মোহময়ী। রাজা কোনওক্রমে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করে নিয়ে তার পাশে বসলেন। রঙ্গভরে তাকে বলেন, ‘আজ আমার পদ্মিনীকে অপূর্ব মনে হচ্ছে। ভাবছি আমার রত্নপেটিকায় তোমাকে আজীবনের জন্য রেখে দেব।’ পদ্মিনী শুধু হাসে। রাজা বলেন, ‘হ্যাঁ পদ্মিনী, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। তাই ঠিক করলাম যে তোমাকে বিবাহ করবো, রাণীর মর্যাদা দেবো। এটিই হবে আমাদের নতূন রাজপ্রাসাদ।’ পদ্মিনী গম্ভীর হয়ে যায়, বলে ‘তা কি করে সম্ভব মহারাজ? তা হয় না।’ বল্লাল বিস্মিত হন, ‘কেন? হয় না কেন?’ ‘মহারাজ আমি হাড়ির কন্যা। আপনার এই বিবাহকে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য পণ্ডিতরা কখনই স্বীকৃতি দেবে না। আমার কোন উন্নতি হবে না, বরং আমার জন্য আপনার অমর্যাদা হবে।’ পদ্মিনীর কথা শুনতে শুনতে মত্ত বল্লালের চোখ দুটি আরও লাল হয়ে ওঠে, ‘কী? আমারই অর্থে পালিত ওই ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যরা আমার বিরোধিতা করবে? তোমার অমর্যাদা করবে?’ গর্জে ওঠেন তিনি, তারপর একটু সামলে নিয়ে বলেন, ‘ব্যবস্থা করছি। কদিনের মধ্যেই আমি এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো। রাজ্যের বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সমাজপতিদের তাতে নিমন্ত্রণ করবো। সেদিন তুমি তাদের নিজে রেঁধে পরিবেশন করে খাওয়াবে। এই ভাবে আমি তোমাকে কুলমর্যাদা দেওয়াব।’ পদ্মিনী তাও ম্লান হয়ে থাকে, বলে ‘তাতেই বা কি হবে মহারাজ, আমি তো আর আপনার সমান হতে পারব না। আপনি যে উপবীত ধারণ করে রয়েছেন তাই বলে দিচ্ছে যে আপনি কত উচ্চ বংশের সন্তান। সেখানে কোথায় আমি? না মহারাজ আমার বোধহয় দূরে থাকাই ভালো।’ বলে একটু সরে বসে পদ্মিনী। বল্লাল ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, ‘সে কি? একথা কেন বলছ? উপবীতে কি আসে যায়?’ ‘আসে যায় মহারাজ’, রুদ্ধ কণ্ঠে বলে পদ্মিনী। ‘ঠিক আছে, নাও এই আমি উপবীত ত্যাগ করলাম’ বলে মত্ত অধৈর্য বল্লাল নিজের উপবীত খুলে পদ্মিনীর পায়ের কাছে ছুঁড়ে দেন। ‘এবার তো কাছে এসো।’ সনাতন সংস্কৃতির রক্ষক রাজার এই হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়া দেখে চাপা হাসে পদ্মিনী, তার চোখে এক লহমার জন্য কঠোর ভাব ফুটে ওঠে, তারপর সে এগিয়ে এসে বল্লালকে গাঢ় আলিঙ্গন করে।

রাজপ্রাসাদের একটি কক্ষ। রাজগুরু ভীম উপাধ্যায়, যুবরাজ লক্ষ্মণসেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ অমাত্য হলায়ুধ ও উমাপতিধর বসে পরামর্শ করছেন। লক্ষ্মণসেন দীর্ঘকায়, বলিষ্ঠ দেহ, গৌরবর্ণ, তাঁর লাবণ্যময় মুখে তাঁর পিতার মত অহংকার ও কুটিলতার ছাপ নেই, বরং সরলতা ও স্বাভাবিক প্রফুল্লতা মাখানো রয়েছে। এখন অবশ্য তাঁর মুখে ক্ষোভ ও বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বললেন, ‘আমি জানি পুত্র হয়ে পিতার সমালোচনা করা অন্যায় কিন্তু পরিস্থিতি অসহ্য হয়ে উঠেছে। পিতা ওই হড্ডিকার সঙ্গে সহবাস করে তাঁকে রাণীর মর্যাদা দিতে চেয়ে রাজবংশের মুখে কলঙ্ক লেপন করেছেন। সমস্ত সমাজকে অনাচার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। স্ত্রী, পুত্র, রাজসভা, দৈনন্দিন কাজ সব ভুলে গেছেন তিনি। সমস্ত আর্যাবর্তের উপর তুরস্ক যবনদের আক্রমণের আশংকা বাড়ছে। এসময় পিতা কোথায় আরও বেশি কাজে মনোযোগী হবেন, তা নয়……’ চুপ করে যান ক্ষুব্ধ লক্ষ্মণসেন। ‘আপনি ঠিক কথাই বলেছেন কুমার। মহারাজ হড্ডিকা সংসর্গ করে যথেষ্ট অন্যায় করেছেন। কিন্তু তাঁর অপকর্মের জন্য সামাজিক সমর্থন লাভের চেষ্টা আরও বিপদজনক। তাঁর প্ররোচনায় বহু ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য হড্ডিকার পরিবেশিত অন্ন গ্রহণ করেছেন। অনুষ্ঠানের দিন তাঁদেরকে গুরুভার সোনার পিঁড়িতে বসানো হয়েছিল, সেগুলিই তাঁরা দক্ষিণা হিসাবে লাভ করেছেন। এইভাবেই সমাজের বিদ্বান, বুদ্ধিমান মানুষকে লুব্ধ করাটাই অনৈতিক। এছাড়া মহারাজ উপবীত ত্যাগ করেছেন, যবন পদ্ধতিতে প্রস্তুত নিষিদ্ধ মাংস খাচ্ছেন—–ছি ছি ছি!’ আহত কণ্ঠে উত্তর দেন কুলপুরোহিত। ‘না আর নয়। মহারাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অসঙ্গত। তাই আমি ঠিক করেছি যত শীঘ্র সম্ভব মাতা ও স্ত্রীকে নিয়ে রাজভবন ত্যাগ করবো। রাঢ়দেশে স্বাধীন ভাবে থাকবো। মহারাজ যা পারেন করুন’, উঠে দাঁড়িয়ে বলেন লক্ষ্মণসেন। ‘আমিও আর অনাচারী বল্লালের আশ্রয়ে বাস করতে চাই না। আমার প্রয়োজন এখানে ফুরিয়েছে। পৈতৃক গ্রামে ফিরে যাবো।’ উঠতে উঠতে বললেন ভীম উপাধ্যায়।

গঙ্গানদীর তীরে কংসহট্ট গ্রাম। কিছুদিন হল এখানেই বল্লালের আবাস। গত কয়েক বছর সুখের হয়নি বল্লালের জীবনে। তাঁর স্ত্রী-পুত্র-পুত্রবধু তাঁকে ত্যাগ করে গেছেন। রাজকর্মচারীদের অনেকেই তাঁর ওপর বিরক্ত, ব্রাহ্মণ বৈদ্য পণ্ডিতরা অনাচারের ভয়ে তাঁকে এড়িয়ে চলেন, তবু পদ্মিনীর মোহ তিনি ত্যাগ করতে পারেননি। আবার প্রত্যেকেই এর বিরোধী বুঝে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ করাও হয়ে ওঠেনি। লোকে তাঁকে বিবেকহীন অনাচারী ভাবে, কিন্তু তাঁর মনে স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্য যে চাপা হাহাকার, তাঁর কথা একমাত্র তিনিই জানেন। তাঁর বয়সও হয়েছে, শেষ পর্যন্ত শরীর ভেঙ্গে পড়লো। বল্লাল কখনই অসুস্থ হতেন না, এইবার তাঁর কঠিন ব্যাধি হলো, চিকিৎসকরা চিন্তিত হলেন। লক্ষণ ভাল নয়, বল্লাল নিজেও বুঝলেন সম্ভবত তাঁর দিন শেষ হয়ে আসছে। স্থির করলেন গৌড় ছেড়ে গঙ্গার তীরে কংসহট্টে যাবেন বায়ুপরিবর্তন ও শেষ জীবনে তীর্থবাসের পূণ্যলাভের জন্য। পদ্মিনীকেও সঙ্গে নিলেন। তীর্থে দূষিত মন নিয়ে থাকা যায় না, সেখানে মানুষ যায় আগের সব পাপ ধুয়ে ফেলতে। কাজেই সঙ্গী ব্রাহ্মণেরা অনেক কঠোর নিয়ম বেঁধে দিলেন বল্লালের জীবন যাপনের জন্য। অসুস্থ শরীরে সেসব মানতে গিয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়লেন বল্লাল। পাশে পরিবার পরিজন কেউ নেই যে একটু সান্ত্বনা দেবে। কাছের মানুষ বলতে পদ্মিনী, তাকেই আরও বেশী করে আঁকড়ে ধরতে চান বল্লাল। তবে কংসহট্টে আসার পর থেকে তিনি পদ্মিনীর মধ্যেও কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। সে আগের মত আর তাঁর ছায়াসঙ্গিনী নয়, বরং তাঁকে কিছুটা এড়িয়ে চলে, কাছে এসে বসতেই চায় না। সম্ভবত তার মন ভাল নেই, হয়ত তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। বল্লাল ঠিক করেন আজ পদ্মিনীকে কাছে ডাকবেন, নিশ্চিন্ত করবেন, জানাবেন যে সামান্য সুস্থ হয়েই তিনি ওকে বিবাহ করবেন। দরকার নেই রাজ্য-রাজধানীর, দুজনে শেষ বয়সে এই তীর্থেই বাস করবেন, আর তাঁর মৃত্যুর সময় তাকে দিয়ে যাবেন বিপুল সম্পদ। কত আনন্দিত হবে পদ্মিনী, ভেবে ক্ষীণ হাসেন বল্লাল।

রাজা ডাকেন তাকে, তার মলিন সাধারণ বেশ দেখে একটু অবাক হন, তারপর তাকে সব কথা খুলে বলেন। শুনতে শুনতে পদ্মিনীর মুখে বিচিত্র এক হাসি ফুটে ওঠে। রাজা বলেন, ‘তুমি নিশ্চিন্ত থেকো।’ পদ্মিনী শান্ত শাণিত সুরে বলে, ‘আজ আমি সত্যিই নিশ্চিন্ত মহারাজ। সমস্ত জীবনের উদ্দেশ্য আজ সার্থক হয়েছে। আমাকে চিনতে পারছেন মহারাজ? আমি শ্রেষ্ঠী বল্লভানন্দের কন্যা হিরন্ময়ী। মনে পড়ছে কিভাবে পিতাকে আপনি অপমানিত, নিঃস্ব করে হত্যা করেছিলেন? কিভাবে আমার সমস্ত পরিবারকে আপনি ধ্বংস করেছেন? আপনার শঠতা আর ক্ষমতালিপ্সার জন্য এরকম কত সংসার শেষ হয়ে গেছে! তাদের সবার হয়ে প্রতিশোধ নিলাম মহারাজ। আজ আপনিও অসহায়, অশক্ত, আত্মীয় স্বজন, প্রজাদের দ্বারা পরিত্যক্ত। যে সংস্কারের গর্ব ছিল আপনার, আজ তা আপনি সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছেন, এক তুচ্ছ হড্ডিকার কামনায়! ছিঃ!’ বল্লাল সচকিত হয়ে রোগশয্যায় উঠে বসেন, কিছু বলতে চান, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা সরে না। পদ্মিনী উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এখানে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে মহারাজ। আমি চললাম। আপনার স্পর্শ করা এই পাপ দেহ আর আমার রাখবার ইচ্ছা নেই। আপনার দেওয়া বস্ত্র-অলংকার সব পাশের কক্ষে রাখা আছে।’ বলে কোনরকম বিদায় সম্ভাষণ না করে দ্রুত দ্বার দিয়ে নির্গত হয় হিরন্ময়ী। বল্লাল উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে শূন্য দ্বারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, এ কি স্বপ্ন না বাস্তব ? জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের রাঙা উজ্জ্বল আলো ঘরে ঢুকছে। আকাশ জুড়ে গৈরিক-রক্তিম রশ্মির হোরি-খেলা। বল্লাল তাঁর শয্যার উপর আস্তে আস্তে লুটিয়ে পড়লেন। বাংলার স্বাধীনতা সূর্য তখন অস্তগামী।

* এই কাহিনীতে যে সামাজিক মূল্যবোধ ফুটে উঠেছে তা আজ থেকে হাজার বছর আগেকার

তথ্যসূত্রঃ

১. বৃহৎবঙ্গ – দীনেশচন্দ্র সেন (১৯৩৫)   ২. বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস – দুর্গাচন্দ্র সান্যাল (১৯১০)   ৩. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস – নগেন্দ্রনাথ বসু (১৯১৪)        ৪. বাঙ্গালীর ইতিহাস – নীহাররঞ্জন রায় (১৯৪৯)    ৫. বাঙ্গালার পুরাবৃত্ত – পরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৭)   ৬. গৌড়ের ইতিহাস – রজনীকান্ত চক্রবর্ত্তী (১৯০৯)  ৭. রাজাবলী – মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। (১৮০৮)

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes
410 Gone

410 Gone


openresty