সপ্তর্ষি বিশ্বাসের গল্প

সপ্তর্ষি বিশ্বাসের গল্প

মধ্যরাতের সিঁড়ি

মধ্যরাতের সিঁড়ি ভেঙ্গে একেবারে চূড়ায় উঠে এলো অনীক।
এখান থেকে দেখাযায় রাত্রির প্রায় সম্পূর্ণ উপত্যকাটিই। একধারে পানাভরা, মরা খাল। খালের ওপারে, বাঁশঝাড়ের আবডালে,অন্ধকার ফেটে ফেটে গিয়েছে কোনো কোনো গৃহস্থের গার্হস্থ ছিঁড়ে আসা আলোর বর্শায়। অন্যদিকে ইস্কুলঘর, হিমাংশু ধরের ছড়ানো বাড়ি, পরিত্যক্ত। গোঁসাইবাড়ির গলী। লন্ডনীবাড়ির শিবহীন শিব মন্দির। … এই সমস্তই অনীকের প্রায় প্রতিটি গল্পের আবহ। এতাবৎ। পরিচিত পাঠকদের অনেকেই এখন বিরক্ত হয় অনীকের গল্প দেখলে। “সেই একই মফস্বল, একই পাড়া, একই নদী” … অনীক ভাবে। চূড়ায় বসে ভাবে। বাড়ির পেছনের দিকে উঁচু করে ছোটো দালান মতো বানানোর চেষ্টা নিয়েছে ছোটোভাই। সেই আরব্ধ চেষ্টার কংকাল বেয়ে যেখানে উঠে এসেছে অনীক সে এই দালান-চেষ্টার তেতলা — যদিও সব তলাই এতাবৎ কংকাল।
চূড়ায় বসে ফুরিয়ে যাওয়া দিনটিকে খুলেই ফেল্লো অনীক, অবশেষে। অবশেষে, কেননা ফুরোনো দিনরাত্রিকে ভয় করে অনীক। একবার খুলে বসলে তারপর খুলতে খুলতে খুলতে খুলতে ঠিক কতোটা গহনে, কতোটা জটিলে গড়িয়ে যায় এই গুলিসূতো …। তবু সাহস করলো অনীক। ফিরে গেলো দিনটির ঠিক সেই বিন্দুতে ঠিক যখন তার মনে এসেছিল এই কথাগুলি।
মেঘলা এক দুপুরের ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে, হেঁটে হেঁটে নদীর দিকে যাচ্ছিল অনীক আর তথাগত। তখুনি মনে এলো কথাগুলি। কথাগুলি, হয়, এই, যে, যে কোনো সম্পর্কই যখন নিবিড়তার, গভীরতার একটি বিশেষ পরিখা যায় পার হয়ে তখনই ‘কথা’, ‘শব্দ’, ‘বাক্য’ হারিয়ে ফেলে প্রয়োজন। ঠিক যেমন তথাগত আর ইন্দ্রনাথের সঙ্গে অনীকের। বছরে দ’বছরে একবার দিন পনেরোর জন্য দেশগ্রামে আসে অনীক। তখনই দেখা সাক্ষাৎ, আড্ডা। চিঠিপত্রের বিনিময়, কম হতে হতে থেমে গিয়েছে সে’ও অনেককাল। ফোন জিনিসটাকে একদা মনে হতো দূর কে নিকটে আনার পন্থা। এখন মনেহয় অন্তর্গত দূরত্বকে পারাপারহীন করে তুলবার এক কৌটো-দানব। ফোন রেখে দেওয়া, লাইন কেটে যাওয়ামাত্র যে বিষাদ, যে নৈঃশব্দ, তা ফোন হাতে তুলে নেওয়ার আগে ছিলনা। অতএব খুব যে ফোন-যোগাযোগ হয় অনীক-তথাগত-ইন্দ্রনাথের তেমনও নয়। তবু সাক্ষাৎ হলে, প্রথম কয়েক ঘন্টায় নিজ নিজ যাপনের দাগানো পংক্তিগুলির বিনিময়ের পর চুপ বসে থাকা, পাশাপাশি হাঁটতে থাকা, শব্দহীন মুখোমুখি — চা আর সিগারেটে। তবু পরস্পরকে বুঝে নেওয়া যায়, মুহুর্মুহু, যেন কোনো অদৃশ্য সঙ্কেতে। … ‘অদৃশ্য সঙ্কেত’ থেকে মনে এসেছিল স্বপনকুমার, সেই ১০০ চটি বইএর ‘বিশ্বচক্র সিরিজ’। দীপক চ্যাটার্জী —
বন্ড আর হোমস্‌ আর পোয়রো আর …। ইন্দ্রনাথ আর শহরে গিয়েছে আজ সকালেই, কর্মোপলক্ষ্যে। “স্বপনকুমার” ইন্দ্রনাথের অবচেতনে করে নিয়েছেন পাকা ঘরবাড়ি। অন্ততঃ এই ‘বিশ্বচক্র সিরিজ’। যদিও নানান প্রকাশন সংস্থা বাঁধানো সমগ্র বার করেছে স্বপনকুমারের তবু ইন্দ্রনাথ জোগাড় করছে, সেই চটি বইগুলি, সেই ছয়ের, সাতের কোঠায় পঠিত। “কলেজ স্টুডেন্ডদের জন্য”। প্রতিবারই এই সংগ্রহের নতুন সংযোজন নিয়ে হয় আলোচনা। এবারে হয়নি। এখনো। তবু ‘অদৃশ্য সঙ্কেত” এই শব্দের টানে অনীক বল্লোঃ ” ইন্দ্রনাথের স্বপনকুমার কালেকশানে নতুন কি যোগ হলো রে, ‘অদৃশ্য সঙ্কেত” বইটা পেয়েছে?”
“সম্ভবতঃ না। মাস দুই আগে ‘ঝরা বকুল’ আর ‘মুখার্জী ভিলা’ পেয়েছে কার কাছে যেন …”
“পড়তে হবে। লাস্ট ও যখন ‘শ্রাবনী সন্ধ্যা’ জোগাড় করেছিল, তখন পড়েছি …”
‘শ্রাবণী সন্ধ্যা’ না’কি ‘শ্রাবণী’ শব্দটিকে ছুঁয়ে চোখাচোখি হলো অনীক আর তথাগত’র? চিলতে হাসি, বোকা বোকা, খেলে গেল কি দুজনেরই ঠোঁটে?
যদিও ফুরোনো দিনরাত্রিকে ভয় করে অনীক কেননা একবার ওই গুলিসূতো খুলে বসলে তারপর খুলতে খুলতে খুলতে খুলতে ঠিক কতোটা গহনে, কতোটা জটিলে গড়িয়ে যায় …তবু এতোদূর এসে আর উপায় নেই ফিরে যাওয়ার। ঠিক যেমন ওই বালিকা, শ্রাবণী, একবার এলো ওদের পাড়ায়, আর গেলোইনা ফিরে। বরং তার বাবা বাড়ি তুলে নিলেন এই পাড়াতেই। ‘ইন্ডাস্ট্রি অফিসের’ গলীতে। ধূধূ ধানক্ষেতের সীমানায়। তারপর সেই বালিকাকে রোজই দেখা যেতে লাগলো, ভোরবেলা, বইব্যাগ কাঁধে টিউশনে যাচ্ছে, রিক্সায় চেপে ইস্কুলে। চোখে চশমা। কাঁচ অনেকটাই পুরু। ইস্কুল ফেরৎ আসতো হেঁটে। তখন সূর্য তার চোখে ফেলতেন তাঁর বিকাল রশ্মি। চশমার কাঁচে প্রতিফলিত … না’কি প্রতিসৃত … হয়ে রশ্মিত হয়ে উঠতো অনীক। সেই নয়ের শ্রেণীর ছবি। ওই হেঁটে আসা দেখতে দেখতে অনীক কখনো হয়ে যেতো পথ। কখনো পাহাড়ি। এই পাহাড়ি নদীটির মতোই। যার দিকে শ্লথ পায়ে এখন চলেছে অনীক আর তথাগত। কখনো অনীক, ওই শ্রাবণীমেয়ের হেঁটে আসা দেখতে দেখতে আলপথ, বর্ষাজলে ডোবা। শরতের ভোরবেলাগুলির ভিতর দিয়ে সে যেন উদ্ভাসিত হতো চক্রবালের পরপার থেকে। পুব আকাশ থেকে আলো এসে নামতো, দলে দলে, পাখির মতন, তার চোখে। চশমার কাঁচে।
পাহাড়িয়া নদীর এপারে দোকানপাট। ওই পারে বাজার। মাঝখানে,ছিল কাঠের সাঁকো। একবার গরমছুটিতে হোস্টেল থেকে ফিরে দেখাগেলো সিমেন্টের রীতিমতো পাকা ব্রীজ। ব্রীজে না উঠে ব্রীজের কিনার ধরে নেমে গিয়ে অনীক আর তথাগত ধরলো উমাপতি গ্রামের পথটি। আদত পথের কিনারে কিনারে নদীপাড় ধরে চলতে লাগলো। আকাশে গাঢ় মেঘ। পাকা ব্রীজের চালচিত্রে। চলার কিনারে কিনারে পাহাড়িয়া নদীর ছলাৎছল। নদীর ধারে, যে মস্ত পাথরে বসে পরলো অনীক আর তথাগত এই পাথরেই বসে ছিল সেদিনও। হয়তো তা’ই তথাগত বলে উঠলো “সেদিনের কান্ডটা মনে আছে?” আবার চোখাচোখি। আবার বোকা হাসি উভয়ের চোখেমুখে। ‘কান্ড’টা পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে দুজনেরই। ইন্দ্রনাথেরো নিশ্চয়। তবু যেন মনেহয় ওই ‘কান্ড’টির ভিতরে যারা ছিল তারা অন্য মানুষ। অন্য দুটি কিশোর। অনীক আর তথাগত। এই চল্লিশ পেরোনো দুটি ‘লোক’, যারা এই মুহুর্তে, মেঘলা আকাশের নিচে, বসে আছে সেই একই পাথরে, এরা নয়।
বড়দিনছুটিতে বাড়ি এসেছে অনীক। সান্ধ্য ত্রয়ী বসেছে, যথারীতি, নদী-পাথরের আড্ডা-আসনে। শীতেবল্লমের ধারে শান দিচ্ছে নদীবাতাস।
“অনীক কে বলেছিস?” — নানা গল্পের ফাঁকে হঠাৎই বলেছিল ইন্দ্রজিৎ।
“আরে নাহ্‌” — তথাগতর উত্তর।
“দুঃশালা, প্রেমে পড়েছিস আর অনীককে বলিস নি…”
“দুর, প্রেম কিসের …”
“প্রেম না’তো কি … রোজ সকালে সাইকেলে পিছু নেয়, জানিস তো, তোদের পাড়ারই মেয়ে। ওর ক্লাস্‌মিট। ওরও বায়োলজি। দেখতে ভালো। তবে ‘কম পাওয়ারি’ তাই চোখে হাইপাওয়ার …”
তথাগত’র সঙ্গে অনীকের বন্ধুত্ব তখন সবে মাত্র আলাপ পর্ব ছাড়িয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বিস্তারের মুখে। অথাগত সাত না আট কেলাসে এই শহর ছেড়ে গিয়ে আবার ফিরেছে বছর খানেক। তখনই অনীকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ক্রমে বন্ধুত্ব।
অনীক তদ্দিনে হোস্টেলবাসী। তথাগতরো চোখে ভাসে, ভেসেওঠে, ছবি। কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনের দিকে চলেছে শ্রাবণী। ইন্ডাস্ট্রি অফিসের গলীর ধারেই তথাগতদের বাড়ি। এক সকালেই, সেও আবিষ্কার করেছিল শ্রাবণীকে। মেয়ে-সাইকেলে চেপে বার হয়ে আসতে কিনারের গলী থেকে। এই সেই ‘সবুজ-করুণ’ অধ্যায় ,জীবনের, যখন বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার মতন রবীন্দ্রসঙ্গীত ঢুকে পরছে অস্তিত্বের আনাচে কানাচে। প্রথমবারের মতো নিজের গহনে জেগে উঠছে আরেক ‘আমি।
… সেই ‘আমির অতলে মুহুর্মুহু ভাংছে,গড়ছে আরেক পৃথিবী। সেই আরেক পৃথিবীর আরেক আলোয়, আরেক অন্ধকারে নতুন অবয়ব নিয়ে জেগে উঠছে মফস্বলের প্রতিটি নদী-নালা-খাল-বিল-ইস্কুলঘর-বাঁশঝাড়, প্রতিটি চেনামুখ,অচেনা মেঘমালা । সেখানেই জীবনের সমস্ত শরৎকাল শিউলী হয়ে আজো ছড়িয়ে রয়েছে ঘাসে ঘাসে । সেখানেই একদিন, যেনবা দিগন্ত পার হয়েই উঠে এসেছিল একটি সদ্য যুবতী মুখ। হাইপাওয়ার চশমা। মেয়ে সাইকেলের প্যাডেলে
পা, যেন পাখিডানা। স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে পরেছিল তথাগত। তারও যে টিউশান যেতে হবে, চাপতে হবে সাইকেলে, সবই বিস্মৃত হয়েছিল। পরে, কলেজে, নিজের ক্লাসেই মেয়েটিকে দেখে আশ্চর্য হয়ে ভেবেছিল “আগে চোখে পড়েনি কেন, না ক্লাসে , না পাড়ায়”। তারপর ওই মোটা কাঁচ চশমা আর পাখিডানা হেন পা গুলি, প্যাডেলে দেখে দেখে তথাগত জেনেছিল যে সবই হয় সুসময় এলে। এতোদিন তার সুসময় আসেনি তাই দেখতে পায়নি ওই শ্রাবণীমেয়েকে। মনেপড়েছে “যাও পাখি”। মনে মনে বলেছেঃ “রিখিয়া … একদিন সুসময়ে তোমার সঙ্গেই আমার ভালবাসা হবে …”
তখনো অনীকের সঙ্গে ততোটা ঘনিষ্ট হয়নি তথাগত আর সামান্য ঘনিষ্ট হওয়ার পরই সততই খোলাবইহেন অনীক তাকে বলে দিলো তার নিজের একতরফা ভালবাসাগল্প, শ্রাবণীকে ঘিরে। সুতরাং অতলান্তিকের মতো অতল তথাগতর আর বলা হলোনা তারও একতরফা প্রেমের কাহন যা ততোদিনে জানা হয়ে গিয়েছিল ইন্দ্রজিতের।
অনীকের বাড়িতে ছিল এক ফিলিপ্স রেডিও আর ছিল এক গীতবিতান। রেডিও শুনে আর গীতবিতান পড়ে আর শ্রাবনীমেয়ের আসা যাওয়া দেখে এমনই এক ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছিল তার দিনগুলি,যে,সহপাঠীরা যখন খাতার প্রথম পাতায় লিখে রাখতো ‘সরস্বতৈ নম’ তখন অনীক লিখে রাখছে ‘পথ হতে আমি গাঁথিয়া এনেছি সিক্ত যূঁথীর মালা, সকরুণ নিবেদনের গন্ধ ঢালা’,‘এই দুয়ার দেওয়া ঘরে কভু আঁধার নাহি সড়ে, তবু আছো তারই প’রে, ও মোর দরদীয়া’ … লিখে রাখছিল ‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে যাহা কিছু সব আছে আছে আছে’ । … কে পূর্ণ, কি পূর্ণ, কোন্‌ অন্তবিহীন পথ পাড়ি দিয়ে কে চলেছে কোথায় সেই সব প্রশ্নে যে আলোড়ন তখন উঠেছিল অনীকের মনে,তা অবশ্যই নয় ‘দার্শনিক অন্বেষা’। তবুও কোথায় যেন নিজের মধ্যে জাগতো এক অপূর্ণতার বোধ যা আশ্রয় খুঁজতো ঐ গানে, ঐ সুরে । ওই সমস্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল শ্রাবণীমেয়েটি। তার চশমাঢাকা উজ্জ্বল চোখ। কমনীয় মুখ। ঠোঁট। কন্ঠ। মেঠো টিলার মতন স্তনের নিচু আভাস আর ওই ‘আসা’ — কখনো দুই পায়ে হেঁটে, কখনো দুই পা’কে পাখিডানা করে সাইকেলের প্যাডেলে।
“তারপর কাকে যেন বিয়ে করে কোথায় চলেগেলো শ্রাবণী …” মেঘলা আকাশের আরো মেঘলা হয়েওঠার দিকে চোখ রেখে বল্লো অনীক।
“আমাদেরই কলেজের কোন একটা ছেলেকে বিয়ে করলো যেন। … এখন শুনেছি দুজনেই পড়ায় কোনো গ্রামের কলেজে।”
পরে, শ্রাবণীকে ঘিরে তার “সুসময়” তত্ত্বটি অনীক, ইন্দ্রনাথ দুজনকেই বলেছিল তথাগত। আরো পরে, আরো আরো পরে, অনীক-তথাগত-ইন্দ্রজিৎ যখন প্রায় “লোক” হয়ে যাচ্ছে তখন অনীক লিখেছিল ক’টি পংক্তি। কবিতার মতোই। তবে কবিতা অনীক সচরাচর লেখেনা বলে পংক্তিগুলি, পংক্তি হয়েই, রয়েগেছে তার খাতায়। “শুধু সুসময় এলে সকল দেওয়ালগুলি ভেঙ্গে পড়ে খান খান হয়ে / শুধু সুসময় এলে পড়শীদের তুলসীতলা থেকে / প্রদীপের আলো এসে ডেকে নেয় ভর সন্ধ্যাবেলা…/ শুধু সুসময় এলে মোটা চাল ভিক্ষা পেয়ে / গান গেয়ে ঘরে ফেরে পৃথিবীর আনন্দিত অনেক ভিখারী। / শুধু সুসময় এলে পুরোনো দেরাজ খুলে কঙ্কাবতী আজো / পড়ে নেয় / আকাশের মতো নীল শাড়ি …” … ‘কঙ্কাবতী’, সেই যুগে নাম দিয়েছিল অনীক। ‘শ্রাবণী’কে ঢেকে। ওই নাম নিয়ে ছোটো ছোটো গল্পও লিখেছিল কলেজের দেওয়াল পত্রিকায়, কলেজ ম্যাগাজিনে। … অনেক অনেক অনেক যুগ পার হয়ে কেন যে ওই ‘কঙ্কাবতী’ শব্দটিই লিখেছিল অনীক, কেজানে।
অনীক-তথাগত-ইন্দ্রজিৎ যখন “লোক” হয়ে গিয়েছে, তখন শ্রাবণীও নিশ্চিত ‘মহিলা’। তথাপি অনীক-তথাগতর মর্মের শ্রাবণী বা ঠিক শ্রাবণী নয়, একটি পাখির মতন কিশোরী, তখনো, এখনো হয়ে আছে কিশোরীই, হয়ে আছে সেই ভোরবেলাই, সেই বিকালই যখন সূর্য তার চোখে ফেলতেন তাঁর বিকাল রশ্মি। চশমার কাঁচে প্রতিফলিত … না’কি প্রতিসৃত … হয়ে রশ্মিত হয়ে উঠতো অনীক। শ্রাবণী বা ঠিক শ্রাবণী নয়, একটি পাখির মতন কিশোরী, যার ওই আসা দেখতে দেখতে অনীক কখনো হয়ে গেছে পথ। কখনো পাহাড়ি, কখনো আলপথ, বর্ষাজলে ডোবা … সেখানেই জীবনের সমস্ত শরৎকাল শিউলী হয়ে আজো ছড়িয়ে রয়েছে ঘাসে ঘাসে …
“ভাবছি, আসলেই কি শ্রাবণী ছিল তেমন কিছু সুন্দরী…” সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে কথাগুলি ছড়িয়ে দেয় অনীক।
“বয়স আর ওই সময়টাও বোধহয়”
‘সময়’ শব্দে তথাগতর মনে হয় সে এক সময় ছিল, সত্যই, যখন গ্রীষ্ম গেলে প্রকৃতই বর্ষা আসত। মেঘ করত। বিষ্টি নামত। বাজ পরত। চম্‌কাতো বিদ্যুৎ। বর্ষা গেলে পায়ে পায়ে আসতো শরৎ। শাদা আকাশে নীল মেঘ। বাতাসে শীত।
শিউলীর ঘ্রান। মাঠে মাঠে পূজার প্যান্ডেলের প্রস্তুতি। ইস্কুলে কলেজে একমাসের টানা ছুটির আয়োজন। তারপর হঠাৎই একদিন আসতো মহালয়ার ভোর। বীরেন ভদ্র’র চন্ডি’র আবহে “মাত্‌লো রে ভুবন, বাজলো তোমার আলোর বেনু’ …। সে এক সময় ছিল যখন প্রতিমা বিসর্জনের পরেও থেকে যেতো প্যান্ডেলগুলি। সেই প্যান্ডেলে জলসা হতো। জমে উঠত জলসা,পাড়ার ‘শিল্পী’দের নিয়েই। নাটক পাড়ার ছেলেরা মিলে। এইসব মফস্বলে কখনো আসতেন কইলকাত্তার ‘আর্টিস্ট’রাও। মাতিয়ে দিয়ে যেতেন আসর। চোখে-কানে ঘোর থাকতো অনেকদিন।
অনীকের মনেহলো গেরস্থবাড়ির বেড়ায়, অফিস কাছারির দেওয়ালে লাগানো পোষ্টারগুলি … ‘মিষ্টার নটবরলাল’,‘কালিয়া’,‘ম্যায় আজাদ হুঁ’,‘কভি হ্যাঁ কভি না’হেন নাম গুলি। সাইকেল রিক্সায় মাইক ঝুলিয়ে পাড়ায় পাড়ায় হেঁকে ফিরতো রামুদা-শামুদারা ‘কাল থেকে রাধার রূপালী পর্দায় জিতেন্দ্র-শ্রীদেবীর হিট্‌ ছবি ‘হিম্মৎওয়ালা’ …আসুন দেখুন …’ তারপরই রিক্সায় ঝোলানো মাইকে ক্যাসেটের গান ‘ঝু ঝু ঝু ঝুপড়ি মে চা চা চা চারপাই/ জীবন মেরা
উসি পরি… ’ আর ঐ হলেই, ম্যাটিনি আর ‘ফাস্‌শো’র ভিড়ে টিকিট ব্ল্যাকে বেচতো ঐ রামুদা-শামুদা’ই । রাধা-দুর্গা-চিত্রবানী তিনটি সিনেমা হলেরি যথেষ্ট রমরমা। ‘চিত্রবাণী’ হলে আসতো পুরোনো ছবি। উত্তমকুমার। মহানায়ক। ‘দেয়া নেয়া’, ‘শাপমোচন’,’পথে হলো দেরী’। একটি বিষাদ, ‘পাষাণের বুকে লেখোনা আমার নাম’ গানের মতো, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠের মতো, চালচিত্রে।
এই সমস্তের সঙ্গে মিলিয়ে একটি অতি সাধারন মেয়ের চশমাচোখ, হাঁটতে হাঁটতে আসা যাওয়া, পাখিডানাহেন পায়ে সাইকেলের প্যাডেল ঘোরানোতে লেগে যাবে আশ্চর্য ঘোর, অনীকের, তথাগতর, এ আর এমন বিচিত্র কি?
কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি নামলো। জানান দিলো আরো নামবে। আরো নামছে। দলে দলে কাতারে কাতারে নামছে। নদীপার ছেড়ে ব্রীজের দিকে পা বাড়িয়ে দিলো অনীক, তথাগত।

মধ্যরাত্রির সিঁড়ি বেয়ে উঠে যে চূড়ায় এসে বসেছে অনীক সেখানে, উঠে দাঁড়ালে, দিনের বেলা, দেখাযায় ওই পাহাড়িয়া নদীটি। অন্ধকারে দেখা যায়না। তবে জানা যায় আছে। ঠিক যেমন আছে হিমাংশু বিমল ধরের ছড়ানো বাড়িটি পরিত্যক্য হলেও,ওই অন্ধকারে মিশে। পথবাতির ম্লানালোকে উদ্ভাসিত শুধু সামনের দিকের ঝোপঝাড় আর নারকোল-সুপুরীর আধাশরীর। অন্ধকারকেই বেশী ভালবাসে অনীক। অন্ধকার আলোর মতো কর্কশ নয়, নিষ্ঠুর নয়। সে অকারণে নগ্ন করেনা রহস্যকে, ছিঁড়ে ফেলেনা কখনো এঁকে তারপর ভুলে যাওয়া ছবিকে খুঁজে এনে, সর্বসমক্ষে। অন্ধকার ভালো। কুয়াশাও ভালো। তারা কেউ বৃষ্টির থেকে মাথা বাঁচাতে চা-মিষ্টির ছোটো দোকানে হঠাৎ ঢুকে পড়ে বলে ওঠেনা –
নদীর এপারে দোকান গজিয়ে উঠছে নতুন নতুন। এখন এখানে এসে পুরোনো, চেনা দোকান আর দোকানীদের নিতে হয় রীতিমতো খুঁজে। পুরোনোদের মধ্যে ‘গীতাঞ্জলী মিষ্টান্ন ভান্ডার’। সিঙ্গারা-‘রসুগুল্লা’র সঙ্গে চা আর সিগারেটে অনেক সন্ধাই
কেটেছে এখানে। এখনো কাটে দেশগ্রামে এলে। সেখানেই দৌড়ে গিয়ে ঢুকলো অনীক আর তথাগত। দোকান-মালিক, যার ছোটোভাই এখন ‘শিলঙ্গে বিজনেস করে’, অনীকের বাল্যচেনা। সেইহেতু আর তাছাড়া অনীক যেহেতু এখন ‘প্রবাসী’ তাই এখানে এলে মনোযোগ পায় একটু বেশী। দুপুরগড়ানো সময়। তায় মেঘলা সকাল থেকেই। অতএব খরিদ্দার নেই খুব। যে দুয়েকজন আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারাও আদতে ঢুকে পড়েছে বৃষ্টির তাড়া খেয়ে। গরমাগরম চায়ে চাইছে নিজেদেরকে শুকিয়ে নিতে।
“এহ্‌, এক্কেবারে ভিজেগেছো দেখছি …” সামনে, কাউন্টারে বসা মালিকজন বলে যদিও তেমন কিছু ভেজেনি ওরা। একদম শেষের যে বেঞ্চি তাদের আড্ডার সেটা খালি দেখে সেখানেই গিয়ে বসে। দু’কাপ চা বলে।
চা আসে। চায়ের পেয়ালাসহ অনীকের আঙ্গুল ও হাত যখন রওয়ানা দিয়েছে, একটু দ্রুত গতিতেই, তখুনি কাঁধে নেমে আসে একটি হাত। অনীকের বেঞ্চি থেকে রাস্তা দেখা যায়না। তাই সে দেখেনি বাইয়ে মোটর বাইক থামিয়ে কখন যে ঢুকেছে সাজন চক্রবর্তী অনীক দেখেনি। তথাগত দেখলেও আন্দাজ করেনি, যে, সাজন চক্রবর্তী এসে হানা দেবে তাদের বেঞ্চিতেই। পাড়ারই ছেলে সাজন। বয়সে তাদের থেকে কিছুটা বড়। ‘বন্ধু’ নয় কখনোই। তবে ‘চেনা’। ভালোমানুষ গোছের। একহারা চেহারা। এখনো তেমনি আছে। চেহারা ছিল ভালোই। এখনো ভালো। তবে অবয়বে, বয়সের চেয়ে বেশী, যাপনের ছাপ।
‘পেছন থেকে দেখে মনে হয়েছিল অনি’ই’ হেসে, কথাটি বলে তথাগতর কিনারে গিয়ে বসে পড়লো সাজন। চা’য়ের হাঁক দিলো।
“প্রায় কয়েক যুগ পরে দেখা …”
“হ্যাঁ। আমি অবশ্য বছরে একবার অন্ততঃ আসি …”
“দেখি’ত তোমাকে…” … সাজনকে চোখে পড়ে অনীকেরো প্রতিবারই। প্রবল বেগে মোটরবাইক হাঁকাচ্ছে। দেখলে ভয় হয় কখন না উড়ে যায়। মনেপড়ে যায় “তালপাতার এক সেপাই ছিল, বলছি শোনো গল্প/ হাত পা ছিল পাতার কাঠি, ওজন ছিল অল্প …” এমনি বেগে সাইকেলও চালাতো সাজন।
“অনেকবারই ভেবেছি ডাকবো বা বাড়িই চলে আসবো”
সাজনের চা এসে পড়েছে। চা-পেয়ালায় মৃদু চুমুক দেয় সাজন।
“হ্যাঁ, এসে পড়লেই হয়। আমার আস্তানা…”
“জানিতো। তোমার বাড়িতে নাহলে ওর বাড়িতে, নয়তো ইন্দ্রজিতের …। আর কোথাও না পেলে ওই নদীর ধারে …” হাসে সাজন। হাসে অনীক, তথাগতও।
“চলে এসো একদিন…”
“হ্যাঁ। এবারে তো দেখা হয়েই গেলো। আসলে এতো ব্যস্ত থাকি। তারমধ্যে মা’রো শরীরটা ভালো যায়না। তার মধ্যে, জানোতো, ইস্কুলের হেড মাস্টার বনে গিয়ে…”
“আরে সে’তো সবচে’ ভালো। মাস্টারদের কাজ থাকে। হেড মাস্টারদের আবার কাজ থাকে নাকি …” তথাগত বলে। হেসেই বলে।
“আরে ভাই, সে সব দিন গেছে। এখন ইস্কুলের হেড মাস্টার মানে আমলাদের হুকুমবরদার। তা’ও যদি ‘মাস্টার’ বলে কেউ কোনো সম্মান করতো…”
“এটা কথা ঠিক” বলে অনীক “আসলে ছাত্রছাত্রীরা বা তাদের গার্জিয়ানরাই কি করবে বলো? একটা সময় যখন হীরা-পান্নাও হয়েগেলো মাস্টর … শালা দুটোর নামেই মার্ডার কেস ছিল। ভাগ্যে দুটোই মরেছে মদ খেয়ে, নইলে জেলের ভাত …”
“তা বলেছো ঠিকই। শুধু কি হীরা আর পান্না? লালিগুন্ডা, রাতুল গুন্ডা সব্বাই তো ছিল এক সময় ‘মাস্টর’ …”
চা-পেয়ালায় আরেক চুমুক দিয়ে তারপর আস্তে আস্তে আবার বল্লো সাজনঃ “আরে, এই সবই, জানো’তো, শ্রাবণীর বাবার কীর্তি। ঘুষ খেয়ে …”
এই সম্বাদও জানাই ছিল অনীক আর তথাগতর। এক সময় এ নিয়ে রীতিমতো ঝামেলাও হয়েছিল। শ্রাবণীর বাবা শিক্ষা বিভাগের ছিল কিছু একটা। এইসব গুন্ডাদের চাকরী দেওয়াতে আদতে ছিল যাদের পাওয়ার কথা, অবধারিত ভাবেই তারা পায়নি চাকরী। খেপে গিয়ে একদল ছেলে একবার হানা দিয়েছিল শ্রাবণীদের বাড়ি। তবে খবর আগেই জেনে যাওয়ায় শ্রাবণীর বাবা দিয়েছিল চম্পট। ছেলের দল শ্রাবণীর মা’কে বিধবার থান উপহার দিয়ে এসেছিল।
ছোটো মফস্বলের পক্ষে অবশ্যই বড় ঘটনা। তবে শ্রাবণী যেমন ঝাপসা হয়ে গিয়েছে তথাগত আর অনীকের মর্ম থেকে, তেমনি এই ঘটনা কিংবা শ্রাবণীকে ঘিরে ঘটে যাওয়া আর সব ঘটনা, ভাবনাও হয়ে গিয়েছে ঝাপসা। শুধু আজ, অনেকদিন পর ‘শ্রাবণী সন্ধ্যা’ নামের টানে অনীক, তথাগত দুজনেরই মনে এসেছিল একটি চশমাচোখ-মেয়ের হাঁটতে হাঁটতে আসা যাওয়া, পাখিডানাহেন পায়ে সাইকেলের প্যাডেল ঘোরানো। মুখটাও আসছিল না, এলোনা এখনো মনে।
তথাগত বল্লোঃ ‘জানি …”
“শ্রাবণীর খবর জানো? তোমাদের সঙ্গেই পড়তো না?” তথাগতকে বলে সাজন।
“হ্যাঁ”
“কয়েক বছর হলো স্ট্রোক হয়ে প্যারালাইসিস। উঠতে পারেনা। হুইল চেয়ার ছাড়া চলাফেরা বন্ধ। মুখেরো একটা পাশ প্যারালাইজ্‌ড্‌। দেরীতে হলেও, বিয়ে হয়েছিল। একটা ছেলেও আছে। বিবেকনগর কলেজে চাকরীও …” একস্রোতে শ্রাবণী বিষয়ে কথাগুলি বলে যাওয়ার সময় সাজন যেন বিস্মৃত হয়েছিল তার শ্রোতাদের। এবার যেন সম্বিৎ ফিরলো তার। বল্লোঃ “জানোই তো, শ্রাবণীরা আমাদের ঠিক পাশের বাড়ি। তাই সব খবরই …”
শ্রাবণী যেমন ঝাপসা হয়ে গিয়েছে তথাগত আর অনীকের মর্ম থেকে, তেমনি এই ঘটনা কিংবা শ্রাবণীকে ঘিরে ঘটে যাওয়া আর সব ঘটনা, ভাবনাও হয়ে গিয়েছিল ঝাপসা। তবে এই মুহুর্তে মনে পড়লো শুধু পাশের বাড়ির প্রতিবেশীই নয়, সাজনও ছিল শ্রাবনীর প্রেমিকদের একজন। একে তার গলীর ‘মাল’, তায় ‘নেক্সট ডোর নেইবার’, তায় সাজন অনীকের চেয়ে দুই কেলাস উঁচুতে। অতএব শ্রাবণীতে তারই যে প্রথম অধিকার তা জানান দিতে সাজন একবার পাকড়েও ছিল অনীককে। পাড়ার ছিঁচকে মাস্তান বাপ্পা’কে নিয়ে।
তখন ইস্কুল কাল। ছেলে ইস্কুল আর মেয়ে ইস্কুল একই রাস্তার উপরে প্রায়। অতএব ক্লাস পালিয়ে হলেও, শ্রাবণীর পিছু পিছু হেঁটে আসতো অনীক। শ্রাবনীর ফেরার পথে। শাড়ি পরিহিতা ওই হাঁটা যেন চোখে নেশা লাগিয়ে দিতো তার। এমনি এক ‘পিছু নেওয়া’ দিনে তাকে পাকড়ে ছিল সাজন, বাপ্পা-গুন্ডা সহ। পরদিন অবশ্য রেল কলোনীর, অনীকের সহপাঠী, ‘ক্যারাটে বিশ্ব’ সদলে এসে বন্ধুকৃত্য করে গিয়েছিল বাপ্পাসহ সাজনকে শাসিয়ে…
মধ্যরাতের সিঁড়ি ভেঙ্গে একেবারে চূড়ায় উঠে এলো অনীক। অনেকক্ষণ অন্ধকারের ভিতর বসেথেকে বল্লো ‘আশ্চর্য’। কাকে বল্লো কেজানে। প্রশ্ন করলো নিজেকেই — কেন এই উঠে আসা? মধ্যরাতে? অন্ধকারের সিঁড়ি বেয়ে? কেন এই বসে থাকা? কেন এই ‘আশ্চর্য’? কে এই মেয়ে? শ্রাবণী? যার মুখও নেই মনে আর তারই দুঃসংবাদ পেয়ে … ‘দুঃসংবাদ’? এই শব্দটির সঙ্গে তো জড়িয়ে থাকে মৃত্যু। কিন্তু এ’তো নয় মৃত্যু সংবাদ। তবু, কেন … আচ্ছা, যদি শ্রাবণীর মৃত্যুখবরই দিতো সাজন, তাহলে? ঠিক যেমন সুদীপ্তার মৃত্যুখবর পেয়েছিল ফোনে কিম্বা প্রশান্তর, তাহলে? অনীকের মর্মে ‘মৃত্যু’ একটি যতি। পরিপূর্ণ যতি। তার পরপারে আর কেউ নেই। কিছু নেই। অনীকের কাছে ‘মৃত্যু’ কোনো ‘মুক্তি’ নয়। মৃত্যু মানে ‘শেষ’। এক অমোঘ তবু, অথবা অমোঘ তাই… এক নিষ্ঠুর, নির্মম যবনিকা।
উড়ে গেলো কিছু একটা। অন্ধকারে। হয়তো বাদুড়ই। কিনারেই গোঁসাই’দের পতিত জমি। সেখানে শ্যাওড়া গাছ। সেখানে বাদুড়ের বাসা।
অন্ধকারের ভিতর দিয়ে উড়ন্ত দের পথরেখা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টার আবডালে অনীকের মনে হলো — মৃত্যু মানে ‘শেষ’। অতএব মৃত্যখবরে শোক থাকতে পারে, থাকেও। কিন্তু ‘আশ্চর্য’ থাকেনা। ‘আশ্চর্য’ শব্দের অতলে থাকে বিস্ময়। আছে বিস্ময়। মৃত্যু কোনো বিস্ময় নয়। তাহলে নিশ্চিত, শ্রাবণীর মৃত্যুখবর যদি পেতো তারা, অনীকের মনে হলো, তারা ‘বিস্মিত’ হতোনা। বাস্তব আরেকটি হেতু, এই অবিস্ময়ের, এই, যে, চল্লিশের কোঠার মাঝামাঝি কোথাও এসে পড়তে পড়তে এতো এবং এমন সমস্ত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে, যে, যদিবা ‘মৃত্যু’র সঙ্গে বিস্ময়ের কোনো ক্ষীণতম সংশ্রব সম্ভব ছিল আরো কুড়ি কিম্বা পঁচিশ বছর আগে, এখন আর তা অসম্ভব।
এই যে ‘আশ্চর্য’ যা’তে আক্রান্ত তথাগত, অনীক — অনীক টের পেলো তার গহনের বিস্ময়টি ‘বিপন্ন’, ‘বিপন্ন বিস্ময়’। এই বিপন্নতার কেন্দ্রে শ্রাবণী নামের মেয়ের আদতে যে কোনো ভূমিকাও নেই — এই কথাটি আর তার সঙ্গে আরো একটি কথা টের পেয়ে আবার ‘আশ্চর্য’ হলো অনীক। শ্রাবণী হারিয়েছে চলৎ-শক্তি আর যে শ্রাবণীর ছবি, ঝাপসা হলেও, অনীক-তথাগত’র গহনে, সেখানে শ্রাবণী মানে একটি ‘চলা’, ‘হাঁটা’, ‘গতি’, ‘সাইকেলের প্যাডেল’, ‘পাখিডানা’। সেই
চলন্ত, সেই উড়ন্ত আজ চলৎ-শক্তিহীন। এর অর্থ হয়… কি হয়? হয় কি আদৌ কোনো অর্থ?
কথা, আড্ডা আর এরপরে জমলোনা খুব বেশী। বৃষ্টিও একটু ধরে এলো। সাজন উঠে পড়লো আবার দেখা করবার অযাচিত অঙ্গীকার ছুঁড়ে দিয়ে।
দিনটি তার অর্থ হারিয়ে ফেলেছিল, অনীক তথাগত, দুজনের কাছেই, সাজনের দ্বারা সংবাদটি পরিবেশিত হওয়ার পরেই। সাজন উঠে যাওয়ার পরে আবার বিনিময় হলো সেই ‘অদৃশ্য সঙ্কেত’, অনীক আর তথাগতর চোখে চোখে।
রাত্রির চূড়ায় বসে অনীক অকস্মাৎ জেনে গেলো এই ‘আশ্চর্যের’ একটি অর্থ। শ্রাবণী আসলে কেউ নয়, কিছু নয় — না তার, না তথাগতর, না ওই সাজন চক্রবর্তীর। শ্রাবণী, প্রকৃত প্রস্তাবে, তাদের জীবনের শরৎকাল। সেই শরৎ কালে শিউলী কুড়োনো কোনো মেয়ে, শিশিরের ভিতর দিয়ে উড়ন্ত কোনো পাখি। সঙ্গে উড়ন্ত তারাও। আবহে ‘যাপন’ নয়, ‘জীবন’ নিজেই উড়ন্ত, চলন্ত। উড়তে উড়তে, চলতে চলতে, হাঁটতে হাঁটতে, সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে চলছিল সকলেই। মাঝে মাঝে মৃত্যুখবর — সমবয়সী বা বয়সিনীদের, সমপাঠীদের — মর্মে এনেছে শোক। হয়তো কিছুদূর ভীতিও। তারপরে ওড়ার, চলার নিজস্ব ছন্দে, তালে তারা, না হারালেও গিয়েছে ঝাপসা হয়ে। ঠিক যেমন শ্রাবণী নামের মেয়ের মুখ, চোখ, তাকে ঘিরে কৈশোরের ঘটনা, প্রথম যৌবনের ভাবনা। কিন্তু যে মুহুর্তে জানা গেলো সে জীবিত অথচ চলচ্ছক্তিহীন, তখুনি, অনীকের, তথাগত’র, হয়তোবা সাজন চক্রবর্তীরো ‘চলা’য় হোঁচট লাগলো।
কিছু সিগারেট পুড়লো। তবু নিঃশব্দ ভাঙ্গলো না। বৃষ্টি পুরোপুরি থামার আগেই ঘরের পথ ধরলো অনীক আর তথাগত। এক সময় অনীক বল্লোঃ “তিনটি কিশোর, কোনো না কোনো ভাবে, কখনো না কখনো একটি মেয়েকেই ঘিরে ছিল মনে মনে।নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে তাদের লজ্জা ছিল, রাখডাক ছিল, ক্রোধ ছিল। ওই তিনটি কিশোর কারা? আমি, তুই আর সাজন চক্রবর্তী? অসম্ভব। এই যে তিনটি ‘লোক’ যারা বসে কথা বল্লো ওই একটি ‘মেয়ে’কে নিয়ে, যে এখন পঙ্গু, সে’ও কি শ্রাবণী? সে’ও ত এক মহিলা। … সমস্তই কেমন অর্থহীন, সমস্তই কেমন যেন নিরন্তর আবর্তের মতো ” …
মধ্যরাতের সিঁড়ি ভেঙ্গে একেবারে চূড়ায় উঠে অনীক টের পেলো শ্রাবণীর চলচ্ছক্তি হারানোর অর্থ তাদের নিজেদের কৈশোরেরই … না, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়, বিলুপ্তি নয়, ‘পঙ্গু’ হয়ে যাওয়া।
ফুরোনো দিনরাত্রিকে এই হেতুই ভয় করে অনীক। একবার খুলে বসলে তারপর খুলতে খুলতে খুলতে খুলতে ঠিক কতোটা গহনে, কতোটা জটিলে গড়িয়ে যায় এই গুলিসূতো …। তবু কেন যে আজ সাহস করলো অনীক কেজানে। হয়তো নিচে, তাদের বিছানায় শুয়ে কিম্বা বারান্দার বসে থেকে এই সাহস করতোনা অনীক। ফিরে যেতোনা দৃশ্যে সাজন চক্রবর্তীর প্রবেশ পর্যন্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে গেলো তার কারণ হয়তো এই উঠে আসা। এই চূড়ায়। মধ্যরাত্রির এই সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে।
ফিরতি পথে তথাগতর বাড়িই আসে আগে। সেখানে থামলো দুইজনে। আবার বিনিময়, ‘অদৃশ্য সঙ্কেতের’।
“আসবি?” তথাগত বল্লো।
অনীক বল্লো, কাকে কেজানে “আশ্চর্য”।
উত্তরে কিংবা নিরুত্তরেই তথাগতও বল্লো “আশ্চর্য”।
মধ্যরাতের সিঁড়ি ভেঙ্গে একেবারে চূড়ায় উঠে এসে অনীকের মনে হলো এ হতে পারে একটি নিঝুম গল্পের হাড়গোড়। সঠিক জুড়ে দিতে পারলেই অবয়ব — গল্পের। এই গল্পের কেন্দ্রে শ্রাবণী নামের মেয়ের আদতেই কোনো ভূমিকাও নেই — এই কথাটির সঙ্গে আরো একটি ‘আশ্চর্য’ টের পেলো অনীক। … মনেহলো লেখকও এক রকমের পঙ্গুই। যা’ই ঘটুক তার আবহে সে পারেনা তার অক্ষর-হুইলচেয়ার ছাড়া এক কদম চলতে…
গল্পটির নামও স্থির হয়েগেলো, মুহুর্তে, তার মগজে।
“মধ্যরাতের সিঁড়ি”।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)