“শ্রেষ্ঠ গল্প- শুভঙ্কর গুহ” একটি পাঠ, কয়েকটি কথা <br /> :: কৌশিক মিত্র

“শ্রেষ্ঠ গল্প- শুভঙ্কর গুহ” একটি পাঠ, কয়েকটি কথা
:: কৌশিক মিত্র

বাঙলা সাহিত্যে ছোট গল্পের প্রাচুর্য নেহাত কম নয়।বিগত শতাব্দী জুড়ে অসামান্য মণিমুক্তো সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সৃজনশীল সাহিত্যিকের কলম থেকে।কয়েকটি নাম উল্লেখ করতে গেলে অবশ্যই আসবে…রমেশ চন্দ্র সেনের ‘সাদা ঘোড়া”, সমরেশ বসুর “আদাব”,নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের “টোপ” তারাশঙ্করের “আখড়াইয়ের দীঘি” কমলকুমারের “নিম অন্নপূর্ণা”-১৯৯৮ সনের ৫ই সেপ্টেম্বর দেশ পত্রিকায় স্বাধীনতা উত্তর শ্রেষ্ঠ পঞ্চাশটি গল্পের একখানা তালিকা বেরিয়েছিল তাতেও এসে পড়ে কিছু কালজয়ী সৃষ্টি। বস্তুত এই সংখ্যা বেরনোর পর অন্তঃত দুটি দশক অতিবাহিত হয়ে গেছে,বাঙলা সাহিত্যে ছোট গল্প কেন্দ্রিক পরীক্ষা নিরীক্ষার জায়গাটি আরও সম্প্রসারিত হয়েছে, এবং ছোট পত্রিকাগুলির হাত ধরে উঠে এসেছেন একের পর এক শক্তিশালী গল্পকার। বলাই বাহুল্য যে বিগত দশকটিতে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে লেখালিখি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণে সাহিত্যের এই ধারাটি আরও পুষ্ট হয়েছে। এ লেখার উদ্দেশ্য নয় বিগত শতক বা দশকের গল্প সাহিত্যের তুলনামূলক সম্প্রসারণ বা শ্রীবৃদ্ধির জায়গাটি নিয়ে আলোচনা করা, বরং এ লেখায় আমরা আলোচনা করব এই সময়ের একজন শক্তিশালী গদ্যকার এর একটি গল্পগ্রন্থ নিয়ে।সুসাহিত্যিক শ্রী শুভঙ্কর গুহ তার “বিয়োর” উপন্যাসের জন্য ইতিমধ্যেই পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছেন। বস্তুত বাংলায় সাপুড়িয়া সম্প্রদায়ের জীবন-ইতিহাস নিয়ে  বাঙলা সাহিত্যে শ্রী গুহ যে কাজটি করেছেন এককথায় তার তুলনা পাওয়া ভার, নিবিড় গবেষণা ,নির্মোহ মনন, এবং সাবঅলটার্ন মানুষদের প্রতি অপার মমত্ব ফুটে ওঠে এ উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে।এক মায়াবী মুগ্ধতার রেশ থেকে যায় এই উপন্যাস পাঠের পরেও, আর তাকেই সঙ্গী করেই অতঃপর আশ্রয় নেওয়া তাঁর গল্পগ্রন্থ, “শ্রেষ্ঠ গল্প” এ। চব্বিশটি গল্প রয়েছে এ বইখানায়।  কি আশ্চর্য এ গ্রন্থে কিন্তু আর “বিয়োর” এর কাহিনীকারকে পাওয়া যায় না। এ গ্রন্থে লেখক বহমান জীবনের প্রেক্ষাপটে থাকা  ব্যক্তিসত্তার ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়েছেন প্রতিটি গল্পে এবং তুলে এনেছেন আধুনিক মনঃসমীক্ষণের এক ভিন্ন আঙ্গিক। মনোবিদ কার্ল রজার্সের বর্ণিত “সেলফ” এর অত্যাধুনিক বিশ্লেষণ প্রতিটি গল্পে। ঘটনার চরিত্রগুলিরর ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে লেখক সত্তার নিবিড় মিথস্ত্রিয়ায় প্রতিটি গল্পই হয়ে ওঠে আধুনিক সাহিত্যের পরীক্ষাগার।

একটু বিশদে লেখা যাক।গল্পগুলি বেশিরভাগই লেখা উত্তমপুরুষে অর্থাৎ গল্পের চরিত্র নিজেই বলে চলেন প্রবহমান সময়ের কথা। আর এখানেই এসে যায় এক অদ্ভুত আত্মসমীক্ষণ পর্ব যা একাধারে অভিনব। সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের পল্লীজীবন এ গল্পগ্রন্থে প্রেক্ষাপট হিসেবে এসেছে খুব কম বরং বারেবারে এসেছে  পার্বত্য মধ্যভারত অথবা ছোটনাগপুরের রুক্ষ অথচ সজীব প্রকৃতি,একইকথা বলা চলে গল্পগুলির চরিত্রগুলির ক্ষেত্রেও।নিখাদ বাঙালী জীবন বা বাঙালী মনন গল্পগুলিতে অনুপস্থিত বরং চরিত্রগুলির মধ্যে ফুটে উঠেছে এক সর্বভারতীয় লোকায়ত মনন ও বিশ্বাস।প্রকৃতি ও অরণ্য জীবনের উপর নিবিড় ভালবাসা, মানবমননের বিচিত্র অভিসঞ্চার, বিশ্বমানবতা,লোকায়ত জীবন এবং বিশ্বাস  ভারতীয় দর্শনের নির্যাস, সর্বোপরি ভারতবর্ষের বহমান সাব-অলটার্ন জনজীবনের যাপন চিত্র এ গল্পগ্রন্থের প্রাণ।ক্ষেত্রবিশেষে যাদু বাস্তবতার অমোঘ প্রয়োগ গল্পগুলিকে পৌঁছে দেয় অন্য মাত্রায়… স্বীয় গুণে গল্পগুলি হয়ে ওঠে এক একটি চলমান চিত্র। এই প্রসঙ্গে বার বার মনে আসছে আকিরা কুরোসাওয়ার “ড্রীমজ” ছবিটির কথা্। যাঁরা ছবিটি দেখেছেন আর এ গল্পগ্রন্থ খানা পড়েছেন অথবা পড়বেন তাঁরা এহেন মন্তব্যের সঙ্গে সহমত হবেন এমনটিই বিশ্বাস রাখি।আমরা আসব কয়েকটি গল্পের সবিস্তার আলোচনায়।

ভুটান সীমান্তে হিমাচল হিমালয়ের একটি পাহাড়ি গ্রামের প্রেক্ষাপটে লেখা কাহিনী “মায়াতুষার”। পাহাড়ি কাঠুরিয়া ন্যান্টোবাহাদুরের জীবনরেখার মধ্যে দিয়ে গ্রামীণ জীবনশৈলী,লোকায়ত বিশ্বাস মনোবিকলনের তীব্রতা নিদারুণ ভাবে ফুটে ওঠে এ গল্পে।মানুষ ন্যান্টোবাহাদুর জীবনের রুক্ষতায়, মনোবিকলেনের প্রাবল্যে, নিদারুণ নিসঙ্গতায় রূপান্তরিত হয়ে যায় একটি পাহাড়ি শিয়ালে। এ যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবীয় চেতনার, একটি ব্যথাতুর সত্তার অবাঞ্ছিত মেটামরফোসিস, যার কোন প্রয়োজন হয়ত ছিল না।

এ গ্রন্থের তৃতীয় গল্প,“নিবেদনে এসরাজ”।কি বলা যবে এই গল্পটিকে? কোন বিমূর্ত চিত্রকলা নাকি অমলিন ভাস্কর্য অথবা কালজয়ী কোন সুরের কম্পোজিশন? জীবন সাধনা ও প্রকৃতির অপুর্ব মিথঃস্ক্রিয়ার নির্যাস থেকে উদ্ভূত এক অন্তর্লীন অনুভূতি কিছু শব্দের মাধ্যমে ধারণ করে এক করুণ অবয়ব যার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই ম্যাজিক রিয়েলিজমের স্বার্থক প্রয়োগে অবয়বটি মিলিয়ে যায়,নিঃসঙ্গ পাঠক দাঁড়িয়ে থাকেন হাহাকার করা শূন্যতার মিনারে। বেনারসের একটি আদ্যন্ত সঙ্গীতজ্ঞ পরিবারের আপনভোলা সন্তান সুধীরাম, যে তার প্রিয় এস্রাজটিকে নিয়ে মেতে থাকে সুরের সাধনায়।পিতা জানকীরাম এবং অন্য শুভানুধ্যায়ীদের ইচ্ছা একটি সংগীতের আসরে তার সাধনা বিস্তৃতি লাভ করুক, ছড়িয়ে পড়ুক সেই সাধনার নির্যাস সারা দেশ জুড়ে। সুধীরাম তাঁর নিবিড় সাধনা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সেই সাধনার মেলবন্ধনটিকে ব্যবসার উপকরণ হতে দিতে চান না।অগত্যা সুধীরাম স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে চলে যান লাজো পাহাড়ের(সম্ভবত শিবালিকের অংশ)উপত্যকায় একটি পাহাড়ি গ্রামে।তাঁর এসরাজের অপূর্ব বাদন প্রকৃতির সঙ্গে মেতে ওঠে অভিসারে,সে সাধনা লাজো গ্রামকে জাগিয়ে রাখে,হয়ে ওঠে তার সুখদুঃখের অচ্ছেদ্য সাথী।কৃতজ্ঞ গ্রামবাসীরা সুধীরামকে তাঁর এই সাধনার জন্য দক্ষিণা দিতে চান।গ্রামপ্রধান দিবাকর যিনি নিজে সুধীরামের একজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা এবং ভক্ত, জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলে একটি সংগীতের জলসার আয়োজন করেন, এবং এই অনুষ্ঠানের মধ্যেই সুধীরামকে সম্বর্ধনা দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।এবং এখানেই দিবাকর বড় ভুল করে ফেলেন আসলে সাধক সুধীরামকে তিনি সনাক্ত করতে পারেননি।নিজের সাধনাকে চিহ্নিত করেন সুধীরাম এ ভাবে- “ মানুষ মাটির সঙ্গে একা একা কথা বললে সে সন্ন্যাসী হয়ে যায়। কলাকার হয়ে যায়।আর আমি চেষ্টা করছি ঐ কৃষকের কথা এসরাজে তুলে আনতে। এসরাজ মানুষের কথা সুন্দর ভাবে অনুসরণ করে।”সুতরাং দিবাকরের এহেন প্রস্তাব সুধীরামের কাছে বড় অসার হয়ে যায়,তিনি নীরবতা অবলম্বন করেন এবং জমাট নীরবতার মধ্য দিয়েই ফিরিয়ে দেন সেই সম্বর্ধনার প্রস্তাব।লাজো উপত্যকায় একদিন সেই সঙ্গীত সম্মেলন হল, বিখ্যাত বাজিয়েরা এলেন, এলেন মাননীয় জেলাশাসক ও অন্যান্য সম্মানীয় অতিথিবৃন্দ, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পশারীরা,সেদিন আর বেজে উঠল না সুধীরামের এসরাজ বরং উপত্যকা মুখর হয়ে উঠল অন্যান্য যন্ত্রসংগীত এবং কণ্ঠসংগীতের অনির্বচনীয় ঐকতানে।গভীর নিশীথে বিশ্বপ্রকৃতি যখন গভীর সুষুপ্তিতে আচ্ছন্ন, সন্তপ্ত সুধীরাম উপত্যকার একটি পাথরে এসে বসেন অন্তিম সাধনায়। তাঁর সাধনা, সমগ্র সত্তা বিলীন যায় বিশ্বচরাচরে।আকশে যখন রঙের ছোঁয়া, হতাশ দিবাকর উপলব্ধি করলেন তাঁর সব আয়োজন আজ ব্যর্থ, বহু প্রচেষ্টায় সাধিত এই সঙ্গীত সম্মেলন তার কাছে একটি বাজার হিসাবে পরিগণিত হতে থাকে, তিনি দ্রুত বেগে ধাবিত হন সুধীরামের আশ্রমের দিকে।কিন্তু কি দেখলেন দিবাকর!! “কোথায় সুধীরামের আশ্রম? এক ঝাঁক নানা রঙের পাখি আকাশের দিকে মুখ তুলে গাইছে সমবেত সংগীত। স্মৃতি থেকে ভাবতে চেষ্টা করছিল দিবাকর, সুধীরাম নামে কোনো সঙ্গীত সাধক সত্যিই কি এসে বসবাস করেছিলেন লাজো উপত্যকায়? “নিজেকেই সে প্রশ্ন করতে থাকল মহা সংগীত সম্মেলনের থেকেও লাজো উপত্যকায় সুধীরামের উপস্থিতি অনেক বেশি জরুরী ছিল…জরুরী ছিল।”

অসামান্য আর এক সৃষ্টি “ফিরে এল উড়ান”। কন্যাহারা এক ঘুড়িশিল্পী ফটিকনাথ জীবনের প্রান্তভাগে এসে বড় নিঃসঙ্গ।চোখে তার গ্রামের বিভিন্ন সময়ের অলৌকিক মায়াবী যাপনচিত্র।কিছু কথা তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা,কিছু হয়ত বা দেখা-সে অলৌকিক ভাবে শুনতে পায় বিলুপ্ত হুকনা পাখির আতংকিত ডাক,প্রাণপণ অনুসন্ধানে আবিষ্ট ফটিকনাথ দেখা পায় প্রাচীন জমিদার গিয়াসুদ্দিনের আবার হয়ত বা অনেক পরবর্তীকালের জমিদার বিল্বনাথের।কিছু কাল্পনিক কথোপকথন আর এর মধ্যেই উঠে আসে দুটি ভিন্ন সময়কালের আধিপত্যকামী মানসিকতার তীব্র দ্বন্দ এবং লড়াই।ক্ষয়িষ্ণু জমিদারশ্রেণীর শেষ প্রতিভূ বিল্বনাথ ফটিকনাথকে অর্পণ করে যান তার নিজস্ব্ শখ ঘুড়ী নির্মাণ শিল্পের কলা।ফটিকনাথ সেই শিল্পেই নিজেকে সমর্পণ করে দেয়।চাষবাসের কাজ বা জীবিকা তার কাছে গৌণ হয়ে যায়।প্রিয়তমা আত্মজা লতা একদিন হারিয়ে যায় তার জীবন থেকে,তার প্রিয়তম শিল্পকার্যের সঙ্গে যুক্ত সুতার সঙ্গে ভেসে ভেসে লতা কোন দূর দিগন্তে বিলীন হয়ে যায়।কেটে যায় বহুদিন। দেশ বদলের চালচিত্রের ছাপ ধরা দেয় গ্রামীণ জীবনেও। ইউনেস্কোর প্রতিনিধি লতা খুরশিদ একদিন গ্রামে আসেন একটি পানীয় জল প্রকল্প রূপায়ণের বার্তা নিয়ে।তিনি সম্বর্ধিত হন।লতার জন্য প্রাণমন ঢেলে ফটিকনাথ গড়ে তোলে অবলুপ্ত হুকনাপাখির একটি অবয়ব।শেষ পর্যন্ত সেই উপহার ফটিকনাথ তুলে দেয় লতার হাতে, না কোন লতা খুরশিদ নয়ত এ যেন তার হারিয়ে যাওয়া আদরের কন্যা লতা।পিতৃহৃদয়ের আর্তি ফুটে ওঠে এভাবেই,“কত দিন পরে, কত বছর পরে তুই ফিরে এলি নন্দপুরে। কত বড় হয়ে গেছিস তুই। কানা নদীর পারে তোর মা ঘর বাস্তু করে নিল।তোকে ছাড়াই দাহ করে দিলাম।তোর মা থাকলে তোকে দেখতে পেলে তোর হাত ধরে চলে যেত ফাঁদি জাল নিয়ে বিল বাদাড়ে।….জানি না আবার কবে তোর সঙ্গে দেখা হবে। হয়তো সামনের জন্মে।এখন ক্ষয়ে গেছি আমি। বাকি শুধু এই শরীরটুকুই আছে রে লতা।। মনে আছে তোর আমি তোকে হুকনা পাখির গল্প বলতাম।কত গল্প বলেছি।তুই অবাক হয়ে শুনতিস।” লতা খুরশিদ বিস্ময়াপন্ন হয়ে এই স্নেহশীল বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকেন,জীবনের উড়ান পুনরাবৃত্ত হয়।

“ফিওদর উসমানি ওয়াজীর বৃত্তান্ত” এ গ্রন্থের অন্যতম সেরা এক সৃষ্টি।ফিওদর হামিদ উসমানি তাঁর পিতামহ ফিওদর উসমানি ওয়াজীর স্নেহচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠেন।সময়ের দাবীতে, উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে এবং অর্থ উপার্জনের তাগিদে তিনি যাত্রা করেন এক শহরে।এক প্রাজ্ঞ পশুচিকিৎসকের সান্নিধ্যে হামিদ এগিয়ে চলেন এক সফল পশুচিকিৎসক হওয়ার দিকে। তিনি প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু হারিয়ে ফেলেন তিনি তাঁর গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ, পিতামহ ফিওদর উসমানি ওয়াজীও হারিয়ে যান তাঁর জীবন থেকে।ফিকে হয়ে যায় সেই পথপ্রদর্শক প্রাজ্ঞ পশুচিকিৎসকেরস্মৃতি।বহুদিন পর এক বিষণ্ব বিকেলের মরে আসা মায়াবী আলোয় এই তিনটি চরিত্রের সাক্ষাত হয়।।টুকরো কাল্পনিক সংলাপ,জীবনের ধূসরতা কে জীবন্ত করে দিতে থাকে, হামিদ অচিরেই উপলব্ধি করেন তাঁর প্রতিষ্ঠার অসারতা।

“ডায়ারির ছেঁড়া পাতা” গল্পে দেখা যায় জটিল মনোপ্রকৃতির এক অপরূপ বিস্তার।গল্পখানার মুখ্য চরিত্র এক বন্দর শহরেরর নকশা শিল্পী যিনি স্বীয় মনোপ্রকৃতির নির্মাণ-বিনিমার্ণের এক জটিল প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত।প্রতিমুহুর্তে তিনি যুদ্ধ করেন তাঁর অলটার ইগো এবং সুপার ইগোর সঙ্গে।ক্ষতবিক্ষত শিল্পী সেই অসম লড়াইয়ের মধ্যেও স্বযত্নে রক্ষা করে চলেন তাঁর উত্তরাধিকার-পিতৃদেবের দিয়ে যাওয়া অথচ না পড়ার জন্য অনুরোধ করা একটি ডায়ারির ছেঁড়া পাতা।। সেই অনুরোধ কি রাখতে পেরছিলেন শিল্পী?গল্পের শেষে দেখা যায় বন্দরের একটি মিশরীয় জাহাজের সন্নিকটে পড়ে থাকা এক অসনাক্ত মৃতদেহ,যার পকেটে থেকে যায় “ডায়ারির ছেঁড়া পাতা”।সুররিয়ালিজম এবং জটিল মনস্তাত্বিক সংঘর্ষের করুণ পরিণতিজনিত আবেদন এ গল্পের পরতে পরতে।

মধ্য এবং উত্তর ভারতের জাতপাত এর সংঘর্ষ শৈল্পিক বিবরণে বিধৃত হয় “বনক্ষেত্র” গল্পটিতে।হিমাচল এর পাহাড়ি সড়ক,দিনের শেষ বাস,যাত্রীরা মুখচেনা-সে বাসে হঠাৎই আবির্ভাব এক কেতাদুরস্ত সাংবাদিকের,নাম প্রভাত ভাটিয়া।গন্তব্য পাহাড়ি গ্রাম নাহোলি।সেই যে যেখানে, খোলা আকাশের নীচে, উচ্চবর্ণের ঠাকুর সমাজের প্রহারে জর্জরিত হয়ে শায়িত রয়েছেন তথাকথিত নিম্নবর্ণের সংগ্রামী জনগণের প্রতিভূ মানস কুরমার, দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা, শোষণ এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলেন মানস পরিণাম এই “শরবিদ্ধ যেন এক কঙ্কাল শুয়ে আছে শরীরের ছেঁড়া চামড়া আর পোড়া মাংসের অস্তিত্ব নিয়ে।।একটি পোড়া কাঠের মতন শরীরে ছড়িয়ে আছে গাছের শুকনো পাতা।এবং গাছের ডালে বসে থাকা পাখিদের বিষ্ঠা।প্রথমে দেখে মনে হয়েছিল মানুষের সভ্যতার দুঃখিত মরশুম পার হয়ে যাচ্ছে তীক্ষ্ণ বনকাঠ বিদ্ধ এই মানুষটি।” এবং এই মানুষটির মৃত্যুই কিন্তু তথাকথিত নিম্নবর্ণের জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভে অগ্নিসংযোগ করার পক্ষে যথেষ্ট। সাংবাদিক ভাটিয়া সেই ক্রান্তিকালের সাক্ষী হতে চান।তাঁর কলমে তুলে আনতে চান এই সংগ্রামের আনুপুর্বিক ইতিহাস। বাস ড্রাইভার গুর্জর সিং এর আতিথ্য বরণ করে নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনপদে ঘুরে বেড়ান ভাটিয়া।লক্ষ্য করতে থাকেন সভ্যতার আদিম প্রবৃত্তিগুলির নিঃশব্দ পদসঞ্চার।একদিন আগুন জ্বলে ওঠে সেই উপত্যকায়।আর সেই আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়েই দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় প্রভাতের গলায়।“ ভারতবর্ষের সংবাদ মাধ্যম যদি সব সময় সত্যি কথাই প্রকাশ করত তাহলে আমাদের দেশ মহাভারত হয়ে উঠতে পারত।আমরা যা লিখি তা অনেক সময় প্রকাশ হয় না।নাহোলির ঠাকুরগোষ্ঠী যে খুব প্রভাবশালী তা জেনেও আমি স্টোরি করতে এসেছিলাম।আমি জানি আমার কাজ আপাত পারলৌকিক ক্রিয়ার মতন স্বান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়।”

মহাকাল, গ্রামীণ জীবন, কিছু লোকগাথা,দুটি চরিত্র, টুকরো সংলাপের মধ্যে দিয়ে এক আশ্চর্য লালিমায় ধরা দেয় ‘মায়াদুপুর’ গল্পে।যাদু বাস্তবতারর অমোঘ প্রয়োগে তা যেন হারিয়ে যায় মন কেমন করা এক অন্তর্লীন শূন্যতায়।

আমাদের চলে আসতেই হয় “দোকানতন্ত্র” গল্পটিতে।একটি চায়ের দোকান,দোকানের মালিক ‘মোতিদা’ আর সেই চায়ের দোকানে সময় কাটাতে আসা এক অবসর প্রাপ্ত আধিকারিক। দুটি পৃথক জীবন,দুটি পৃথক সংস্কৃতি এবং আলাদা জীবনশৈলী,তবুও কি এক অচ্ছেদ্য বাঁধনের নিগড়ে কাছাকাছি চলে আসে দুটি চরিত্র।হঠাৎ করে মোতিদা মারা যান।গভীর রাত্রে শ্রাদ্ধবাসর থেকে ফেরার পথে ঐ আধিকারিক মানসচক্ষে লক্ষ্য করেন, মোতিদার দোকান খুলেছে-সেখানে দেখা যায় স্বাভাবিক কাজকর্ম।মোতিদা বিস্ময়াহত আধিকারিককে উদ্দেশ্য করে বলে চলেন “বসুন।বসে পড়ুন। কি ভাবছেন?আমি মৃত? ধুস এই মায়াবী সংসারে জন্মালে কেউ মারা যায় না।অনেকে অনেকের বিনাশ করতে চায়।কিন্তু পারে না। আমরা আমাদের জীবন্ত অস্তিত্ব নিয়ে বড়ো বেশি ভাবি।আসলে মানুষটা না থাকলেও, মরে গেলেও মানুষটা থাকে।” আহা! এ যেন ভগবৎ গীতা/ভারতীয় দর্শনের সেই অমোঘ উপলব্ধির কাছে বিনম্র অভিবাদন।

“গল্প বলিয়ের গল্প” এমনই আর এক অসাধারণ আখ্যান। উত্তম পুরুষে বর্ণিত এ গল্পের মূল চরিত্র এক লেখক যিনি গল্প বলিয়েদের জীবন নিয়ে একটি গবেষণার ইচ্ছা রাখেন। একটি রিপোর্টিং এর সূত্র ধরে তিনি পৌঁছে যান বিহারের মোকামায় জনৈক দিওয়াকর মিশ্রের খোঁজে, চোখে তাঁর কল্পনার মায়াকাজল।তিনি স্বপ্ন দেখেন ইতিহাসের সারণি বেয়ে গ্রামীণ জনজীবনের স্নেহস্পর্শ্য পাওয়া  ধূলি ধূসরিত কোন মুখ তিনি আবিষ্কার করছেন, কার্যত তিনি যাঁর সাক্ষাৎ পেলেন তিনি একজন গল্প বলিয়ে বটে কিন্তু পেশাদার, অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধি এবং গল্প বলার সাবেকি কায়দাকে তিনি মুড়ে দিয়েছেন আধুনিকতার উপকরনে। লেখকের স্বপ্নের অনভিপ্রেত মৃত্যু ঘটে যায়। তিনি মুহ্যমান হন। আধুনিকতা বনাম সাবেকীয়ানা অথবা সভ্যতার দ্বন্দ্ব এ গল্পের প্রতিপাদ্য।

“চিনির পুতুল অথবা গ্রামপক্ষের জ্যোৎস্না” গল্পে দেখা গেল প্রাচীন গ্রাম সমাজের অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণদান এর শোষক রূপটিকে। চাঁদের আলোয় ব্যক্ত দুটি অশরীরি ভ্রাম্যমাণ ছায়ামানবের সংলাপ চিন্তাভাবনা প্রকট করে দেয় সামন্ততন্ত্র অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিক পুঁজিবাদী শোষণের ভয়াল স্বরূপটিকে। গল্পের শেষে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাঙ্কগুলির ধসে যাওয়া এবং গ্রামীণ মহাজন দীনু বণিকের মৃত্যুর সমাপতন যেন প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পুঁজিবাদী শোষণের মৃত্যুঘন্টা বাদনকেই সূচীত করে যায়।অনেকটা একই ধরণের কাজ দৃশ্যমান হয় “কালসিন্ধুর ছকবাজি” গল্পে। একটি রূপকের মধ্যে দিয়ে পুঁজিবাদী শোষণ/স্বৈরতান্ত্রিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম-যে সংগ্রামে মানুষের পরাজয় ঘটলেও হয়ত বা থেকে যায় আগামী দিনে সাম্যবাদী বিজয়ের স্বপ্ন।

“মৃত্তিকাচরিত” এ গল্পগ্রন্থের অন্যতম সেরা এক সৃষ্টি। মৃত্তিকাশিল্পী বৈদ্যনাথের সত্তার গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মরমীয়া মানবমন, শিল্পসত্ত্বা, প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার তীব্র আর্তি এ গল্পে ফুটে ওঠে আশ্চর্য সুষমায় । নিজস্ব শিল্পকর্মের পাশাপাশি বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দখে এক আশ্চর্য কচ্ছপ নির্মাণের যা নিকটস্থ স্বাতীর জলের সংস্পর্শে পাবে প্রাণের পরশ।জড় এবং জীবনের মিলনে সৃষ্টি হবে এক নূতন প্রান।প্রকৃতির প্রতি অপার মমত্ব এবং শিল্পীহৃদয়ের নিগুঢ় আর্তি এবং “স্বপ্রাণবাদ” সংক্রান্ত ধারণাবলীর স্বার্থক প্রয়োগ এ গল্পের মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

“একটি মৃত্যুর তারিখ” গল্পটিতে কলকাতার অবাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারের খন্ড যাপনচিত্রের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে তাদের একাকীত্ব, উৎসের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা প্রভৃতি বিষয়গুলি।“পাখি বিষয়ক” আখ্যানটিতে ধরা পড়ে অবলুপ্ত প্রায় পাখি সংরক্ষণ, নারী স্বাধীনতা এবং আধুনিক মানব মননের জটিল পদসঞ্চার। একইভাবে “বংশীলাল” [প্রেক্ষাপট সর্বভারতীয়] গল্পটিতেও দেখা যায় সামাজিক বিচারবোধ বা স্টিরিওটাইপ কিভাবে মানবিকতার বিরুদ্ধে জয়লাভ করে যা হ্য়ত একবারেই কাম্য নয়।

“নৌকাবিলাসী” গল্পখানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ সমাজের এবং মানসিকতার বহুমুখী সরণের প্রতিচ্ছবি।বিচিত্রপুর গ্রামের একটি সরোবর নাম তার হেঁসোপুকুর,গ্রামবাসীর কাছে সে সরোবরের মাহাত্ম্যই আলাদা.সেখানে ভাসে ধনী জোতদার নাদন আলির বাহারে নৌকা।গ্রামের অন্য প্রান্তেই বয়ে চলেছে হাজার বছরের পুরনো অথচ বড় অবহেলিত কানা নদী।সেখানে ডিঙি নৌকা নিয়ে ভেসে বেড়ায় রাখাল মাঝি। বড় নিঃসঙ্গ অবহেলিত জীবন তার, কানানদীর মতই। এক তীব্র বর্ষায় কানানদী হয়ে ওঠে উত্তাল, সে গ্রাস করে নেয় হেঁসোপুকুরকে,নাদন আলির আদরের নৌকা যায় হারিয়ে।বহু অনুসন্ধানের পর রাখাল মাঝি সে নৌকা উদ্ধার করে এনে দেয় নাদন আলিকে।তারপর সে হারিয়ে যায় নিজের জগতে। একই জায়গার দুটি পৃথক অবস্থান ও একই সমাজের দুটি পৃথক অংশের জীবন চিত্রের বৈপরীত্য এবং প্রকৃতির ভ্রুকুটির কাছে এই অবস্থানগুলির অসহায়তা অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে বিধৃত হয় এ গল্পে।

‘ইতি শ্বেতশোক” গল্পে এক ব্যক্তি তাঁর মায়ের মৃত্যুকালীন ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্মাণ করেন প্রবহমান সময়ের ইতিকথা।এক মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনবোধ, ধর্ম বিশ্বাস এবং মনস্তাত্বিক দ্বন্দের গভীরতা, গল্পের নির্মাণশৈলীর অভিনবত্বে পাঠকসত্তাকে বিমূঢ় করে দেয়।একই ধরণের নির্মাণ কৌশল দেখা যায় “পোকা” গল্পটিতেও।

বিশেষ করে যে গল্পটির কথা আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার তা হল “ ইসমাইল…ইসমাইল…” । নির্জন পাহাড়ি মুনশিগঞ্জ স্টেশনের স্টেশনমাস্টার অবধেশ পণ্ডিত। স্টেশনে সারাদিন দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন আর মালগাড়ী…কয়েক ঘণ্টার টিকিট বিক্রি,স্টেশন চত্বরের তদারকি,অখন্ড অবসরে স্ত্রীকে চিঠি লেখা।সে চিঠিতে অবধেশ লিপিবদ্ধ করেন তাঁর প্রকৃতি ও অরণ্য প্রেম,এবং বিশ্বমানবতা। স্টেশনে বসেই অবধেশ লক্ষ্য করেন মানবচরিত্রের আনাগোণা।তিনি পতিতালয়ের কর্মীদের মানবিক আচরণে আলোড়িত হন আবার সাধারণ মানুষের উদাসীনতা তাঁকে দুঃখ দেয়।জীবনের ঔদার্য্য, অসহনীয় উত্তাপ এ গল্পটিকে এক অসামান্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়।

সুদীর্ঘ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, বহমান মানব সভ্যতার বহুবিধ অভিঘাত, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি অপরিসীম ভালবাসার সাক্ষর থেকে যায় এ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পেই। ভাল লাগত এ গল্পগ্রন্থের সবগুলি গল্পের উপরেই কিছু বলতে পারলে-কিন্তু কোন আলোচনাতেই এমনটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই গল্পগ্রন্থে লেখক পাঠককে বার বার পৌঁছে দেন তার অস্তিত্বের উৎসমূলে। বিভিন্ন আঙ্গিকে সাইকোফিজিকাল রিয়েলিটিকে মূর্ত করে তোলা, সামাজিক সমস্যাগুলিকে বার বার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাওয়া, জাদুবাস্তবতার অনবদ্য প্রয়োগ গল্পগুলিকে পৌঁছে দেয় একটি মিনারে, যেখানে পাঠক  গল্পগুলির শৈল্পিক বিস্তারের মধ্যে বিলীন হয়ে যান। পা্ঠশেষে, অসামান্য এই সৃষ্টিগুলির প্রতি এবং স্রষ্টাকে বিনম্র অভিবাদন জানানো ছাড়া কার্যত আর  কিছুই করার থাকেনা।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)