শ্রীময়ী ভট্টাচার্য-র কবিতাগুচ্ছ

শ্রীময়ী ভট্টাচার্য-র কবিতাগুচ্ছ

ঝাঁপতাল


মেয়েটির সচরাচর ঘুম ভাঙে না।

মেয়েটির ঘুম ভাঙলে চইচই আর হইচই যায় দোকানে।
রামধনু কিনে এনে লাগিয়ে দেয় সাত দেওয়ালে।

মেয়েটি দেওয়াল কুড়ে কুড়ে রং খায়।

মেয়েটির উসকোখুসকো চুল, হইচই ভাসিয়ে দেয় দালানে।
আর চইচই?
মহানন্দে ডানা বেয়ে ভেসে বেড়ায়।

মেয়েটি কাঁদে না সচরাচর।
মেয়েটির চোখের কোলে সমুদ্র টলমল করে। আর চোখ নেমে আসে সমতলে।
চইচই দালান ছেড়ে এক লাফ দেয় চোখে।
হইচই গান ধরে।

সেই কবে সে মাঝি আর চড়ুইপাখির গান বেঁধেছিল! সেই গান।

মেয়েটির নৈঃশব্দ ভালো লাগে, আবার লাগেও না।

মেয়েটি হাসে না সচরাচর।
শুধু চোখের পাতায় অরণ্য লেগে যায়।
তিরতির তিরতির করে হেসে ওঠে পাতাবাহার।
হইচই ছুট্টে যায় দোল খেতে।
আর চইচই?
কুমীর ডাঙ্গা খেলে।

মেয়েটি চোখ পেতে রাখে,
যতক্ষণ না দূর থেকে কেউ তাকে
মুগ্ধতা বলে ডাকে।

নামের ভারে মেয়েটির চোখ বুজে আসে।
হইচই আর চইচই মিলিয়ে যায় হাওয়ায়…

মেয়েটির ঘুম ভাঙে না সচরাচর।
কিন্তু একবার ঘুম ভেঙে গেলে, মেয়েটি আর ঘুমোতেই চায় না…


এত কিলবিল, আর এত কিলবিল, আর এত হয় ভয়…

সাপের মৃত্যুসংশয়
ঢেকে রাখে বিরহের ডিম।

অহেতুক দোলে বঙ্কিম !


সকাল সকাল মেয়েটির বেড়াল দশা চলে।
তার সাপরঙা চুল লেজের মত ঘুরপাক খায় তখন…

তাৎক্ষনিক ওঠাবসা, আদর…
আঙ্গুল পা টিপে টিপে হেঁটে চলে কাতুকুতু অবধি।

তারপর খেই নেই, খেয়া নেই; ছেলেটির অতীতের ঘুম আসে খুব।

ঘুম ভাঙে।
ভাঙে কি?
ভাঙলেও দোলনার দিব্যি…

মেয়েটি না। বাঁশুরিয়া বলেছিল কবে,
বেড়ালের কান্না অশুভ।


পলক না ফেলতেই শতাব্দী ঘুরে এসে দাঁড়ায়।
হাঁফ নেয়।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

হাঁটুতে জাঁকিয়ে বসে সময়।

কে তাকে বোঝাবে বলো,
আঁকড়ানো ছোঁয়াচে স্বভাব?

ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে তার, ধোঁয়া হয়, সব ধোঁয়া লাগে…

পাড়ে বসে থাকে মেঘ, শহরকে পেটে আগলিয়ে…

পলক না ফেলতেই মেয়েটি গভীরে এসে দাঁড়ায়।

শতাব্দী জেটি হয়ে যায়…


আজানের সুর ভেসে আসে। রোজকার সন্ধের মত।
পিরীতি, পাড়া মাতিয়ে, লুকোয় ঘরের খাঁজে এসে।

মাটিতে ঈশান কোণে উপড়ানো বিছানার রেশ
মনে রাখে,
চার ক্রোশ
নিস্পলক
তাকিয়ে থাকা।

ক্ষীরগঙ্গার ধারে মেঠো পথ, পাহাড়ী ফতোয়া,
হাঁটু গেড়ে বসে শোনে চাতক।

সে ভাবে বাউল গান, মন্থনে সংযমরত।

অযথা মাটিতে যায় মানচিত্র ভাসান,
বিরহে…

কেন?
কে জানে?
না-জানা, উড়তে শিখে, সোহাগের চোখ বুজে আছে।
এমন ওড়ার আহ্লাদ!

আজানের সুর ভেসে আসে। রোজকার সকালের মত।
আলগোছে রাতটুকু মেয়েটি যত্নে বাঁধে চুলে।

এবং, ছেলেটিও !


এ’যাবত জ্ঞান ছিল। পাপবোধ ছিল সন্দিহান।
শিয়রে নরম কাঠি লুকিয়ে দিলেন ম্যাজিশিয়ান।

ঝড় খুবই ক্লিশে, তবু ঝড় ছাড়া কী ডাকব বল্?
কবিতা লেখায়, আর কবি ভাবে ঘুম সম্বল।

ঘুম ঘুম ঘর তার পরাবাস্তব মনে হয়
রৈখিক দিন, সে তো বিভ্রম, জানায় সময় ।

সোনাকাঠি-রুপোকাঠি মেলায় কে তার নেই ঠিক
গুলাবি বন্নো শুধু গান ধরে, একা, নির্ভীক।

গানের ভেতরে সুখ, চিলেকোঠা, চুমু,
আর থাক…
আপাতত পাপবোধ অন্ধ, বন্ধ, নির্বাক।

আদরের সুর লেগে নিঃশ্বাস ও চোখ বুজে থাকে।
মেয়েটি কী ঠিক-ভুল, ভোলে দুর্নিবার বিপাকে…


এতই কাতর
তার চাহনির জোর
চোখ কি করে সরাই?

মেয়েটি ঝাঁপায়
তার চোখের ভিতর
কাঁপে বসুন্ধরা…

ভয় ভয় লাগে
তার এত ভালোলাগা
থেকে থেকে মরে যায়

রাখবে কোথায়
বল্, মাতালকোঠা?
সখী, মৃত্যু বেজায়…

তার গানের নেশায়
তাতে গল্প মেশায়
কোনো গহনের দিন…

মেয়েটি সুরেই
দোলে অচিনপুরে
আমি গান জুড়ে দিই !

চিত্র-সৌজন্য- দেবর্ষি সরকার

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)