‘মারো,যত পারো!  <br /> হিন্দোল ভট্টাচার্য

‘মারো,যত পারো!
হিন্দোল ভট্টাচার্য

বামপন্থী মতাদর্শের প্রেক্ষিত থেকে এবং আজীবন গণ আন্দোলনের অংশ হয়ে থাকার ইতিহাসের জায়গা থেকে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে তাঁর সমসময়ের রাজনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির মধ্যে আগামী একশ বছরের সময়কেও দেখতে পেতেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাঁর কবিতায় রাজনীতির জায়গাটি তাই উচ্চকিত স্লোগানের মতো ছিল না, বরং ছিল এক দাঁতে দাঁত চেপে থাকা লড়াকু সৈনিকের মতো, যার কখনও কখনও কিছু করার থাকেও না, মর্মান্তিক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা ছাড়া।

একজন প্রকৃত কবি যে তাঁর সময়ের থেকে এগিয়ে থাকেন, তা খুব-ই পুরনো কথা। অতি ব্যবহৃতও বটে। কারণ কবির ডিএনএ-ই হল সময় আর ইতিহাসচেতনাকে কবিতায় ধারণ করে রাখা। স্বভাবতই তিনি আগামী সময়কেও দেখতে পান। কিন্তু প্রশ্নটি যখন ‘সময়’ নামক অদৃশ্য নিয়ত প্রবহমানতা সম্পর্কে হয়, তখন কখনও কখনও সেই সময়ের বাহ্যিক রূপের পরিবর্তন খুব একটা হয় না। হয়ত তার রূপের পরিবর্তন ঘটে, তার ব্যবহারিক পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু তার অন্তর্বস্তুর পরিবর্তন খুব একটা হয় না। এ কথা অনস্বীকার্য যে কোনও শব্দই আসলে অরাজনৈতিক হতে পারে না। এ কথাটিকে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত করেছিলেন তাঁর আজীবনের সৃজনে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আরও কিছু ছিল। মতাদর্শগত প্রেক্ষিত থেকে, বামপন্থী মতাদর্শের প্রেক্ষিত থেকে এবং আজীবন গণ আন্দোলনের অংশ হয়ে থাকার ইতিহাসের জায়গা থেকে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে তাঁর সমসময়ের রাজনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির মধ্যে আগামী একশ বছরের সময়কেও দেখতে পেতেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাঁর কবিতায় রাজনীতির জায়গাটি তাই উচ্চকিত স্লোগানের মতো ছিল না, বরং ছিল এক দাঁতে দাঁত চেপে থাকা লড়াকু সৈনিকের মতো, যার কখনও কখনও কিছু করার থাকেও না, মর্মান্তিক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা ছাড়া।

এক প্রকৃত বামপন্থী কমিউনিস্ট এবং সৈনিক কবির মতোই তিনি চিরকাল ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন, নির্ভীক চিত্তেই। আপস করার কোনও মধ্যপন্থা তো তাঁর ছিলই না, উপরন্তু তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতেই আক্রমণ করে গেছেন আজীবন এই আপসপন্থার, মধ্যপ্পন্থার। এই পৃথিবী তো আমাদের স্বপ্নের মতো হল না, কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, সারা দেশেই মানুষ এক মুক্ত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই লড়াই শুরুও হয়েছিল। কারণ তার প্রেক্ষাপটে ছিল আবার এক মৃত্যু উপত্যকা স্বরূপ দেশ, যাকে শাসন করছিল রাষ্ট্রের শোষণ।
কিন্তু ১৯৬৮-এর ২২ অগস্ট তিনি যে কবিতাটি লিখেছিলেন, তা কি আজও ভারতবর্ষের চিত্র নয়? ক্রমশ এবং ক্রমশ ভারতবর্ষে ফ্যাসিস্ট শাসন আরও অনেক বেশি ঘাড়ের উপর থাবা ফেলছে যখন, তখন এই ধরনের কবিতার কাছাকাছি এসে মনে হয় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েই এই কবিতাটি লিখছেন।

অন্ধ পৃথিবী

কার পাপ আমাদের রক্তের ভিতরে;
কার অন্ধকার?

কণ্ঠস্বর
ভেসে আসে, ‘জোর যার’…
মানুষ কি এখনও তোমার
চোখ-রাঙানো প্রেমের চাকর?

অথচ কোথায় যাব? এ পৃথিবী আমার, তোমারও!
‘মারো! যত পারো!’

ভাবুন পাঠক, এই কবিতাটি তো সেই মন্ত্রের মতো, যা আমার-আপনার-সকলের অস্ফূট আর্তনাদের মতো গুনগুন করছে আমাদেরই অস্তিত্বে। এ পৃথিবী অন্ধ। কিন্তু এ পৃথিবীকে অন্ধ করল কে? আমরাই তো। শঙ্খ ঘোষ যখন লেখেন এ আমার তোমার পাপ, জীবনানন্দ যখন লেখেন ‘যারা অন্ধ আজ সবচেয়ে বেশি চোখে দেখে তারা’, তখন যেন মিলেমিশে যায় সবকিছু। কার পাপ আমাদের রক্তের ভিতর, যে যুগের পর যুগ ধরে, সারা পৃথিবীতে চলছে অন্ধকারের রাজত্ব। এক গভীর হিংস্র আগুনের মতো অন্ধকার আমাদের সকলকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এই আগুন কাদের? আমরা যখন ভুবনায়নের গ্রাসে নিজেদের শিকড়চ্যুত করে করে তুলছি হ্যামলিনের বাঁশিতে ছুটে চলা ইঁদুরের মতো লোভী, যখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার গ্রাসে আত্মসমর্পণ করছি, তা কি আমার তোমার পাপ নয়? কে আমাদের শাসন করবে? কাদের শাসক হিসেবে, রাজা হিসেবে আমরা বরণ করব, কাদের জন্য ‘ মানুষ মেরেছি আমি, তার রক্তে আমার হৃদয় ভরে গেছে’,? আজ তাদের সামনে আমরা আমাদের সভ্যতার শ্মশানভূমিতে তৈরি করেছি উন্মাদের পাঠক্রম। মেনে নিচ্ছি এই সমর্পণ। মেনে নিচ্ছি আমরা শাসিত এবং আমাদের শাসন করার, আমাদের ইচ্ছেগুলি নিয়ে যা খুশি করার অধিকার তাদের আছে। আমরা শাসককে,রাষ্ট্রকে সেই অধিকার দিচ্ছি এবং আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছি না। কী আশ্চর্য এই সোনার পাথরবাটি- ‘চোখ রাঙানো প্রেমের চাকর’! শুধু এই লাইনটির মধ্য দিয়েই হয়ত বীরেনবাবুর সমস্ত রাজনৈতিক ক্রোধ ব্যক্ত হয়। অথচ কত কম কথায়! কত কম নিনাদে এবং কত কম উচ্চারণে।

১৯৬৮ সালের গ্ণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ ছিল বিপ্লবীদের বধ্যভূমি। সাধারণ মানুষ, দলিত মানুষ, বেঁচে থাকার সংগ্রাম করা মানুষের বধ্যভূমি ছিল এই দেশ। এই যে রাজনীতি মাত্র দুটি লাইনের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠল, তার প্রেক্ষাপটে আছে আরও কয়েকশো বছরের বৃহত্তর রাজনীতি। এই সময়টা তো আকস্মিক ভাবে শূরু হতে পারে না। মনে রাখতে হবে এই সময়েই ইউরোপে চলছে মানুষের আন্দোলন। ফ্রান্সে, স্পেনে চলছে ছাত্র আন্দোলন। আমাদের দেশেও তখন ধীরে ধীরে মেকি বামপন্থাকে ভেঙে ফেলে উন্নততর বামপন্থার দিকে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক সমাজ এগোচ্ছে। ফেটে পড়ছেন সারা দেশের বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু তাও, শাসকের উদ্যত ছূরির সামনে পিষে যাচ্ছে সমস্ত প্রতিরোধ। শাসক কাকে শাসন করে? যারা এই চোখ রাঙানো প্রেমের চাকর হয়ে থাকে, তাদের শাসন করতে হয় না শাসককে। তাদের সামনে খুড়োর কল ঝুলিয়ে দেওয়াই শাসকের বৈশিষ্ট্য। যে চিত্র কার্ল মার্ক্স আরও একশ বছর আগে দেখতে পেয়েছেন, সেই চিত্রই বীরেনবাবু দেখলেন ১৯৬৮ তে। আর আজ ২০১৯ সালে এসে সেই চিত্রই আমরা দেখতে পাচ্ছি চারিদিকে। আর বিস্ময়ে পড়ছি এই কবিতাটির শেষ লাইন-
‘অথচ কোথায় যাব? এ পৃথিবী আমার তোমারো!
মারো! যত পারো!

আমাদের সত্যিই তো কোথাও যাওয়ার নেই। একদিকে যেমন রয়েছে আমার স্পর্ধা, আমি বলছি, এ পৃথিবী আমার, তোমারও। তেমন আরেকদিকে রয়েছে তার জন্য আমার সহ্য ক্ষমতা। আমি বলছি, মারো, যত পারো। কিন্তু মার খেলেও জেনে রাখবে মানুষ তোমার চোখ-রাঙানো প্রেমের চাকর নয়।
লেনিন নয়, এ কবিতাতে আশ্চর্যজনক ভাবে আমি গান্ধীকে দেখতে পাই যিনি বলেছিলেন- তারা আমদের উপর অত্যাচার করতে পারে, টুকরো টুকরো করতে পারে, হত্যাও করতে পারে। কিন্তু আমাদের ওবিডিয়েন্স, আমাদের বশ্যতা পেতে পারে না।
হয়ত সব বিপ্লবীর সুর এক হয়। হয়ত সব বিপ্লবীর মধ্যেই থাকে এই ত্যাগ। আমি তোমার চোখ রাঙানো প্রেমের চাকর নই। কারণ তুমি, আমারই পাপ। এ অন্ধকার আমার।
তাই মারো, যত পারো।

কী নীরব,শান্ত এক সংলাপ! সমসাময়িক অথচ চিরকালীন।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (2)
  • comment-avatar
    Ishita Bhaduri 3 weeks

    খুব ভালো লেখা।

  • comment-avatar
    Ranjita Chattopadhyay 3 weeks

    Hindol! I have deep respect for your mighty pen. This article will enrich the readers. Thanks to the editors of Abahaman for publishing these kind of enriching essays.