‘মান্যম বীরুদু’ আল্লুরি সীতারাম রাজু ভারতের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিস্মৃত বিপ্লবী  <br />  প্রসেনজিৎ দত্ত

‘মান্যম বীরুদু’ আল্লুরি সীতারাম রাজু ভারতের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিস্মৃত বিপ্লবী
প্রসেনজিৎ দত্ত

এহেন অরণ্যের বীর সন্তান সীতারাম রাজুকে কিন্তু জনজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত ভেবে বসবেন না। তিনি বিভিন্ন পাহাড়ি জনজাতিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেই কারণে ‘মান্যম বীরুদু’ সীতারামের নেতৃত্বে সংগঠিত এই বিদ্রোহকে স্থানীয়রা বলেন ‘মান্যম ফিতুরি’ অর্থাৎ অরণ্যের বিদ্রোহ। শব্দ বা জনজাতির কথা শুনে অনেকেই হয়তো ভাবছেন আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ইতিহাসের পর্যালোচনা করা হবে। তবে এই বিদ্রোহের গভীরতা কিন্তু কেবলমাত্র আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে সমাধান করা ছিল না, বরং একইসঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সীতারামের নেতৃত্বে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন এই জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। এজেন্সি এলাকাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি পুলিশ স্টেশন ছিল রাজাভোম্মাঙ্গি। সেখানে বিদ্রোহীরা আক্রমণ করেছিলেন। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, অরণ্যের এই বিদ্রোহের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কেবলই আঞ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। কেন, তা আসছি পরে।

প্রচুর ধান হয় বলে এই রাজ্যকে বলে ‘ভারতের চালের ঝুড়ি’। সেই রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশের জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে বলে এজেন্সি এলাকা। এই এলাকার একটি জায়গার নাম ভেমুনিপত্তম। যা এখন বারো পৌরসভার অন্তর্গত। এখানে জন্মেছিলেন ভারতের অন্যতম সেরা মুক্তিযোদ্ধা আল্লুরি সীতারাম রাজু। ১৮৯৭ সালে। ৪ জুলাই, যেদিন আমেরিকা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হয়েছিল, সেদিনই জন্মদিন তাঁর। আমাদের মূর্খতা যে, আমরা তাঁকে মনে রাখিনি। আমাদের স্বভাবদোষেই তাঁর মতো মহাপ্রাণও চলে গেছেন বিস্মৃতির আড়ালে। লেখার শুরুতেই অন্ধ্রপ্রদেশের এজেন্সি এলাকার কথা বলেছি। এখানকারই গুদেম পাহাড়ি এলাকায় আজ থেকে ঠিক ৯৯ বছর আগে একটা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। সুজলং সুফলং নানা জাতির ভারতে বহু জনজাতির বাস। অন্ধ্রপ্রদেশের এক জনজাতি সম্প্রদায় বিদ্রোহকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘ফিতুরি’। এই ফিতুরি-র নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল্লুরি সীতারাম রাজু, যার নাম ‘রাম্পা’ বিদ্রোহ। 

এই রাম্পা বিদ্রোহের নায়ক সাধারণের কাছে কী নামে পরিচিত ছিলেন জানেন? তাঁকে ডাকা হত ‘মান্যম বীরুদু’ (Manyam Veerudu)। যার অর্থ ‘অরণ্যের নায়ক’। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, এহেন অরণ্যের বীর সন্তান সীতারাম রাজুকে কিন্তু জনজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত ভেবে বসবেন না। তিনি বিভিন্ন পাহাড়ি জনজাতিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেই কারণে ‘মান্যম বীরুদু’ সীতারামের নেতৃত্বে সংগঠিত এই বিদ্রোহকে স্থানীয়রা বলেন ‘মান্যম ফিতুরি’ অর্থাৎ অরণ্যের বিদ্রোহ। শব্দ বা জনজাতির কথা শুনে অনেকেই হয়তো ভাবছেন আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ইতিহাসের পর্যালোচনা করা হবে। তবে এই বিদ্রোহের গভীরতা কিন্তু কেবলমাত্র আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে সমাধান করা ছিল না, বরং একইসঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সীতারামের নেতৃত্বে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন এই জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। এজেন্সি এলাকাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি পুলিশ স্টেশন ছিল রাজাভোম্মাঙ্গি। সেখানে বিদ্রোহীরা আক্রমণ করেছিলেন। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, অরণ্যের এই বিদ্রোহের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কেবলই আঞ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। কেন, তা আসছি পরে।

শোনা যায় যে, সীতারামের সঙ্গী এই মাটির মানুষরা গেরিলা যুদ্ধের ধাঁচে ব্রিটিশ সরকারকে ল্যাজে-গোবরে খেলিয়েছিলেন। এর প্রধানতম কারণ ছিল অরণ্য। গভীর জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধ করবার দক্ষতা ছিল আল্লুরি সীতারাম রাজুর সেনাপতিদের। সেই কারণে ব্রিটিশরা একটা চাল চেলেছিল। তারা বিদ্রোহ দমন করার জন্য নিয়ে এলো বিশেষ এক বাহিনী। যাদের কাছে সেই সময়েই ছিল ওয়্যারলেস ফোন। এবং এই বিশেষ বাহিনী ছিল মালাবার অঞ্চলের। অরণ্যে যুদ্ধ করবার দক্ষতা ছিল তাদেরও। তাই শেষমেশ ধরা পড়লেন আল্লুরি সীতারাম। ৭ মে, ১৯২৪-এ মাত্র ২৭ বছরে দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেছিলেন তিনি। এরপর বিদ্রোহেরও দমন ঘটেছিল। তবে অসহযোগ আন্দোলনের সমসময়ের দেশের আরেক প্রান্তে চলা এই বিদ্রোহ কিন্তু সমান তালে ইংরেজদের কপালে চিন্তার ভাঁজ তুলে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক মামিদিপুড়ি ভেঙ্কটরামাইয়া (৮ জানুয়ারি, ১৮৮৯ – ১৩ জানুয়ারি, ১৯৮২)-র লেখা পড়লে জানা যায় যে, তৎকালীন সময় অসহযোগ আন্দোলনের চেয়েও রাম্পা বিদ্রোহ ইংরেজদের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একবার সীতারামকে নিয়ে বলেছিলেন― “আমি মনে করি, জাতীয় আন্দোলনে আল্লুরি সীতারাম রাজুর ভূমিকার প্রশংসা করাটা আমার বিশেষাধিকার, ভারতের যুবসমাজ তাঁকে অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখবে।” তিনি যে তেলেগু সমাজের এক কিংবদন্তি, তা বলাই বাহুল্য। তিনি রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় মুক্তিযোদ্ধাও। ১৯৭৪ সালে তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে একটি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল। পরিচালক ছিলেন ভি. রামাচন্দ্র রাও। অভিনেতা কৃষ্ণ ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। পয়লা মে মুক্তি পেয়েছিল এই ছবি। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, অন্ধ্রপ্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্লকবাস্টার ছিল এই চলচ্চিত্র। তাছাড়াও এস এস রাজামৌলি পরিচালিত ‘আরআরআর’ নামেও একটি চলচ্চিত্র চলতি বছর অক্টোবরে মুক্তি পেতে চলেছে। ছবিটিতে আল্লুরি সীতারাম রাজুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রামচরণ। পাঁচটি ভাষায় বিশ্বব্যাপী এই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা।

প্রসঙ্গে ফেরা যাক। ১৮৮২ মাদ্রাজ বন আইন পাস হওয়ার পরে অরণ্যের জনজীবনের ওপর অবাধ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। ইংরেজরা তাঁদের এলাকাকে ‘সংরক্ষিত’ ঘোষণা করে। এরফলে ওই অঞ্চলে ঝুমচাষ (স্থানীয় ভাষায় ‘পোডু’ চাষ) নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এমনকী দৈনন্দিন যে বন্যসামগ্রী আদিবাসীরা সংগ্রহ করতেন, তাতেও কোপ পড়ে। তাঁদের চোখের সামনে নিজ ভূমি দখল হতে শুরু করে। প্রায়শই বন বিভাগের লোকজন কিংবা ঠিকাদাররা অত্যাচার চালাত। আদিবাসীদের ঘরবাড়ি খালি করে দিত। ‘জোর যার মুলুক তার’-এর মতো আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল। আদিবাসীদের প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে আদিবাসীদের দিয়েই শ্রম আদায় শুরু হল তাঁদেরই নিজস্ব ভূমিতে, তাও আবার বিনা তনখা বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। আর যাঁরা কাজ করতে অস্বীকার করতেন বা কাজে ভুল করতেন, তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হত ভিটে-মাটি-জমি। 

সীতারামের কর্মক্ষেত্র ছিল এই রাম্পা। তাঁর এই অরণ্যে ঘেরা কর্মভূমির মানুষদের ব্রিটিশরা ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল। ব্রিটেনের রপ্তানির জন্য মেহগনি গাছ কাটতে আদিবাসীদেরই আশ্রয় নিতে হয়েছিল আদিবাসীদের। প্রাণভয়ে আদিবাসীদের সামনে গাছ কাটা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। ব্রিটিশদের লোভী ঠিকাদারদের অধীনে আদিবাসী নারীদের যৌন ক্রীতদাস এবং শিশুদের ‘শ্রমিক’ হিসাবে ব্যবহার করা হত। এদিকে, সীতারাম রাজুর একটা ক্ষত্রিয় পটভূমি ছিল। তাঁরা অন্ধ্রের গোদাবরী অঞ্চলে কোয়া উপজাতিদের কাছে ‘ঈশ্বরতুল্য’ ছিলেন। প্রচুর দানধ্যান করতেন তাঁরা। ব্রিটিশরা গোদাবরী এলাকায় অধিগ্রহণ করার পর দুর্দশার মেঘ নেমে এলো আদিবাসীদের ওপর। তাঁরা তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করতেন। তাঁরা প্রকৃতির ক্ষতি করে না, সংরক্ষণ করে। আদিবাসীরা একটি হরিণ বা একটি বাঘের মতো অরণ্যেরই অংশ ছিল। সেখানেই তাঁরা চাষবাস করতেন। পোডু (ঝুম) চাষ পাহাড়ি এলাকায় একধরনের কৃষিপদ্ধতি, যা একধরনের স্থানান্তরিত কৃষিপদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে চাষ করা হয়। আবার সেই জায়গায় জমির উর্বরতা কমে গেলে আগের জায়গা থেকে কৃষিজমি স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময় অন্যত্র কৃষিজমি গড়ে ওঠে। এই চাষ বাস্তুতন্ত্রকেও ঠিক রাখে। এমনই এক পাহাড়ঘেরা বনভূমি ইংরেজরা দখল করে নিল। তবে, বারবার আঘাত খেতে খেতে পাল্টা আঘাতও একদিন মানুষ করে। আর সেই পাল্টা আঘাত করতে শিখিয়েছিলেন সীতারাম রাজু।

সীতারাম রাজু কিন্তু অন্য যুবকদের মতো ছিলেন না। তিনি ১৮ বছর বয়সে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। সন্ন্যাসী হয়ে তিনি উত্তরভারতে গিয়েছিলেন। বারাণসী, হরিদ্বারের মতো তীর্থস্থানগুলিতে ভ্রমণ করেছিলেন। সেখানে বছরের পর বছর ধরে ধ্যান করেছেন, প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করেছেন। উপজাতির মানুষের বিশ্বাস ছিল যে, তাঁর রহস্যময় ক্ষমতা রয়েছে। তাঁরা সীতারাম রাজুকে ‘ঈশ্বরের দূত’ হিসাবে দেখতেন। এই মানুষটিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ জাতীয় কংগ্রেসের সভাতেও যোগ দিয়েছিলেন সীতারাম। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি গোদাবরী জেলায় যুবকদের একত্রিত করেছিলেন। কিন্তু ১৯২২ সালে, মহাত্মা গান্ধি অসহযোগ আন্দোলন তুলে নিলে সীতারাম রাজু কংগ্রেসে বিরক্ত হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রাম রাম্পা বিদ্রোহকে স্থানীয় ভাষায় ‘মান্যম’ বিদ্রোহও বলা হয়। তিনি আদিবাসীদের নিয়ে একটি সেনা সংগঠন করেছিলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করেছিলেন। কোয়া জনজাতির গামা ভাই গন্তাম দোরা এবং মল্লু দোরা, কঙ্কিপতি পাড়ালু, আগিরাজু প্রমুখ ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত লেফটেন্যান্ট। ১৯২২ সালের ২২ আগস্ট― রামচোদাভরম এজেন্সির চিন্তাপল্লী থানায় প্রথম আক্রমণ করার ঘটনার দিয়ে রাজুর নেতৃত্বে এই ‘মান্যম’ বিদ্রোহ শুরু হয়। তিনশো বিদ্রোহী নিয়ে রাজু পুলিশ স্টেশনে আক্রমণ করেছিলেন। কেবল তাই নয়, ১১টি বন্দুক, ৫টি তলোয়ার, ১৩৯০টি কার্তুজ সেখান থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল রাজু-বাহিনী। রাজু ব্যক্তিগত এক রেজিস্টারে একথা উল্লেখ করেছিলেন। আদিবাসী বিদ্রোহী দলের হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল দু’জন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার তথা বেশ কিছু ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তারা। কোনও ভারতীয় পুলিশ নিহত হয়নি। এই ভারতীয় পুলিশদেরই পরবর্তীকালে ব্রিটিশরা গুপ্তচর হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তাছাড়াও দাম্মামপল্লী, কৃষ্ণদেবী পেটা, রাজাভমঙ্গি, আদাতেগালা, নরসীপত্তনম এবং অন্নভারামের আশপাশের থানা গুলিতেও অভিযান চালিয়েছিল রাজুর বাহিনী। কিন্তু যিনি স্বয়ং ঈশ্বরের দূত, তাঁর সঙ্গে কি যুদ্ধে জেতা সহজ? ব্রিটিশরা রাজু-বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে নিয়ে এসেছিল কামান-তোপ। তা সত্ত্বেও রাজুকে ব্রিটিশরা পরাস্ত করতে পারছিল না। রাজুর গেরিলা বাহিনী অর্থাৎ উপজাতি সেনারা অরণ্য দখল করে নিয়েছিল। 

কীভাবে সীতারাম রাজুকে হত্যা করা যায়, তা ভেবে পায়ের ঘাম মাথায় ফেলেছিল ব্রিটিশরা। এর পরেই মালাবার থেকে বিশেষ বাহিনী ডেকে আনার কথা ভাবা হয়েছিল ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে। প্রথমদিকে এই বাহিনী যখন অভিযানে নেমেছিল, সেই সময় তাদের গুপ্তচরবৃত্তির আশ্রয় নিতে দেখা যায়। ভারতীয় পুলিশ কর্মীদের ঘুসও পর্যন্ত দেওয়া হত রাজুর খোঁজ দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোনও গুপ্তচরই তখন বলতে পারেনি যে, রাজু কোথায় আছেন বা কখন তিনি আক্রমণ করবেন। ১৯২৩ সালে রাজু এবং আন্ডারউডের মধ্যে বিশাল লড়াই হয়। যেখানে ব্রিটিশরা বিশাল এক পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। এর সমসাময়িক সময় অবশ্য রাজুর অনুগামী সৈনিকদের বন্দি করে তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে আন্দামানের কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বন্দিরা কিন্তু রাজুর ঠিকানা কোথায়, তা খোলসা করেননি কোনও অবস্থাতেই। ব্রিটিশ সরকার রাদারফোর্ডকে মান্যম অঞ্চলে কমিশনার হিসাবে নিয়োগ করেছিল, যাঁর নামে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের ইতিহাস ছিল। এরই মধ্যে রাজুর অন্যতম বিশ্বস্ত সাহসী লেফটেন্যান্ট আগিরাজু সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের পর ধরা পড়লেন। তাঁকেও আন্দামানে নির্বাসিত করা হল। রাদারফোর্ড সুযোগ বুঝে এক আদেশ পাঠালেন যে, রাজু এক সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে মান্যম অঞ্চলে গণহত্যা চালাবে ব্রিটিশ বাহিনী।

গোটা আদিবাসী গোষ্ঠী রাজুর সমর্থনে ছিল। এরজন্য আদিবাসী সমাজ ইংরেজদের রোষানলে পড়েছিল। রাজু-বিরুদ্ধ আদিবাসী গোষ্ঠীর তৈরির জন্য ইংরেজরা উঠেপড়ে লাগল। এরজন্য নারী ও শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন করা শুরু হল। তাঁদের পেটে বাঁশের ব্যাগ বেঁধে তার নিচে ইঁদুর রেখে দেওয়া হত। ইঁদুরগুলি পেটে কামড়ে দিত। এই অকথ্য পাশবিক অত্যাচারের পরও আদিবাসীরা হাল ছাড়েননি। 

রাজুর মন এটা সহ্য করতে পারেনি। আদিবাসীরা অত্যাচারিত হচ্ছেন, ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, যা দেখে মন কেঁদে উঠল রাজুর। তাঁর সম্পর্কে ব্রিটিশদের কাছে জানিয়ে দেওয়ার আর্জি আদিবাসীদের কাছে করলেন তিনি। কিন্তু আদিবাসী সমাজ তা সত্ত্বেও ব্রিটিশদের কাছে আপস করেনি। সাঁওতালি এক প্রবাদ আছে― ‘হড় খানগে পেড়া’। এর অর্থ, সাঁওতাল মানেই সাঁওতালদের আত্মীয়। এই বিশ্বাস কিন্তু কেবল সাঁওতালদের নয়, গোটা আদিবাসী সমাজেই মান্যতা পায়। রাজুর অনুগামী আদিবাসীরাও যে এমনই অনুভূতির মানুষ ছিলেন। এমন অনুভূতি থেকেই যে জাতীয়তাবোধ তৈরি হয়। আর জাতীয়তাবোধ থেকেই গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী চেতনা। এক্ষেত্রেও তাই-ই হয়েছিল।

অবশেষে এলো সেই দিন। ৭ মে, ১৯২৪। ব্রিটিশ সরকারের কাছে আল্লুরি সীতারাম রাজু খবর পাঠালেন যে, তিনি কয়িউরে আছেন। রাজু পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। ব্রিটিশ অফিসার রাজুকে গুলি করে হত্যা করল, যা ছিল একটা বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ ব্রিটিশরাজ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, জাতীয় কংগ্রেসের কাছ থেকে কোনও সমর্থন পাননি মাত্র ২৭-এ শহিদ হওয়া আল্লুরি রাজু। বাস্তবে তারা রাম্পা বিদ্রোহ দমন ও রাজুর হত্যাকাণ্ডকে স্বাগতও জানিয়েছিল। ‘স্বতন্ত্র’ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা দাবি করেছিল যে, রাজুর মতো মানুষকে হত্যা করা উচিত। ‘কৃষ্ণা পত্রিকা’ লিখেছিল, বিপ্লবীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পুলিশ এবং লোকজনকে আরও বেশি করে অস্ত্র দেওয়া উচিত। যদিও রাজুর মৃত্যুর পর ওইসব পত্রিকা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছিল। রাজুকে তারা ‘অন্য শিবাজি’, ‘রানা প্রতাপ’-এর সঙ্গে তুলনা করে প্রশংসা করেছিল। কেউ কেউ তো আবার তাঁকে ‘অন্য জর্জ ওয়াশিংটন’ বলেও অভিহিত করেছিল। 

দুঃখজনক যে, রাজু সম্পর্কিত কোনও বই নেই। কোনও পাঠ্যপুস্তকও তাঁর সম্পর্কে কথা বলে না। তিনি বেশিরভাগ ভারতীয়দের মনে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন। এ কি তাঁর ইতিহাস এবং লড়াইকে দমন করা নয়? কেবল তেলেগু রাজ্যগুলিতে তাঁর মূর্তি বিভিন্ন শহর-গ্রামে দেখা যায়। তাঁর নামে নামকরণ করা অনেকগুলি এলাকা, স্কুল, কলেজ রয়েছে। তেলেগু সমাজে তিনি কিংবদন্তি। কিন্তু, গোটা ভারতবর্ষ তাঁকে চেনে না বলে আদিবাসীদের ওপর বঞ্চনার ইতিহাসটিই আরও প্রকটভাবে সামনে আসে। সেই কারণেই তো স্বাধীনতার পরবর্তীকালে আদিবাসী সমাজের জমির সবচেয়ে বেশি দখল হয়ে যায়। ১৯৫৯ সালের Andhra Pradesh Schedule Areas Land Transfer Regulation বা অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে জমি হস্তান্তর অধিনয়ম আইনের কথা হয়তো অনেকেই জানেন। আইনটি ১/৭০ আইন নামে পরিচিত। এই আইন প্রয়োগের পরে ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০-এর মধ্যে গোদাবরী অঞ্চলে ৩০ শতাংশ হস্তান্তরিত হয়। পি সাইনাথ তাঁর ‘Godavari: and the police still a wait an attack’ প্রবন্ধে এক ক্ষেত্রসমীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছেন সেই ইতিহাস। প্রবন্ধটি রাখা রয়েছে PARI (People’s Archive of Rural India)-র ওয়েবসাইটে। যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২৯ আগস্ট, ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’য়।

এই প্রবন্ধে লেখক পি সাইনাথ কথা বলেছেন কোন্ডাপল্লীর ভূমিহীন কোয়া আদিবাসীর পোট্টাভ কামরাজের সঙ্গে। প্রাবন্ধিককে কামরাজ বলেন, “এখনকার জমি যেখানে-সেখানে লিজ দেওয়া হচ্ছে।… সম্পন্ন কোয়া আদিবাসীরা বহিরাগত নাইডুদের জমি লিজ দেয়। অথচ স্বজাতির মানুষকে দেয় না। ধনীরা সবসময়ই এককাট্টা থাকে।” এই লিজ দেওয়া জমি কখনও-সখনও জমির আসল মালিকের হাতে ফেরে। জমি দখলের লোভে বহিরাগতদের অনেকেই আবার আদিবাসী সমাজের কোনও মহিলাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবেও গ্রহণ করে। এই কোন্ডাপল্লী রাজুর কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। ভাইজ্যাক জেলার মাম্পা গ্রামের কামরাজু সোমুলু ঠাট্টার ছলে প্রবন্ধিককে বলেছিলেন, “ছোটোখাটো বনজ সম্পদ নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। জঙ্গল থাকলে তবে তো!” রামায়াম্মার মতে, এর ফলস্বরূপ অঞ্চলের দরিদ্রের দুর্ভোগ আরও বাড়বে, “এখানকার মানুষ প্রায়ই একবেলা কাঞ্জিজলটুকু আহার করে দিন গুজরান করেন।” পূর্ব গোদাবরী দেশের সবথেকে সমৃদ্ধ গ্রামীণ জেলাগুলির একটি হয়েও অঞ্চলের জনজাতিভুক্ত মানুষের কোনও সুরাহা করতে পারেনি। এসব পড়তে পড়তে ভাবি, আল্লুরি সীতারাম রাজু আদিবাসীদের অধিকারের জন্য লড়াই করে শহিদ হয়েছিলেন, তাঁকে একসময় ‘কলকাতার কোনও গুপ্ত সংগঠনের সদস্য’ বলেও ব্রিটিশ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। এই মানুষটির কথা জানেন আজও সমস্যা যুঝা মানুষগুলোও। তাই রাজুর কথা শুনেই হয়তো বুকে বল পান তাঁরা। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘A hungry man is angry man’― পড়েছি যে, এখানকার মানুষ প্রায়ই একবেলা আধপেটা খেয়ে দিন গুজরান করেন। জমি নেই, ভিটে নেই, কিন্তু খিদে আছে। ভুখা পেট নিয়েই আল্লুরি সীতারাম রাজুর উত্তরসূরিরা একদিন গর্জে উঠবেনই।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)