ভাষার আগে ভাষা <br /> শ্রীজাতা গুপ্ত

ভাষার আগে ভাষা
শ্রীজাতা গুপ্ত

১।

‘Communication’ এর মনমত বাংলা প্রতিশব্দ পাইনা। এক হয়, ‘ যোগাযোগ’। তবে যোগাযোগ বললেই মনে হয় অনেক কথা বলা প্রয়োজন। অথবা লেখা, যা কিনা কথিত ভাষার রূপান্তর মাত্র। শব্দের আঁচড়ে কথার সাঙ্কেতিক প্রকাশ। এই উচ্চারিত কথা অথবা কথাদের শব্দরূপের বাইরে গিয়েও যে যোগাযোগ সম্ভব, তা আমরা ভুলতেই বসেছি প্রায়। অথচ, communication শব্দটির Latin উৎস ‘communicare’ থেকে, যার অর্থ ‘to share’। একজনের মনের ভাবনা, চিন্তা, ইচ্ছা বিনিময়ে ব্যক্তিগত চিন্তা কে common shared knowledge করে তোলাই communication এর মূল লক্ষ্য। আমাদের চারিদিকে যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তাদের সংমিশ্রণে তৈরী হতে থাকে বহু ‘তথ্য’। Facts. তথ্যই আমাদের বহির্জগৎ। তথ্যের অবলোকনে আমাদের মনে সৃষ্টি হয় নিজস্ব চিন্তা বা Thoughts। এরপরের স্তরে, চিন্তাকে ভাষায় পরিণত করে, জাগতিক তথ্যের রূপান্তর ঘটিয়ে প্রকাশ করা দুরূহ বিষয়। প্রায় অসম্ভব, বলেছিলেন লুডউইগ উইটগেন্সটাইন। তবুও, ভাবপ্রকাশ না করে আমাদের নিস্তার নেই। জীবনধারণের উপায় নেই। Basic survival এর জন্যই আমাদের communicate করতে হয় একে অপরের সঙ্গে।
আমরা যে ভাষা ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করি তা’ এক জটিল বিবর্তনের পথ পেরিয়ে যে স্তরে এসে পৌঁছিয়েছে, জীবজগতে তা’ সত্যিই বিরলতম। অনন্য। মনের জটিলতা ব্যক্ত করার মাধ্যম হিসাবে যতরকম সঙ্কেত ব্যবহার করে মানুষ, তার ধারেকাছে আসতে পারেনি অন্য প্রাণীদের বিবর্তিত কোনও শাখা। মানুষ যা-যা দেখে, ভাবে, অনুভব করে বা করতে চায়, সব কিছুর জন্য রয়ছে নির্দিষ্ট নির্বাচিত শব্দ; গুটিকয়েক ধ্বনি নানা প্রকারে জুড়েজুড়ে শব্দগুলি তৈরী; অর্থপূর্ণ সেইসব শব্দদের অঙ্কের নিয়মে ফেলে বাক্য গঠন করে, একই শব্দ উলটেপালটে শব্দের স্থান পরিবর্তন করে সাজিয়ে বাক্যের অর্থ পরিবর্তন করে ফেলা অতি সহজ ব্যপার; সীমত ধ্বনি থেকে শব্দ নির্মাণ, এবং শব্দ থেকে নিশ্চিত ব্যকরণ মেনে অপিরিমিত সংখ্যক বাক্য গঠনের ক্ষমতা মানুষের চূড়ান্ত বৈশিষ্ট্য। জীবজগতে এমন সুপরিকল্পিত যোগাযোগের মাধ্যম আর কোনও প্রজাতির মধ্যে আমরা খুঁজে পাইনা। এর বিশেষ কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় মানুষের এক এবং অদ্বিতীয় ‘মন’-কে। ‘মন’ নিয়ে আমাদের কৌতূহলের কোনও শেষ নেই। মন কী, মন কেমন, মন কার, কন কেন, এসব জানতে চেয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। পুরাকাল থেকে দার্শনিক সাহিত্যিক পুরোহিত বিজ্ঞানী সকলেই এই আলেয়ার উৎসসন্ধানে ব্রতী। নিজের মন ভালো না খারাপ সেই বুঝতেই দিন যায়, তার উপর আছে অন্যের মন বুঝে চলার বিড়ম্বনা। প্রায় ৪০০ বছর আগে রেনে ডেকার্রট বলে গেছেন, মানুষের মনের গঠন আর কোনও জাগতিক পদার্থের গুণগত বৈশিষ্ট্যের ঊর্ধ্বে। শরীরে যে পদার্থের রাসায়নিক নিয়ম চলে, মনে তা’ চলেনা। মন কেবল মানুষের উন্নীত ঐশ্বরীক বোধশক্তি থেকেই প্রসূত, বাদবাকি জীবের মধ্যে তার দেখা পাওয়া অসম্ভব। অন্যান্য জন্তুর মধ্যে আমরা যে জৈবিক প্রক্রিয়া দেখি, তা’ কেবলই যান্ত্রিক পদ্ধতি বই আর কিছু নয়। মেশিনের মত ক্রিয়া-প্রক্রিয়া নির্ভর ব্যবহার বাকি জীবজগতের automata-দের। মানুষের মত চিন্তাশীল ব্যবহারের থেকে যা একেবারেই আলাদা। মানুষ ছাড়া আর কারো এমন মন নেই। কার্টেসিয়ান এই শক্তিশালী মতবাদের থেকে জন্ম নেয় মন নিয়ে আমাদের অনির্বাণ গর্ব; সেই মনের ভাবসম্প্রসারণে নির্গত ভাষা নিয়ে অহেতুক অহঙ্কার! মানুষই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠোত্তর সৃষ্টি, এই ভেবে জাগতিক বাকি সবকিছুর থেকে বহুদূরে এসে দাঁড়াই আমরা, একলা মানুষ।
ডেকার্টের পরে কালের নিয়মে সময়ের স্রোত বয়েছে বহুর্মুখী। ‘মন’ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দার্শনিক বিজ্ঞানীরা মন বদলেছেন। কেউ বলেছেন মন কেবল বহির্জগতের প্রতিফলন মাত্র, কেউ বলেছেন মন বলে আসলে কিছুই হয়না, কেউ আবার এও বলেছেন, সব প্রাণীর সমানভাবে রয়েছে একটি মন। এই এত মতামত পেরিয়ে আজ আমরা দাঁড়িয়েছি কাটাকুটি রাস্তার দুরূহ জানজটে। একদল বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, প্রাণীর মন তৈরী হয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক প্রয়োজনে- সেই প্রাণী কোন পরিবেশে থাকে, তার সমাজের গঠন কীরকম, সেই সমাজে তাকে কী কী উপায় খাবার সংগ্রহ করতে হয়, কত রকমের সম্পর্কে জড়াতে হয়, কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় এবং সন্তান ধারণ করতে হয়, এই নিয়ে তৈরী তার পরিবেশ। জাকোব উয়েক্সকুল এবং তোমাস সেবিওক যাকে ডেকেছেন ‘উমওয়েল্ট নামে। বিশেষ উমওয়েল্টে সফলভবে বসবাসের জন্য নানারকম মনের আবির্ভাব জীবজগতে। কোনও কোনও মনের খুব সাধারণ চিন্তাতেই দিন কাটে, কারুর আবার চাই জটিল চিন্তার ক্ষমতা। মন কি চোখে দেখার বস্তু? মন বোঝার জন্য চাই ম্যাজিক আয়না, একমাত্র যেখানে পড়বে অশরীরী মনের প্রতিফলন। সমস্ত রঙবেরঙের (মনের রঙ হয়?) মনের প্রতিফলন দেখা যায় প্রাণীদের ব্যবহারের ম্যাজিক আয়নায়। কোন পরিস্থিতিতে কোন প্রাণী কেমন ব্যবহার করবে, তা নির্ধারিত হয় তার পরিবেশ অনুযায়ী, আমাদের শিখিয়েছেন কনরাড লরেঞ্জ, নিকো টিনিবার্গেন ও কার্ল ভন ফ্রিশ। এই সমস্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রাসঙ্গিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব তাদের মনের বিভিন্ন স্তর, তা’ শিখিয়েছেন রবার্ট ইয়ার্কিস, মার্গারেট ওয়াশবার্ন ও উল্ফগাঙ কোহলার। এখান থেকেই comparative cognitive science এর জন্ম। এখান থেকেই শুরু মনের বিবর্তনের অন্বেষণ। মানুষের হৃদয়ের (হৃৎপিন্ড) সঙ্গে ব্যাঙ, মাছ, ইঁদুর, বাঁদরের হৃদয়ের যে নিয়মে মিল, হাত পায়ের গঠন যে সূত্রে একই অঙ্কে ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে রয়েছে একের পর এক প্রাণীর মধ্যে, ঠিক সেই সমীকরণেই, মানুষের মনেরও রয়েছে বিবির্তনের ইতিহাস, যার পরিচিত টুকরোগুলো বেঁচে রয়েছে genetically related প্রজাতিদের মধ্যে। বিবর্তনের ইতিহাসে যে প্রাণী মানুষের যত কাছাকাছি, তাদের মনের সঙ্গেও মানুষের মনের ততটাই মিল। মনের অন্যতম প্রকাশমাধ্যম communication-এর ক্ষেত্রেও হিসাবটা একইরকম। নিবিড় সম্বন্ধীয় প্রজাতির যোগাযোগের মাধ্যমেই ধরা রয়েছে মানুষের ভাষাশক্তির বিবির্তনের ইতিহাস। তাই, নিজেদের মনের হদিস, ভাষার হদিস পেতে গেলে খুঁজতে হবে এইসব সম্বন্ধীয় প্রাণীদের মন এবং ‘ভাষা’।
ভাষার শুরু কথার থেকে অনেকখানি আগে। শিশুকাল থেকেই বিভিন্ন ইশারা, হাতের ভঙ্গি, মুখের ভাব, স্বরনিক্ষেপ, ইত্যাদি একের পর এক শিখতে শিখতে একদিন আমরা কথা বলতে শিখি। তখন এই পূর্বের সঙ্কেতগুলো মুখের কথার সঙ্গে মিশে তৈরী করে সম্পূর্ণ ভাষা। তবে, যেহেতু শব্দ প্রাধান্য পেয়ে যায় কথা শেখার পর, বাকি ইশারাদের গুরুত্ব হারায়। ভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রত্যেকটি যোগাযোগের মাধ্যমের আলাদা ভুমিকা থাকে, তার মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয় মনের মধ্যে চলতে থাকা ভাবনাগুলির সরল থেকে জটিল হয়ে ওঠার ধাপ। তাই, যোগাযোগ মাধ্যমের স্তরগুলি বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যাবে নেপথ্যে মনের স্তর। ভাব বিনিময়ের জন্য সবসময়ে শব্দের ভাষা নিষ্প্রয়োজন। কথা না বলাও এক প্রকার communication, যোগাযোগের অনিচ্ছা প্রকাশের। চোখের তাকানো, হাতের চলন, ঘুরে বসা, গলার স্বর, ভ্রুভঙ্গি, এইসব নীরব সঙ্কেতে আমরা সর্বক্ষণ যোগাযোগ স্থাপন করে চলেছি। কখনও, মৌখিক কথার চেয়েও বেশি যোগাযোগ সম্ভব এমন অনুষঙ্গের মাধ্যমে। কাব্য করে বলছি না, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত সত্য। কথা বলার সময় আমরা ক্রমাগত হাত নাড়ি, কেউ বেশি, কেউ কম। এই হাত নাড়া, বা gesturing কোনভাবেই অবিন্যস্ত নয়। প্রতিটি কথার পরিপ্রেক্ষিতে হাতের যে চলন, তা মনের নির্দিষ্ট ভাবের প্রতিনিধি। শুধুমাত্র মুখের ভাষায় যে খামতি থেকে যায়, তার কিছুটা পূরণ করে দেয় এই gestures। একজন লেখক এবং একজন চিত্রকর যেমন দু’রকম মাধ্যম ব্যবহার করে একই ভাবনার রূপ ফুটিয়ে তুলতে পারেন, মুখের কথা আর বিভিন্ন সঙ্কেত তেমন ভাবেই একই মনোভাব প্রকাশের দুই চ্যানেল। আমাদের আলাদা করে ভাবতে হয়না। স্বাভাবিক নিয়মেই কথার সঙ্গে সঙ্গে যুতসই হাতের চলন চলে আসে। অঙ্গভঙ্গি বা gestures-এর মাধ্যমে মনের ভাবপ্রকাশ করার ক্ষমতা রয়েছে আমাদের নিকটতম আত্মীয়দের মধ্যেও- শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, বোনোবো, ওরাংওটাং ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাইমেটদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই হাত-পা-মাথা নেড়ে gesturing। এক-এক ইশারার এক-এক অর্থ, বিভিন্ন পরিস্থিতে এক-এক সঙ্কেত পৌঁছিয়ে দেবে প্রাসঙ্গিক বার্তা। ঠিক যেমন মানুষ তার ভাষার মাধ্যমে করে থাকে। এই প্রাইমেট প্রজাতিদের communication channels অনুসন্ধান থেকে আমরা পেতে পারি আমাদের নিজেদের ভাষা, এবং অত:পর মনের, বিবর্তনের চাবিকাঠি।

কিছুকিছু যোগাযোগের সূত্রের উপর আমাদের সচেতন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। যেমন, আমাদের হাতে ছ্যাঁকা লাগলে হাত সরে আসে মুহূর্তে, বা পায়ে সুঁচ ফুটলে মুখ বিকৃত হয় আজানতেই। অপর আরেকজন সেই হাত সরিয়ে নেওয়া বা মুখের রকমফের দেখে বুঝে যাবে আমরা ব্যথা পেয়েছি। তার কাছে এই বার্তা পৌঁছিয়ে দেওয়ার পিছনে আমাদের সক্রিয় অবদান নেই। তেমনই, বৃষ্টি পড়লে ময়ূর পেখম মেলবে, তা দেখে ময়ূরী বিভোর হবে, বা, পুরুষ পাখির লাল রঙ দেখে মহিলা পাখি বুঝে নেবে তার পছন্দের সাথী, এসব কিছুর উপরেই কোনও জোর থাকেনা কারুর। বিবর্তনের নিয়মে এই সঙ্কেতগুলো genetecially coded. যখন প্রয়োজন, জীবন বাঁচানোর জন্য বা প্রজননের জন্য তাদের প্রয়োগ। অপরপক্ষের সেই সঙ্কেত বুঝে নেওয়া, তা-ও genetic. আর, আন্য কিছু সময়ে, যোগাযোগ স্থাপন করার ইচ্ছা সম্পূর্ণরূপে যোগাযোগকারীর নিয়ন্ত্রণাধীন। আমার যখন তেষ্টা পেয়েছে, আমি চাই আমার বন্ধু জলের বোতলটি এগিয়ে দিক- আমি বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বুঝে নেবো সে আমার দিকে দেখছে কিনা; তারপর জলের বোতলের দিকে তাকিয়ে আবার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে বা হাত দিয়ে ইশারা করব। বন্ধু বুঝবে আমি জলের বোতলটি চাইছি, সে আমাকে বোতল এগিয়ে দেবে। এই পুরো ঘটনটাটি খুব সাধারণ। আমরা দিনে বহুবার এইভাবে নিয়ন্ত্রাণাধীন ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে থাকি। বিজ্ঞানীরা বলেন, এমন নিয়ন্ত্রণাধীন সঙ্কেতগুলি বিবর্তনের এক ধাপে এসে মানুষকে ভাষা তৈরীর ক্ষমতা দিয়েছিল। তাই, মানুশের ভাষার জৈবিক ইতিহাস জানতে গেলে খুঁজতে হবে অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে একইরকম সমতূল্য নিয়ন্ত্রণাধীন ইচ্ছাপূরণের সঙ্কেত। বলা হয়, প্রাইমেটদের gesture-এর যে যোগাযোগ মাধ্যম দেখা গেছে, তা’ এইরকম সঙ্কেতের পূর্বসুরি। তবে এই নিয়ন্ত্রণাধীন ইচ্ছাকৃত যোগাযোগের নেপথ্যে থাকে মনের অনেকগুলি জটিল স্তর। থাকে লজিক্যাল নির্ণয়ের পদ্ধতি। মানুষের ব্যবহৃত সঙ্কেত আর অন্য প্রাইমেটদের মধ্যে দেখা তুলনামূলক সঙ্কেতগুলীর উৎসস্থল তাদের মনের মধ্যে চলতে থাকা একই পদ্ধতি নিসৃত কিনা, সেইটি জানার চেষ্টাই হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
এই ইচ্ছামত communicate করার জন্য প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন নিজের মনের সম্পর্কে নিজের সচেতনতা। আমার যে একটি মন আছে, তার মধ্যে যে ইচ্ছার উদ্ভব হচ্ছে, সেইটি সম্পর্কে প্রথমে অবগত হতে হবে আমাকে। এর সঙ্গে থাকতে হবে সেই ইচ্ছা প্রকাশ করার সঠিক মাধ্যম। তারপর জানতে হবে আমার আসেপাশে যারা আছে তাদেরও একটা মন আছে কিনা। সেই মন আমার মনের মতই কিনা। আমার প্রকাশিত ইচ্ছা সেই মন অবধি পৌঁছোবে কিনা, এবং পৌঁছিয়ে দাগ কাটবে কিনা। যার কাছে আমার ইচ্ছা ব্যক্ত হল, সে কি অভিপ্রেত ব্যবহার ফেরত দেবে? যদি একবারেই সক্ষম হয় যোগাযোগের ব্যবস্থা, তাহলে আমার যোগাযোগ মাধ্যম সফল। ইচ্ছাপূরণ সম্পূর্ণ। যদি তা বিফল হয়, আমাকে বদলাতে হবে যোগাযোগের ধরন, যতক্ষণ না মনের মত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এই এতগুলি স্তরে লেখা থাকে মনের বিবর্তনের ইতিহাস। Theory of mind. Levels of intentionality. ভাষায় কতরকম জটিলতা প্রকাশ পাবে তার পুরোটাই নির্ভর করে মন কতটা জটিল পর্যায়ে বিবর্তিত হতে পেরেছে। জীবজগতে, প্রাণীদের বিভিন্ন রকম communication এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় তাদের মনের জটিলতার পর্যায়। এত স্তরের খেলা বোঝা অনেকসময়ে কেবল কঠিনই নয়, প্রায় দুষ্কর। মানুষ হয়ে আরেক মানুষের মন বোঝাও কেবল এক অনুমানের খেলা, বলেছিলেন উইটগেনস্টান। শুধুমাত্র প্রজাতিগত মিল থাকায় আমরা ধরে নি’ অন্য মানুষটির মন আমারই মত, তাই, আমরা ক্রমাগত নিজের মনের নিরিখে নির্ণয় করে চলি অপর মানুষটির ব্যবহারের অন্তর্হিত মানসিক পদ্ধতিগুলি। উপর্যুপরিভাবে থাকে ভাষার মাধ্যমে জেনে নেওয়ার বা ভুল-বোঝা সংশোধনের সুযোগ। তবে, অন্য প্রজাতির প্রাণীদের মন বা ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে এইখানেই সবচেয়ে বড় বাধা। অন্য প্রজাতির মনকে মানুষের মনের মত ভেবে নেওয়ার প্রাথমিক অনুমানেই গলদ। তাদের উমওয়েল্টে তাদের অভিজ্ঞতার নাগাল পাওয়া এক্ষেত্রে দুষ্কর নয়, অসম্ভব, বলেছেন তোমাস নেগেল। এই প্রাথমিক সমস্যাটাই এত জটিল যে এর বেশি গভীরে না গিয়ে বলে দেওয়াই সহজ যে অন্য কোনও প্রাণির মন নেই, তাই তাদের ভাষাও নেই।

নেগেল বা উইটগেনস্টাইনের বিচক্ষণ মতামত বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসু বৈশিষ্ট্যকে বিরত রাখতে পারেনি। মানুষের মন বা ভাষা এলো কোন জাদুবলে তা’ জানতে চাওয়ার মানুষের অভাব হয়নি, সৌভাগ্যবশত। গত শতক ধরে বহু বিজ্ঞানী প্রাণীদের মন এবং মন থেকে উদ্ভূত ভাষা এবং অন্যান্য ব্যবহার বোঝার চেষ্টা করছেন। এই প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদি, এবং হতাশাদীর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে জানা প্রয়োজন বিভিন্নক প্রজাতির প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাস, তাদের পরিবেশের বৈশিষ্ট্য; সেই প্রাণীদের ব্যবাহার পর্যবেক্ষণের সময়ে যেন নিজেদের আবেগ তাদের উপর আরোপিত না হয়, এই বিষয়ে নজর রাখা একান্ত প্রয়োজন। এইভাবেই ধীরে ধীরে সমুদ্রতটে কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি জুড়ে জুড়ে ভাষা এবং মনের এক মসৃণ চিত্রপটের দিকে এগিয়ে চলার প্রয়াসের নাম comparative cognitive psychology। মানুষের মনের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীকূলের অমিল এবং মিল খোঁজার দুর্গম, রোমাঞ্চকর পথ। এই সন্ধানের লক্ষ্য শুধুমাত্র মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার খোঁজের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, হয়ত। এই মন এবং ভাষা, বা যে কোনও অন্য ব্যবহারের বিবর্তনের ইতিহাসে লেখা থাকে মানুষ প্রজাতির সঙ্গে বাকি জৈবজগতের গূঢ় যোগসূত্র। সার্বিক কারণে এই তথ্য অত্যন্ত আশাবাদী দিকে আমাদের নিয়েযেতে পারে, যেখানে আমরা বুঝতে শিখব যে এই প্রাকৃতিক বিপুল সামৃদ্ধ তার অন্তরজালে আমাদেরও ততটাই বেঁধে বেঁধে রেখেছে যতটা রয়েছে পাখিদের গান বা প্রজাপতির রঙ। ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠোত্তর সৃষ্টি হয়ে থাকার মধ্যে রয়েছে কেবল অনন্ত নি:সঙ্গতার যন্ত্রণা, যা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক শাখাপ্রশাখায় ফুটে থাকার আশ্বাসে, প্রশান্তিতে হারিয়ে যেতে বাধ্য।

২।
মানুষের ভাষা যেহেতু মূলত কথা কেন্দ্রিক, ভাষার উৎস অনুসন্ধান স্বাভাবিক নিয়মেই শুরু হয় অন্য প্রানীদের মধ্যে শুনতে পাওয়া বিভিন্ন ডাকের গঠন ও ব্যবহারিক ক্রিয়া প্রক্রিয়ার গবেষণায়। গভীর জঙ্গলে, গ্রামের দিকে, নিতান্ত শহরের তোলপাড় বুকেও কান পেতে শোনা যায় প্রাকৃতিক সিম্ফোনি, সারাক্ষণ। দিন বা রাতের সময় বুঝে, পরিবেশের রকম বুঝে বদলে বদলে যায় সেইসব বাজনাদের সংমিশ্রণ। ভোররাতে থেমে যায় ঝিঁঝিঁডাক। সারা রাত তারা একে অপরের উপর কান রেখেছে ডানাকম্পনের তীব্র স্বরনিক্ষেপে। এবার রেওয়াজে বসবে পাখি। ভিন্ন রাগে পারদর্শী ভিন্ন প্রজাতির বিহঙ্গকূল নিজেদের সুরে চিনে নেয় কোন গাছের ডালে বসে আছে স্বগোত্রীয় আরেকজন। অনেকেই আস্তিনে লুকিয়ে রাখে সুরেলা গান, যা কেবল গাওয়া হয় প্রেমের মরশুমে। এর পাশাপশি চলতে থাকে ব্যাঙের গ্যাঙোরগ্যাঙ, গরুর হাম্বা, বিড়ালের মিয়াওঁ, সাপের হিসহিস, এই লিস্ট থামার নয়। মোটকথা, জীবজগতে স্বরসমাহার ধেয়ে চলেছে একে অন্যকে ‘জানানোর’ জন্য, আমি আছি।
বিবর্তনের শাখা প্রশাখায় মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি যারা আছে তাদের এক কথায় বলা হয় বনমানুষ। ইংরিজিতে প্রাইমেট। শিম্পাঞ্জী, বোনোবো, ওরাংওটাং, গোরিলা- এই প্রজাতির প্রাণীরা মানুষের নিকট আত্মীয়। মানুষ এবং এরা লক্ষ লক্ষ বছর আগে একই মূল পূর্বপুরুষজাত। তাই, আকারে ব্যবহারে এদের প্রবল মিল। এইসব বনমানুষ প্রজাতির প্রাণীরা নানারকম আওয়াজের মাধ্যমে কমিউনিকেশান করে থাকে একে অপরের সঙ্গে। সেই সব আওয়াজের নির্দিষ্ট গঠন রয়েছে। তরঙ্গের মাপজোখ করে দেখা গেছে এই স্বরগুলি স্বতন্ত্র এবং বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ স্বর ব্যবহার করা হয়। এইসব স্বরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থাকে মুখের ভাবভঙ্গি। facial expression. ভয় পেয়ে যে চিৎকার করা হবে, তার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবিরূপে যে মুখভঙ্গি হবে, খাবার দেখে খুশির প্রকাশে বদলে যাবে গলার আওয়াজ এবং মুখের রেখা। এই দুইয়ের রকমফেরের নেপথ্যে কাজ করে আমাদের মুখ এবং কন্ঠনালির হাড় এবং পেশীর গঠন। মানুষ এবং বনমানুষদের বিবর্তনের নিয়মে এই গঠন প্রায় একই রকম হওয়ার ফলে facial expressions এবং vocalisations এরও বিস্তর মিল। উপরন্তু, এক এক রকম আওয়াজে ডেকে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট মুখভঙ্গি করতেই হবে, নইলে সে আওয়াজ বেরিয়ে আসতে পারবে না গলা থেকে। মানুষের ভাষায় যে মৌলিক ধ্বনি শোনা যায়, বনমানুষদের গলায়ও সেই স্বরের আভাস দেখা গেছে। মানুষের রাগ, খুশি, ঘৃণা, ভয়ে যে সব মুখভঙ্গি হয়ে থাকে, বনমানুষদেরও তেমনটাই হয়। এই কথা ডারউইন সাহেব বলে গেছেন অনেক বছর আগে। এর জন্য দায়ী বিভিন্ন পরিস্থিতে উদ্বেলিত নানা প্রকারের আবেগ। emotions. যার জন্ম মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যার তত্ত্বাবধানে কন্ঠের এবং মুখের পেশীর চলন নিয়ন্ত্রিত হয়। মস্তিষ্কের এই অংশগুলিও বিবির্তনের হাত ধরে আমাদের এবং অন্যান্য প্রাইমেটদের প্রায় একরকম। তাই, এই দুইয়ের মধ্যে খুব বেশি তফাত দেখা যায়না। কিছু কিছু বাঁদর প্রজাতি, যারা মানুষের বিবর্তিত শাখা থেকে আরও একটু দূরে, তবুও একই পূর্বপুরুষজাত, তারাও এই নিয়মেই আবদ্ধ। তাদেরও গলার স্বরে, মুখের ভাবে এই সব আদিম আবেগের প্রতিফলন।
ভাষাশক্তির ইতিহাস তবে কি এইখানেই সমাপ্ত? শেষ হইয়াও হইল না যার শেষ…
দেখা গেল, বনমানুষ বা বাঁদরেরা যে সকল স্বর উৎপাদন করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, তার বাইরে বেরিয়ে নতুন কোনও আওয়াজ তারা তৈরি করতে পারেনা জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে। বিভিন্ন আওয়াজকে ভেঙে, জুড়ে নতুন স্বররূপ সৃষ্টি তাদের আয়ত্তের বাইরে। যেভাবে আমরা আওয়াজ জুড়ে জুড়ে শব্দ বানাতে পারি অগুন্তি, আমাদের নিকটতম জৈবিক আত্মীয়দের সে ক্ষমতা নেই। তাদের এই স্বরনির্গত ভাবপ্রকাশে নেই কোনও মিয়ন্ত্রণ। তাই, আসন্ন বিপদে হঠাৎ ডেকে ওঠা কেবলই জিনের সমীকরণগত। এইখানেই কি মানুষের ভাষা দাঁড়িয়েছে উন্নত বেদীতে? নাকি, প্রাইমেটদের আরও অন্য পদ্ধতি রয়েছে স্বয়ংচালিত ভাবপ্রকাশের। গবেষণা এগোতে দেখা গেল সেই একরাশ gestures, যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। হাত পা নাড়িয়ে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাবপ্রকাশ করার মাধ্যম। দেখা গেল, মানুষ যে ভাবে এক এক ধাপে ভাষা শিক্ষা পায়, বনমানুষেরাও সেই ধাপে ধাপে gesticulate করতে শেখে। নানা gestures জুড়ে অভিনব পরিস্থিতে যোগাযোগ স্থাপন করে। এই মাধ্যম অনেক বেশি সচল, flexible. নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রেরকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। ভাষাশক্তির সেখানেই শুরু। এই gestures ক’প্রকার, কোন প্রজাতির বনমানুষের মধ্যে তার কত রকমের প্রয়োগ, কীভাবে বয়সের সাথে সাথে তা বদলে যায়, কেনই বা বদলায়, এই নিয়ে গত পাঁচ দশকের বেশী ধরে চলেছে পরীক্ষা নিরীক্ষা। দেখা গেছে, মৌলিক বৈশিষ্ট্যে এই বার্তা প্রেরণের মাধ্যম মানুষের ভাবপ্রকাশের নিয়ম মেনেই চলছে। এই সব gestures মানুষের মধ্যেও সমান ভাবে রয়েছে, যা দিয়ে সে প্রথম যোগাযোগ স্থাপন করতে শেখে। যেমন, নিজের দিকে হাত নাড়িয়ে ডাকা মানে কাউকে কাছে আসতে বলা, নিজের থেকে দূরে হাত চালনা মানে কাউকে দূরে যাওয়ার নির্দেশ, এইসব আমাদের shared gestures. কেবল, এক জায়গায় গিয়ে মানুষের gesticulation-এর ক্ষমতা এগিয়ে যাচ্ছে আরও। মানুষ শুধুমাত্র ভঙ্গিমায় এমন গূঢ় আদানপ্রদান সীমিত রাখছে না, তাদের শব্দ ব্যবহারেও এই নিয়ন্ত্রণের ও সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন, যা প্রাইমেটদের নেই। উপরন্তু, মানুষ একটি বার্তা থেকে নির্যাস নিংড়ে অ্যাবস্ট্র‍্যাক্ট সংকেত তৈরী করতে সক্ষম, যা কখনও সার্বজনীন, কখনও আবার বদলিয়ে যায় এক গোষ্ঠি থেকে আরেক গোষ্ঠিতে। তাই, থাম্বস-আপ বা দু’আঙুলে ভি-চিহ্ন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত, এবং সেই সঙ্কেতের অর্থও এক; আবার, ইতালির মত দেশে গেলে দেখা যাবে সবাই সব সময় নানা রকম হাতের মুদ্রা করছে, যার অর্থ সঠিকভাবে না জেনে প্রয়োগ করলে জীবনে ক্ষতির সম্ভাবনা চূড়ান্ত। এও দেখা গেছে, একের পর এক gestures সাজিয়ে নিজেদের মধ্যে ‘কথোপকথন’ চালাচ্ছে বনমানুষ। যেমন আমরা শব্দ সাজিয়ে বাক্য গঠন করি। তবে, ওদের এই বাক্যের মত ভঙ্গিমালায় কোনও ব্যকরণ নেই। কোন ভঙ্গির পরে কোন ভঙ্গি বসবে, তার একটি নিয়ম আছে ঠিকই, তবে শেষমেশ যে মালাটি তৈরি হবে, তার কোনও বৃহত্তর ফরম্যাট নেই। যেন, লাল ফুল সব সময়ে বসবে কালোর পরে, হলুদ ফুল আর নীল ফুল থাকবে পাশাপাশি। তবে এই লাল-কালো, হলুদ-নীল জুটিরা কীভাবে একে অপরের আগে পরে থাকবে, তার নির্দিষ্ট প্যাটার্ন পাওয়া যায়নি। এবং, এই gestures মালার মাধ্যমে আলাদা করে যোগাযোগের কী বিশেষ কাজ নিষ্পন্ন হছে, তাও আমাদের এখনও অজানা।
এই যে ভাষার সূত্র ধরে মনের হদিস পাওয়া গেল বনমানুষদের মধ্যে, এখানেই উপন্যাসের ইতি, তা মানতে মন চায়নি আমার। কোনওকিছুর বিবর্তনের ইতিহাসের শেষ থাকেনা। অনন্ত কন্টিনিউটিতে ধাবমান অতীত। থ্রিলারের ক্ল্যু খুঁজে খুঁজে কোথাও একটি পৌঁছোনোর ক্লিশে মেটাফর, তবু পৌঁছিয়েও খুঁতখুঁতে মন, আরও কিছু অজানা থেকে গেলনা তো? সেই অজানার সন্ধানে শুরু হয় আমার ডক্টরাল গবেষণা। শিম্পাঞ্জী গোরিলাদের মধ্যে দেখা গেছে যে সূত্র, তার কতটুকু রয়েছে প্রাইমেটদের আগের ধাপে বাঁদরদের মধ্যে? বাঁদরেরাও কি সমানভাবে মনের ভাবপ্রকাশ করতে পারে? একই যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে? কতটা একরকম সেই মাধ্যম? বা, কতটা ভিন্ন? আমার কাজ শুরুর আগে এমন ধারণা ছিল, যে বাঁদরদের ‘ভাষা’ অনুন্নত, মন হয়ত ততখানি সুপরিকল্পনায় সক্ষম নয়, যতখানি বনমানুষ প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়। দু’বছর দক্ষিণ ভারতের বান্দিপুর অভয়ারণ্যে বনেট মাকাক নামক বাঁদর প্রজাতির উপর আমি গবেষণা করি। সকাল থেকে সন্ধ্যা তারা কী করে, কোন পরিস্থিতে কী মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, তা’ই বোঝার চেষ্টা। সবশেষে দেখা গেল, মানুষের ভাষাশক্তির বীজ রয়েছে বনমানুষের চেয়েও আদিম প্রাইমেটদের মধ্যেও। তাদেরও রয়েছে একইরকম স্বয়ংনিয়ন্ত্রিত gestures, এবং সেসব জুড়ে জুড়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী, সম্পর্ক অনুযায়ী ভাব আদান প্রদানের ব্যবস্থা। গবেষণার পূর্বের স্তরে থেমে থাকলে আমরা যা জানতে পারতাম না।
কিন্তু, এই যে vocalisation থেকে gesture এর দিকে পাল্লা ভারী হল ভাষার শিকড়ের, তার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই গড়ে উঠেছিল দুটি শিবির। এক দলের ধারণা প্রাইমেটদের ডাক নিয়ে আরও গভীর গবেষণা করলে জানা যাবে, ওইটিই মানুষের ভাষার মূল উৎস; দ্বিতীয় দল বলছেন, একমাত্র অঙ্গভঙ্গিমায় লুকিয়ে রয়েছে ভাষার চারাগাছ। কিছুতেই এই দুই গোষ্ঠির মনের মিল হয়না, হাত মিলিয়ে কাজ করতে নারাজ দুপক্ষ। একটু চিন্তা করলেই একটা জিনিস পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। মানুষ যখন মনের ভাব প্রকাশ করে, সবরকম সঙ্কেত তারা একসঙ্গে ব্যবহার করে। কথার সঙ্গে হাত চলে, মাথা নড়ে, স্বর ওঠে নামে, মুখের রেখা বদলায়। একটিকে বন্ধ রেখে অন্যটি করা অসম্ভব। আর এই রকম এক সমষ্টিবদ্ধ সঙ্কেতরাশির উৎস খুঁজতে আমরা কেবল এক এক প্রকারের সঙ্কেতকে আলাদাভাবে বোঝার চেষ্টা করে চলেছি, তা’ কি সঠিক পদ্ধতি? যেন, নীল আর হলুদ কে আলাদা পাত্রে রেখে চিনতে পারলে জানা যাবে সবুজের পরিচয়। তা অসম্ভব। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন, তাই, আমার বর্তমানের গবেষণার প্রচেষ্টা সবরকমের সঙ্কেত একসঙ্গে করে কী বলতে চাইছে শিম্পাঞ্জীরা, তার অর্থোদ্ধার। গলার ডাক এবং হাতের চলন এক হলে কি বদলে যাচ্ছে সঙ্কেতের একক অর্থ? সংমিশ্রণে কি তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন অর্থের সমাহার, যেমনটা হয়ে থাকে মানুষের ভাষায়। এই গবেষণার শেষ থেকে শুরু হবে আরেক নতুন গল্প।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (1)
  • comment-avatar

    সমৃদ্ধ তথ্য, তবে কি যত সভ্যতার অগ্রগতি সাধিত হয়েছে ততই মানুষ বিচ্ছিন্ন ও ঘোর আত্মাসর্বস্বতার সুবিধা ভোগী আত্মকেন্দ্রিকতার আস্টেপৃষ্ঠে নিজেকে সংকীর্ণ জালে বেঁধেছে।

  • demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes
    410 Gone

    410 Gone


    openresty