ফয়েজ় পরিক্রমা – দ্বিতীয় পর্ব <br /> নীলাঞ্জন হাজরা

ফয়েজ় পরিক্রমা – দ্বিতীয় পর্ব
নীলাঞ্জন হাজরা

"সহসা দেখি আকাশের নীচের দিকে একটা আলো। আগুন। ঠিক যেন মশালের শিখা। দুলছে। তারপর দুটো। তারপর তিনটে। অনতিবিলম্বে একটা আঁকা বাঁকা আলোর রেখা তৈরি হয়ে গেল নিকষ অন্ধকারে। সেই রেখা থেকে আরও রেখা, তার থেকে আরও আরও রেখা। দেখতে দেখতে চোখের সামনে গোটা অন্ধকারটায় আগুন ধরে গেল। আমি জানি ওখানে ত্রিকূট পাহাড়। পাহাড়ে গভীর অরণ্য, অরণ্যে নাকি চিতাবাঘেদের আনাগোনা। পাহাড়টা দাউ দাউ করে জ্বলছে। দাবানল। কিন্তু যে কিস্সা গত পর্বে তগজ়্জ়ুল দিয়ে শেষ করেছিলাম, তার খেই হঠাৎ দাবানলের বর্ণনা দিয়ে শুরু করলাম কেন? করলাম এই কারণেই যে, আমার মনে হয়েছে সেই রাতেই আমার মাথার মধ্যে রাত্রির প্রথম প্রবেশ। এবং সেই মুহূর্তটার হতচকিত শিহরণ ছাড়া আর কোনও কিচ্ছু দিয়ে ওই ১৯৭৬ সালেই, ন’ বছর বয়সে ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়ের দুনিয়ায় আমার প্রবেশের পর্বটাকে খোলসা করা আমার দ্বারা অসম্ভব। ফয়েজ় আমার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল দাবানলের মতোই। আর তার প্রথম মশাল-শিখাটা ছিল একটা গান। সে গান বহুকাল কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছে এই উপমহাদেশে। একটা গজ়ল।"-- নীলাঞ্জন হাজরার ফয়েজ় পরিক্রমার আজ দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত। পূর্ববর্তী পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করুন ফয়েজ পরিক্রমা- প্রথম পর্ব।

আগের পর্ব- ফয়েজ পরিক্রমা -প্রথম পর্ব

বিরহের রাত, আমাদেরই অশ্রুতে ঝলমলে হয় যেন আগামী তোমার

(বিশেষ অনুরোধ — এই লেখা লিখছি আবহমান পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করণের জন্য। ইন্টারনেট আমাদের সামনে এনে দিয়েছে একাধারে পড়া দেখা শোনার অভিজ্ঞতার অভূতপূর্ব সুযোগ। সেই ভাবেই এ লেখার বয়ন। তাই সঙ্গের লিঙ্কগুলি অতিরিক্ত মনে করে উপেক্ষা করবেন না)

যার মাথায় একবার রাত্রি ঢুকে পড়েছে, কবিতা থেকে তার আর কোনও নিস্তার নেই। রাত্রি যে কখন কেমন করে কার মাথায় ঢুকে পড়ে তা কেউ বলতে পারে না। আমার বেলায় সে কাণ্ডটা যখন ঘটেছিল তখন আমি মোটেই আর কচি খোকাটি নই। ১৯৭৬। পাক্কা ন’ বছর বয়স। তার বছর তিনেক আগেই ঝাপসা চোখে মায়ের অপসৃয়মান অবয়বটা ঘন উত্তর কলকাতায় পাইকপাড়ার এলোমেলো হৈচৈ, রিকশার তীব্র প্যাঁকপেকি, হলদেটে আলো, রেডিওর গান, পাঁচ মেশালি মানুষের ভিড়, তেলেভাজার নোনতা গন্ধের মধ্যে মিলিয়ে যেতে দেখার পরেই বুঝে ফেলেছিলাম অতঃপর হয় আমি দুনিয়াটাকে ঝাপসা চোখেই দেখতে থাকতে পারি, কিংবা হলঘর ভর্তি আরও, ঠিক আমারই বয়সি, একদল ঝাপসা-চোখা সহপাঠীর সঙ্গে দিনরাত দুরন্ত হুল্লোড়ের সুযোগ দু’ হাতে আঁকড়ে ধরতে পারি। এ ছাড়া কোনও তৃতীয় বিকল্প ছিল না। আমি দ্বিতীয়টা বাছায়, পাকপাড়ার চিলড্রেন্স হ্যাপি হোম নামক এক অতি অখ্যাত স্কুলের এক চিলতে হস্টেল থেকেই আমার দুরন্ত হুল্লুড়ে জীবন শুরু হয়ে গেল। সেটা ক্লাস ওয়ান। রাত বিরেতে হলঘরের এ কোণ সে কোণ থেকে ভেসে আসা সরু গলায় চাপা ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ কানে এলেও পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছি। মধ্যবিত্ত কলেজ-মাস্টার বাপ-মায়ের একমাত্র উচ্চাকাঙ্খা উচ্চশিক্ষিত সন্তান তৈরির ধাক্কায় কল্যাণীর সেন্ট্রাল মডেল স্কুল হয়ে পরবর্তী তিন বছরে সেই হুল্লুড়ে জীবন এক কড়ক শীতের সন্ধ্যায় পৌঁছে গেল দুপাশে যদ্দূর দেখা যায় ভীষণ পাঁচিলের মাঝখানে এক বিশাল ফটকের সামনে। বিহার। সাঁনথাল পরগনা। দেওঘর ওরফে বৈদ্যনাথ ধাম। উইলিয়াম্স টাউন। রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ। ক্লাস ফোর।
এই প্রথম হুল্লুড়ে জীবনের গাড়িটার ক্লাচ-গিয়ারের তালমিলে গোলমাল হয়ে একটা মোক্ষম হ্যাঁচকা লাগল। ঘুমের সমস্যা শুরু হল। দৈত্যাকার পাঁচিল ঘেরা মাঠের পর মাঠ পার হয়ে মাঝখানে মন্দির রেখে দু’ পাশে আমাদের হস্টেল। ঋতু যায় ঋতু আসে, ঘুম আসে না। তখন ছোটানাগপুরী দারুণ গ্রীষ্ম। মাঝরাত। চারপাশে নিশ্চিন্ত সম্মিলিত ঘুমের শব্দ। পা টিপে টিপে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, শনশনে বাতাস। বোধহয় লোডশেডিং, নতুবা মাঠের কিনারার রাস্তার আলোগুলো সারা রাত জ্বলে। সহসা দেখি আকাশের নীচের দিকে একটা আলো। আগুন। ঠিক যেন মশালের শিখা। দুলছে। তারপর দুটো। তারপর তিনটে। অনতিবিলম্বে একটা আঁকা বাঁকা আলোর রেখা তৈরি হয়ে গেল নিকষ অন্ধকারে। সেই রেখা থেকে আরও রেখা, তার থেকে আরও আরও রেখা। দেখতে দেখতে চোখের সামনে গোটা অন্ধকারটায় আগুন ধরে গেল। আমি জানি ওখানে ত্রিকূট পাহাড়। পাহাড়ে গভীর অরণ্য, অরণ্যে নাকি চিতাবাঘেদের আনাগোনা। পাহাড়টা দাউ দাউ করে জ্বলছে। দাবানল।
কিন্তু যে কিস্সা গত পর্বে তগজ়্জ়ুল দিয়ে শেষ করেছিলাম, তার খেই হঠাৎ দাবানলের বর্ণনা দিয়ে শুরু করলাম কেন? করলাম এই কারণেই যে, আমার মনে হয়েছে সেই রাতেই আমার মাথার মধ্যে রাত্রির প্রথম প্রবেশ। এবং সেই মুহূর্তটার হতচকিত শিহরণ ছাড়া আর কোনও কিচ্ছু দিয়ে ওই ১৯৭৬ সালেই, ন’ বছর বয়সে ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়ের দুনিয়ায় আমার প্রবেশের পর্বটাকে খোলসা করা আমার দ্বারা অসম্ভব। ফয়েজ় আমার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল দাবানলের মতোই। আর তার প্রথম মশাল-শিখাটা ছিল একটা গান। সে গান বহুকাল কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছে এই উপমহাদেশে। একটা গজ়ল।
গরমের ছুটিতে বাড়ি এসেছি। দেখি বাবার ঘরে প্রাচীন ওয়েস্টন টেপ রেকর্ডারের পাশে ক্যাসেটের থাকের একদম ওপরে রাখা রয়েছে একটা সাদা-কালো-সবজে ছবি দেওয়া ক্যাসেট। টেকো, গালে দাগ, চোখে সুরমা, লম্বা গালপাট্টাওয়ালা একটা মুখের ছবি, যার ওপরে লেখা রয়েছে — Best of Mehdi Hassan। বাবার প্রথম জীবন কেটেছিল লখনও-তে। মা সেতার শিখত। কাজেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, গজ়ল, ঠুমরি আমার কানে অপরিচিত ছিল না। তার মধ্যেই বড়ো হয়েছি। চালিয়ে দিলাম। এবং প্রথম গানটাতেই আটকে গেলাম। বেশ লম্বা আলাপ, তারপর গান শুরু। সে গান পরবর্তী ৪৩ বছরে আমি অজস্রবার অজস্র অবয়বে মেহদির গলায় শুনেছি। কিন্তু সেই ক্যাসেটটার ঠিক সেই রূপটা আর কোনও দিন পাইনি।

তার বেশ কাছাকাছি যা এখন পেলাম তা এ রকম — https://youtu.be/dJMwVN79df0

এ গানের সঙ্গে সে দিন শোনা সেই গানের সব থেকে জরুরি পার্থক্য যেটা, তা হল মাঝখানে গাওয়া মহিন্দর সিং বেদী নামক এক ‘শায়র’-এর ‘এই গজ়লের ওপরেই লেখা আর একটি গজ়লের’ একটা ‘শে’র’ —

হুয়া যো তির-এ-নজ়র নিমকশ তো কেয়া হাসিল
মজ়া তো যব হ্যায় কে সিনে-কে আরপার চলে।।
(যদি অর্ধেক বিঁধে থাকে দৃষ্টির তির, কী হবে হাসিল তবে আর
আসল মজা তো বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাওয়ার ।।)

এ শে’র সেই ক্যাসেটের গানে ছিল না। বাকি প্রায় সবই এক। ‘কাফিয়া’ আর ‘রদিফ’ নিক্তি মেপে এক। আপাতত শব্দ দুটো মাথায় রাখা থাক পরে দেখা যাবে। ক্যাসেটের ভেতরের ফ্ল্যাপে গানের তালিকা, পাশে প্রত্যেক গীতিকারের নাম। এ গানের জন্য লেখা — Gulon mein rang bhare. Lyrics: Faiz Ahmed Faiz। নামটার সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। কাজেই সজ্ঞানে রবীন্দ্রনাথের দুনিয়ায় প্রবেশের মতোই ফয়েজ়ের দুনিয়াতেও আমার প্রথম প্রবেশ সুরের মশাল ধরে। নিকষ আকাশভরা অজস্র নক্ষত্ররাজির নিজস্ব ঘূর্ণির বিন্যাসে মাথার মধ্যে ফয়েজ় ঢুকে গেল।

অনেক বছর আর কোনও গান আমাদের বাড়িতে আসেনি যার গীতিকার ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়। তারপর অনেক, অনেক বছর পরে অবিশ্যি একে একে এল। আমিই জোগাড় করলাম। ধর্মতলা স্ট্রিটের এসপ্লানাড মোড় থেকে মৌলালির দিকে একটু এগোলেই ডান হাতে একটা দোকান ছিল, ওয়াচেল মোল্লার পাশেই — নামটা এখন আর মাথা কুটেও মনে করতে পারছি না। আশ্চর্য দুনিয়া। ঢুকলেই থরে থরে লং প্লেয়িং ভিনাইল রেকর্ড সাজান। বিভিন্ন বিভাগে। আর টার্ন টেব্ল। সেখান থেকেই একদিন এইচএমভি-র সব থেকে সস্তা টার্ন টেব্ল ‘ফিয়েস্তা’ বগলদাবা করে বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফিরলাম। এই দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান একটা নেশার মতো ছিল। এত সময় লাগার একটা কারণ ছিল আকাঙ্খা অশেষ, আর পকেটে রেস্তো অতি সামান্য। আর ছিল একেবারে চৌরঙ্গির ওপরেই রিৎজ়্ কন্টিনেন্টাল হোটেলের কাছেই ‘হ্যারি’জ় মিউসিক’। ছোট্টো, কিন্তু পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের কালেকশন খুব ভালো ছিল। ওয়েলিংটনের মোড় আর ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের পুরনো রেকর্ডের খনির কলকাতা তখনও আমার দুনিয়ার বাইরে। মেট্রো সিনেমার পাশে কান-ফাটান ‘সিম্ফনি’ খুলেছিল অনেক পরে, কিন্তু খুলে পকেটের ভারি সাশ্রয় করে দিল। অনেক ক্যাসেট জমল, ফয়েজ়ের লেখা গানও — যার প্রত্যেকটা আমরা শুনব এই দাস্তানগোয়িতেই। ক্রমে ক্রমে। কিন্তু গুলোঁ মে রঙ্গ্ ভরে-র গোলোকধাঁধা থেকে আজও আমি বেরতে পারলাম না। বরং কালে কালে রেশমগুটি থেকে বেরনো তন্তুর মতো বেড়েই চলতে লাগল সে গানের আশ্চর্য বর্ণময় কিস্সা।

সেই ক্যাসেট হাতে পাওয়ার বহু, বহু বছর পরে সেই বেআইনি ভাবে পাচার হয়ে যাওয়া ‘বিশ্বাসবিধি’, নুসখাহা-এ-বফা-র পাতা উল্টাতে উল্টাতে বার করে ফেলেছিলাম গোটা কবিতাটা। যার শেষে লেখা ছোট্টো দুটো লাইন আমাকে কবিতাটার থেকেও শিহরিত করেছিল বেশি, আজও করে। এটা গজ়ল, এর গোড়াতেই গোল চিহ্ন দেওয়া আছে —

কবির নিজের গলায়: https://youtu.be/2fDqBrLEE8U

ফুলে ফুলে ভরে যাক রঙ, বয়ে যাক নতুন বসন্তের বাতাস আবার
এসো এইবার, দোহাই তোমার, শুরু হোক বাগানের যত কারবার।।

কী বিষণ্ণ এ খাঁচা, বন্ধু, ভোরের হাওয়ার সাথে কিছু তো কথা বলো
ঈশ্বর! কোথাও তো কেউ আজ কিছু কথা তুলুক প্রিয়ার।।

তোমার ঠোঁটের কোণে কখনও তো উঠুক ফুটে ভোর
বিনুনির পাকে পাকে কখনও আবার মৃগনাভিগন্ধী আঁধার।।

এ বাঁধন গভীর ব্যথার, তাই তো আসল, হোকনা অকিঞ্চন প্রাণ
জুড়োবে যে সব ক্ষত, আসবে সে যার টানে, সে নাম তোমার।।

আমাদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে তা তো গিয়েছেই
তবু বিরহের রাত, আমাদেরই অশ্রুতে ঝলমলে হয় যেন আগামী তোমার।।

প্রিয়ার সামনে বুঝি দিতে হবে উন্মাদনার খুঁটিনাটি হরেক হিসেব
বুকের কাপড়টার টুকরোগুলোই তাই বেঁধেছেঁদে চলেছি এবার।।

কোনও কিছু পথে আর প্রাণেই যে ধরেনি ফয়েজ়
ছেড়েছি যে প্রিয়তমার পথ, যেদিকে চলেছি সেইখানে ঘাতক রয়েছে তৈয়ার।।

মন্টগোমারি জেল
২৯ জানুয়ারি, ১৯৫৪
(পৃ ২৬৪-২৬৫। জ়িন্দাঁ নামা। নুসখাহা-এ-বফা, এজুকেশনাল পাবলিশিং হাউস, দিল্লি, ১৯৮৬।)

এখন মুশকিল হল। কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া এই গানটার প্রথম যে দুটো লাইন, গজ়লের পরিভাষায় যাকে বলবে ‘মতলা’ — কথাটা মনে রাখুন, আমরা তগজ়্জ়ুল বুঝে নিতে আবার ফিরব ওই শব্দে — সেই পঙ্ক্তিদুটোর এই তরজমায় একটা গভীর গোলমাল আছে। মতলা-টা আরও একবার মূল ভাষায় শুনি —

গুলোঁ মে রঙ্গ্ ভরে বাদ-এ-নও-বাহার চলে
চলে ভি আও কে গুলশন কা কারোবার চালে।।

মহা সমস্যা হলো ওই ‘ভি’-টিকে নিয়ে। যেহেতু ‘চলে’ শব্দটা স্বরবর্ণে শেষ, ‘ভি’-টিকে তুলে দিয়ে ‘এ’ টাকে টেনে উচ্চারণ করলে ছন্দে পার পেয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু ছন্দের খাতিরে তো ‘ভি’ বসিয়ে দেওয়া নয়। যে উদ্দেশ্যে ওই ‘ভি’, তা কম সে কম তিরিশ বছর চেষ্টা করেও আমি বাংলায় পার করতে পারিনি। ওই ‘ভি’-এর মধ্যে যে সাংঘাতিক আকুতি পুরে দেওয়া আছে তার তুল্যমূল্য শব্দ ‘দোহাই’ নয়। মনে পড়ে যাচ্ছে ঠিক অনুরূপ প্রসঙ্গে প্রণম্য আবু সয়ীদ আইয়ুবের কিছু কথা। বাংলায় মির্জা গালিবের শ্রেষ্ট তরজমা ‘গালিবের গজ়ল থেকে’। সেই চটি বইটির তরজমা-তারাগুলো বাদ দিলেও, রয়েছে এক রত্নভাণ্ডার — একটা দীর্ঘ ভূমিকা। আইয়ুবেরই লেখা। সেইখানে তিনি পাঠকের কাছে ‘গুরুনিন্দার’ জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েও আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ইংরেজ কবি জন ডান-এর দাপুটে পঙ্ক্তি ‘For god’s sake hold your tongue, and let me love’ বাংলায় ‘দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর্ / ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর’ করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কেমন পিছলে গিয়েছিলেন। মুশকিল হয়েছিল ওই ‘For god’s sake’ নিয়ে। (বইটা হাতের কাছে নেই, স্মৃতি থেকে লিখছি, তাই পৃষ্ঠা ইত্যাদি উদ্ধৃত করতে পারলাম না)। আমিও এখানে ‘দোহাই তোমার’ দিয়ে যে পুলটিশ দিলাম, তা আসলে অচল।

তবে বাংলা তরজমায় ওই ‘ভি’ কী হবে না হবে, ইত্যাকার ভাবনা তো আর ১৯৭৬ সালের সেই প্রখর পশ্চিমরাঢ়ী দাবদাহের দিনে আমার মাথায় আসেনি, কেবল একটা তাড়না মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল, যেমনটা হয় মাথার মধ্যে রাত্রি ঢুকে গিয়ে ঘুরপাক খেতে থাকলে। তাড়নাটা কীসের? একটা খোঁজের। কিসের যে খোঁজ তাও আমার কাছে খুব স্পষ্ট ছিল না। আজও নেই। কেবল বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে জেনেছি, ১৯৫৪ সালের গোড়ায়, ভয়ঙ্কর স্বৈরাচারী এক শাসনযন্ত্রের নির্দেশে কারাগারের কুঠরিতে মৃত্যদণ্ডের আশঙ্কায় দিন-গোণা এক কবির লেখা একটা গজ়ল কী ভাবে কিংবদন্তি হয়ে উঠল। তার রঙিন কিস্সা ছাড়া আমার ফয়েজ় পরিক্রমা পূর্ণ হতেই পারে না।
১৯৭৭ সালে রেডিও পাকিস্তানের খুশবখ্ত শুজাতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহদি জানাচ্ছেন ১৯৫৯ সালে তিনি এই গজ়লে প্রথম সুরারোপ করেন এবং লাহোর রেডিও থেকে তা সম্প্রচারিত হয়। মেহদির কথায়, ‘আজ ১৯৭৭, আজ পর্যন্ত একটিও আসর যায়নি যাতে এই গজ়ল আমাকে গাইতে হয়নি।’ শেষে অবস্থা কেমন দাঁড়িয়েছিল তার ভারী কৌতুহলোদ্দীপক বর্ণনা দিয়েছেন কুলদীপ কুমার,‘Of love and protest’ শিরোনামে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ The Hindu সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক লেখায়। ১৯৭৮ সাল। ফয়েজ় ভারতে এসেছেন। দিল্লিতে তাঁকে ঘিরে বিপুল উদ্দীপনা। আসর বসল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফয়েজ় বলবেন, কবিতা আবৃত্তি করবেন। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র কুলদীপ। হাজির তিনিও। কিন্তু বেশ হতাশই হয়েছিলেন! লিখছেন, ‘আমরা দেখলাম ফয়েজ় নিজের গজ়ল আর নজ়্ম এমন ভাবে বলে চলেছেন যেন কোনও আগ্রহই নেই। যেন অন্য কারও কবিতা পড়ছেন। খুব মৃদু স্বরে কথা বলছিলেন। কেউ একজন যখন তাঁকে অনুরোধ করল ‘গুলোঁমে রঙ্গ্ ভরে’ আবৃত্তি করতে, ফয়েজ় উত্তর দিয়েছিলেন যে, গজ়লটা তিনি মেহদি হাসানকে উপহার দিয়ে দিয়েছেন, সকলের উচিত তাঁর কণ্ঠে গজ়লটি শোনা।’ কোনও অনামী অখ্যাত গিতীকার নয়, এমন জগৎ-বিখ্যাত কবির কাছ থেকেও যে তাঁর কবিতা কোনও গায়ক অ্যাপ্রোপ্রিয়েট করে নিতে পারেন, তেমন উদাহরণও আর শুনেছি বলে মনে পড়ে না।
১৯৫৯ সাল থেকে আমৃত্যু বিভিন্ন রূপে মেহদি ঝিঁঝোটি রাগে গড়া এই গজ়ল পরিবেশন করেছেন। সে সবের মধ্যে উল্লেখ করতেই হয় ১৯৬৪ সালের বিপ্লবী ছবি ‘ফরঙ্গি’-র কথা। সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থনে রাজত্ব করা এক সরকার (মনে রাখতেই হবে মার্কিন সিআইএ-র সঙ্গে পাকিস্তানি শাসনতন্ত্রের যোগাযোগ) একটা গ্রাম ধ্বংস করে দেয় সেনার জন্য একটা রাস্তা বানাবে বলে। রুখে ওঠে এক নবীন গোলন্দাজ, কারণ গ্রামটা তার। সঙ্গ দেয় গ্রামের সাধারণ মানুষ। ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহ। পিছু হটে সরকার। এই হলো গপ্পো। পরিচালক খালিল কায়সার জেদ ধরেন ছবিতে ‘গুলোঁ মে রঙ্গ ভরে’ গানটি রাখতেই হবে। কিন্তু তেমন কোনও সিকুয়েন্স তো ছবির প্লটে নেই। কুছ পরোয়া নেহি। সিকুয়েন্স বানান হলো। গানটিতে যন্ত্রসঙ্গীত আরোপ করলেন সঙ্গীত পরিচালক রশিদ আত্রে।

গাইলেন মেহদি হাসান — https://www.youtube.com/watch?v=TzjoF8oxJk0&feature=youtu.be

পাকিস্তানের মানুষ লুফে নিয়েছিলেন সেই ছবি। একাধিক পুরস্কার, বেস্ট প্লেব্যাক সিঙ্গার মেহদি হাসান। সুপার ডুপার হিট।

কিন্তু শুধু মেহদিই নন, দশকের পর দশক ধরে অজস্র বিখ্যাত-অখ্যাত গায়ক নিজের নিজের মতো করে আজও গেয়ে ছলেছেন এই গজ়ল। অনেকেই ঘটিয়েছেন লক্ষ্যণীয় রদবদল। কিন্তু তার তথাকথিত ‘বিশুদ্ধতা অটুট রাখা’ নিয়ে শানিত নখদন্ত প্রকাশ করতে কদাচ দেখিনি বা শুনিনি ফয়েজ় বা মেহদি-কে। বব ডিলান বা লিওনার্ড কোহেনের মতো দিক্পাল গীতিকার-সুরকার-গায়কের অজস্র গান বহু গায়ক নিজের নিজের মতো গেয়েছেন। পল সাইমন এবং আর্ট গারফাঙ্কলের যুগান্তকারী সৃষ্টি Bridge Over Troubled Water এগারো জন শিল্পী নিজের নিজের মতো করে গেয়েছেন। কখনও তা নিয়ে কেউ পাড়া মাথায় করেছে বলে শুনিনি। বরং এ প্রসঙ্গে মনে পড়েছে নিজের চোখে-দেখা-কানে-শোনা একটা ছোট্টো আবেদন। ১৯৯৬ সালে নজরুল মঞ্চে আয়োজিত আসরে প্রণম্য পিট সিগার বারংবার শ্রোতাদের কাছে আবেদন জানাচ্ছিলেন ‘objective silence’ খানখান করে তাঁর সঙ্গে গলা মেলাতে, আর বলছিলেন — ‘গাইতে থাকো। গাইতে থাকো। চুলোয় যাক সুরের বিশুদ্ধতা রাখার ভাবনা, গান গেয়ে যেতে হবে।’ বিলকুল। সেই গানই প্রাণ পেয়ে যায়, যে গান নবীনরা যুগ থেকে যুগান্তরে নানা রূপে নিজেদের মতোন করে গাইতে থাকবে। এই বাংলাই এ নিয়ে যতো ধ্যাসটামো দেখেছে! শিল্পীর সঙ্গীত রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কালজয়ী গানের নিরন্তর বহমানতার বাঁকে বাঁকে চমক থাকবে বইকি। যেমন চমকে উঠেছিলাম ১৯৮০-র দশকের গোড়ায় ‘গুলোঁ মে রঙ্গ ভরে’ এক সুবিখ্যাত বাঙালি শিল্পীর গলায় শুনে। খুবই বিখ্যাত, কিন্তু তিনিও যে এ গান গাইতে পারেন তা কেন জানি কখনও মাথাতেই আসেনি। ইচ্ছে করেই নাম বলছি না, কৌতুহলটা থাক।

শুনে দেখুন মন্দ লাগবেনা — https://www.youtube.com/watch?v=cQv-vyQ18pQ&feature=youtu.be

মেহদি হাসানের সঙ্গে তুলনা করার দরকার কী? শুনলেই বোঝা যায় আদরে-যত্নে-দরদে গাওয়া। কিন্তু একটা গভীর গোলমাল করে ফেলেছেন এই শিল্পী। মন দিয়ে শুনলেই দেখা যাবে গজ়লের শেষ দু’ পঙ্ক্তি — যাকে গজ়লের পরিভাষায় বলবে ‘মকতা’ — সেই মকতাতে একটা বিশ্রী গোলমাল হয়ে গিয়েছে — সু-এ-দার হয়ে গিয়েছে সু-এ-ইয়ার। ঘাতক হয়েছে প্রিয়তমা! এটা কাম্য নয়।

আরও বেশি চমকে গিয়েছি ইংরেজ/সুইস শিল্পী টানিয়া ওয়েল্স-এর হৃদয় উজাড় করা এই প্রচেষ্টা দেখে। — https://www.youtube.com/watch?v=_fkg4g93LhA

আবার শুধু পাকিস্তানি ছবি ফরঙ্গি-তেই নয়, ভারতীয় পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের এই সেদিনের ছবি ‘হায়দার’-এর অমোঘ দৃশ্যে রয়েছে অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে ‘গুলোঁ মে রঙ্গ্ ভরে’। নিজের মতো করে গজ়লটিকে ইন্টারপ্রিট করে নিয়েছেন পরিচালক / গায়ক — https://www.youtube.com/watch?v=KNQ7ElKRtAs&feature=youtu.be

আর ২০১৯-এর নভেম্বরে, মন্টগোমারি জেলের পাষাণকক্ষে সেই আশ্চর্য সৃষ্টিমুখর দিনের ৬৫ বছর পরে, কোক স্টুডিও থেকে পরিপূর্ণ ব্যান্ড-সঙ্গীতের সাজে আলি শেঠি-র গলায় প্রকাশিত হল ‘গুলো মে রঙ্গ্ ভরে’ — https://www.youtube.com/watch?v=hR8FEdC6aAs&feature=youtu.be

আরও আছে। শুধু গানে ও চলচ্চিত্রে নয়। সেটা ১৯৭৫। অসমের গুয়াহাটি শহরের মহা ভিড়ভাড়াক্কার পানবাজারে একটা রেকর্ডের দোকানে আর পাঁচ দিনের মতোই নতুন কোনও ভালো গানের ভিনাইল রেকর্ড এলো কি না তার খোঁজ করতে হাজির হলেন এক যুবতী। পরিচিত দোকান ভরালি ব্রাদার্স। কাউন্টারের ভদ্রলোক একগাল হেসে চালিয়ে দিলেন একটা রেকর্ড। কী যেন একটা ঘটে গেল সেই নারীহৃদয়ে। বুকের ভিতর থেকে যেন হুহু করে চলকে উঠে থাকল রঙ — রঙিন ছবি। সুপ্রভা নাথ। প্রথাগত ভাবে কোনও দিনই আঁকা শেখেননি তিনি। নিজের খেয়ালেই আঁকা শেখা। তবে তুলি বশ মানে তাঁর আঙুলে। বাড়ি ফিরেই শুরু হল আঁকা। একটি গজ়লে একটি ছবি। ১৯৯০ সালে এই সব কথা যখন নিজেই জানাচ্ছেন সুপ্রভা, তখন পর্যন্ত তাঁর আঁকা হয়ে গিয়েছে ২০০টি ছবি। যেমন এই নিচের ছবিটি —

হয়তো পড়া একটু মুশকিল, কিন্তু ছবির নিচের ডানদিকের কোনে যে লেবেল আছে, তাতে লেখা রয়েছে — Painting No. 1. Ghazal. Gulon men rang bhare / bad nou bahar chale / chale bhi ao ke / Gulshan ka karobar chale. (ছবিগুলি দেখতে ও এ বিষয়ে আরও জানতে ক্লিক করুন https://artbysupravanath.blogspot.com/p/landing.html )

আমার চোখ বিশেষ করে আটকে রয়েছে প্রথম তিনটি কথার ওপর — Painting No. 1! ছবির উৎকর্ষ্য নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই। আমি ভাবছি এই তরঙ্গ হৃদয় থেকে হৃদয়ে বাহিত হতে হতে আর কোথায় কোথায় পৌঁছে আরও কী কী কাণ্ড ঘটাবে!

আমাদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে তা তো গিয়েছেই
তবু বিরহের রাত, আমাদেরই অশ্রুতে ঝলমলে হয় যেন আগামী তোমার।।

‘গুলো মে রঙ্গ্ ভরে’ গজ়ল কাল থেকে কালান্তরে অযুত হৃদয়ের মীড়ে ও মোচড়ে জানে তার মানে! এই তো ফয়েজ়!

(ক্রমশ)

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (4)
  • comment-avatar
    পার্থপ্রতিম মন্ডল 6 months

    কী বলব এই লেখাটি নিয়ে!! কোনও কবি ও তার সৃষ্টিকে নিয়ে আলোচনা ঠিক যেমন হওয়া উচিত, ঠিক যেমন হৃদয়-ছুঁয়ে-যাওয়া লেখার আশায় আমরা বসে থাকি, এ লেখা তাই।

  • comment-avatar
    গৌরাঙ্গ শ্রীবাল 6 months

    দ্বিতীয় পর্বের লেখাটি পড়লাম। বেশ ভালো লাগল। লেখায় উল্লিখিত জন ডানের কবিতাটিও সম্প্রতি পড়লাম। কবিতার প্রথম পংক্তির বাংলা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শেষের কবিতা’ উপন‍্যাসে।

  • comment-avatar
    manasi kabiraj 6 months

    একটা গজল এবং তার এই বিস্তার এইভাবে নীলিঞ্জন দেখিয়ে না দিলে সম‍্যক উপলব্দি সম্ভব ছিল কিনা আমার জানা নেই।
    কতটা বিস্তৃতি থাকলে ফয়েজ আহমেদ কে এভাবে লেখা যায়!
    লেখকের কলম তার অনুসন্ধিৎসাকে অভিবাদন।

  • comment-avatar
    Prasun Pramanik 6 months

    অপার মুগ্ধতা