পার্ল সিডেনস্ট্রিকার বাক: একটি জীবন, কয়েকটি কবিতা  <br /> ভূমিকা ও অনুবাদ -উদ্দালক ভরদ্বাজ

পার্ল সিডেনস্ট্রিকার বাক: একটি জীবন, কয়েকটি কবিতা
ভূমিকা ও অনুবাদ -উদ্দালক ভরদ্বাজ

ঔপন্যাসিক হিসেবেই স্বীকৃত পার্ল সি বাক। কিন্তু লিখেছেন বেশ কিছু কবিতাও। অজস্র লেখা তার, কিন্তু কবিতা কখনো প্রকাশ করেন নি। লুকিয়ে লিখতেন নিজের ডায়েরীতে। মৃত্যুর এক বছর পরে, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল “Words of Love”, তাঁর এক মাত্র কাব্যগ্রন্থ। তাঁর স্বকীয়, মাত্রাতিরিক্ত ভাব পরিবর্জিত ভঙ্গিতে লেখা, এই ছোট্ট কবিতাগুলি ইংরেজি সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। বহু বছর ধরে লেখা কবিতাগুলি এক অকপট সারল্যে প্রকাশ করে প্রেমের অজস্র ভাব। কখনো দুঃখ, কখনো আনন্দ, কিন্তু সব ছাপিয়ে পাঠকের মনের চোখ ধরে ফেলে এক সজীব আত্মার মূর্ত প্রতিচ্ছবি, যার হৃদয়বত্তা স্পর্শ করেছিল সকলকে, অথচ যার ব্যক্তিগত দুঃখ দেখেছে শুধু তাঁর কবিতা। অনুবাদ ও ভূমিকায় উদ্দালক ভরদ্বাজ।

জন্ম:২৬ জুন, ১৮৯২, হিলসবোরো, পশ্চিম ভার্জিনিয়া (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
মৃত্যু: ৬ মার্চ, ১৯৭৩, ড্যানবি, ভারমন্ট (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
সাহিত্য নোবেল প্রাপ্তি: ১৯৩৮, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
নোবেল প্রাপ্তির প্রণোদনা: “চীনদেশের কৃষক-জীবনের এক অসামান্য এবং যথার্থই মহাকাব্যিক বর্ণনা এবং তাঁর অনন্য জীবনীমূলক গ্রন্থের জন্যে”
ভাষা: ইংরেজি
প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা: ৭০ বা তার বেশী
প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ: East Wind: West Wind (১৯২৯)
শেষ প্রকাশিত গ্রন্থ: Words of Love (১৯৭৪)
বিখ্যাত গ্রন্থ: The House of Earth ট্রিলজি (১৯৩১ – ১৯৩৫), বিশেষত সিরিজের প্রথম গ্রন্থ The Good Earth (১৯৩১)
জীবিকাঃ লেখক

সংক্ষিপ্ত জীবনী ও সাহিত্যচর্চাঃ

বাকের উপন্যাস মার্কিন সাহিত্যে নিয়ে এসেছিল এক সম্পূর্ণ নতুন বিষয়, এশিয়া, বিশেষত এশীয় মহিলার প্রতিদিনের জীবন। সত্যিকারের অন্তর্দৃষ্টিজাত, সহানুভবতা ও সহমর্মিতার আলোয় উদ্ভাসিত সেই লেখা, দেশ কাল ভেদ করে, স্পর্শ করল, সকল জাতির মানুষকে। মার্কিন এবং ইউরোপীয় পাঠক যেমন জানল এক অজানা চীনকে, তেমনই চীনের নতুন প্রজন্ম চিনতে শিখল তাদের ঐতিহ্য, সংস্কার, লোকাচার ও অভিনিবেশের ইতিহাস; বুঝতে পারল তাদের মা-বাবার প্রাচ্যদেশীয় ভাবনাধারা। বাকের লেখার প্রশংসা করতে গিয়ে, আর এক মার্কিন মহিলা নোবেল বিজয়িনী টনি মরিসন এক সময়ে মজা করে বলেছিলেন, “বাক আমাকে ভুল পথে চালিত করেছিলেন…আমি তো ভাবতে শুরু করলাম যে ভিন্ন সংস্কৃতিকে নিয়ে লেখা বোধ হয় এরকমই হয়, সহানুভূতিশীল, সরব, সৎ।“
এবং এই কাণ্ড সম্ভব হয়েছে বাক তাঁর জীবনের এক বিরাট অংশ চীনদেশে কাটিয়েছিলেন বলে। পার্লের বাবা ছিলেন, তদানীন্তন চীনে, খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের কাজে নিযুক্ত। দুই সদ্যোজাত সন্তানকে হারানোর পর তাঁরা কিছুদিনের ছুটিতে আমেরিকা ফেরত আসেন এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় জন্ম হয় পার্লের। তিন মাসের পার্লকে নিয়ে চীনে ফেরত যান তাঁর মা বাবা, এবং জীবনের পরবর্তী প্রায় চল্লিশ বছর তাঁর কেটে যায় সেখানেই। স্বভাবতই, দ্বিভাষিক শিক্ষা হয় বাকের। দিনের বেলায় মা শেখাতেন ইংরেজি, আর বিকেলে এক চাইনিজ শিক্ষক, চীনা ভাষা। বাক মজা করে নিজেকে “culturally bifocal” বলতেন। অথচ মাঝে মাঝেই এক অদ্ভুত একাকীত্বেও ভুগতেন, মনে হত দুই দেশেই তিনি যেন বাইরের লোক। অথচ এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতিই কিন্তু পরবর্তী কালে ইন্ধন জুগিয়েছে সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের প্রতি দরদী হয়ে উঠতে।
১৯১১ সালে পার্ল চলে যান ভার্জিনিয়ার র‍্যাণ্ডলফ মেকন মহিলা কলেজে স্নাতক-পর্যায়ের পড়াশোনা করতে। ফিরে আসেন ১৯১৪ সালে এবং বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন কৃষি অর্থনীতিবিদ জে লোসিং বাক-এর সঙ্গে। ১৯২০-১৯৩৩ বাক এবং লোসিং দুজনেই ছিলেন নানজিঙ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত এবং থাকতেনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এ ছাড়াও বাক জিনলিন কলেজ এবং ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতেও ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন। নানজিয়াঙে থাকাকালীনই বাক রচনা করেন তাঁর প্রথম দিকের লেখাগুলি। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস The Good Earth এর সৃষ্টিও এখানেই।
১৯২০ সালে বাকের এক মাত্র কন্যা ক্যারলের জন্ম হয়। অন্তর্জাত বিপাকীয় ব্যাধি ফিনাইলকিটোনিউরিয়া থাকায় ক্যারলের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়। বাকের মায়েরও মৃত্যু হয় এই বছরেই ক্রান্তীয় রোগ স্প্রুয়ে এবং বাকের বাবা থাকতে শুরু করেন মেয়ের সঙ্গে। ১৯২৪ সালে এক বছরের ছুটি কাটাতে সবাই ফিরে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই সময়ে বাক কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে নেন। ১৯২৫ সালে বাক দম্পতি দত্তক নেন জ্যানিসকে এবং সেই শরতেই ফিরে যান চীনে।
কিন্তু ১৯২৭ সালের নানকিং ঘটনা পালটে দেয় তাঁদের জীবনের গতিপথ। চিয়াং কাই-শেকের জাতীয়তাবাদী সৈন্যবাহিনী, কম্যুনিস্ট বাহিনী, এবং বিভিন্ন ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল লড়াইয়ের ফলে শুরু হল ইউরোপীয় ও মার্কিন জনজাতির মানুষের হত্যা। বাকের বাবার নির্দেশে বাক পরিবার নানজিঙ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই দুর্বিপাকের সময়ে এক রাত্রি এক দরিদ্র চীনা পরিবার তাদের আশ্রয় দেয় এবং পরদিন আমেরিকান গাদাবোট তাঁদের উদ্ধার করে। সাংহাই হয়ে বাক পরিবার পাড়ি দেন জাপানে। ১৯২৭ সালে জাপান থেকে নানজিঙে ফিরে এসে সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে লিখতে শুরু করলেন বাক। বন্ধুস্থানীয়, বিশিষ্ট চীনদেশীয় লেখকরা, যেমন জু ঝিমো (Xu Zhimo) এবং লিন য়ুতাং (Lin Yutang) এর উৎসাহে বাক নিজেকে পেশাদারি লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা চিন্তা শুরু করেন এ সময়ে। বাকের বিবাহিত জীবনেও চিড় ধরতে শুরু করেছে তত দিনে। বিবাহ থেকে বেরলেও তার টাকার প্রয়োজন, বিশেষত ক্যারলের চিকিৎসার খরচার জন্যে ছিল অনেক অর্থের প্রয়োজন, যা খৃষ্টান মিশনারী বোর্ডের পক্ষে তাঁকে দেওয়া সম্ভব ছিল না।
১৯২৯ সালে তাই বাক আবার ফিরে গেলেন আমেরিকায়, মূলত ক্যারলের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই। এবং সেখানে থাকাকালীনই জন ডে পাবলিশারস-এর সম্পাদক জে ওয়ালশ, তাঁর প্রথম উপন্যাস East Wind: West Wind ছাপাতে স্বীকৃত হন। শুরু হয় তাঁর সাথে ওয়ালশের সম্পর্কের, যা শেষ পর্যন্ত পরিণয়ে রূপান্তরিত হয় এবং সৃষ্টি হয় এক দীর্ঘমেয়াদি পেশাদারি সম্পর্কেরও। সফর শেষে নানকিঙে ফিরে গিয়ে প্রতিদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় আবাসনের চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে লিখতেন বাক এবং এক বছরের মধ্যে শেষ করেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস The Good Earth-এর প্রথম খসড়া।
১৯৩০ সালের গোড়ার দিকে বাক আমেরিকায় ফিরে ফিলাডেলফিয়ায় একটি পুরনো ফার্মহাউস কিনে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করলেন। এই বাড়ি হল তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ঘাঁটি। এখানেই তিনি ক্যারল ও তাঁর সাত দত্তক সন্তান কে বড় করেন এবং লেখালেখিও চলতে থাকে এখানেই। শুরু হয় জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে এবং মানসিক ভাবে পিছিয়ে-পড়া বাচ্চাদের জন্যে নানান সক্রিয় সংগঠনের কাজও। আমেরিকায় তাঁর এই দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবনে বাক ছিলেন আন্তর্সংস্কৃতি বোঝাপড়ার পুরোধায়।

মানব প্রেমিক ও সমাজসংস্কারক বাক

১৯৪১ সালে বাক ও তাঁর দ্বিতীয় স্বামী রিচার্ড ওয়ালশ, শিক্ষা বিনিময়ের জন্যে পত্তন করেন East and West Association, যা অচিরেই শিকার হয়ে ওঠে ম্যাকার্থীবাদের এবং পঞ্চাশের দশকে বন্ধ হয়ে যায় এর কার্যকলাপ। প্রায় এক দশক দুজনে চালান “এশিয়া” নামের পত্রিকা, যা ছিল, সে যুগে, পূর্ব-এশিয়া সম্বন্ধে জানার প্রায় একমাত্র উপায়। ১৯৪০-এর গোড়ার দিকেই বাক ও ওয়ালশ, কুখ্যাত Chinese exclusion law-এর বিরুদ্ধেও সঙ্ঘবদ্ধ প্রচার অভিযানে সোচ্চার হন। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে প্রতিবাদও দলীয় মতবাদ নির্ভর। অথচ বাকের প্রতিবাদী কণ্ঠ কোন ইজমের ধার ধারে নি কোন দিন। নিখিল মানবাত্মার যেখানেই অপমান, সেখানেই ছুটে গেছেন বাক, তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠের প্রতিবাদ এবং সমস্যা-নিরসনের সক্ষম চেষ্টা নিয়ে। তাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, জাপানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চীনা প্রতিরোধের সম্যক পৃষ্ঠপোষক হওয়া সত্ত্বেও, পার্ল হারবার আক্রমণের পরে, জাপানী-আমেরিকানদের অন্তরণের বিরুদ্ধে যে কজন হাতে গোনা আমেরিকান মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধাচারন করেছিলেন, তাঁর মধ্যে বাক দম্পতি ছিলেন অন্যতম।
এশিয়া এবং আমেরিকা দু-জায়গায়ই নিজের সময় এবং অর্থ বাক সাড়া জীবন ব্যয় করে যান শিশুকল্যানের কাজে। বিশেষত যে সব ছেলেমেয়েরা মানসিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পিছিয়ে পড়ত, তাদের জন্যে ছিল, বাকের জীবনভর নিয়োজন। তাঁর একমাত্র কন্যা ক্যারলের মানসিক প্রতিবন্ধকতা তাকে যুগিয়েছিল এক অদম্য শক্তি। ১৯৫০ সালে এশীয় শিশুদের দত্তক নেয়ার ক্ষেত্রে মার্কিনীদের কুণ্ঠা এবং এই সঙ্ক্রান্ত নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা, অপপ্রচার ও বিরোধের মোকাবিলা করতে প্রতিষ্ঠা করেন Welcome House, যা ২০১৪ সাল অবধি সারা পৃথিবীর প্রায় সাত হাজার অনাথ শিশুর আশ্রয় করে দেয় অজস্র মার্কিন পরিবারে। ১৯৫০ সালে তাঁর মানসিক ভাবে অনগ্রসর সন্তান ক্যারলকে নিয়ে বাক রচনা করলেন The Child Who Never Grew বইটি। এই বই পড়েই রোজ কেনেডি, সর্বসমক্ষে তাঁর মানসিক-প্রতিবন্ধী সন্তান রোজমারির কথা বলার সাহস খুঁজে পান। সামগ্রিক ভাবে মানসিক রোগের প্রতি মার্কিনী মানিসিকতার আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিল এই বইটি। ১৯৬৪ সালে বাক তাঁর নিজের নামের একটি প্রতিষ্ঠান (Pear S Buck International) স্থাপন করেন; যে সব শিশু অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের শিকার, পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে ন্যুনতম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের ভরণপোষণ, শিক্ষার দায়িত্ব নিতে। এই প্রতিষ্ঠান আজও সক্রিয় এবং হাজার হাজার শিশু উপকৃত হয়ে চলেছে আজও, বাকের স্বপ্ন সাকার করে।
মার্কিন শাসনতান্ত্রিক অধিকার (Civil Rights)-এর লড়াইয়ের অগ্রভাগেও ছিলেন বাক, সারা জীবন। ১৯৩৪ সালে পাকাপাকি ভাবে আমেরিকায় ফেরত যাওয়ার সময় থেকেই নিয়মিত ভাবে বাক লিখতেন National Association for the Advancement of Colored People-এর মুখপত্র Crisis এবং National Urban League-এর Opportunity পত্রিকাতেও। NAA-এর দীর্ঘ সময় ধরে সেক্রেটারি, ওয়াল্টার হোয়াইট ১৯৪২ সালের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের সভায় বলেছিলেন, “মাত্র দুজন সাদা আমেরিকান, কালো মানুষদের বাস্তব বোঝেন, এবং দুজনই ঘটনাচক্রে মহিলা, একজন ইলিনর রুজভেল্ট এবং দ্বিতীয় জন পার্ল বাক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিল বাকের কণ্ঠস্বর। হরদম ওঠা বসা ছিল তাঁর W. E. B. Du Bois, পল এবং এসল্যান্ডা রবসনের মত লেখকদের সঙ্গে। ১৯৪৯ সালে এসল্যান্ডা ও বাক মিলে মার্কিনী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে American Argument, a dialogue on American racism নামে একটি বই প্রকাশ করেন; অথচ সে সময়ে, মার্কিন সমাজে সাম্প্রদায়িকতার অবস্থিতি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল ছিলেন না শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা। বলাই বাহুল্য, নারী স্বাধীনতার প্রবক্তা হিসবে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং Equal Rights Amendment for women বিলের স্বপক্ষে বার বার বক্তব্য রেখেছেন বাক।
জনমানসে কবির স্থানঃ বিংশ শতাব্দীতে পঞ্চাশ বছরে আমেরিকা এশিয়ায় তিনটি যুদ্ধ লড়েছে। সেই লড়াই আজ আর নেই কিন্তু এখন চলছে এক অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে, অন্তত আধ ডজন এশীয় দেশে, নির্মাণে, বাণিজ্যে, শুরু হয়েছে নজিরবিহীন উন্নয়নের কাজ। যুক্তরাষ্ট্রে এশীয় এবং এশীয়-আমেরিকানের সংখ্যা এখন ২১০ লক্ষেরও বেশী। খোলা বাজার ও উন্মুক্ত পৃথিবীতে আমেরিকার ভবিষ্যৎ যে এশিয়ার ও সারা বিশ্বের লক্ষ্যের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, এ কথা এখন সর্বজনগ্রাহ্য। তবু, বহুজাতিবাদের আহ্বান সত্ত্বেও, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মানুষ, গোষ্ঠীগতভাবে, এখনো একে ওপরকে এক অদ্ভুত গতানুগতিকতা ও সন্দেহে-মোড়া কাঁচের আড়াল থেকেই দেখে। বিশেষত, আজকের দিনে, যখন চীন থেকে আগত করোনা ভাইরাসের আক্রমণ আবার বিষিয়ে তুলছে পৃথিবীর বাতাবরণ; সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়েছে সমস্ত এশীয় মানুষকে, সেই সময়ে পার্ল বাকের জীবনীর কথা বলা তাই অত্যন্ত জরুরী।
তাঁর সাহিত্যের বিস্তার যাই হোক না কেন এ কথা অনস্বীকার্য, তিনিই এক মাত্র আমেরিকান যিনি মার্কিনী পাঠকের প্রথম পরিচয় করিয়েছিলেন এশীয় ভূচিত্র এবং জীবনপদ্ধতির সাথে। বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে খেটে-খাওয়া মানুষের সংগ্রাম, তার প্রতিদিনের লড়াই, পৃথিবীর সর্বত্র এক। দুটি ভিন্ন মহাদেশে এক অত্যন্ত ঘটনাবহুল জীবন কাটিয়েছেন তিনি। দেখেছেন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্তরে অজস্র উথালপাথাল। সাম্রাজ্যিক চীনের শেষ ভাগ থেকে নোবেল পুরস্কার এবং তারপর আমেরিকার মধ্য-শতাব্দীয় সংগঠিত শাসনতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই। কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো বা সময়ের চাহিদায়, নানান সামরিক এবং আদর্শগত বিপ্লবের সাথে, বার বার নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন বাক। তাঁর জীবন ও লেখনী, সমাজে নারীকে দিয়েছিল তার নতুন মর্যাদার স্থান। তৎকালীন সমাজে তিনি ছিলেন এক এক অনন্য আলোকবর্তিকা; স্বাধীনচেতা, প্রতিবাদে সরব, লড়াকু। আট সন্তানের ভরণপোষণ করেছেন তিনি যাদের মধ্যে একজনই তার নিজের গর্ভপ্রসুত, বাকিরা সবাই দত্তক, তাদের মধ্যে অনেকেই ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর। দারিদ্রে জীবনের শুরু, কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করেছেন তিনি এবং অকাতরে ব্যয়ও করেছেন মুক্ত হস্তে, আত্মীয়, বন্ধু এবং শোষিত মানুষের স্বার্থে। অভিবাসন, দত্তকগ্রহণ, সখ্যালঘু-অধিকার, এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্বন্ধে মার্কিনী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করার সার্থক চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সারা জীবন।
এত বিশাল সার্থক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীলতা সত্ত্বেও বাক যেন হারিয়েই আছেন মার্কিন জাতীয় সচেতনতার থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে তাঁর সাহিত্য খ্যাতি যেন রাতারাতি নিশ্চিহ্নই হয়ে গেল এক রকম। এর প্রধান কারণ হয়ত তাঁর সাহিত্যের বিষয়, চীন এবং নারী; দুটি বিষয়ই সেযুগের বিচারে ছিল প্রান্তবর্তী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবল থেকে সবে ছাড়া-পাওয়া পৃথিবীতে, যেন একরকম লঘুই।
আবার কেউ বলেন তাঁর উপন্যাসের সাদামাটা গঠন এবং ভাষার কারণেও হয়ত বিদগ্ধজন তাঁকে খুব গুরুত্ব দেন নি। আসলে বাক ঘটনা এবং চরিত্র সৃষ্টির প্রতি যতটা যত্নশীল ছিলেন ততটা তাঁর শৈলী নিয়ে নয়। তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির বক্তৃতায় বাক বলছেন, “যে অনুভূতি, শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা, তা কখনো শিল্প-উৎপাদনের প্রক্রিয়া হতে পারে না। সৃষ্টির অনুভূতি আদতে এক অদ্ভুত, অদম্য প্রাণশক্তি, কোন এক অজ্ঞাত কারণে মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে; কিন্তু সাধারণ জীবনের কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনের চেয়ে অনেকাংশেই বহুলপ্রমাণ বলে, কোন একটি জীবন তাকে ধারণ করতে পারে না। এই শক্তি তাই নিজেই নিজেকে ব্যবহার করে, আরও নতুন নতুন জীবনের সৃষ্টি করতে। শিল্পে, ভাস্কর্যে, লেখায়, যা কিছু তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তির মাধ্যম, তাতেই সে ছড়িয়ে দেয় নিজেই, নিজের সেই অদম্য শক্তিপুঞ্জ। সমস্ত ইন্দ্রিয় জেগে ওঠে এক সুতীব্র তীক্ষ্ণতায়, আশেপাশের সমস্ত জীবনের অভিজ্ঞতা, স্বপ্নেরও অতল থেকে অনুভূতি তুলে এনে মিশিয়ে, সৃষ্টি করে নতুন জীবন। সৃষ্টি হয় শিল্পের, সাহিত্যর”। মানুষের প্রতিদিনের জীবন থেকে নেওয়া অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি বাকের সব গল্পও ছিল তাই ঠাসবুনোট; অজস্র আকর্ষণীয় চরিত্র সৃষ্টি করলেন এবং পাশ্চাত্যের পাঠকের মনে আঁকলেন, এশিয়ার এক নতুন ছবি, যা ছিল নেহাতই তাদের আয়ত্তের বাইরে। তাঁর সেই সাদামাটা ভাষার গুণেই, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প, তার কর্মস্থল, যুদ্ধ, উৎসব, সন্তান-প্রসব, অপরিসীম দারিদ্র, অসামান্য ইচ্ছাশক্তি, সব যেন এক মূর্ত রূপে ঢুকে পড়ল পাঠকদের মনে, মস্তিষ্কে, চৈতন্যের কোষে।
তাঁর সাহিত্যে, নান্দনিক সৌকর্য যেমনই থেকে থাকুক, অবশ্যম্ভাবী ভাবে থাকত কিছু কঠিন প্রশ্ন। সমাজের বঞ্চনার, গ্লানির ছবি যা কিনা মানুষকে চাবুকের মত আঘাত করে যেত। যদিও তিনি বিখ্যাত বেশী তাঁর The House of Earth ট্রিলজির জন্যে, তাঁর জীবনী-মূলক লেখা, যেমন Exile and Fighting Angel; আত্মজীবনীমূলক My Several Worlds; চীন দেশের ওপরে তাঁর সব বই, যেমন The Mother, First Wife and Other Stories, Dragon Seed, Pavilion of Women, and Kinfolk; এবং আমেরিকার ওপরে লেখা, This Proud Heart -এ ছড়িয়ে রয়েছে সমাজ ও জীবনের হাজার বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অজস্র প্রশ্ন। তাঁর নারীবাদী প্রবন্ধের সঙ্কলন Of Men and Women, যাকে অনেকেই ভার্জিনিয়া উলফ-এর লেখার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন, নারীপুরুষের প্রভেদ বিষয়ে যে কোন আলোচনায়, এখনো প্রাসঙ্গিক। এই সব ধারালো প্রশ্নের কারণেও রাজনৈতিক দলাদলির শিকার হয়েছেন বাক। শাসনতান্ত্রিক অধিকারের স্বপক্ষে রাখা, তাঁর বক্তব্যের জন্যে দক্ষিণপন্থীরা যেমন তাঁকে আক্রমণ করতে ছাড়ে নি, তেমনই, স্বৈরাচারী কম্যুনিস্ট শাসনের প্রতিবাদ করার ফলে বামপন্থিদেরও রোষের কারণ হয়েছেন তিনি। তা ছাড়া, মহিলা হয়ে, এক জীবনে, এত নানা রকম সাফল্যের অধিকারী হওয়ায়, তাঁর পরিচিত পুরুষেরা অনায়াসে তাঁকে অগ্রাহ্য করতে চেয়েছেন এই বলে যে মূলত পাঠককুলের, বিশেষ করে মহিলা পাঠকদের দোষ যে তাঁরা সত্যিকারের উচ্চমানের সাহিত্য ছেড়ে বাকের সাহিত্য পড়েছেন।

বাকের চীন, চীনের বাক

চীন ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না বাকের, চীন ছিল তার বাড়ি। ১৯৩৪ সালে যখন সাংহাই থেকে রওনা দিলেন বাক, ভেবেছিলেন যখন ইচ্ছা ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু নিয়তির নিদান ছিল ভিন্ন। ১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয় চীনে শান্তি এনে দিল না, বরং শুরু হয়ে গেল জাতীয়তাবাদী ও কম্যুনিস্টদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ, চলল চার বছর। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কম্যুনিস্টদের জয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত বিরূপ। মাও সে তুং-এর শাসন কে স্বীকৃতি দিতে গররাজি মার্কিন সরকার দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সমস্ত রকমের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে দিল। প্রয় দুই দশক পার্ল বা কোন মার্কিন নাগরিকই বেসরকারি প্রয়োজনে চীন যাওয়ার অনুমতি পেলেন না।
১৯৭২ সালে রিচার্ড নিক্সনের চীন-যাত্রা এবং জেনেরাল মাওের সাথে করমর্দন, ছিল, বিংশ শতাব্দীর কূটনীতির আমূল পরিবর্তন করে দুই দেশের সম্পর্ককে পুনরজ্জীবিত করার চেষ্টা। বাকও ভাবলেন এই সুযোগ, দেশে ফেরার। ভিসার আবেদন করলেন তিনি, টেলিগ্রাম পাঠালেন, জউ এন লাই এবং অন্যান্য চীনী নেতাদের কাছে, হোয়াইট হাউসের আমলাদের কাছে তদবির করলেন প্রেসিডেন্টের সাহায্যের জন্যেও। বহু মাস সম্পূর্ণ নীরব থাকার পরে, কানাডায় নিয়োজিত এক নিম্নপদস্থ চাইনিজ অফিসার প্রত্যাখ্যান পত্র পাঠালেন, যাতে লেখা ছিল “you have in your works taken an attitude of distortion, smear and vilification towards the people of new China and its leaders, I am authorized to inform you that we cannot accept your request for a visit to China.”
অথচ বাক জীবনে কখনো চীনদেশকে বা তার মানুষকে ছোট করে দেখান নি। বস্তুতপক্ষে, একক চেষ্টায়, পৃথিবীর আরও কোন লেখক, বাকের মত করে, তিরিশ চল্লিশের দশকে চীনের স্বপক্ষে মার্কিন জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন নি। কিন্তু একই সঙ্গে, যথার্থ অর্থে মানব-দরদী বাক, কম্যুনিস্ট শাসনের দমননীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির রোষের কারণ হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত The Three Daughters of Madame Liang গ্রন্থে তিনি চীনের তথাকথিত সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানের আড়ালে লুকনো সত্যকে প্রকাশ করেছিলেন, যখন পাশ্চাত্যের অধিকাংশ মানুষই ছিলেন প্রতিবাদহীন। চীনের তিব্বত আক্রমণের নিন্দা ছিল ১৯৭০ সালে প্রকাশিত Mandala উপন্যাস এবং ১৯৬১ সালের “The Commander and the Commissar” গল্পে। যেতে পারলেন না বাক, ফেরত তাঁর সাধের চীনে, তাই।
১৯৭৩ সালে, নিক্সনের চীন সফরের কিছু মাস পরেই বাক মারা যান। মৃত্যুর পরেও, প্রায় ১৯৯১ সাল অবধি তিনি ছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির না-ব্যক্তি (non-person) তালিকায় কিন্তু ১৯৯২ সালে সমাসন্ন তাঁর শতবার্ষিকীর প্রাককালে, বাকের লেখায় চীনের চিত্রণের স্বপক্ষে, তাঁর সমর্থক এক দল চাইনিজ বুদ্ধিজীবী একটি জাতীয় অধিবেশনের প্রস্তাব রাখেন এবং তা জিয়াংসুর প্রাদেশিক সরকার দ্বারা গৃহীতও হয় কিন্তু বেইজিং মন্ত্রিত্ব খারিজ করে দেন সেই আবেদন। ১৯৯৭ সালে আবার আবেদন, এবারে প্রস্তাব গৃহীতও হল কিন্তু বলা হল বাককে আলোচনা করা যাবে কিন্তু তাঁর নাম নেওয়া যাবে না, আলোচনা করতে হবে চীনি-মার্কিনী সাহিত্য সম্বন্ধীয় অধিবেশনে (Chinese-American Literary Relations)-এর নামে।
এর পর, ধীরে ধীরে, ১৯৯৭ থেকে ২০১২-র মধ্যে চীন সরকারের বাক-বিরুদ্ধতা কমে আসে। ঝেনজিয়াং প্রদেশে তাঁর শৈশবের বাড়িটিকে মেরামত করে উন্মুক্ত করা হয় প্রদর্শনের জন্যে। লুশান/মাউন্টলু-র গ্রীষ্মাবাসটিও। চীনের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাকের চীন-চিত্রায়নকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়ার সদিচ্ছায়, অবশেষে, ২০১২র মে মাসে বাক পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হলেন তার উপযুক্ত সম্মানে। নান জিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহ এবং তহবিল সংগ্রহের ফলে, সম্মানিত আর্কিটেক্ট এবং ঐতিহাসিকদের তত্বাবধানে বাকের পৈত্রিক বাড়ির সংস্কার এবং উন্মোচন হল এক বিশাল আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে। প্রায় বারোটি চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষকরা বাকের সাহিত্যকর্ম, ও চীনদেশে কাটানো তার জীবন কালের ওপরে লেখা গবেশনা-প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ইউরোপের বহু গবেষকও অংশগ্রহণ করেন, যেমন বাকের অন্যতম জীবনীকার হিলারি স্পারলিং, বাকের জীবন নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা ডন রগোসিন (Donn Rogosin), পার্ল এস বাক ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রেসিডেন্ট জ্যানেট মিন্টজার, পেনসিলভানিয়া ইউনিভারসিটির অধ্যাপক ও পার্ল বিশেষজ্ঞ পিটার কন ইত্যাদি।
বেশ কিছু দিন ধরেই চীনের জনমানসে এবং লেখক-দার্শনিক মহলে বাকের লেখা নিয়ে যে নতুন উৎসাহের সঞ্চার হচ্ছিল, এই সম্মেলনকে বলা যায় সেই বাক-পুনরুদ্ধারের শীর্ষবিন্দু। আশার কথা, এই নতুন উৎসাহের ফলস্বরূপ বাকের প্রায় বারটি উপন্যাসের চীনা অনুবাদ এবং অসংখ্য চীনদেশীয় পত্রিকায় তার জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। দেরীতে হলেও চীনের মানুষ, বিশেষত তার কর্মস্থল, নান জিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করেছেন বাকের সাহিত্যের কি অপরিসীম মূল্য। যেমন এক দিকে এই সাহিত্য তদানীন্তন চীনা কৃষকসমাজের এক পুঙ্কানুপুঙ্খ চিত্রায়ন, তেমনই পাশ্চাত্যের চোখে চীনদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক নজিরবিহীন আলোকপাত, যা বাকের আগে বা পরে আর কেউ করে উঠতে পারেন নি।
অনুদিত কবিতাগুলি নিয়ে কিছু কথা: অজস্র লেখা তার, কিন্তু কবিতা কখনো প্রকাশ করেন নি। লুকিয়ে লিখতেন নিজের ডায়েরীতে। মৃত্যুর এক বছর পরে, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল “Words of Love”, তাঁর এক মাত্র কাব্যগ্রন্থ। তাঁর স্বকীয়, মাত্রাতিরিক্ত ভাব পরিবর্জিত ভঙ্গিতে লেখা, এই ছোট্ট কবিতাগুলি ইংরেজি সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। বহু বছর ধরে লেখা কবিতাগুলি এক অকপট সারল্যে প্রকাশ করে প্রেমের অজস্র ভাব। কখনো দুঃখ, কখনো আনন্দ, কিন্তু সব ছাপিয়ে পাঠকের মনের চোখ ধরে ফেলে এক সজীব আত্মার মূর্ত প্রতিচ্ছবি, যার হৃদয়বত্তা স্পর্শ করেছিল সকলকে, অথচ যার ব্যক্তিগত দুঃখ দেখেছে শুধু তাঁর কবিতা।

কবিতার ভাষা

বাক জীবদ্দশায় কবিতা ছাপান নি সুতরাং কবিতা সম্বন্ধে বা তার ভাষা নিয়ে কোন প্রকাশিত লেখা নেই। কিন্তু বাকের কবিতার ভাষার সোজা-সাপটা ধরণ ভাবতে বাধ্য করে, “এই ভাষাই কেন”? এবং উত্তর পাওয়া যায় লেখা নিয়ে বাকের নিজের ধারণা থেকেই। বাকের নোবেল বক্তৃতা থেকেই জানতে পারি, বাক কখনই প্রকাশের কৌশলকে বেশী গুরুত্ব দেন নি। তাঁর কাছে, বিষয়বস্তুর গভীরতা ও সততা ছিল অনেক বেশী মূল্যবান। তিনি লিখছেন, “যে প্রক্রিয়ায় শিল্প সৃষ্টি হয় সেই একই প্রক্রিয়ায় কিন্তু সৃষ্ট শিল্পের শৈলী নির্ধারিত হতে পারে না। শিল্পের সংজ্ঞা তাই অপ্রধান, প্রাথমিক গুরুত্ব কখনোই তার নয়। উপন্যাসিক, প্রধান উপজীব্যের সৃষ্টি করা যার কাজ, তিনি যদি গৌণ অংশ নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন, তখন তাঁর সেই কাজ তার গুরুত্ব হারায়। আকার প্রকৃতি, শৈলী নিয়ে তাঁর সেই ব্যস্ততা, যেন বাড়ির ছাদে আটকে-পড়া জাহাজের মত, সর্ব শক্তি দিয়ে প্রপেলার চালালেও এক ইঞ্চিও অগ্রসর হওয়া অসম্ভব, তার পক্ষে। উপন্যাসিকের একমাত্র লক্ষ্য জীবনের প্রকাশ; যে জীবনের মধ্যে তিনি আছেন এবং তাঁর চারপাশের জীবন। সার্থক সৃষ্টির একমাত্র পরিচয়, এই চরিত্রগুলি জীবন্ত কি না! এবং মানুষই বলে দেবে, তিনি যা লিখেছেন তা ঠিক কি না। সাধারণ মানুষের বিচারের মাপকাঠি শিল্পের ধড়াচুড়ো, কাঠামো, নকশা নয়, তারা শুধু মিলিয়ে নিতে চায়, তাদের পড়া বাস্তব, তাদের বেঁচে থাকার বাস্তবের সাথে মেলে কি না”।
তিনি আরও বলছেন; “আমি জানি, ঔপন্যাসিক নিশ্চয়ই তাঁর সৃষ্ট জীবনকে সুন্দর এবং নিখুঁত হিসেবে দেখতে চাইতেই পারেন, কিন্তু তা হবে মিউজিয়ামের ঠাণ্ডা হলঘরে গিয়ে অপূর্ব ভাস্কর্য দেখার সামিল। তাঁর জায়গা তো সেখানে নয়, সে তো মানুষের মাঝে, রাস্তায়, রাজপথে, কুঁড়েঘরে। যেখানে কোলাহল, ভিড়; মানুষগুলোও অসম্পূর্ণ, খুঁত-সমেত, কিন্তু জীবন্ত। তারা জানে না কোথায় যাচ্ছে, যাওয়া উচিৎ। কিন্তু জীবন্ত-প্রাণ, মানুষ তারা।এবং সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় সত্য এবং সৌন্দর্যও। সেই সৌন্দর্যের হাত ধরাই লেখকের কাজ, কোন তথাকথিত শিল্পের মানদণ্ডের নিচে গিয়ে গুটিসুটি দাঁড়ানো নয়”।
আমার ধারণা বাকের কবিতা, যদিও তা সাধারণের জন্যে লেখেন নি তিনি, সেই একই দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তাঁর কবিতায়ও তিনি তাই হৃদয়ের গভীর কথা বলেন, সরল, অকপট ভাষায়। হৃদয়ের কথাই যে বলতে এসেছিলেন তিনি। কবিতায়, উপন্যাসে, জীবনেও। তার গোটা জীবনই তাই তিনি, হৃদয় যেমন যেমন বলেছে তেমনটিই করেছেন। শুধু নিজের নয়, গোটা পৃথিবীর মানুষের হৃদয়ের ব্যথা স্পর্শ করত তাঁকে। এবং শুধু লেখায় নয়, কাজেও, সেই কষ্ট দূর করতে ব্রতী হয়েছিলেন।

অনূদিত কবিতাগুচ্ছ

নির্যাস

আমার সব কবিতা তুমি রেখো;
আশিরনখ, আরক্ত রমণে মধুর
কিম্বা তীব্র কশাঘাতে।
তবু সব অভ্রভেদী শব্দ পেরিয়ে
জেগে থাকবে শুধু একটিই কবিতা।
একটি সহজ সুর, প্রানের প্রতিমে –
স্পষ্টতায় জাগরূক, পৃথিবীর সব নদী
কানায় কানায় ভরে বলে যাবে,
“ভালবাসা”,
এ ছাড়া, ছিল না কিছু, নেই কোনখানে।

ছলনায়

ভালবাসা সরিয়ে দিয়েছি
তোমার আর প্রয়োজন নেই তাতে।
এখন আমি ভালবাসার ভান করব শুধু
আগের মত। হাসব, গাইব,
নেচে উঠবো হিল্লোলে, দিনের আরক্ত গায়ে।
তারপর রাত্রি এলে, নিশ্চুপ, লুকবো নিজেকে
আমার নিজস্ব নরকে, স্বর্গ-অভিধায়।

মিলন

ক্রমশ উত্তাল হয়, ফেনিল স্বপ্নের সুখ,
শিরায় শিরায় নামে উন্মত্ত ঝড়,
স্ফিতকায়, অলীক চুড়ায়,
স্পন্দনে, স্পর্ধায় জাগে;
অনন্য বন্যায়-
ভেসে যায় হৃদয়ের বন, ক্রীড়নক নদী-
নিবিড় মোহানায় নামে, কৈশোর উচ্ছ্বাসে
সিক্ত-বুক সাগরের কোলে।
তখন, হে প্রেম আমার !
আমিই তোমার প্রাণ, তুমিই আমি,
বৈতরণী মিশে যায়, ভেসে ওঠে আদিম মানব
আমাদের যৌথ বুকে, অন্তিম মিলন ক্রীড়ায়।

স্বপ্ন সত্য তুমি

স্বপ্নে বাঁচি আমি,
মৃত এ বাস্তবে।
স্বপ্ন দেখি, জানি-
মিথ্যে বলতে হবে
আসলে ফাঁকি দিই
নিজেই নিজের মন।
হয়ত সত্যি এটাই
বুঝেও ফেলবে মন।
বুঝেও তবু আরও
স্বপ্ন আয়োজন।
সত্য আমার শুধু
তুমিই মনমোহন।

সুত্রপঞ্জি

Rediscovering Pearl Buck: The preface to Peter Conn’s Pearl S. Buck: A Cultural Biography: https://www.english.upenn.edu/Projects/Buck/preface.html
Pearl Buck – Biographical. NobelPrize.org. Nobel Media AB 2020. Fri. 29 May 2020. https://www.nobelprize.org/prizes/literature/1938/buck/biographical/
Pearl S. Buck Biography: Biography.com Editors; The Biography.com website (https://www.biography.com/writer/pearl-s-buck)
Pearl S. Buck; Wikipedia contributors; Wikipedia, The Free Encyclopedia. https://en.wikipedia.org/w/index.php?title=Pearl_S._Buck&oldid=958157675
Three poems from Words of Love by Pearl S. Buck(1974) by Nava Atlas; literaryladiesguide.com; November 9, 2017: https://www.literaryladiesguide.com/classic-women-authors-poetry/three-poems-from-words-of-love-by-pearl-s-buck-1974/
Pearl S. Buck, the Youngest Woman to Receive the Nobel Prize in Literature, on Art, Writing, and the Nature of Creativity; Maria Popova; Brainpickings.org; https://www.brainpickings.org/?s=Pearl+S.+Buck
Asian-American doctors and nurses are fighting racism as well as the pandemic: Tracy Jan; The Washington Post; May 19, 2020; https://www.washingtonpost.com/business/2020/05/19/asian-american-discrimination/
Violence Against Asian Americans Is on the Rise—But It’s Part of a Long History; Andrew R Chow; Time; May 11, 2020; https://time.com/5834427/violence-against-asian-americans-history/
What the Remarkable Legacy of Pearl Buck Still Means for China; Peter Conn; The Atlantic; August 9, 2012; https://www.theatlantic.com/international/archive/2012/08/what-the-remarkable-legacy-of-pearl-buck-still-means-for-china/260918/
Donn Rogosin and Craig Davidson’s documentary on the life of Pearl S. Buck. Penn Arts & Sciences; https://www.english.upenn.edu/Projects/Buck/video-documentaries.html
Welcome House search information; Pearl S. Buck International Website; https://www.english.upenn.edu/Projects/Buck/video-documentaries.এইচটিএমএল

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)