নিশীথ চিন্তা <br /> গৌতম বসু

নিশীথ চিন্তা
গৌতম বসু

গৌতম বসুর এই অনুভববেদ্য গদ্য ১৯৯১ সালে ‘গাণ্ডীব’ পত্রিকার অষ্টম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। শুধু একটি গন্তব্য নয় -— কবিতা, রেনেশাঁস যুগের চিত্রশিল্পী মাথিস গ্রুনেওয়াল্ডের জীবন থেকে কমলকুমার মজুমদার -— এমন নানা ঠাঁই স্পর্শ করে গেছে লেখকের ভাবনার সঞ্চারপথ । ত্রিশ বছর আগের এই অগ্রন্থিত অনুভূতিমালার পুনঃপ্রকাশ বাস্তবিকই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

কবিতা, শেষ পর্যন্ত, চেতনার প্রকাশ এ-কথা বারংবার অনুভব করেও বুঝতে পারি এটি একটি অক্ষম সংজ্ঞা। মানুষের সমূহ বিদ্যাই যখন চেতনাপ্রসূত, কবিতাকে পৃথক ক’রে চেনবার ও চেনাবার কোনো সূত্র সত্যিই আছে কি না ভাবতে চাই, আরও ভাবতে চাই ‘চেতনা’ শব্দটির অন্তরালে যে উন্মুক্ত প্রান্তর রয়েছে, তার কথা। আমরা নিজ-নিজ সীমারেখার এপারে দাঁড়িয়ে কবিতা কী তা অনুমান করতে পারি, কিন্তু এমনই সূক্ষ্ম ও অনিশ্চিত সে-বোধের অবস্থান যে, তাকে ভাষায় যথাযথ প্রকাশ করতে পারি না। ‘দিনে দিনে বাড়ে কালকেতু’ — এই উক্তির ঠিক কোথায় কবিতা লুকিয়ে রয়েছে তা আমার কাছে কোনোদিনই উদ্ঘাটিত হবার নয়, কারণ, প্রকৃত অর্থে, এর দেহ, মন, আত্মা অভিন্ন, সবই কবিতা। মানুষের আনন্দ বেদনায় যার মূর্ছনা মিশে রয়েছে। পদছায়া যার সর্বত্রগামী, তাকে কীভাবে গ্রহণ করব? অতিসাধারণ এই ঘরে কোথায় তাকে বসাই?
***

একটি কবিতা রচিত হ’ল, মুদ্রিত হ’ল, কিন্তু কোথাও কোনো প্রাণে সাড়া জাগাতে পারল না। আমার মনে পড়ে গঙ্গার ঘাটে নানা রঙের কত ফুল ভেসে যেতে দেখেছি; কখনো একটি জবা, কখনো কিছু ছেঁড়া ফুলের হলুদ ও বেগুনী পাপড়ি, আবার কখনো-কখনো আস্ত একটা মালা। দুলে-দুলে ভেসে চলেছে ফুল, নৌকোর ছায়ায় প্রবেশ করছে, বেরিয়ে আসছে আবার, শেষে জলে তলিয়ে যাচ্ছে। এই বিপুল পৃথিবীতে এমনই হীনবল এরা, সমস্ত উদ্দীপনা, দৃশ্যাবলী থেকে এমনই বিমুক্ত যে, বোধকরি, তলিয়ে গিয়ে এরা এরকম পরিত্রাণ পায়। অনন্তশয্যায় প্রশান্তি নেই, অনন্তজীবনের দাহ নেই, প’ড়ে রয়েছে শুধু আপন আয়ুষ্কাল -— ক্ষুদ্র, সুন্দর।
***

তোমাতে যে আলো রয়েছে তা প্রকৃত বিচারে যদি অন্ধকার হয়, তবে কতগুণ প্রগাঢ়, দুর্ভেদ্য ও সীমাহীন সে অন্ধকার! এর পরেও কিছু সংকল্প থেকে যায়, যেগুলি বিসর্জন দেবার নয়, আত্মবিশ্বাস রয়ে যায় অনির্বাপিত, বেঁচে থাকার, নতুন ক’রে বেঁচে ওঠবার সুপ্রাচীন আজ্ঞা বহন করতে হবে ব’লেই আমৃত্যু এই অস্ত্রধারণ; বুঝে নিতে হয় নিজের আলোয় কতটুকু সত্যিই আলো, কতখানি অন্ধকার।
***

আনুমানিক ১৪৭৪ খ্রীষ্টাব্দে গ্রুনেওয়াল্ডের জন্ম। স্থানীয় আর্চবিশপের দরবারে সভাচিত্রীর পদাধিকার অর্জন করবার জন্য তরুণ গ্রুনেওয়াল্ডকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। সেই চাকরিসূত্রে, ৩৮ বছর বয়সে অধুনা সুখ্যাত আইসেনহাইমে অ্যান্‌থোনাইট মঠের অল্টারপিসের কাজে তিনি হাত দেন। জর্মানিতে মধ্যযুগ তখন সমাপ্তপ্রায়, ইতালি থেকে নবজাগরণের ঢেউ এসে পড়ছে, কিন্তু ওই পর্যন্তই, চারিদিকে তখনও কুসংস্কার, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক নিপীড়ন তখনও বদ্ধমূল, দেশ-জোড়া প্লেগের প্রকোপে মানুষ অসহায়। প্লেগনিরাময়ের উদ্দেশ্যে অ্যান্‌থোনাইট মঠটি একটি হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়েছিল, সেই হাসপাতালের উপাসনাগৃহে গ্রুনেওয়াল্ড তাঁর কাজ শুরু করলেন। গ্রুনেওয়াল্ডেরই সমবয়সী ডুর‌্যর ভেনিসস্থ কর্মশালায় স্বয়ং এসে তাঁর চিত্র ও খোদাইয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ক’রে গেছেন। গ্রুনেওয়াল্ড ও ডুর‌্যরের ভাগ্য অসম; ডুর‌্যর স্বদেশে ফিরলেন, ন্যুরেমবুর্গ হয়ে উঠল তাঁর কর্মক্ষেত্র, প্রভূত সম্মান ও অর্থের অধিকারী হলেন তিনি, গ্রুনেওয়াল্ড পড়ে রইলেন সেই আইসেনহাইমে। ১৫২০ খ্রীষ্টাব্দে দুই শিল্পীর একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল ব’লে শোনা যায়, ডুর‌্যর তাঁর কিছু শিল্পকর্ম গ্রুনেওয়াল্ডকে উপহার দিয়েছিলেন।

জর্মানির আর্থসামাজিক পরিবেশ সংকটদীর্ণ হতে-হতে ক্রান্তির দিকে সুনিশ্চিতভাবে এগিয়ে চলেছে। একদিকে, ক্যাথলিক চার্চের অনাচারের বিরুদ্ধে মার্টিন লুথারের প্রতিরোধ, অপর প্রান্তে ভূমিসংস্কারের দাবি, উভয় শক্তিই ক্রমবর্ধমান; অবশেষে, ১৫২৫ সালে কৃষকদের অভ্যুত্থান সংগঠিত হ’ল। গ্রুনেওয়াল্ড লুথারের একনিষ্ঠ সমর্থক হওয়ার কারণে সভাচিত্রীর পদ থেকে বিতাড়িত হয়ে ফ্রাঙ্কফুর্টে আশ্রয় নিলেন। এখানে বাধ্যত তাঁকে ওষুধ ও রং বিক্রির অতিসাধারণ জীবিকা গ্রহণ করতে হ’ল, কিন্তু যেহেতু তাঁর মতো একজন চিহ্নিত মানুষের পক্ষে ফ্রাঙ্কফুর্টও যথেষ্ট নিরাপদ নয়, সেহেতু তিনি পালিয়ে গেলেন হ্যালে। ১৫২৮ সালে, প্লেগ অবশেষে তাঁকে মুক্ত করল। মৃত্যুকালে তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির তালিকা অতি সংক্ষিপ্ত: একটি খাট, কিছু বই, প্রোটেস্টান্ট ধর্মের কিছু প্রচারপত্র, রং, তুলি, সভাচিত্রীর জীর্ণ পোষাক। শহরের বাইরে তাঁর সমাধিস্থলে কোনো ফলক ছিল না। অচিরে, মাথিস গ্রুনেওয়াল্ড নামটি মুছে গেল; প্লেগ কবলিত জর্মানির একটি ছোট্ট শহরের হাসপাতালে তাঁর কাজগুলি দেখতে যাওয়া অতি বিপজ্জনক এক অভিযান হ’ত, সন্দেহ নেই।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে জর্মানির সম্রাট আইসেনহাইম অল্টারপিস অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণে আগ্রহী হলেন, ততদিনে শিল্পবস্তুগুলি পরিচয়হীন।
***

আজ এ মরজগতে আপনি নাই।
কাব্যতত্ত্ব ও আর্টচর্চার পদ্ধতি আমাকে
আপনি বলিয়াছিলেন তাহা
আমার মনে আছে

‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’-এর উৎসর্গপত্র যতবার sস্মরণ করি ততবার একই প্রশ্ন জাগে। কে ছিলেন এই শচীন চৌধুরী? কমলবাবুকে তিনি শিল্পসৃষ্টির কোন্ গোপন সূত্র দিয়ে গেছিলেন।

কমলবাবুর রচনা বাংলা সাহিত্যের এক অন্ধকার প্রহরের আলো; তিনি আজ নেই, সেই আলো ঊর্ধ্বে তুলে ধরবার দায়ভার গ্রহণ করবেন এমন কেউ নেই, গভীরতর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখছি একটি সম্ভাবনা কীভাবে ধীরে-ধীরে নিভে আসে। কমলবাবুর একক প্রয়াসের সর্বাধিক মূল্য তাঁকেই দিতে হয়েছিল, জীবদ্দশায় অন্তিমচরণে শুদ্ধতারক্ষার প্রয়োজনবোধ তাঁকে এমন এক প্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল যেখানে তাঁর অতিদুরূহ উক্তিগুলি প্রকৃতপক্ষে নীরবতার ভাষান্তর ব’লে মনে হয়। আপন দুর্গ রক্ষার্থে তাঁর আত্মঘাতী কৌশল আজ আর অনুসরণযোগ্য না হ’তে পারে, কিন্তু তাঁর অতুলনীয় বীরত্ব প্রত্যক্ষ ক’রে প্রাণে গভীর সমর্থন ধ্বনিত হয়। অন্তিমপর্বের কমলকুমারকে যদি ঈষৎ ক্লান্ত ও অধোমুখ মনে হয়, এ-কথা যেন বিস্মৃত না হই যে, ক্লান্তি ভিন্ন বীরের কোনো অন্তিম ভূষণ নেই।
***

অকালবর্ষণের বিকেল, পথের পাশে দাঁড়িয়ে রাহুলের একটি পঙ্‌ক্তির কথা ভাবছি — ‘বর্ষাতি নেই বলে ভিজে গেছি বাংলাভাষায়।’ কত কবিতা লেখা হ’ল বাংলায়, অসংখ্য কবিতায় ধরা রইল মানুষের গভীরতম উক্তি, সান্ত্বনা, দুঃখের প্রদীপ জ্বলে রইল কিন্তু কই, একটি গাছেরও পাতা তো নড়ল না, একটিও মরা শিশু ফিরে এল না! আমরা আকাশের দিকে চেয়ে-চেয়ে শুধুই ভিজে গেলাম। একটি বিপুল আক্ষেপ মেলে ধরেছি আকাশে, সে যদি তবুও নীরব, নির্দয় তবে কোথায়, কার নিচে এসে প্রাণের ভিজে ছাই হাতে আমরা দাঁড়াই?

‘নিবিষ্ট ক্রান্তির স্বর ঝরঝর বুকে
অবারিত
চকিত গলির প্রান্তে লাল আভা দুরন্ত সিঁদুরে
পরায় মুহূর্ত টিপ,
নিভে যায় চোখে
কম্পিত নগরশীর্ষে বাড়ির জটিল বোবা রেখা।
বিরামস্তম্ভিত লগ্ন ভেঙে
আবার ঘনায় জল।
বলে নাম, বলে নাম, অবিশ্রাম ঘুরে ঘুরে হাওয়া
খুঁজেও পাবে না যাকে বর্ষার অজস্র জলাধারে।’

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Hacklinkizmir evden eve nakliyatbalgat nakliyateryaman evden eve nakliyatçankaya nakliyat