দেবাশিস তেওয়ারী-র বারোটি কবিতা

দেবাশিস তেওয়ারী-র বারোটি কবিতা

স্মার্টনেসে পরিচয়

স্মার্টনেসে পরিচয়,চিত্রনাট্যে মান্ধাতা আমল
এইতো বদ্বীপ, প্রাণ—-কোথা থেকে ভেসে এলো জল?
গনগনে পিকচার্স তাই ফিল করি—-নতুন দর্শক!
সহস্র ফুলের মধ্যে আমি কার লোক?
এ-ওকে জিগ্যেস করি ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে দেশ!
বয়সের কেস সেটা বয়সেরই কেস
বয়সে চমক আছে,দুঃখ কম—-দু’ঘণ্টার ছবি,
বিদেশ প্রেমের দেশ—-কলকাতার ফুটপাথে
শুয়ে আছি
নদীয়ার কবি।

লেখা

গাছের ফাঁকের নীচে পাতা পড়ে এল

নীচে অবেলার বেলা
ঘোর কাটতে বহুপথ বাকি

বিকেলের রাতে ওই রাতের বিকেলগুলো
চুপিসারে গাছে দেয় ঝাঁকি

কে সে? ও কী কোনও পাখি
নাকি হনুমান তার বালবাচ্চা নিয়ে

এইবেলা দুটো-একটা ফাঁকি
লিখে যাচ্ছি অবিরল

বছর বছর ধরে সেই লেখা পড়ে থাকে
গাছেদের নীচে
কাগজে পাতায় মাখামাখি


লঙ্কাগুঁড়োর এই মগজে

ঢলানো স্বাদ ভালোর ভালো
লঙ্কাগুঁড়ো জ্বালায় আলো
হেডলাইটে
সে তো আমার সন্দেহকাল
দেখছি তাকে সকাল-বিকাল
বাঁধছি সিটে,
সিটবেল্টের নরম গদি
উড়তে উড়তে হাওয়ায় যদি
পাঠাই মগজ
তাহলে এই এ আস্তিনে
গুটিয়ে নিলাম রোদ্র-দিনে
দু’-একটা ডোজ ।
কিন্তু আঁচে ব্রথ জমে যায়
উড়ছে না ডোজ হাওয়ায় হাওয়ায়
এই বিকেলে
কে আর এখন ওদের খোঁজে
লঙ্কাগুঁড়োর এই মগজে
আগুন জ্বেলে !


বিশ্রামের অবকাশে আলোর উড়ালটুকু

সেদিনের বাজিগুলো আজ আর ফাটে না
কত চেষ্টা করে তার সলতে টেনে আগুন দিয়েছি
সে ফাটে না নিজে,কিন্তু অন্যকে কি ফাটাতে পারে না?

আগুনের ভরসাহীন ছাতি
এই হয়তো ফুটে উঠবে রোদ্রকে আড়াল করে
রোদ্রের খাতির
আমাকে আড়াল করে
ছোটাতে পারে না

টানটান বেঁচে থাকি, এই ভরসাটুকু বুকে নিয়ে
সূর্যকে আড়াল করতে গিয়ে
দেখি
সেখানেও অতিকায় অন্ধকার-বিন্দু ঝুঁকে আছে

তাই সমস্যার কাছাকাছি
এই, এই রাত্রি নিয়ে বাঁচি
বিশ্রামের অবকাশে আলোর উড়ালটুকু
ঢেকে দিচ্ছে মশা আর মাছি


না-ফোটা বিকেল

যতটা ত্যাগের জন্য নিরাসক্তি, ওই
আকাশের ডাকে,
এই রোদ্র-দুপুরের বিরস মিলনে
দূরে…দূরে ছুটে যাচ্ছে
খরতপ্ত প্রান্তরের মেল

না-ফোটা বিকেল


আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, স্মৃতিহীন মিথ্যের পাহাড়
ইরানি-স্মৃতির দূরে স্পটে-গোঁজা ঘাড়
ঘাড়ে গোঁজা লোডশেডিং ফুল
হাজার ওয়াট বাতি, ক্ষমতা খাতির
নীচে মুক্তিধাম
আদর্শের ভুল…

আরও নীচে ডিপ্লোমেট—-সংসারের ঝাড়

আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, স্মৃতিহীন ‘মিথ’-এর পাহাড়


সাহিত্য ও সত্য

সাহিত্য সত্যের দিকে বড় প্রবঞ্চক
বড় ধাপ্পাদেয় তার রসনা গ্রহনে,তবু
যে কোনও পাঠক তাকে বেশ পড়ে নিতে পারে
ঘটনার খেইও যাকে ধরে রাখতে হয়

পাঠক পড়েন,আর
ইন্দ্রিয়শক্তির দ্বারা পুনর্গঠন
সত্য বলে প্রতিভাত হয়
আরেক পাঠকে
সেই সত্য ক্রমে সরে যায়

এ যেন প্রতিটি বিন্দু ছায়া থেকে ছায়া ঘুরে মরা

সত্যকাহিনির দ্বারা সাহিত্যকে ধরা?
এর মানে পরিস্কার—-সাহিত্য ও সত্য
দু’জনেরই অপমান করা


কবিতা সন্ধানী

শুধু কী প্রবীণ রক্ত,ঢের বেশি নবীনের প্রাণ
মিশে আছে কবিতা শরীরে

মিশে যাচ্ছে অস্তিবোধ, সব স্বস্তিটুকু

প্রাণের আহারে যত আত্মার শান্তির দ্বার উদ্ঘাটিত হয়
সমস্ত দ্বারের প্রান্তে ফিল্টারের মতো
সেই অস্তিবোধ থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রত্যয়

প্রত্যয়ের ভূমিকায় আমি বড় অভিমানী

নৈকট্যের সহজ বাঁধনে
সেই অভিমান ধুয়ে ধুয়ে সরে গিয়ে
আমি আজ
কবিতা সন্ধানী


গোরের ভিতরে ডুবে যাই

রোদে-জলে টিপে ধরি মায়ার ভ্রুকুটি
জোড়া জোড়া ভ্রুণে মাখা জোড়া জোড়া টুটি

অনিত্য টুটির সাথে নিত্যের চাদরে
কার অঙ্গ ঢেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছ গোরে?

অঙ্গের কাজলে আঁকা গোরের বাতাসা
এই অব্দি মুখে নিয়ে,মাটির নীচের সুরে
আকাশকে হাসা

কীরে বোকা? পারলি না তো, পারবে কোন শালা—–
‘আগে তো মৃতের সঙ্গে জমুক আলাপ,
পরে ছাই’

প্রলাপে আলাপে জাগে মুন্সি,মানে মৃত
বাকিটা উদযাপনে,প্রেমের ভিতরে—-
গোরের ভিতরে ডুবে যাই


মহাভিনিষ্ক্রম

বৃষ্টিহীন বিবেকের কথা বললাম তোমাকে,
এবার তোমাকে এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিবাভাগ উপহার দেব।আঙুলের আস্তিনে লেগে থাকা
রোদ্রগুঁড়ো থেকে যেভাবে জন্ম নেয় অভাবি মায়ের
কোল।তার স্তন্যে গাথা থাকে বৃষ্টিহীন মেঘলা
দুপুর।উপোসী মায়ের কথা নাই-বা বললাম,
তবু দেখো জন্মদাগ মেখে মেখে ধ্বস্ত হচ্ছে তোমার
উপাস্য দেবতারা,আর মায়াময় মৃত্তিকার সুগভীর ধ্যানে
পন্ডিতেরা হেঁটে যায়,ঝোলা নিয়ে,অগস্ত্য যাত্রায়।


পাইপয়সার হিসেব

সহজলোকের সলতেটুকু নিয়ে
একটু জ্বালি,একটু পোকায় কাটে
লুকিয়ে পড়ে সাঁতলা পড়া বিয়ে
অলসবেলায় বিরিঞ্চিদের ঘাটে।

বিরিঞ্চিদের পোড়ামাটির কাজ
খুব ধুমধাম সতেজ সন্ধেবেলা
আলের ধারে যেই পড়েছে বাজ
হারিয়ে গেল ছোটোবেলার খেলা।

হারায়নি সে —- ছোটোবেলার ঘুম
রাস্তা হাঁটি পাতায় পাতায় যোগ
এক-আধবেলা জোনাকি নিঝঝুম
হাসতে হাসতে এলিয়ে পড়ে ভোগ।

দুর্ভোগ বা সুভোগ তা যাই বলুক
লুকিয়ে পড়ে সাঁতলা পড়া হাটে,
সহজলোকের সলতে এবার জ্বলুক
পাইপয়সার হিসেব পোকায় কাটে।


লাখ কথার এক কথা

ভোরের গন্ধে ভাসে সুমধুর চূড়া
ইষ্টিকুটুম মেঘেদের স্তরে স্তরে
ভেসে যায় দূরে ভাটিয়ালি এক ঝোরা
ছলাৎ শব্দ উঠে বসে অন্তরে।

ছলাৎ শব্দ বেওকুব তার হাসি
আতিথ্য ঘোর খুলে যায় তলে তলে
তলে তলে মেঘ যখন ঘুরতে আসি
নীচে রোয়া জমি নিকানো মফসসলে।

চিন্তা বলতে মফসসলের ঘুম
জেগে উঠে পড়ে সস্তা বাজারপাড়া
নানা পঞ্জিকা নানা বর্ণের ধুম
ফেরি করে করে বেঁকেছে পিঠের দাঁড়া

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (1)
  • comment-avatar
    চিরপ্রশান্ত বাগচী 6 months

    দেবাশিস তেওয়ারীর কবিতাগুলো পড়লাম। প্রতিটি কবিতার যে ভাব ও ভাষা, তার মেলবন্ধন অসাধারণ । ছন্দমাত্রামিল তাঁর হাতে সহজেই প্রকাশ পায় বলে ,পাঠকের খুব কাছে তিনি পৌঁছে যেতে পারেন । তাঁর একটা নিজস্ব কবিভাষা আছে । এইজন্য তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশেষ একটা পরিচিতি লাভ করবেন, সন্দেহ নেই ।