দুর্লভ চিঠি, ছবি এবং ফিরে দেখা

দুর্লভ চিঠি, ছবি এবং ফিরে দেখা

রবিপক্ষ। প্রকাশিত হল কিছু দুর্লভ চিঠি, ছবি এবং লেখা। সংগ্রহে সাহায্য করেছেন বর্ষীয়ান কবি শ্রী গৌতম বসু।

সূচি-

রানী চন্দ
বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়
বন্দেমাতরম প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহড়ুকে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি
মোহিতলাল মজুমদার
প্রমথ চৌধুরী
মুকুল দে

এছাড়াও আছে ১৩৩৮-এর রবীন্দ্রজয়ন্তীর ঐতিহাসিক বিজ্ঞপ্তিপত্র

দীনেশচন্দ্র সেন-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ পত্রালাপ

‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’ থেকে
রানী চন্দ

১৪ মে ১৯৪১ । ৩-১৫ মিনিট
সকাল

ভোরবেলা গুরুদেবের ঘরে ঢুকে দেখি তিনি তখনো ঘুমোচ্ছেন, তাঁর বিছানার পাশে একখানি ছোটো কাগজে লেখা আছে কয়েক লাইন কবিতা। শেষরাতে গুরুদেব বলেছেন ― কাছে
যিনি ছিলেন লিখে রেখেছেন:

‘রূপনারানের কূলে
জেগে উঠিলাম
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়।
সত্য যে কঠিন
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’
আমি সেখানা নিয়ে কবিতাটি আর-একটি কাগজে বড়ো বড়ো করে লিখে রেখে দিলুম। ছোটো লেখা পড়তে গুরুদেবের কষ্ট হয়। গুরুদেব জাগলেন ; হাত-মুখ ধোবার পর কফি খেলেন। পরে কবিতাটি তাঁকে দেখালুম। তিনি কাগজটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, আরো কয়েক লাইন লিখে রাখ্‌ :
‘সে কখনো করে না বঞ্চনা।
আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন ―
সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,
মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে।’
তার পর বললেন :
আসল কথাটা কী জানিস, রাত্রি হচ্ছে ঘুমে স্বপ্নে অন্ধকারে জড়িত।এই স্বপ্ন মানুষের বুদ্ধিকে দুঃখ দিয়ে বেড়ায়। এই কুহেলিকা যখন সরে যায় তখনি দেখা যায় সত্যের রূপ। আমরা রাত্রিবেলায় থাকি সেই কুহেলিকায় আচ্ছন্ন হয়ে। সকাল চাই কেন।কেন থাকি ভোরের আলোর জন্য উদগ্রীব হয়ে। ভোরের আলো আমাদের প্রাণে আশ্বাস এনে দেয়। পৃথিবীর সত্যরূপ বাস্তবরূপ দেখায়।তখন আর ভাবনা থাকে না। সত্য কঠিন ― অনেক দুঃখ, দাবি নিয়ে আসে। স্বপ্নে তা তো থাকে না; কিন্তু তবুও আমরা সেই কঠিনকেই ভালোবাসি। ভালোবাসি সেই কঠিনের জন্য সবকিছু দুঃসহ কাজ করতে। এমনি করে জীবনের দেনা শোধ করে চলি আমরা ।এই ধর্‌-না …

[উৎসনির্দেশ ও ঋণস্বীকার: ‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’, রানী চন্দ। ]

‘চিত্রকর’ থেকে
বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের খুব নিকটে আসবার সৌভাগ্য আমার ঘটে নি। আবার তিনি আমার জীবন থেকে কখনো দূরেও চলে যান নি । জীবনের আনন্দ কেউ কাউকে বিলিয়ে দিতে পারে না। তবু বলতে হয় জীবন যে আনন্দময়, সৃষ্টির পথে অবসাদ অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে যে মুক্তি পাওয়া যায়, সেকথা উপলব্ধি করার সার্থক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে উপস্থিত করেছিলেন তাঁর গানের ডালি। প্রকৃতির শোভা-সৌন্দর্য ও তাঁর গান একত্রে যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল তার স্মৃতি শান্তিনিকেতনের কোনো ছাত্রছাত্রীর মন থেকে বোধহয় মুছে যায় নি।
বর্ষার দিনে শান্তিনিকেতনের ছাত্রাবাসগুলি প্রায় জলে ডুবে যেত, ফুটো ছাদ,ভাঙা জানলা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা এসে অনেক সময়ে বিছানাপত্র ভিজিয়ে দিয়েছে। বর্ষার এই রকম এক রাত্রি অনিদ্রায় কাটিয়ে আমরা কয়েকজন ছাত্র অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাঁকে আমাদের অসুবিধের কথা জানিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘তোরা বোস। দ্যাখ, আমারও রাত্রে এই খড়ের ঘরে জল পড়েছে, আমিও সারারাত ঘুমোতে পারি নি। বসে বসে একটা গান লিখেছি। শোন, কিরকম হয়েছে।’ এই বলে রবীন্দ্রনাথ গান শুরু করলেন ― ‘ওগো দুখজাগানিয়া, তোমায় গান শোনাব, তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো …’। গান শেষ ক’রে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আর্টিস্ট,কবি ― আমাদের একই দশা। কেউ আমাদের দেখে না।’ রবীন্দ্রনাথের ঘরে জল অবশ্য সামান্যই পড়েছিল। আমরা পরম আনন্দে রবীন্দ্রনাথের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নিজেরাই বলাবলি করলাম, ‘কই আমরা তো এরকম পারি না!’ আজ একথা নিশ্চয়ই স্বীকার করব, কই রবীন্দ্রনাথ তো ঘর মেরামতের কোনো ব্যবস্থা করলেন না! রবীন্দ্রনাথ ঘর মেরামতের কোনো ব্যবস্থা করেছিলেন কিনা আজ আমার স্মরণ নেই, তবে সেদিন রাত্রের সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর গানে।

[উৎসনির্দেশ ও ঋণস্বীকার : ‘চিত্রকর’, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়।]

‘সভ্যতার সঙ্কট’ পাঠে ক্ষীতিমোহন সেন

কবি ও মহাত্মা

বন্দেমাতরম প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহড়ুকে লেখা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি

An unfortunate controversy is raging round the question of suitability of ‘ Vandemataram’ as national song. In offering my own opinion about it I am reminded that the privilege of originally setting its first stanza to the tune was mine when the author was still alive and I was the first person to sing it before a gathering of the Calcutta Congress. To me the spirit of tenderness and devotion expressed in its first portion, the emphasis it gave to beautiful and beneficent aspects of our motherland made special appeal so much so that I found more difficulty in dissociating it from the rest of the poem and from those portions of the book of which it is a part, with all sentiments of which, brought up as I was in monotheistic ideals of my father, I could have no sympathy.
It first caught on as an appropriate national anthem at the poignant period of our strenuous struggle for asserting the people’s will against the decree of separation hurled upon our province by the ruling power. The subsequent development during which ‘Vandemataram’ became a national slogan cannot, in view of the stupendous sacrifices of some of the best of our youths, be lightly ignored at a moment when it has once again become necessary to give expression to our triumphant confidence in the victory of our cause.
I freely concede that the whole of Bankim’s ‘Vandemataram’ poem read together with its context is liable to be interpreted in ways that might wound moslem susceptibilities, but a national song through derived from it which has spontaneously come to consist only of the first two stanzas of the original poem, need not remind us every time on the whole of it, much less of the story with which it was accidentally associated. It has acquired a separate individuality and an inspiring significance of its own in which I see nothing to offend and sect of community.

( ২৬ অক্টোবর, ১৯৩৭, কংগ্রেস সেক্রেটারির কাছে পত্রবাহক কর্তৃক পাঠানো)

রবীন্দ্রকাব্যের কবিপুরুষ (অংশ)

মোহিতলাল মজুমদার

১.

যতদূর মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম দেখিয়াছিলাম স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে ― জাতির যুবশক্তির সেই বিরাট বোধনযজ্ঞে, টাউন হলের শিবাজী উৎসব সভায় নূতন সামচ্ছন্দের উদ্গাতারূপে;সেদিন তিনি শিবাজীর উদ্দেশে রচিত তাঁহার বিখ্যাত কবিতাটি পাঠ করিয়াছিলেন। সেই সভায় যাঁহারা তাঁহার সেই মূর্তি দেখিয়াছিলেন এবং সেই কণ্ঠের সেই আবৃত্তি শুনিয়াছিলেন, তাঁহাদের অনেকেই স্মরণ করিবেন, সে-দিন আমরা রবীন্দ্র-কবিপুরুষের কোন্‌ রূপ দেখিয়াছিলাম। রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের মধ্যাহ্ন তখন অতীতপ্রায়, অথচ সে যাবৎ ঊষা ও প্রভাতের রবিরশ্মি তো দূরের কথা ― সেই মধ্যাহ্ন-পূর্ব প্রহরের ভাস্বর কিরণচ্ছটাও দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাই! তখন ‘নৈবেদ্য’র যুগও শেষ হইয়াছে; তাহার অনেক পূর্বেই কবির জীবনকুঞ্জে বসন্তের যৌবন-উৎসব প্রায় সমাধা হইয়া গিয়াছে, অথচ দেশের মধুব্রতগণ তাহার কোন সংবাদই রাখেন নাই। কবি যখন গাহিতেছিলেন ―

‘আজ মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে
গুচ্ছ গুচ্ছ ধরিয়াছে ফল ।
বসন্তের দুরন্ত বাতাসে
নুয়ে বুঝি নমিবে ভূতল,
রসভরে অসহ উচ্ছিয়ে
থরে থরে ফলিয়াছে ।।

― তখন তাঁহার সেই গান কাহারও রসপিপাসাকে উতলা করে নাই। এত বড়ো কবির এমন নিঃসঙ্গ কবিজীবন কেমন করিয়া সম্ভব হইল, এবং সেই প্রায় অবজ্ঞাত, আত্মপ্রত্যয় ও আত্মতৃপ্তিমাত্র সম্বল সাহিত্যসাধনায় তিনি যে কখনও কিছুমাত্র নিরুৎসাহ হন নাই ― রবীন্দ্রনাথের কবিপ্রতিভা ও কবিপ্রাণের স্বরূপনির্ণয়ে ইহা মনে রাখিবার প্রয়োজন আছে। এই প্রসঙ্গে আমি, এক অনুরূপ উপলক্ষ্যে, রবীন্দ্রনাথেরই একটি উক্তি স্মরণ করিতেছি:
‘সহায়তা নাই,কৃতজ্ঞতা নাই, অনুকূলতা নাই, কেবল আপনার অন্তরের অপ্রতিহত
ধৈর্য্য ও উপবাসসহিষ্ণু অকাতর অনুরাগে চিরজীবন একাকী বসিয়া কাজ করিয়া
যাইতে হইবে।’
― বঙ্কিমচন্দ্রের সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ এই যে কথা বলিয়াছিলেন ― তাঁহার নিজের জীবনের তাহা সম্ভব হইয়াছিল আরও একটি কারণে, আমি উপরে তাহারই আভাস দিয়াছি।
কিন্তু আমি যখন রবীন্দ্রনাথকে দেখিলাম তখন তিনি তাঁহার সেই নিভৃত নিঃসঙ্গ সাধনার আসন ত্যাগ করিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। তখন তিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দেরই উত্তরসাধক রূপে সেই দুই মহাপুরুষের দ্বারা সদ্যকর্ষিত বাংলার যুবজন–মনোভূমিতে যে ভাববীজ বপন, ও তাহা হইতে যে আশু পুষ্পোদ্গম করাইতেছিলেন, তাহাতে আমাদের সেকালের সেই আকাশ-বাতাস ‘সুরার মতো সুরভি’ হইয়া উঠিয়াছিল, তাহাতেই রবীন্দ্রনাথের সহিত আমাদের প্রথম পরিচয়। কিন্তু সে-পরিচয়ও রবীন্দ্রনাথের আসল পরিচয় নয়; তখন তাঁহার কবিপ্রাণে বাহির হইতে একটা বাতাস লাগিয়াছিল ― তাঁহার সেই নিঃসঙ্গতার কূলে জনতার হৃদয়তরঙ্গ আছাড়াইয়া পড়িয়াছিল। এইরূপ বিচলিত হওয়ার মূলে কবির নিজেরই মনের অস্বস্তির দুইটি কারণ হয়তো ছিল। প্রথমটি ― মনুষ্যহৃদয়সুলভ দুর্বলতা। সকল প্রতিবেশ-প্রভাব জয় করিয়া, দেশ ও কালের সকল অনিত্য প্ররোচনা অস্বীকার করিয়া, তিনি এক নিরুদ্দেশ সাধনতীর্থের অভিমুখে চলিয়াছিলেন বটে ― পথের পথসংকট অপেক্ষা দূর দিগন্তবলয়ের রহস্যসীমা তাঁহাকে অধিকতর আকুল করিত বটে, কিন্তু তিনি যে-দেশে যে-সমাজে জন্মিয়াছিলেন তাহার অশুচি অবস্থা তাঁহার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত করিত, তাঁহার সেই অতিশয় দৃপ্ত ও স্বতন্ত্র আত্মিক সাধনার বিঘ্ন ঘটাইত। বাংলার সেই নবজাগরণের যে ক্ষণে, এবং যে পরিবারে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল, তাঁহার ভাবজীবনের স্বাতন্ত্র্যবোধ যতই প্রখর হোক, এ-অস্বস্তি হইতে তাঁহার অব্যাহতি ছিল না।তাই যত দিন তাঁহার দেহে ও মনে যৌবনের পূর্ণ আধিপত্য ছিল, তত দিন তাঁহার চিত্তে সেই ব্যথা বাজিত; কখনও অধির আক্ষেপে গাহিয়া উঠিতেন ―
‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন!’
কখনও-বা সবলে আত্মসংযম করিয়া মগ্ন স্বরে গুঞ্জন করিতেন ―
‘এখনো সময় নয়!
এখনো একাকী দীর্ঘ রজনী
জাগিতে হবে পল গনি গনি
অনিমেষ চোখে পূর্ব গগনে
দেখিতে অরুণোদয়।’
এই দুইটি কবিতা তিনি পরে তাঁহার স্বনির্বাচিত কবিতাসংগ্রহ থেকে বাদ দিয়াছিলেন।
আর একটি যে-অস্বস্তি, তাহা তাঁহার কবিচিত্তেরই বিবেকদংশন। রবীন্দ্রনাথের কবিকল্পনা যেমন অতিশয় অন্তর্মুখী ― আত্মভাবপরায়ণ তেমনই, তাঁহার কবিমানস অতিশয় আত্মসচেতন ছিল, তাঁহার প্রকৃতিতে ভাবানুভূতির সূক্ষ্মতা ও তত্ত্বজ্ঞানের তীক্ষ্ণতা এই দুইয়েরই এক আশ্চর্য মিলন ঘটিয়াছিল। তাই কবিস্বভাবের বশ্যতা যতই অলঙ্ঘনীয় হোক, তিনি ইহাকে জানিতেন যে, তাঁহার কাব্যলক্ষ্মী অন্তঃপুরচারিণী, আত্মবিহারিণী; উচ্চ–অবরোধবাসিনী; তাহার বিচরণস্থান সাধারণ মানুষের সমাজ নয়, সে আপনার জন্য একটি স্বতন্ত্র স্বপ্নলোক সৃজন করিয়া তাহার মধ্যে স্বেচ্ছাবন্দী হইয়া আছে। সেখানে সে আপনাকে প্রদক্ষিণ করিয়া যে গীত গাহিয়া থাকে, তাহাতে মানুষের হাসি-কান্নার ধ্বনি নাই ― প্রতিধ্বনিমাত্র আছে; তাহাতে মানুষের বাস্তব দেহদশার প্রতিই সেই সশ্রদ্ধ সহানুভূতি নাই, যাহা না থাকিলে কবিকেও অমানুষ হইতে হয়। ইহাই ভাবিয়া তিনি সময়ে সময়ে বড়োই লজ্জিত ও অনুতপ্ত বোধ করিতেন। তাই একবার বড়ো আক্ষেপ করিয়া লিখিয়াছিলেন ―
‘এবার ফিরাও মোরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে
হে কল্পনে,রঙ্গময়ী!দুলায়ো না সমীরে সমীরে
তরঙ্গে তরঙ্গে আর, ভুলায়ো না মোহিনী মায়ায়।
…’
কিন্তু সেদিনও এই আবেদনে একটা প্রবল আত্মধিক্কারমূলক বাসনাই ছিল,তাহার বেশি কিছু ছিল না। তখন তাঁহার কবিস্বভাবেরই পূর্ণ উন্মেষকাল; তাই লোকালয়ে ফিরিবার ― জাতির জীবনে যুক্ত হইবার ― আকুল উৎকণ্ঠার মধ্যেও, তিনি তাঁহার জরা ও জীবনের উভয়েরই সেই এক অধিষ্ঠাত্রী দেবীর ― তাঁহার সেই দিব্যলোকবাসিনী কাব্যলক্ষ্মীর ধ্যানেই শেষে সকল লজ্জা সকল আক্ষেপ নিবারণ করিয়াছিলেন । তখনও তিনি গাহিলেন ―
‘দুর্দিনের অশ্রুজলধারা
মস্তকে পড়িবে ঝরি, তারি মাঝে যাব অভিসারে
তাঁর কাছে ― জীবনসর্বস্বধন অর্পিয়াছি যারে
জন্ম জন্ম ধরি। কে সে ? জানি না কে, চিনি নাই তারে ―
শুধু এইটুকু জানি, তাঁরি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে
চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর-পানে
ঝড় ঝঞ্ঝা বজ্রপাতে জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে
অন্তরপ্রদীপখানি।’
এই ‘অন্তরপ্রদীপখানি’র কথাই আজ আমি বলিতে বসিয়াছি; রবীন্দ্রনাথ সে বিষয়ে ―
নিজের জীবনব্যাপী সেই সাধনার মূলমন্ত্র সম্বন্ধে ― কখনও কোনো কালে ভুল করেন নাই।কবি তাঁহার পূর্ণ-যৌবনকালে, কবিশক্তির সেই পূর্ণ উন্মেষের ক্ষণে, একটা স্ববিরোধী প্রেরণার প্রতিক্রিয়ামুখে অনেকটা আবেশবিহ্বল অবস্থায় এই যে আত্মপরিচয় দিয়াছিলেন, তাহা যে কত সত্য তার প্রমাণ ― এই কবিতার শেষ কয় পঙক্তি আজ যখন আমরা পাঠ করি, তখন স্পষ্টতই মনে হয়, কবিজীবনের সুদীর্ঘ সাধনার অবসানে, উহাই যেন রবীন্দ্রনাথের শেষ উক্তি ― কবির সদ্যনীরব কণ্ঠধ্বনি এই শ্লোকগুলির মধ্যেই যেন এখনও শোনা যাইতেছে ―

২.

আজ রবীন্দ্রজীবনের দীর্ঘ যাত্রাশেষে, বিদায়কালীন তাঁহার সেই মূর্তির পাশে, আমার সেই প্রথম-দেখা মূর্তিটিকে স্মরণ করিতেছি। সেই যৌবন আর এই জরা ― এই দুয়ের মধ্যে কোন্‌ ব্যবধান আছে? কালের ব্যবধান আছে, কিন্তু ভাবেরও আছে কি? আমরা জানি, তাঁর কল্পনা নব নব ক্ষেত্রে প্রসারিত হইয়া সেই ব্যক্তিত্বকে বহুরূপী করিয়াছে; তথাপি সে-কল্পনা কি চিরদিন ভাবের একটা ভ্রুমধ্যবিন্দুতে সংবদ্ধ ছিল না? রবীন্দ্রনাথ যখন অনতিকাল পরেই স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি বিশেষ মমত্ব সংবরণ করিয়া নির্বিশেষ মানবপ্রেমের সাধনায় অগ্রসর হইয়া চলিলেন, তখন কি তাঁহার কবিচিত্তে কোনও ভাবান্তর ঘটিয়াছিল? ভাবে ভাষায় ছন্দে, রচনার নিত্য নূতন আদর্শ-সন্ধানে, তাঁহার কবিমানস যে নিরন্তর বৈচিত্র্য কামনা করিয়াছে, তাহার মূলে কোথায় সেই ঐক্যসূত্র আছে যাহা আবিষ্কার করিতে না পারিলে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিধর্মের মতো তার তাঁহার কবিধর্মও দুর্বোধ্য হইয়া পড়ে? আমাদের দেশের পণ্ডিতরা প্রতিভাকে যে–অর্থে নবনবোন্মেষশালিনী বলিয়া থাকেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা কেবল সেই অর্থেই নবনবোন্মেষশালিনী নহে; কাব্যের অন্তরালে যে কবিপুরুষ থাকে ― রবীন্দ্রকাব্যের সেই কবিপুরুষও যেন নিত্যনবীন রূপে আমাদিগকে বিস্মিত ও চমকিত করিয়াছে। তথাপি রবীন্দ্রকাব্য তথা সাহিত্যের ভিতরে দৃষ্টিপাত করিলে, এত রূপান্তর সত্ত্বেও, কবির একটি স্থির মূর্তির দর্শনলাভ দুরূহ হইবে না, যৌবন ও জরার মধ্যে কোনো ব্যবধান আছে বলিয়া মনে হইবে না। কিন্তু সে কোন্‌ দিকে, কোথায়?

[উৎসনির্দেশ: ‘পূর্ব্বাশা’ রবীন্দ্র-স্মৃতি সংখ্যা আশ্বিন ১৩৪৮/ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪১;সম্পাদনা সঞ্জয় ভট্টাচার্য]

বিজ্ঞপ্তি রচনা: অমল হোম
হস্তাক্ষর : রাজশেখর বসু

বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষরকারীদের তালিকা

প্রথম পৃষ্ঠা প্রথম সারি
১। শ্রীজগদীশচন্দ্র বসু ২।শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র রায় ৩। শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়
৪। শ্রী রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ৫। শ্রী কামিনী রায় ৬। শ্রীযতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
৭।বাসন্তী দেবী ৮। শ্রী অবলা বসু ৯। শ্রী সরলা রায় ১০। শ্রীনীলরতন সরকার
১১। শ্রীপ্রমথনাথ রায়চৌধুরী ১২।আবুল কালাম আজ়াদ ১৩। ঘনশ্যাম দাস বিড়লা
১৪। শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ১৫। শ্রী কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য

প্রথম পৃষ্ঠা দ্বিতীয় সারি

১৬। শ্রীহরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৭। সি. ভ়ি. রমন ১৮। হাসান সূরাওয়ার্দি
১৯। শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ২০। শ্রীবিধানচন্দ্র রায় ২১। মহম্মদ আকরাম খাঁ
২২। শ্রীপ্রমথনাথ চৌধুরী ২৩। শ্রী হীরেন্দ্র নাথ দত্ত ২৪। সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণনন
২৫। শ্রী বিপিনচন্দ্র পাল ২৬। শ্রী চারুচন্দ্র ঘোষ ২৭। শ্রী সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক
২৮। শ্রী যতীন্দ্রনাথ বসু ২৯। শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু ৩০। শ্রী দুর্গাচরণ সাংখ্য বেদান্ততীর্থ
৩১। শ্রী কৃষ্ণকুমার মিত্র

প্রথম পৃষ্ঠা তৃতীয় সারি
৩২। শ্রী ঋষিকেশ লাহা

দ্বিতীয় পৃষ্ঠা প্রথম সারি
৩৩। ফস্‌ ক্যালকাটা (‘দ্য মেট্রোপলিটন’ ৩৪। শ্রী দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী
৩৫। শ্রী শ্রীশচন্দ্র নন্দী ৩৬।ডব্লু.এস.উর্‌কুহার্ট ৩৭।জে.আর.ব্যানার্জি(জ্ঞানরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়)
৩৮। শ্রী হেরম্বচন্দ্র মৈত্রেয় ৩৯। এ. কে. ফজলূল হক ৪০। এইচ. এ. গিড্‌নে
৪১। শ্রী নগেন্দ্রনাথ বসু ৪২। শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন ৪৩। শ্রী জলধর সেন ৪৪। মুজীবর রহমান
৪৫। শ্রী নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত ৪৬। আনন্দ্‌জি হরিদাস ৪৭। শ্রীসুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত
৪৮।এ. মূর (আর্থর মূর) ৪৯। ই. সি.বেন্থাল ৫০। শ্রীমতী সরোজিনী দেবী
৫১। ওঁকারমল জেঠীয়া ।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠা দ্বিতীয় সারি
৫২। শ্রী নৃপেন্দ্র নাথ সরকার ৫৩। এস. খুদা বক্স ৫৪। হরিরাম গোয়েঙ্কা
৫৫। শ্রী অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায় (ও. সি. গাঙ্গোলি) ৫৬। পদমরাজ জৈন
৫৭। জহাঙ্গীর কোয়াজি ৫৮।শিবানন্দ (অধ্যক্ষ: শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন)

[উৎসনির্দেশ ও ঋণস্বীকার : ‘দ্য ক্যালকাটা মিউনিসিপাল গেজেট, ট্যাগর মেমোরিয়াল স্পেশাল সাপলিমেণ্ট’,
প্রকাশনা: দ্য কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন, সম্পাদনা অমল হোম, প্রথম প্রকাশ:১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪১,
চতুর্থ সংস্করণ জানুয়ারি ২০০৬ ]

ঘরোয়া আড্ডায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্র-স্মৃতি
প্রমথ চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন ― আমরা অর্থাৎ তাঁর আজীবন ভক্তরা পড়ে রইলুম। এ-ঘটনায় আমাদের দুঃখ ভাষায় প্রকাশ করবার মতো বস্তু নয়।
রবীন্দ্রনাথ আশি বছর ইহলোকে ছিলেন, কিন্তু তিনি এই বহুকাল শুধু জীবনধারণ করেননি ― কিন্তু ‘বেঁচে’ ছিলেন। বেঁচে যে ছিলেন ― প্রমাণ তাঁর অখণ্ড অফুরন্ত রচনাবলী। সে রচনার নিত্য নব স্ফূর্তি শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল।
আমাদের মতো লেখকদের আর-একটি দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা যে এ-বিষয়ে কিছু লিখব এমন আশা অনেকে করেন।
কিন্তু আমার পক্ষে এ-অবস্থায় কিছু লেখা সম্ভব নয়। কারণ আমি আজ ৫৫ বৎসর ধরে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত, সুতরাং আমার পক্ষে আজকের দিনে মৌন অবলম্বন করাই শ্রেয়।
কেন, বলছি:
বাঙ্গলার লোকোত্তর পুরুষের তিরোধানে জনগণ যে শোক প্রকাশ করেছে সে সামাজিক শোক আমরাও অনুভব করছি। কিন্তু এই জনগণের এই শোকের বাহ্য প্রকাশের ভঙ্গিটি আমাদের মতো লেখকদের ভাষায় প্রকাশ-ভঙ্গিটি সম্পূর্ণ বিভিন্ন হতে বাধ্য। আমরা লেখকরা আমাদের মনোভাবকে সংযত ও সংহত করতে বাধ্য। আমার মনের সকল আকূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারিনে। ভাষায় যা ধরা পড়ে তাই আমরা ব্যক্ত করতে পারি। যে-মনোভাব যোগের ভিত্তি তা পতঞ্জলির মতে সার্বভৌম হলেও ব্যক্তিবিশেষকে সে-মনোভাব আয়ত্ত করতে হলে সাধনার প্রয়োজন। সে-সাধনার প্রথম পদ হচ্ছে চিত্তবৃত্তি নিরোধ করা। লেখাও এক রকম যোগ-সাধনা। লিখতে বসলেও অসংখ্য অস্থির চিত্তবৃত্তি নিরোধ করতে হয়। মন যখন নিতান্ত কাতর তখন এই সব অবাধ্য চিত্তবৃত্তিকে বশীভূত করা এক রকম অসাধ্য সাধন করা। কথাকে এ-অবস্থায় সাজিয়ে-গুছিয়ে একটি ব্যক্ত রূপ দেওয়া অসাধ্য সাধন করা।
আমি যখন কৈশোরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত তখনই তাঁকে একজন লোকোত্তর পুরুষ বলে চিনতে পারি। এ-কথা আমি পূর্বেও ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করেছি।
‘লোকোত্তর পুরুষ’ কথাটি আমি বৌদ্ধশাস্ত্র থেকে আহরণ করেছি। ইংরেজি Superman কথাটা আমার মনঃপুত নয়।
দেশসুদ্ধ লোক যে রবীন্দ্রনাথকে লোকোত্তর পুরুষ বলে পেরেছে এ অতি আনন্দের কথা। তাদের শোক, এ-যুগে ভারতের অদ্বিতীয় লোকোত্তর পুরুষের তিরোধানে জনগণের শোক। কি করে মহাপুরুষ শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলকে স্পর্শ করে সে একটি রহস্য । কিন্তু করে, তা একটি fact।
লোকোত্তর পুরুষ স্বপ্রকাশ। সে যাই হোক, শোক প্রকাশ ও আনন্দ প্রকাশের রূপ সম্পূর্ণ বিভিন্ন। কোনো ক্ষেত্রে এ-দুটি ঘুলিয়ে গেলে অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হয়।
সে যাই হোক, আমরা এখনও ইহলোকে আছি, আমরা কি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে বাক্‌বিস্তার করবার জন্যই আছি ? আশা করি তা নয়।
আমাদের জীবনে বিশেষ কোনও সার্থকতা না থাকলেও এ-অবস্থায় লেখা অসম্ভব।কারণ আমরা লেখক হলেও মানুষ ― আর ক্ষুদ্র হৃদয়-দৌর্বল্যের একান্ত বশবর্তী, আর আমরা যারা বীরপুরুষ নই আমাদের মতে এই হৃদয়-দৌর্বল্যের উপর মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠিত।
সে যাই হোক, আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করতে বাধ্য যে আমাদের মুখে তিনিই ভাষা দিয়েছেন। বাংলা ভাষা তিনিই গড়ে তুলেছেন অপূর্ব সৌন্দর্যে মণ্ডিত করে, যে সৌন্দর্যে আমাদের ভাষা অবশ্য বঞ্চিত। উপরন্তু তিনি আমাদের মাতৃভাষাকে অপূর্ব ঐশ্বর্য দান করেছেন ― যে ঐশ্বর্যের প্রসাদে আমাদেরও ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে।
বাংলা ভাষার বয়েস খুব বেশি নয়, বিশেষত বাংলা গদ্যের। আমরা চণ্ডীদাসকে আমাদের প্রথম কবি বলে ধরে নিয়েছি, তার পূর্বের কোনও কবির সঙ্গে আমি পরিচিত নই। যে-দুখানি পুস্তক প্রাচীন বলে কারও কারও মতে গণ্য হয়েছে, সে-বই দুখানি সম্বন্ধে আমার সন্দেহ আছে। শূন্যপুরাণের কতক অংশের ভাষা অবশ্য প্রাচীন কিন্তু তার অপর অংশ বহু পরে লিখিত। কৃষ্ণকীর্তন যাঁরই রচনা হোক পদাবলীর চণ্ডীদাসের লেখা নয়। সে যাই হোক, এ-বিষয়ে লোকের মতভেদ আছে। সুতরাং আমরা চণ্ডীদাসকেই আদি-কবি বলে গ্রহণ করতে পারি।
চণ্ডীদাসের কবিতার ভাবও ভালো ভাষাও ভালো কিন্তু তাঁর ভাষা অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করলেই তাঁর ভাষার দারিদ্র্য ধরা পড়ে। তাঁর পরবর্তী কবিদের ভাষা, যথা কবিকঙ্কণের ভাষাও lyrical quality বঞ্চিত। একমাত্র ভারতচন্দ্রের ভাষা চমৎকার কিন্তু সে-ভাষারও পরিধি কম। রবীন্দ্রনাথের ভাষার মতো তাঁর ভাষার ঐশ্বর্য নেই।
ইংরেজি আমলের প্রথম কবি ও প্রধান কবি মাইকেল। কিন্তু তাঁর ভাষা নূতন নয় উপরন্তু কৃত্রিম।এতই কৃত্রিম যে তাঁর পরবর্তী কোনো কবিই তাঁর অনুকরণ করেননি এমন কি অনুসরণ করেননি। বাংলা ভাষায় ও একটি প্রক্ষিপ্ত কাব্য। মাইকেলের ভাষা অনেকের মনে ধাক্কা লাগিয়েছে কিন্তু কোনো কবিকে অনুপ্রাণিত করেনি। হেম-নবীনের কবিতা সম্বন্ধে নীরব থাকায় শ্রেয়।
তার পর রবীন্দ্রনাথের আকস্মিক আবির্ভাব। প্রথম থেকেই অনেকের চোখে পড়ে সে- ভাষা কবির ভাষা। তার পর তাঁর দীর্ঘ জীবনে বাংলা ভাষার ঐশ্বর্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। আজ সে-ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার অপূর্বতা দেখবার দিন নয়। আমরা আমাদের জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে তাঁর ভাষা থেকেই নিজের নিজের সাহিত্যিক ভাষা গড়ে তুলেছি। আমরা লেখকমাত্রই তাঁর কাছে সম্পূর্ণ ঋণী। ভর্ত্তৃহরি বলেছেন যে, জল আমরা এক ঘটিই তুলতে পারি, সে জল আমরা কুয়ো থেকেই তুলি বা বারিধি থেকেই তুলি। রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত ও সৃষ্ট শব্দাম্বুধি থেকে আমরা নিজ নিজ বুদ্ধির ঘটে যতখানি ধরে ততখানি আহরণ করেছি।
রবীন্দ্রনাথ চলে গিয়েছেন ― কিন্তু তাঁর ভাষা রেখে গিয়েছেন। সে-ভাষা অমর। ভাষা নিজ হতেই বাড়ে না বৃক্ষের মতো। যুগে যুগে মহাকবিরা তাঁর ঐশ্বর্য ও শ্রীবৃদ্ধি করেন। রবীন্দ্রনাথের এ-দান, বাঙ্গালী জাতিতে অমূল্য দান ― আর এ-দানের পরমায়ু ভবিষ্যতেও সমান থাকবে ।
ভাষা হচ্ছে মনের সদর পিঠ। তার ভাষার ঐশ্বর্য থেকে আমরাও বক্তার মনের ঐশ্বর্যের পরিচয় পাই। রবীন্দ্রনাথের মন যে বিশ্বব্যাপী ছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ তাঁর ভাষা। রবীন্দ্রনাথের বাঙ্গালী জাতিকে নানা বিষয়ের দান সম্বন্ধে নানা আলোচনা হচ্ছে ― আশা করি সমালোচকরা তাঁর ভাষাকে উপেক্ষা করবেন না। কেননা, ভাষাই হচ্ছে মনের সদর পিঠ ও সর্বলোকের প্রত্যক্ষ। রবীন্দ্রনাথের ভাষা স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল ― উপরন্তু তাঁর ভাষায় যাদু আছে যা অপরের ভাষায় নেই ।
আর একটা কথা ― মানুষ রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে জানবার কৌতূহল অনেকের আছে। এ-কৌতূহল এ-যুগে ― এ-যুগের সৃষ্টি । ইউরোপে Homer-এর বিষয়ে কিছু জানা নেই। এ দেশে বাল্মিকি, কালিদাসের লৌকিক জীবন সম্পর্কে সম্বন্ধেও কিছু জানা নেই। তাঁদের কাব্যই তাঁদের চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যই তাঁকে অমর করে রাখবে এ-দেশে ও বিদেশে। আমি পূর্বে বলেছি যে, আমি তাঁর কাছে বহুদিন থেকে পরিচিত সুতরাং অনেকে মনে করেন, আমি তাঁর দৈনন্দিন জীবন সম্বন্ধে অনেক কথা লিখতে পারব। এ-আশায় অনেকে নিরাশ হবেন। প্রথমত, এরকম বাচালতায় বিপদ আছে। কারও চোখে মানুষের জীবন কতকগুলি ছোটো জিনিসের বড়ো সমষ্টি আবার কারও চোখে তা কতকগুলি বড়ো জিনিসের ছোটো সমষ্টি । এ- ক্ষেত্রে আমরা ছোটো জিনিসকে বড়ো বলে ভুল করতে পারি নয়ত বড়ো জিনিসকে ছোটো বলে ভুল করতে পারি। অতিমানুষও মানুষ সুতরাং জীবনও নানা ছোটো জিনিসের সমষ্টি ― কিন্তু তিনি অতিমানুষ বলে গণ্য হন, কতকগুলি অসামান্য গুণের জন্য যার প্রকাশ তাঁর কবিতা ও কর্মে।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে তাঁর লৌকিক জীবনের অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। যখন তাঁর রচিত পত্রাবলী সংগৃহীত ও প্রকাশিত হবে তখন তাঁর বিষয়ে অনেক কথা জানা যাবে। এর জন্য পাঠক সমাজকে কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

[উৎসনির্দেশ: ‘পূর্ব্বাশা’ রবীন্দ্র-স্মৃতি সংখ্যা আশ্বিন ১৩৪৮/ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪১;সম্পাদনা সঞ্জয় ভট্টাচার্য]

আমার কথা
মুকুল দে

… জাহাজ সিঙ্গাপুর ছাড়তেই ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে পড়ল। এর আগে ডায়মন্ড হারবার ছাড়তেই একবার ঝড়ের সামনে পড়তে হয়েছিল বটে, কিন্তু তার প্রকোপ এতটা ভয়ঙ্কর ছিল না। এবারের ঝড় দেখে মনে হল জাহাজের কোনো মানুষই বোধ হয় আর পরিত্রাণ পাবে না। হাওয়ার ঝাপট, ঢেউয়ের দোলায় যে-কোনো মুহূর্তেই বুঝি জাহাজডুবি হয়। পাল ছিঁড়ে চৌচির হয়ে গেল, ডেকের পাটাতনে জল থৈ-থৈ করছে, গুরুদেবের জোব্বা, আমাদের জামা কাপড় ভিজে একাকার। সুস্থির হয়ে বসবার মতো জাহাজের কোনো অংশই শুকনো নেই। অনেকেই ধরে নিয়েছিল অবধারিত মৃত্যু। এরই মধ্যে দেখেছি দুজন মানুষের কি নির্বিকল্প ভাব। এক গুরুদেব, অন্যজন জাহজের ক্যাপ্টেন। গুরুদেব ধীর, স্থির, শান্ত। আর ক্যাপ্টেন সারাক্ষণই জাহাজের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছেন। কর্মচারীদের প্রয়োজনমতো নির্দেশ দিচ্ছেন। দুরাত্রি তিনি চোখের পাতা এক করেন নি। শুধু যে ঝড় তা নয়, এদিকে আবার ক্যাপ্টেনের মুখে শুনলাম, এ-পথে জলের নীচে লুকোনো পাহাড় আছে, জাহাজের খোল একবার সেখানে লাগলেই একেবারেই পঞ্চত্ব প্রাপ্তি। তা কি ভয়ানক পরিস্থিতি তখন জাহাজের ― ওপরে ঝড়ের তাণ্ডব, আর নীচে লুকিয়ে- থাকা পাহাড়। তবুও বিন্দুমাত্র ঘাবড়ান নি ক্যাপ্টেন, অসামান্য তৎপরতার সঙ্গে সবকিছু সামলে দিয়েছিলেন।
যে-রাত্রে ঝড় সবচেয়ে মারাত্মক হয়ে উঠল, সে-রাত্রেও গুরুদেবের এতটুকু চাঞ্চল্য নেই। গুরুদেব তখন একমনে যেন ধ্যানস্থ হয়ে গান রচনা করে চলেছেন, ‘ভুবনজোড়া আসনখানি।’ প্রথমে তিনি একাই গাইতে শুরু করেন, তারপর তাঁর সঙ্গে আমিও যোগ দিলাম। প্রথমে আমি, তারপর একে-একে পিয়ার্সন ও অ্যান্ডরুজ়। ঝড়ের সময় গুরুদেবের ওইরকম প্রার্থনার ভঙ্গিতে ধ্যানস্থ হয়ে গান গাওয়া দেখে, ক্যাপ্টেনের ধারণা হয়েছিল গুরুদেবের কোনো বিশেষ মন্ত্রশক্তি আছে। ঝড় থামলে ক্যাপ্টেন ছুটে এসে গুরুদেবকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে টুপি খুলে দাঁড়াল। আমরাও বাঁচলুম। প্রভাতে অরুণোদয়ের সঙ্গে সমুদ্র শান্ত হল, সকলের মুখেই ফুটল হাসি।

[উৎসনির্দেশ:১.‘আমার কথা’ মুকুল দে (পৌষ ১৪০২) ‘দেশ-বিদেশ ভ্রমণ ও শিল্পী হওয়ার পটভূমিকা’ শীর্ষক
পরিচ্ছেদের একাংশ
২.‘ভুবনজোড়া আসনখানি’ রচনা ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৩/২১ মে ১৯১৬, ‘তোসামারু’ জাহাজ, চীন সমুদ্র
‘গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচী’ অখণ্ড সংস্করণ ১৩৯৯, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি।
ছবিটি তুলেছিলেন সুকুমার রায়। ১৯০৬ সালে।

দীনেশচন্দ্র সেন-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ পত্রালাপ

[সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ১৯৩৯]
ওঁ
শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন

কল্যাণ নিলয়েষু

বিজয়ার আশীর্বাদ গ্রহণ করিবেন। বাংলা প্রাচীন সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি কাব্যগুলি ধনীদের ফরমাসে ও খরচে খনন করা পুষ্করিণী; কিন্তু ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলা পল্লীহৃদয়ের গভীর স্তর থেকে স্বত উচ্ছ্বসিত উৎস, অকৃত্রিম বেদনার স্বচ্ছ ধারা। বাংলা সাহিত্যে এমন আত্মবিস্মৃত রসসৃষ্টি আর কখনো হয়নি। এই আবিষ্কৃতির জন্য আপনি ধন্য। ইতি বিজয়াদশমী ১৩৪৬।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

***

শ্রী হরি শরণং
Phone South 1123,
“Rupeswar House”
Behala , P.O.
Calcutta

১৭।১০।৩৯
পরম শ্রদ্ধাভাজনেষু,

পূজার সংখ্যা বাতায়নে আপনি অতি অল্প কয়েকটি ছত্রে মৈমনসিংহ গীতিকা সম্বন্ধে যে মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন, সেরূপ সমালোচনা আপনি ভিন্ন অন্য কেহ করিতে পারিতেন বলিয়া আমার মনে হয় না, আপনার অন্তর্দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ ও সত্যাশ্রিত যে তাহাতে যে কোন বিষয়ের জটিলতা ভেদ করিয়া তাহার স্বরূপ উজ্জ্বল করিয়া দেখায়। আপনি বৃদ্ধ, কিন্তু মনের জগতে আপনার চিরযৌবন; তাহা বয়স এবং শারীরিক দৌর্বল্য ক্ষুণ্ণ করিতে পারে নাই। আপনার মন্তব্য ক্ষুদ্র একটি মণির ন্যায় বহুমূল্য ও উজ্জ্বল। আপনি আমার শত শত প্রণাম গ্রহণ করুন।
বহুদিন পরে আপনাকে চিঠি লিখিলাম, আমি আপনার আপেক্ষা ৫/৬ বৎসরের ছোট, তথাপি আপনার মত স্বাস্থ্য রক্ষা করিতে পারি নাই। অনেক সময় বিছানায় মৃতের মত পড়িয়া থাকি এবং বিগত জীবনের সেই অধ্যায়টি বিশেষ করিয়া স্মরণ করি যখন আপনার দুর্লভ সঙ্গ ও সৌহার্দ্য লাভ করিয়া কৃতার্থ হইয়াছিলাম। আপনার স্মৃতিতে যদি সেই অধ্যায়ে কোন দাগ কাটিয়া থাকে, তবে হয়ত বুঝিবেন, আপনার প্রীতি ও সহৃদয়তা বঞ্চিত হইয়া আমি কতটা রিক্ত ও ক্ষুণ্ণ হইয়াছি ।
চিরানুরক্ত
শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন

[উৎসনির্দেশ: ‘চিঠিপত্র’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দশম খণ্ড। এই চিঠিটি লেখার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, নভেম্বর মাসে দীনেশচন্দ্রের জীবনবসান হয়।]

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (2)
  • comment-avatar
    শীর্ষা 1 month

    রবিপক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বেশ ভালো লাগল। শিক্ষাসত্রে পড়াকালীন রবীন্দ্রচর্চায় এরকম টুকটাক চিঠিপত্র বা রবীন্দ্র পরিবেষ্টিতদের কথাবার্তা পড়ার সুযোগ হত। আবহমান পত্রিকাকে ধন্যবাদ।

  • comment-avatar
    Vihaan Saha 1 month

    আজ কবিগুরুর ১৬০তম জন্মতিথি উপলক্ষে তাঁহার চরনে অশেষ প্রনাম জানাই এবং এই সমগ্র রচনাবলী পাঠ করিয়া আমি আজকের দিনটিকে স্মরণ ও উদযাপন করিলাম। তাহার জন্য আবহমান পত্রিকার প্রতি আমি বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি। নমস্কার। 🙏