তিরন্দাজির পথে, জেন <br /> দ্বিতীয় পর্ব <br /> পার্থজিৎ চন্দ

তিরন্দাজির পথে, জেন
দ্বিতীয় পর্ব
পার্থজিৎ চন্দ

‘জেন’- শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে চলা রহস্যময়, মিস্টিক এক সাধনপদ্ধতি; প্রাচ্যের সুগভীর দর্শনের একটি ধারা, যে ধারার মধ্যে মিশে রয়েছে পারমিতার ছায়া, ‘না-জানা’র মধ্য দিয়ে জানার গূঢ় পদ্ধতি। একটি সুবিখ্যাত জেন-কবিতায় পাওয়া যায়, ‘Sitting quietly, doing nothing / Spring comes, and the grass grows itself’। এই ‘কিছুই না-করা’র পদ্ধতি অর্জন করতে হয় দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে। আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের এই ধারার সঙ্গে তিরন্দাজির মতো একটি শৌর্যময় বিষয়ের কি কোনও সংযোগ থাকতে পারে? তিরন্দাজি কি শিল্প? এই শিল্পের মধ্যে দিয়ে কি প্রবেশ করা সম্ভব জেন-এর মিস্টিক পৃথিবীতে? আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল অয়গেন হেরিগেল-এর ‘Zen in the Art of Archery’। ব্যক্তি-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এ কাহিনি যেন এক রোমাঞ্চকর শান্ত থ্রিলার, ইউরোপের চোখে ‘জেন’ দর্শন অথবা ভিন্নধারার ডিসকোর্স।

কেন আমি ‘জেন’ পথের পথিক হয়েছিলাম আর কেনই বা তার কারণে তিরন্দাজি শিক্ষা করতে শুরু করেছিলাম সে নিয়ে কয়েকটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। ছাত্রাবস্থাতেই আমি অতীন্দ্রিয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম, রহস্যময় এক জগতের প্রতি ঝোঁক মাথায় ঘুরঘুর করত। দিন দিন আমার কৌতুহল বাড়ছিল। অতীন্দ্রিয়বাদে বুঁদ হয়ে আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম বাইরে থেকে, সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াই শুধু জেন-সম্পর্কিত পুথি পড়ে আমি তার ভেতর প্রবেশ করতে পারব। কিন্তু পুথিগুলি পড়ার পর ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম এসব পুথির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে আমার দিন কেটে যাবে, রহস্যের যে উঁচু পাঁচিল রয়েছে জেন-এর চারদিকে সেটা পেরিয়ে তার অন্দরমহলে আমি ঢুকতে পারব না কিছুতেই। অতীন্দ্রিয়বাদ ও জেন-কে আশ্রয় করে যে বিপুল সাহিত্য তাতে আমার তৃষ্ণা মিটবে না, বারবার হতাশ ও হতোদ্যম হয়ে বুঝতে পারছিলাম একজন প্রকৃত বিরাগী, নিরাসক্ত ব্যক্তির পক্ষেই বৈরাগ্য কী তা বোঝা সম্ভব। আলোর সন্ধান পাওয়া যে মানুষের নির্বাণ লাভ হয়েছে, যে পার্থিব অস্তিত্বকে ছাপিয়ে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যেতে পেরেছে সে’ই করুণাঘনের সঙ্গে একাত্ম হতে পারবে। বুঝতে পারছিলাম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই রহস্যময় পথের সন্ধান পাওয়া যাবে না। যদি সে পথে কেউ না হাঁটে, এই বিপুল পুথি তার কাছে নিছক পুথি হয়েই রয়ে যাবে।
কিন্তু একজন সাধারণ ব্যক্তিমানুষ কীভাবে সে পথের পথিক হয়ে উঠবে? কল্পনার গজদন্তমিনারে নয়, বাস্তবিক কীভাবে সে জগতজোড়া এই বিপুল বস্তুপুঞ্জ ও মায়ার হাত থেকে নিজেকে ক্রমে বন্ধনহীন আর নিরাসক্ত করে তুলবে? এ পথের মহাজনদের থেকে বেশিরভাগ মানুষই বহু আগে বিচ্যুৎ হয়ে গেছে, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে তাঁদের যোজন যোজন দূরত্ব। আমরা তথাকথিত আধুনিক মানুষ, আমাদের পথ আলাদা; আমাদের জন্য কি সে পথের কোনও দরজা খোলা আছে?
কোথাও আমি আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর পাইনি, যদিও পুথি পড়ে মহাজনদের পথের ধারা ও পর্যায়গুলি জেনে গেছিলাম। কিন্তু যে পদ্ধতি অনুসরণ করলে সঠিক পথ খুঁজে পেতে পারি তার সন্ধান পাচ্ছিলাম না কিছুতেই, কোনও মহাগুরুর সন্ধান পাইনি তখনও আমি। অথচ এপথে হেঁটে যেতে গেলে একজন পথ-প্রদর্শক থাকা একান্ত জরুরি। কিন্তু পথপ্রদর্শক আর নিরস প্রাণহীন পথনির্দেশ’ই কি যথেষ্ট?
এসব বাহ্যিক যান্ত্রিক পদ্ধতি আসলে একটি পরিসর নির্মাণ করে মাত্র, মানুষের অধিত তথাকথিত কোনও ‘জ্ঞান’ই তাকে অতীন্দ্রিয় সে পথের সন্ধান দিতে পারে না। সমস্ত জ্ঞান’কে অতিক্রম করে সে এক অন্য জগৎ।
আমি বিচলিত হয়ে উঠতাম, যেন বন্ধ কতগুলি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। বারবার সে দরজায় ধাক্কা খেতাম, দরজাগুলি খোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতাম। দরজা খুলত না, শুধু ব্যর্থতার প্রহরগুলি ঝনঝন করে বেজে যেত। যত দিন যাচ্ছিল আমার অপেক্ষার প্রহরগুলি ভারী হয়ে উঠছিল।
সে সময়ে একটা ঘটনা ঘটল, তখন আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হল টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়ানোর। এক সুবর্ণ সুযোগ এসে গেলে আমার সামনে, জাপান আর তার বাসিন্দাদের জানার এ এক অসামান্য সুযোগ। কিন্তু আমাকে সব থেকে বেশি উদ্বেলিত করে তুলেছিল আরেকটি সম্ভাবনা – জাপান মানে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে মিশে যাবার সুযোগ। যে অতীন্দ্রিয় জগতের পথিক হতে চেয়েছি, আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে যে রহস্যময় জগতের সন্ধান পেতে চেয়েছি তা বাস্তবায়িত করবার এর থেকে বড় সুযোগ আর হয় না। শুধু তাই নয়, শুনেছিলাম জাপানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সাধনপদ্ধতি জেন-এর ধারা এখনও দিব্যি বহমান। আছেন সেই সব মহাগুরু’রা যাঁরা পথ দেখান, আধ্যাত্মিক সংকটের দিনে দিক নির্দেশ করেন।
নতুন কর্মজীবন শুরু করার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার আধ্যাত্মিক চাহিদার প্রকৃত রূপ। এক সময়ে এ পথে ঘুরে ঘুরে পথ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের মতো ইউরোপিয়ানদের একটাই সমস্যা, আমরা জেন-এর প্রতি আকৃষ্ট হই, পুথির উপর চূড়ান্ত আস্থা জ্ঞাপন করি। শেষে কোনও আলোর দিশা না-পেয়ে হতোদ্যম হয়ে নিরাশ হয়ে পড়ি। এটা বোঝার আগে আমারও বহুদিন ব্যর্থ কেটে গেছে। কিন্তু একটা সময়ে বুঝতে পেরেছিলাম, কেন জেন-এর পুথিগত বিদ্যার বদলে হাতেকলমে সেটা জানা বেশি জরুরি।
সে সময়েই আমি জানতে পারি, কোনও ইউরোপিয়ানের পক্ষে জেন-এর আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করা সম্ভবপর নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি জেন-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনও একটি শিল্পের চর্চা করছেন।
জেন-এর মহাবিশ্বে প্রবেশ করবার জন্য একটি শিল্পমাধ্যমের চর্চা শুরু করা প্রাথমিক ধাপ। কাজটা খুব সহজ ছিল না, কিন্তু আমার বেশ রোমাঞ্চ লাগছিল।
আসলে জেন-এর কাছে পৌঁছে যাবার জন্য আমি যে কোনও কষ্ট সইতে প্রস্তুত ছিলাম, কোনও পথ খুঁজে না-পাওয়ার থেকে কষ্টকর একটা পথ খুঁজে পাওয়া অনেক ভাল।
যে কোনও একটি শিল্পমাধ্যম বেছে নেবার প্রশ্নে চিন্তায় পড়ে গেছিলাম; আসলে ভেবে উঠতে পারছিলাম না কোন শিল্পমাধ্যমটি বেছে নেওয়া আমার পক্ষে ভাল হবে। আমার স্ত্রী ততদিনে বেশ ভেবেচিন্তে ইকেবানা আর জাপানি-অঙ্কন বেছে নিয়েছে। আমি বেছে নিলাম তিরন্দাজি; রাইফেল-পিস্তল চালানোয় আমার সামান্য দক্ষতা ছিল। ভেবেছিলাম এ অভিজ্ঞতা তিরন্দাজিতেও সাহায্য করবে। সে ভাবনা যে কত বড় ভুল ছিল বুঝতে বেশি সময় লাগেনি।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী ছিলেন সোযো কোমাচিয়া, তিনি আইনের প্রফেসর। শুধু তাই নয়, তিনি কুড়ি বছর ধরে তিরন্দাজি শিখছেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ তিরন্দাজদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আমি তাঁকেই অনুরোধ করেছিলাম তাঁর এক সময়ের গুরু বিখ্যাত কেনজো আওয়ার কাছে আমার নামটা ছাত্র হিসাবে লিখিয়ে দিতে।
তিরন্দাজির সেই মহাগুরু প্রথমে আমার অনুরোধ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকেও দোষ দেওয়া যায় না, একবার এক বিদেশি ছাত্রকে শেখাতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েন। চরম শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিরন্দাজি তাঁর কাছে শুধু একটা খেলা নয়, এক শিল্প। এ শিল্পের রস কোনও অযোগ্য ছাত্রকে শেখাতে গেলে ফল হিতে বিপরীত হয়; একই ভুল তিনি আর দুবার করতে চান না।
আমি জানতাম জাপানে মেয়েরাও তিরন্দাজি শেখে, এ প্রথা বেশ প্রাচীণ। গুরু’র স্ত্রী ও দুই কন্যা’ও বেশ নামকরা তিরন্দাজ। আমার স্ত্রী’ও যে আমার সঙ্গে তিরন্দাজি শিক্ষা করতে চায় সেটা জানিয়েছিলাম তাঁকে। তিরন্দাজি যে আমার কাছে শখের কোনও খেলা নয় এবং আমার তিরন্দাজি শেখার একমাত্র কারণ যে জেন-মহাবিশ্বের সন্ধান পাওয়া সেটা জানার পর গুরুজি একটু নরম হয়েছিলেন।
আমার সহকর্মী মিঃ কোমাচিয়া দোভাষীর ভূমিকা পালন করছিলেন, তিনিই আমাদের হয়ে ওকালতি করতে শুরু করেছিলেন গুরুজির কাছে।
শুরু হয়েছিল ছয়-বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমসাধ্য এক শিল্প-শিক্ষা। এ সময়ে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল; স্ত্রী’র ইকেবানা ও আঁকার ক্লাসে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল।
তিরন্দাজি আর এই দুই-শিল্প যেন একে অপরকে পুষ্ট করতে করতে অগ্রসর হয়। দুটি শিল্পকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার পক্ষে আশির্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছিল।
(ক্রমশ)

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)