জয় শ্রী রাম এবং একটি হিন্দুরাষ্ট্রের সায়েন্স ফিকশন  <br /> হিন্দোল ভট্টাচার্য

জয় শ্রী রাম এবং একটি হিন্দুরাষ্ট্রের সায়েন্স ফিকশন
হিন্দোল ভট্টাচার্য

'জয় শ্রী রাম'! এই স্লোগানটি শূধুমাত্র স্লোগান নয়। এই স্লোগানটি হল দেশের এক মন্ত্র। দেশ মানে কী? দেশ মানে হল, দেশের শাসকরা দেশের যে সংজ্ঞা তৈরি করছে, সেটিই। খুব বেশিদিন পরের কথা নয়। হয়তো আর কয়েক মাসের। তার কারণ, 'রাম' এখন মিথ থেকে বেরিয়ে, মানুষের ধর্মবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে হয়ে উঠেছে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রদেবতা, রাষ্ট্রধর্ম এবং রাষ্ট্রের স্লোগান। 'জয় হিন্দ' বা 'বন্দেমাতরম' ভুলে যান। কারণ এই স্লোগানদুটির কোথাও ধর্ম নেই। বরং দেশকে 'মা' সম্বোধন করা আছে একটিতে। কিন্তু বর্তমানে যে স্লোগান প্রচলিত ও প্রসারিত, সেই স্লোগানে, দেশ আর মা নেই, দেশ হয়ে উঠেছে এক ধর্মের প্রতিভূ। নির্দিষ্ট ভাবে বললে, 'জয় শ্রী রাম' হিন্দুরাষ্ট্রের স্লোগান।

খুব বেশিদিন পরের কথা নয়। এই ধরুন কয়েক মাস বা নিদেনপক্ষে একবছর। আমার আপনার মধ্যে ধরুন দেখা হল। আমরা কী বলব? ‘জয় শ্রী রাম’। বা ধরুন সরকারি অফিসে গেছেন। সকলে ঠিক সকাল দশটায় উপস্থিত হয়ে একে অপরের দিকে ‘জয় শ্রী রাম’ বলে দিন শুরু করেন। বা, ধরুন, রাস্তার পুলিশ, স্কুলের শিক্ষক, কলেজের ছাত্র ও অধ্যাপক, জমাদার ও ব্যবসায়ী, মুচি এবং পুরোহিত, কবি, লেখক, গায়ক, চিত্রশিল্পী, সকলেই ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ভরিয়ে দেন। তার পর দিন শুরু হয়। যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার অধস্তন, অধস্তনের অধস্তন, আঞ্চলিক পুরসভার মেয়র –যে কেউ দেখা হলেই দাঁড়িয়ে পড়ে গলার শির ফুলিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ বলেন। বা, ধরুন কোনও অনুষ্ঠান শুরু হবে, সেখানে আগে জয় শ্রী রাম বাধ্যতামূলক। গোটা হলের সমস্ত দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে ‘জয় শ্রী রাম’ না বললে অনুষ্ঠান শুরুই হবে না। ইত্যাদি প্রভৃতি।

আর যাঁরা ‘জয় শ্রী রাম’ বলবেন না? তাঁদের যা খুশি হতে পারে। রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে তাঁদের ধরে নিয়ে যেতে পারে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র তাঁদের দাগিয়ে দিতে পারে দেশের শত্রু হিসেবে। দেশের ও দশের শত্রু হিসেবে এবং রাম-এর শত্রু হিসেবে যাঁরা চিহ্নিত হবেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদি তিনি কোনও দায়িত্বে থাকেন, তবে দায়িত্ব থেকে নির্মম ভাবে গলা ধাক্কা দেওয়া হয়। কবি বা সাহিত্যিক বা শিল্পী হলে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় জেলে। রাজনৈতিক কর্মী হলে গুম করে দেওয়া হয় বা অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলের গোপন কুঠুরিতে তাঁদের স্থান হয়। অথবা, এমন কোনও ডিটেনশন ক্যাম্পে তাঁদের নির্বাসন দেওয়া হয়, যেখানে কখন তাঁদের মেরে ফেলা হবে তা কেউই জানবে না। দেশ এবং ধর্মের শত্রু, রাম এবং রামরাজত্বের শত্রু হলে, তাঁর এ দেশে থাকার কোনও অধিকার নেই, এ বিশ্বে বেঁচে থাকারও কোনও অধিকার নেই।

‘জয় শ্রী রাম’! এই স্লোগানটি শূধুমাত্র স্লোগান নয়। এই স্লোগানটি হল দেশের এক মন্ত্র। দেশ মানে কী? দেশ মানে হল, দেশের শাসকরা দেশের যে সংজ্ঞা তৈরি করছে, সেটিই। খুব বেশিদিন পরের কথা নয়। হয়তো আর কয়েক মাসের। তার কারণ, ‘রাম’ এখন মিথ থেকে বেরিয়ে, মানুষের ধর্মবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে হয়ে উঠেছে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রদেবতা, রাষ্ট্রধর্ম এবং রাষ্ট্রের স্লোগান। ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দেমাতরম’ ভুলে যান। কারণ এই স্লোগানদুটির কোথাও ধর্ম নেই। বরং দেশকে ‘মা’ সম্বোধন করা আছে একটিতে। কিন্তু বর্তমানে যে স্লোগান প্রচলিত ও প্রসারিত, সেই স্লোগানে, দেশ আর মা নেই, দেশ হয়ে উঠেছে এক ধর্মের প্রতিভূ।

ধর্ম কেন বলছি? আমরা তো ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আমাদের সংবিধানে তো কোনও বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ছিল না। তাই তো দেশের স্লোগান, দেশের জাতীয় সঙ্গীত, দেশের মন্ত্র, দেশের রং, সর্বত্র রয়েছে এক ধর্মনিরপেক্ষতার ইমেজ। কিন্তু তুমি তো অতীতের কথা বলছ। অতীতে একটা সময় ভারতের তথাকথিত ভাষা-ধর্ম-বৈচিত্রের কথা বলে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু আজ তো তা নয়। আজ যখন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পদের এক নেতা বলেন, যে আমাদের দেশের এক সুর, এক ভাষা, এক রং, এক পোশাক, তখন তিনি এই জোর করে প্রতিষ্ঠার ‘একতা’র তত্ত্ব দিয়ে বহুস্তরীয় এবং বহুস্বরের ভারতবর্ষকেই কারারুদ্ধ করে দিয়ে চান। এখনও পর্যন্ত আমরা ভাগ্যবান যে একজন তামিল, একজন তেলেগু, একজন মারাঠি, একজন গুজরাতি, একজন বাঙালি, একজন গারো, একজন কাশ্মীরি, একজন রাজবংশী এবং এমন কতই জাতি, ধর্ম ও ভাষাভাষী মানুষ তাঁদের জাতিসত্তা বজায় রেখেছেন। আমরা ভাগ্যবান, এই বৈচিত্র্য এবং বহুস্বর ভারতবর্ষের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতবর্ষের শাসকরা যা চাইছেন তা তো এই সব মানুষদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ‘একতা’ নয়। বরং স্বাতন্ত্র্য খর্ব করে ‘একনায়কতন্ত্র’ তৈরি করা। একনায়কতন্ত্রে যে একতা, তা তো দেশের জন্য নয়, তা একটি ব্যক্তির জন্য বা বলা ভাল একটি ‘আইডিয়া’-র জন্য বা একটি বিশেষ ধর্মকে কেন্দ্র করে শাসকের ধর্মকে প্রতিষ্ঠার জন্য।

তাহলে, সকলেই জানেন এবং বোঝেন, ব্যাপারটি যাচ্ছে অবধারিত ভাবে হিন্দুরাষ্ট্রের দিকে। গতকাল নেতাজীকে হ্যাপি বার্থডে বলতে এসে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে যা হল, তা একপ্রকার প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত। আর সেই ইঙ্গিতটি শাসকের এক দুর্বিনীত আচরণের। দেশ-টেশ নয়। সৌজন্য-টৌজন্য নয়। নিয়ম-টিয়ম নয়। সংবিধান চুলোয় যাক। আমরা হিন্দুরাষ্ট্রের পূজারী। আমাদের মন্ত্র ‘জয় শ্রী রাম’। আমি প্রধানমন্ত্রী হলেও, আমি কোনও ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রধানমন্ত্রী নই। আমি যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার নাম ভারতবর্ষ এবং সেই দেশকে আমি এবং আমরা পরিবর্তিত করে ফেলেছি একটি হিন্দুরাষ্ট্রে। তোমাকে যদি এ দেশের নাগরিক হয়ে থাকতে হয়, তবে, আগামী দিনে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতেই হবে। কারণ ‘জয় শ্রী রাম’ আমাদের পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের মন্ত্র, স্লোগান, ইহকাল ও পরকালের দরজা।

আমরা তো এতদিন ‘জয় শ্রী রাম’ নিয়ে প্রচুর মজা করেছি। কিন্তু এইবার ভয় করছে। আগামীকাল দেশের যে কোনও ধর্মের, যে কোনও ভাষার, যে কোনও সংস্কৃতির মানুষকে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতেই হবে, যদি তিনি এভাবে রামের জয়ধ্বনি না দেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি দেশের জন্য জয়ধ্বনি দিচ্ছেন না। অতএব, তিনি রাষ্ট্রবিরোধী। রাষ্ট্রবিরোধী হলে, শাস্তি তাঁর প্রাপ্য। আইন দেশের হাতে। শাসকের হাতে। এমনটিও হতে পারে, ‘জয় শ্রী রাম’ না বললে, বিনা জামিনে এবং বিনা বিচারে সেই ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করে রাখা যেতে পারে। টাডা, মিসা এবং এই জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনগুলির সঙ্গে যা তুলনীয়।

লাল বিপদঘন্টি শূনতে পাচ্ছেন? বিপদসীমায় জল যে বহু আগে উঠে এসেছে, তাও কি অনুভব করতে পারছেন? পারছেন না সম্ভবত। সম্ভবত, এর মধ্যেও ভারতের বা বাংলার জনগণ কোনও বিপদ দেখতে পাচ্ছেন না বলেই শিক্ষিত লোকজনের মধ্যেও শূনতে পাচ্ছি ‘বিজেপি আসুক বাংলায়’ জাতীয় কথা। ডেকে আনতেই পারেন আপনারা মৃত্যুদূত। হয়তো বাঁচার ইচ্ছে আপনাদের চলে গেছে। বা, হয়তো, আপনাদের মধ্যে আর আত্মসম্মান বলে কোনও বস্তু নেই। বা, আপনাদের মধ্যে হয়তো জমে উঠেছে প্রবল ঘৃণা এবং রাগ। জমে উঠেছে না-পাওয়া জনিত ক্ষোভ। এতদিন ধরে ভারতীয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী পেয়েছেন আপনারা? এই তো ভাবছেন? বা, ভাবছেন ‘জয় শ্রী রাম’ বললে কী এমন ক্ষতি হয়ে যাবে? প্রবল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ হয়তো আপনাদের মনে। বা, হয়তো কিছুই নেই। ভয় পাচ্ছেন। এরা যদি শাসনে আসে, আর আমরা যদি কুনজরে থাকি, তাহলে তো কিছুই পাব না। আমাদের তো ভিটেমাটি থেকে সরিয়ে দেবে। জ্যান্ত পুঁতে দেবে। আমেদাবাদের মতো, পুলিশ দিয়ে ঘিরে লোক ঢুকিয়ে দেবে ঘরে। তরোয়ালের শীর্ষে ওরা গেঁথে নেবে আমার সন্তানের ভ্রুণ।

কী করব আমরা? খুব বেশিদিন পরের কথা নয়। কয়েক মাস বা নিদেনপক্ষে বছর। ভুলে যাবেন না, গেস্টাপো বাহিনীর মতো সাংস্কৃতিক এবং অন্যান্য সমস্ত বাহিনী এখানে গড়ে উঠেছে আপনাকে নজরে রাখার জন্য। ‘হাইল হিটলার’ নয়, এখানে বলতে হবে ‘জয় শ্রী রাম’। এখনও কি বুঝতে পারছেন না, গতকাল সরকারি ভাবে ‘জয় শ্রী রাম’ হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের স্লোগান।

নির্দিষ্ট ভাবে বললে, হিন্দুরাষ্ট্রের স্লোগান।

পুনশ্চ— বাংলার ও ভারতের সেই সব কবি-শিল্পী- সাহিত্যিক- অভিনেতা- গায়ক- বিজ্ঞানী- অধ্যাপক-শিক্ষক এবং সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি বেদনা জানাই। তাঁরা মৃত্যুর আগে নিজেদের সত্তার মৃত্যু ডেকে এনেছেন আগেই। কিন্তু অনুরোধ, আত্মহননকারী হলেও, হননকারী হবেন না। আর একবার ভেবে দেখুন। ইতিহাস হননকারীদের ক্ষমা করেনি কখনও। রূপকথা বা সায়েন্স ফিকশনেও নয়।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (5)
  • comment-avatar
    Snehasis 5 months

    অসাধারণ….. এই ভয় অমূলক নয়….

  • comment-avatar
    Gouranga sribal 5 months

    পড়লাম।

  • comment-avatar
    গৌতম চৌধুরী 5 months

    “The Hindu Mahasabha has deployed sannyasis and sannyasins with tridents in their hands to beg for votes. Hindus bow in reverence at the very sight of tridents and the saffron robes. The Hindu Mahasabha has entered the political arena by taking advantage of religion and has desecrated it. It is the duty of every Hindu to condemn it. Banish these traitors from national life. Don’t listen to them.” – Subhas Chandra Bose, May 12, 1940

  • comment-avatar
    অর্ঘ্য চক্রবর্তী 5 months

    অনেকদিন ধরেই যে ডিসটোপিয়ান ভয় পেয়ে আসছি তা আপনি আবার দাগিয়ে দিলেন |

  • comment-avatar
    দেবলীনা 5 months

    পড়লাম সত্যি ভায়াভয় !!