ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন <br />  পর্ব -১ <br /> সন্দীপন চক্রবর্তী

ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন
পর্ব -১
সন্দীপন চক্রবর্তী

" আমি তখন নিতান্তই কচি। সবে চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়ে যাদবপুরে উড়ে বেড়াচ্ছি। এমন সময়ে বেরোলো ধ্রুবপদ। একইসঙ্গে দেখতে আর বিষয়গতভাবে এত চমৎকার, এত অভিজাত, যে প্রথমেই তার প্রেমে পড়ে গেলাম। কিন্তু ছাত্রবয়স। হাতে তত রেস্ত নেই। ফলে একটু কাঁচুমাচু মুখেই একদিন সুধীরদাকে জানালাম যে, একটু বেশি ছাড় দেওয়া যায় না কি? সঙ্গে-সঙ্গেই মঞ্জুর হলো দাবী। উল্টে আশাতীতভাবে তিনি জানালেন যে, সব ছাত্রদের জন্যই এবার থেকে এই বেশি ডিসকাউন্ট থাকবে। আর পায় কে!" সন্দীপন চক্রবর্তীর কলমে শুরু হল নতুন জার্নাল " ছিম্ন-বিচ্ছিন্ন'।

সুধীরদার কথা বলতেই আমার প্রথম মনে পড়ে ধ্রুবপদের কথা। আর মনটা হু হু করে ওঠে। সেটা কি ১৯৯৯? ধ্রুবপদ বোধহয় তার বছরখানেক আগে থেকেই প্রকাশ শুরু হয়েছে। তারও আগে, এক রবিবারের আড্ডায়, অল্প খানিক আলাপ হয়েছিল সুধীরদার সঙ্গে।

আমি তখন নিতান্তই কচি। সবে চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়ে যাদবপুরে উড়ে বেড়াচ্ছি। এমন সময়ে বেরোলো ধ্রুবপদ। একইসঙ্গে দেখতে আর বিষয়গতভাবে এত চমৎকার, এত অভিজাত, যে প্রথমেই তার প্রেমে পড়ে গেলাম। কিন্তু ছাত্রবয়স। হাতে তত রেস্ত নেই। ফলে একটু কাঁচুমাচু মুখেই একদিন সুধীরদাকে জানালাম যে, একটু বেশি ছাড় দেওয়া যায় না কি? সঙ্গে-সঙ্গেই মঞ্জুর হলো দাবী। উল্টে আশাতীতভাবে তিনি জানালেন যে, সব ছাত্রদের জন্যই এবার থেকে এই বেশি ডিসকাউন্ট থাকবে। আর পায় কে! ওইসময়ে খুঁজে খুঁজে আর ভয়ংকররকম দরদস্তুর করে সুবর্ণরেখা থেকে জোগাড় করতাম পুরোনো এক্ষণের নানা সংখ্যা। সেখানেই প্রথম দেখেছিলাম ‘পরিভাষা পরিচয়’ নামের একটি বিভাগ। বেশ অভিনব এবং আমার কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লেগেছিল ব্যাপারটা। কারণ এমন অনেক খটোমটো টার্ম শুনি যাদবপুরে, যার সম্পর্কে একটা খুব আবছা ধারণা হয়তো আছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে জানি না সেটা। অথচ সেসব বলে অনেকেই বেশ বাহাদুরি নেয়। বাচ্চাদের নতুন নতুন দাঁত উঠলে যেমন সুড়সুড় করে, আমাদেরও তাই করতো আর কী! তবে খানিকটা জানার ইচ্ছেও ছিল। ইংরেজিতে যেমন রেমণ্ড উইলিয়ামস্ -এর Keywords আছে, বাংলায় সেরকম কিছু আমাদের হাতের কাছে ছিল না। এরমধ্যেই ধ্রুবপদ থেকে বেরোল একটা সংখ্যা — ‘বুদ্ধিজীবীর নোটবুক’। এই সংখ্যাটা নিয়ে তাই স্বাভাবিকভাবেই খুব উচ্ছ্বসিত আমি। সুধীরদাকে জানিয়েওছিলাম সেটা। আর ওঁরও হয়তো ভালো লেগেছিল আমার মুগ্ধতাময় সেই পাগলামি।

এরপর কেটে গেছে আরও বছর তিনেক। যাদবপুর থেকে পাশ করে বেরিয়ে, তখনও পাকা চাকরি পাইনি কিছু। আর এর মধ্যে নানা সময়েই মাঝেমাঝে সুধীরদাকে উস্কেছি যে — ওই বুদ্ধিজীবীর নোটবুক সংখ্যাটায় না এই প্রসঙ্গটা থাকলে বা ওই যে ওই প্রসঙ্গটাও থাকলে আরও ভালো হতো কিন্তু। এরকমই একদিন কী একটা বলতে গেছি। আমায় বললেন যে, ওই সংখ্যাটা আরও বাড়িয়ে একটা বই করার কথা ভাবছি। শুনে তো আমি তো মহাখুশি। বাঃ, দারুণ ব্যাপার। তাহলে আমার খুবই কাজে লাগবে বইটা। কিন্তু এরপরেই সুধীরদা আচমকা মারলেন একটা ল্যাং — একটা উদ্ভট প্রস্তাব দিয়ে বসলেন আমায়। বললেন — তুমি তো ফিল্ম নিয়েই পড়েছ, ফলে তোমাকেও একটা এন্ট্রি লিখতে হবে। আর্ট ফিল্ম ও কমার্শিয়াল ফিল্ম নিয়ে। শুনে তো আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়! ওখানে কারা সব লিখছেন…কত নামকরা আর পণ্ডিত সব মানুষজন…তার মধ্যে আমি? হংসমধ্যে বক? অসম্ভব!! বললাম যে তাতে আপনারই বদনাম হবে। তার চেয়ে বরং আমার বিভাগেরই কোনো মাস্টারমশাইকে বলুন। অনেক ভালো হবে। কিন্তু বলতে গিয়ে স্ট্রেট এক ধমক খেলাম — তোমাকে তোমার যোগ্যতা বিচার করতে তো বলিনি। আর কাকে দিয়ে কী লেখাবো বা বইতে কী মানাবে বা মানাবে-না, সে বিষয়েও তোমার মতামত চাইনি। তোমাকে ওই বিষয়টা নিয়ে লিখে দিতে বলেছি, সেটা লিখে জমা দেবে এত তারিখের মধ্যে আর এত শব্দের মধ্যে। ব্যাস। ফলে লিখে ফেলা ছাড়া আমার সামনে আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা ছিল না। লেখাটা দেওয়ার পর, দেখা হলেই দূর থেকে পালাই। একদিন ডেকে বললেন — লেখাটা ভালো হয়েছে। তারপর বোধহয় ২০০৫-এ ওই বুদ্ধিজীবীর নোটবুক আরও অনেকটা বড় চেহারায় বই হয়ে বেরোল। সেই প্রথম কোনো গদ্য-বইয়ের কমপ্লিমেন্টারি কপি পাওয়া আমার জীবনে। আজ ভাবলে আরও অবাক লাগে যে, কী করে একজন নামগোত্রহীন বখাটে সদ্য তরুণকে জোর করেই টেনে এনেছিলেন ওইরকম সব মহারথীদের মাঝে! কীভাবে পেরেছিলেন ভরসা করতে? আমরা কি কোনোদিন পারবো এরকম?

একসময়ে কালের নিয়মেই বন্ধ হয়ে গেল ধ্রুবপদ। খুবই আক্ষেপ হয়েছিল। সুধীরদাকে বারবার বলেওছিলাম বন্ধ না-করার জন্য। বলতেন — এভাবে বারবার কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় এসে দৌড়াদৌড়ি করে পত্রিকা করা আর সম্ভব হচ্ছে না। পরে একবার গল্পপ্রসঙ্গে সমীরদা (সমীর সেনগুপ্ত) বলেছিলেন — ধ্রুবপদের শেষদিকে সুধীরবাবু আমায় একবার বলেছিলেন যে, আপনি যদি পুরো দায়িত্ব নিয়ে এটা করতে পারেন, তাহলে ধ্রুবপদটা আমি আপনার হাতে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিতে পারি। সেক্ষেত্রে আপনাকেই সম্পাদনা করতে হবে ধ্রুবপদ। তো, আমি বললাম, খুবই ভালো প্রস্তাব, কিন্তু ধ্রুবপদ করতে হলে আমি আমার নিজের কাজগুলো করবো কখন? ফলে রাজি হননি সমীর সেনগুপ্ত। তবে এই ঘটনার সত্যাসত্য আমি কোনদিনও সুধীরদার কাছে জিজ্ঞাসা করে যাচাই করিনি। কিন্তু সুধীরদা ধ্রুবপদ থামিয়ে দেওয়ায় আমার সেই আক্ষেপটা কিন্তু আজও রয়ে গেছে। মাঝেমাঝেই খোঁচা দেয়।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)