চিন্তার চিহ্নমালা  <br /> নবম পর্ব <br /> সন্মাত্রানন্দ

চিন্তার চিহ্নমালা
নবম পর্ব
সন্মাত্রানন্দ

কোনোরকম ধর্মবোধ বা অধর্মবোধ সঞ্চারিত করার জন্য এ লেখা নয়। নয় কোনো অলৌকিকতা ছড়ানোর দুর্বল প্রয়াস। আমি বুঝতে চাইছি, এসব ঘটনার অর্থ, এগুলোর তাৎপর্য। কেন এমন হয়, কেন কোনো পরিবেশে নিজের দিক থেকে অণুমাত্র প্রয়াস ছাড়াই জেগে ওঠে বিশ্বাসের বোধ কিংবা আত্মসংশয়ের প্রবণতা? আমাদের পূর্বজ চিন্তকরা এ বিষয়ে কিছু কি ভাবনা করেছেন? সেসব কি কাজে লাগবে আর এখন?. চিন্তার চিহ্নমালা। নবম পর্ব লিখলেন সন্মাত্রানন্দ

প্রথম পাঠ

উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো এক ব্যস্ত শহরের প্রেক্ষাগৃহ। সারা সন্ধে আনন্দ-প্রোজ্জ্বল কোনো অনুষ্ঠানে আমরা মেতে ছিলাম। হলটা লোকের ভিড়ে কানায় কানায় ভরে ছিল। সম্ভবত মঞ্চসফল কোনো নাটক চলছিল সেদিন। রাত সাড়ে আটটার দিকে একবার দর্শকাসন থেকে উঠে এগজিট ডোর দিয়ে বেরিয়ে এলাম। করিডোর দিয়ে দুয়েক পা হাঁটতেই উদ্যোক্তাদের একজনের সঙ্গে দ্যাখা। ভদ্রলোক আমার মুখ-চেনা। জিগগেস করলাম, টয়লেটটা এপাশে কোনদিকে বলতে পারেন? তিনি বললেন, আসুন আমার সঙ্গে। মঞ্চের পেছনে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, ভেতর দিয়ে চলে যান। ঘরের এক প্রান্তে একটা অ্যাটাচড টয়লেট পাবেন। আমি ভেতরে গেলাম।

টয়লেট ব্যবহার করে বেরিয়ে এসে দেখলাম, সেটা একটা খুব বড়ো আর ফাঁকা ঘর। অনেকগুলো এলোমেলো চেয়ার, টুল, দেওয়াল-জোড়া বড়ো বড়ো আয়না দেখে মনে হল, এটা আসলে সাজঘর। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ইতস্তত সাজের সামগ্রী, নাট্যোপযোগী উপাদান। ঘরে কেউ নেই দেখে খানিক বিশ্রাম করার জন্য বসলাম একটা চেয়ারে। মিনিট দশেক এমনিই বসে আছি। কিন্তু কী যে হল বসে থেকে থেকে; ওই দশ মিনিটের ভেতর শরীর ভীষণ খারাপ লাগতে লাগল। কেন জানি মনটাও কেমন ভার-ভার, বিমর্ষ। অথচ মাত্র দশ মিনিট আগে অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিলাম; হাসছিলাম, কথা বলছিলাম, আনন্দ করছিলাম। কী এমন হল যে, এত বিমর্ষতা পেয়ে বসল আমাকে? একটা সুগভীর বেদনার অনুভব, ব্যর্থতার বোধ, কেমন যেন হেরে-যাওয়া, হারিয়ে-যাওয়ার ভাব। আর মনের মধ্যে সারা জীবনের সুচিরসঞ্চিত দুঃখের স্মৃতি, অপমানিত হওয়ার স্মৃতি, পরাজয়ের গ্লানি! কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। যখন দেখলাম, আমি একরকম ঘুমিয়ে পড়ছি টেবিলে মাথা রেখে—এমনই নির্জিত অবস্থা; তখন নিজেকে এক ঝাঁকুনি মেরে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখি, অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে এসে ভাবছিলাম, কী হয়েছিল আমার সেই ঘরে সন্ধ্যাবেলা?

অনেক ভেবেও কোনো ব্যাখ্যা না পেয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছে ওই হল, ওই ঘর সম্পর্কে খোঁজখবর করে যা জানলাম, তা বিস্ময়কর। ওখানে ওই ঘরে বিভিন্ন সময়ে অন্ততঃ তিনবার কারও-না-কারও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। যা জানা গেছে, সেগুলো সব প্রণয়জনিত ব্যর্থতার ফল। মঞ্চে যখন অনুষ্ঠান চলছে, সবাই মেতে আছে সেইদিকে, তখন এই নির্জন ঘরে সিলিং ফ্যান থেকে ফাঁস লাগিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে একাকী কোনো কোনো মানুষ নিজের হাতে জীবনের ওপর যবনিকা টেনে দিয়েছেন।

অথচ, আমি তো এই বৃত্তান্ত ঘুণাক্ষরেও জানতাম না। এসব না জেনেও সেদিন সেই সন্ধ্যায় আমার মনে স্মৃতিকাতরতা, অবসাদ, ব্যর্থতা প্রভৃতির রাশি রাশি অনুভূতি স্বতঃই এসে উপস্থিত হয়েছিল। ওরকম অনুভূতি মনে ওঠার কোনো কারণই ছিল না, মিনিট দশেক আগে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, আনন্দময় ছিলাম—যেকথা আগেই বলেছি। তাহলে কী হল?

এর বিপরীত ঘটনাও দুর্লভ নয়। আমার এক বন্ধু, স্বভাবে সংশয়ী; নাস্তিক বললেও ভুল হয় না। ‘জানিবার অবিরাম অবিরাম ভার’ তাঁকে বিমর্ষ করে রাখে প্রায়ই নানা স্পষ্ট সুসংজ্ঞায়িত কারণে। এমন একজন মানুষ নিতান্ত বেড়ানোর উদ্দেশ্যেই ওঙ্কারেশ্বর গিয়েছিলেন। কোনো ধর্মভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নয়, কারণ ওরকম ভাবালুতা তাঁর মনের ধর্মই নয়। সেখানে নর্মদাতীরে এক গুহামন্দিরে তিনি ঢুকেছিলেন মন্দিরের স্থাপত্য, ভাস্কর্য এসব দেখতে। কিন্তু সেখানে কী যে তাঁর হল! বসে থাকতে থাকতে মনে হল, তিনি পূজা দেবেন। এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাঁর অণুমাত্র আস্থা নেই, সেই তিনিই কখন যেন আর সবার মতই একেবারে নিখুঁত নিয়ম মেনে পূজা দিতে লাগলেন, মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলেন, প্রণাম নিবেদন করলেন। অথচ কাকে প্রণাম করছেন, তিনি জানেন না। পরে তিনি নিজের আচরণেই অবাক হয়ে কথাগুলো আমাকে বলেছিলেন। আমি তাঁর বলা থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, এ তাঁর জীবনের অবিশ্বাস্য সত্যি ঘটনা। ঘটেছে, অথচ বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি নিজেই।

কোনোরকম ধর্মবোধ বা অধর্মবোধ সঞ্চারিত করার জন্য এ লেখা নয়। নয় কোনো অলৌকিকতা ছড়ানোর দুর্বল প্রয়াস। আমি বুঝতে চাইছি, এসব ঘটনার অর্থ, এগুলোর তাৎপর্য। কেন এমন হয়, কেন কোনো পরিবেশে নিজের দিক থেকে অণুমাত্র প্রয়াস ছাড়াই জেগে ওঠে বিশ্বাসের বোধ কিংবা আত্মসংশয়ের প্রবণতা? আমাদের পূর্বজ চিন্তকরা এ বিষয়ে কিছু কি ভাবনা করেছেন? সেসব কি কাজে লাগবে আর এখন?

দেখা যায়, সাংখ্য দার্শনিকরা এক সমষ্টি-মনের কথা প্রথম বলেন। তাকে তাঁরা অভিহিত করেছেন ‘মহৎ’ এই অভিধায়। এই ‘মহৎ’ সাংখ্য দার্শনিকদের মতে প্রকৃতির প্রথম এভোলিউট বা পরিণাম। এই সমষ্টি মন থেকেই বৈশ্বিক অহং বা কসমিক ইগোর আবির্ভাব, তার থেকেই পঞ্চ সূক্ষ্ম কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ সূক্ষ্ম জ্ঞানেন্দ্রিয়, ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম ইত্যাদি পঞ্চ সূক্ষ্ম পদার্থ ও ব্যক্তি-মনের জন্ম। সূক্ষ্ম পদার্থগুলি আবার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্থূল পঞ্চভূত বা পদার্থে পরিণত হয়। সে যাই হোক, এখানে দেখার বিষয়, প্রতিটি ব্যক্তি-মনের পেছনে এই সমষ্টি-মনের অস্তিত্ব তাঁরা স্বীকার করেছেন। এ সবই জড়, চেতন একমাত্র আত্মা বা মানুষের প্রকৃত স্বরূপ। আর সবই জড়, ভারতীয় দর্শনের প্রতিটি শাখাই মনকে জড় বা ম্যাটার বলেছেন। মনের পেছনে শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ আত্মা থাকায় মন সেই চেতনার আলোকে ভাস্বর হয়ে থাকে এবং মনকে কনশাস কিছু একটা বলে মনে হয়।

বেদান্তদর্শনেও সমষ্টি-মনের কথা আছে। তাকে বেদান্তীরা ‘হিরণ্যগর্ভ’ বলেছেন। হিরণ্যগর্ভ মানে অবশ্য শুধু সমষ্টি মন নয়। সমষ্টি-সূক্ষ্মশরীরে উপহিত চৈতন্যকে হিরণ্যগর্ভ বলা হয়। আমাদের প্রত্যেকের একটি করে রক্ত-মাংসের স্থূল শরীর আছে। এর পেছনে আছে পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ প্রাণ বা ভাইটাল এনার্জি, মন আর বুদ্ধি। এগুলো সবই সূক্ষ্ম জড় পদার্থ। এই সূক্ষ্ম জড় পদার্থ নিয়ে গঠিত আমাদের প্রত্যেকের সূক্ষ্ম শরীর। এছাড়াও আমাদের প্রত্যেকের একটি কারণ শরীর আছে, যা অজ্ঞানস্বরূপ, যার সঙ্গে স্বপ্নহীন গভীর নিদ্রার মধ্যে দেখা হয়। সেকথা এখন থাক। কথা হল, আমাদের প্রত্যেকের একটি করে সূক্ষ্ম শরীর আছে। সকলের সেই সূক্ষ্ম শরীরকে একটা আঁটি করে বাঁধলে যে সমষ্টি সূক্ষ্ম-শরীর হয়, সেই সমষ্টি সূক্ষ্ম শরীর পশ্চাদবর্তী চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত হয়। আমাদের ব্যক্তি-মন অতএব সমষ্টি-মনের অংশ।

আমাদের সময়কালের সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং সমষ্টি-নির্জ্ঞান বা কালেকটিভ আনকনশাসের কথা বলেছেন। আমাদের সহসা-উদিত আবেগ, ভয়, শ্রদ্ধা কিংবা বিমর্ষতার পেছনে এই সমষ্টি-মনের ভূমিকা আছে বলে, জানিয়েছেন ইয়ুং। এতে ব্যক্তি মন বা তার অব্যবহিত পূর্ববর্তী অবস্থার ভূমিকা অল্পই। আমরা বুঝতে পারি না, এই তো বেশ হাসছিলাম, খেলছিলাম, হঠাৎ কী হল আমার যে এত বিষণ্ণতা বোধ করছি? কিংবা এই তো দিব্যি সাইট-সিয়িং-এ এসেছিলাম, কোথা থেকে এত শ্রদ্ধার বা উপাসনার ভাব জেগে উঠল আমার মনে?

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বিবর্তনের নিয়মে পৃথিবীতে মানুষ আসারও আগের ধাপে, মানুষের আদিতম পূর্বপুরুষেরা হিংস্র মাংসাশী পশু ও শিকারী-পাখিতে পরিপূর্ণ এক ভয়াল প্রতিবেশে বাস করত, যেখানে ছিল পদে পদে অনিবার্য মৃত্যুর আশঙ্কা। এর থেকে বাঁচবার তাগিদে এক বিচিত্র এসকেপ্-ইন্সটিংক্ট বা পলায়নী প্রবৃত্তির জন্ম হয় সেইসব আদিম পূর্বপুরুষের মনে। একটা মৌলিক খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ধারণা তৈরি হয়েছিল তাদের চেতনায়, যার ফলে বিপদ কোনদিক থেকে আসছে বুঝতে পেরে মানুষের সেইসব আদিম পূর্বপুরুষ পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় সময়টুকু অন্তত পেত। কিন্তু এই মৌলিক খাদ্য-খাদকের জ্ঞান একেবারে ভণ্ডুল হয়ে গেছিল সাপের ব্যাপারে। সাপের নিরীহ চলাচল, তুচ্ছ লাঠি বা দড়ির মতন নির্জীব পড়ে থাকা দেখে প্রাইমেটরা ভাবতেই পারেনি কী বিপজ্জনক হতে পারে সাপেদের উপস্থিতি। ফলত, অনেকেই শেষ হয়ে যায় সাপের কামড়ে।

তখন ধীরে ধীরে আমাদের সেইসব আদি পূর্বপুরুষের মস্তিষ্কে সাপের বিপজ্জনক উপস্থিতি সনাক্ত করার পদ্ধতি জেগে উঠতে লাগল। ভয় এল; মগজের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে এক বিশেষ স্নায়বিক সংবেদনার আবির্ভাব ঘটল। সেই সংবেদনাই পুরুষানুক্রমে সঞ্চারিত হয়েছে আমাদের মনে। কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আমাদের প্রাচীনতম পূর্বপুরুষের মনে সাপেদের প্রতি যে ঘৃণা, যে ভয় জন্মেছিল, আজও তা রয়ে গেছে আমাদের কালেকটিভ আনকনশাসে; সাপ দেখলেই সমষ্টি-নির্জ্ঞানের সেই আদিম বিবর থেকে সেই ভয়, সেই ঘৃণা আজও উঠে আসে এঁকেবেঁকে আমাদের চেতন-মনের উপরিতলে। সাপের তির্যক গতি, তার হিলহিলে চেহারা, যখন তখন পায়ে জড়িয়ে যাওয়ার ইচপিচে অনুভূতি এই কারণেই আমাদের কাছে এতটা ভয়োদ্দীপক—এছাড়া সাপকে ভয় পাওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ আর নেই।

কোনো স্থানে একদল লোক দিনের পর দিন সচেতন ও প্রবলভাবে একই ধরনের কাজ বা চিন্তা করে চললে, তাঁদের চিন্তা, কর্ম, অভ্যাস, প্রবণতা সমষ্টি-চেতনায় প্রবল অভিঘাত সঞ্চারিত করে। সেই অভিঘাত ছাপ রেখে যায় সেই স্থানের স্থূল জড় পদার্থের ওপরেও। বাইরের মাটি, দেওয়াল, আসবাবপত্র স্থূল জড় বা গ্রস ম্যাটার। আর মন সূক্ষ্ম জড় বা সাটল ম্যাটার। উভয়েই জড় বলে একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলত, সেই সব স্থানে দীর্ঘকাল ধরে আচরিত ঘটনার ছাপ থেকে যায়। পরে সংবেদনশীল মন ওই পরিবেশে এলে ওই সব ছাপ অসচেতনভাবে মনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। তখন আনন্দ-উচ্ছল মন হঠাতই বিমর্ষতার শিকার হতে পারে, কিংবা অনীশ্বর সংশয়ী মন সহসাই ভক্তিপূরিত চিত্তের মতো ব্যবহার করতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ মনে পড়ে? এ প্রসঙ্গে মনে পড়ার কথা কিন্তু। সুস্থ মানুষ সুস্তানদীতীরের সেই প্রাচীন প্রাসাদে ঢুকে অজ্ঞাতপরিচয় কোনও এক পাষাণ-প্রোথিত সুন্দরীর প্রেমে পাগল হয়ে যেত। অতিপ্রাকৃত দৃশ্য দর্শন করত, উন্মাদের মতো আচরণ করত। অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত কিছু বিশ্বাস না করেও সমষ্টি মনে সুচিরসঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকেই তার ব্যাখ্যা করা চলে। এই প্রাসাদে অত্যাচারী সম্রাট মরুপথপ্রান্তর হতে সুন্দরী মেয়েদের তুলে নিয়ে এসে বন্দী করে রাখত, তাদের ভোগ করত। সেই সব বন্দিনী মেয়েদের অসহায় কান্না যেন এই পাষাণকারার ভেতর সুবিপুল কাল ধরে সঞ্চিত থেকে আগন্তুক সুস্থ ব্যক্তিদের বর্তমান কালেও প্রণয়ব্যথাতুর, উন্মাদ, অসুস্থ করে তুলত। তখন এই প্রাসাদের অভ্যন্তরস্থ ব্যাপারই সত্য মনে হত, আর বাইরের গোটা দুনিয়া, গোটা জীবনের দিকে তাকিয়ে মনে হত, ‘সব ঝুট হ্যায়!’

কলকব্জা দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না এবং এসব মতের বিরুদ্ধ চিন্তারও অভাব নেই। বিরুদ্ধ চিন্তাগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তাদের হাতে যুক্তি আছে। হ্যাঁ, এসব সমষ্টি-নির্জ্ঞান, সমষ্টি-মন, বাহ্য বস্তুর ওপর সমষ্টি মনের ছাপ ফেলে যাওয়া—এসব সকলে মানেন না। কিন্তু সকলে মেনে নেওয়ার পর আমি কোনো মত স্বীকার করব—একথা যে বলে, সে হচ্ছে তেমন লোক যে কিনা গঙ্গার সব জল সমুদ্রে চলে যাওয়ার পর গঙ্গা পার হবে ঠিক করেছে। জগতে সর্ববাদিসম্মত মত বলে কিছু হয় না বা সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ওপর সত্য কী, তা নির্ভর করে থাকে না। জাগতিক সত্য আপেক্ষিক। আমাকে আমার জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে হবে, কোন ভাবনা আমাকে কতটা সাহায্য করতে পারে। কোন ভাবনার কাছে আমি কতটুকু কী পেতে পারি। নিজের ভাবনা অন্যের ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দেওয়াকে মৌলবাদ বলে। সে ভাবনা আস্তিকতাই হোক আর নাস্তিকতাই হোক।

দেখা যাচ্ছে, আমি যখন অনুভব করি যে, আমি এমন একটা পরিবেশের মধ্যে এসে পড়েছি যেখানে আমার মন না চাইতেই বিষণ্ণতার, বিমর্ষতার, নিরাশার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে, তখন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজেকে ঝাঁকিয়ে তুলে নিয়ে যেতে হবে। অসুস্থ, নৈরাশ্যময় পরিবেশ থেকে নিজেকে নির্মমভাবে সরিয়ে নিতে হবে। এবং সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেকে স্থাপন করতে হবে যথাসম্ভব শুভচেতনার মধ্যে, আনন্দের মধ্যে, সুস্থতার মধ্যে। সৌভাগ্য এই, প্রতিটি মানুষকে প্রকৃতি এই ইচ্ছাশক্তি পূর্বাহ্নেই দিয়ে রেখেছেন, যার সাহায্যে মানুষ নিজেকে এক পরিবেশ থেকে উপড়ে নিয়ে অন্য পরিবেশে স্থাপন করতে পারে। দিনের পর দিন এই প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতার অব্যবহার ও অপব্যবহারের দ্বারা আমরা আমাদের এই ক্ষমতাকে নির্জীব করে ফেলেছি। কিন্তু একে আবার সক্রিয় করা যায়। দিনের পর দিন মহামারীর সময় মৃত্যু, রোগ আর আতঙ্কের মুখচ্ছবির ভেতর বসবাস করতে করতে, দিনের পর দিন এইসব ব্যথাতুর সংবাদের আদানপ্রদান করতে করতে মন বিমর্ষতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। মন দুর্বল হলে শরীর সহজেই সংক্রামক ব্যাধির অধীন হয়। এসব অভ্যাস বন্ধ করে যেখানে যা যতটুকু ইতিবাচকতা আছে, হাসি আছে, আনন্দ আছে, সজীবতা আছে, জ্ঞানের অন্বেষণ আছে, সেইখানে মনকে স্থাপন করতে হবে। জীবন সীমিত এবং মরার আগে হাসাই ভালো, কেতরে কেতরে মরার কোনো মানেই হয় না।

মানসিকভাবে সুস্থ থাকার এটিই সুনিশ্চিত প্রথম পাঠ।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (4)
  • comment-avatar
    Sruti Chakraborty 1 month

    লেখাটার মধ্যে একদম মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম, যাকে বলে hooked হয়ে যাওয়া।এখানেই লেখকের অসামান‍্যতা।এমন অনুভূতি, অস্বস্তি আমার মনে হয় কম বেশি অনেকেই অনুভব করেছেন।এই ব‍্যাখ‍্যা ভাবতে বাধ্য করবে।

    • comment-avatar
      সন্মাত্রানন্দ 1 month

      হ্যাঁ, নানাভাবে এসব অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা ও চর্চা চলুক। নমস্কার নেবেন।

  • comment-avatar
    Anup Sengupta 1 month

    চিন্তার চিহ্নমালার প্রতিটি পর্ব পড়েই মুগ্ধ হচ্ছি। অনেক দরজা-জানলা খুলে দিচ্ছেন লেখক।

    • comment-avatar
      সন্মাত্রানন্দ 1 month

      আন্তরিক শুভেচ্ছা নেবেন।