কুন্তল মুখোপাধ্যায়-এর একগুচ্ছ কবিতা

কুন্তল মুখোপাধ্যায়-এর একগুচ্ছ কবিতা

ছন্দ

তাসাপার্টি মূলত চালু একটি নাচুনি যা যেকোনও বিষয়ে ভাড়া করা যেতে পারে–এই ভাবনাকে বেলাইন করার জন্য একটি বাঁশি বাজে । সেটি বেশিরভাগ সময়ই সঠিক সুর বলে না । কিন্তু সেটি তীক্ষ্ণ ও সুলক্ষনা । মূলত হাওয়ার অদ্ভুত এই খেলায় ফুলে ফুলে ওঠে বাঁশীবাদকের তৈলাক্ত কপোল । দর্শকের আমোদ ও প্রকাশিত ছন্দরাগে কিছুক্ষণ স্বস্তি পায় বায়নাকারীরা যারা মূলত কোলাহল চায়। সুর নয় । প্রদর্শন চায়। গান নয় ।

এই জটিলতার মধ্যে পড়ে ট্রাকের হ্যালজেন আলোর অন্ধকারে ভাসতে থাকে কৃষ্ণকালো নওলকিশোর । সে বুঝতে পারে না সামনের তারস্বরে নাচ ঠিক কিসের জন্য । তার ভুল সুর , সামনের তাসাপার্টি নাকি নৃত্যপ্রয়াসীদের পানাসক্তির কারণে জেগে ওঠা অতিসক্রিয়তা ! শুধু একটু দূরে খয়েরি রঙের চাদর জড়িয়ে একটি লোক দাঁড়িয়ে থাকে । তার মুখে এমন একটা বিরক্তি থাকে যাকে প্রসন্নতায় অনুবাদ করার জন্যে সে প্রাণপনে বাজাতে থাকে । লোকে বলে তার নাম মহাদেব ।

গভীর রাতে সে স্বপ্নে শোনে কেউ তাকে বলছে খ্যাপা তাসাপার্টি কবিতা নয়

পলাতক ও অনুসরণকারী

তোমার ঈর্ষা দেখে টের পাই তুমি বন্ধু হতে পেরেছ আমার । বুদ্ধিমান নিজেকে লুকোতে জানে , তাই তার পরিত্রাণ নেই , কারণ সে জানে সে বুদ্ধিমান । কিন্তু যে নবতিপর বহু শীত পেরিয়ে এসেছে , সে ঠিকই চিনতে পারে শরতের দিনে গা ঢাকা দিয়ে পা টিপে টিপে কীভাবে ঘনায় শীত । বন্ধু তোমার ঈর্ষা আমি সেই ভাবে টের পাই । আমি চারদিক দেখে নিই তাই । কেউ কি আমার পিছনে আসছে ? কেউ অনুসরণ করছে আমায় ?গাঢ় টমেটোর ক্ষেত আর আলগা জলের শব্দ শুনতে পাই । আকাশ উদাস ক’রে দুপুরবেলার রোদ গা টেনে গা টেনে চলে যায় মোহনার দিকে । আমাকে কি কেউ দেখছে ? কেউ কি পিছনে আসছে আমার ? আমাকে রাস্তা পর্যন্ত প্রায়ই এগিয়ে দেয় এক অব্যক্ত অন্ধকার ।

ইদানীং মন ছাড়া কেউ আর পিছু নেয় না আমার ।

জীবন

যারা সবসময় জিতে যায় , তারা জানে না জিতে যাওয়া কোনও সমাধান নয় । সম্ভাবনার অসংখ্য দুয়ার সে নিজে হাতে বন্ধ করে দেয় । অন্যদিকে, যারা বহুদিন হারতে হারতেও খেলে যায় একটাই খেলা, চ্যাম্পিয়ন খুঁজে পায় না তাদের ।

অনিবার্যকারণে স্পষ্টভাষীদের বন্ধুত্ব হয় চাপা স্বভাবের নিরুচ্চারজনের সঙ্গে । একজন ভাবতে থাকে আর একজন কথা বলে যায় । এইভাবে দুজনই হয়ে যায় ঐরকম । তাদের মধ্যে দুটো মানুষ তৈরি হয় ।একজন ভাবতে থাকে আর একজন কথা বলে যায় ।

চ্যাম্পিয়ন জানে না যে দুটো মুখ আর দুটো গলা নিয়ে বেদনাতুর মানুষদুটি প্যান্টে জামা গোঁজার মতো করে আর একটা গলা বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। চাঁদের আলোয় একটা গাছের সামনে এসে দাঁড়ায় ।

খুব রাত্রে গাছও সব শাখা নিজের কাণ্ডের মধ্যে গুঁজে নেয় । ফলে সামনে যাকে দেখে খুব সহজ বেদনাহীন মনে হয় আসলে সে দিনের বেলায় অন্যরকম ।

চ্যাম্পিয়ন এসব জানে না ।

ব্লাইন্ড স্পট

স্নান করতে গিয়ে একদিন শরীরে পেলাম সেই জায়গা যা বহুদিন পরিষ্কার করা হয়নি । ফলে শৈশবের রাস্তাঘাট উঠে এলো , অবৈধ রোদ্দুর আর হা হা করে ছুটতে ছুটতে যাওয়া বালিকদের বিনুনী নিয়ে খেলা । উঠে এলো ময়লার মতো অসংখ্য ভুল । মন যখন বড়ো হয় না শরীর তখনই আশ্চর্য সুন্দর হয় , বলো অরুণাভ , তখনই সমস্ত ভুল সমস্ত প্রেম হয় । একদিন স্নান করতে গিয়ে উঠে এলো শরীরের অদৃষ্ট ময়লা কলতলা কুয়োর জলের শব্দ অন্ধকারে কারো হাত ছুঁয়ে বেলফুলের গন্ধ .. এইসব আজ সমাহিতের মনে পড়লো , মনে পড়লো সে না থাকলেও তো জগৎ থাকে । শরীর না থাকলে ?

আমি তো টিভি চালিয়ে নেমে এসেছিলাম একতলায় । এখন দোতলায় আমি নেই । তবু টিভি তো চলছে । তার শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি । মৃত্যু কি এমনই যার চারিদিকে জলের শব্দ ?

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)