কবির নিয়তি <br /> :: গৌতম বসু

কবির নিয়তি
:: গৌতম বসু

বাইবেল থেকে উঠে-আসা কোনও এক প্রবীণ ধর্মজ্ঞের মতো, এক
মুখ দাড়ি নিয়ে, দু’সপ্তাহ জুড়ে, এম. শুয়ে রইল শ্যরদিন-এর
জেলের হাসপাতালে; গভীর অন্তর্দৃষ্টি, এবং, আমার মনে হচ্ছিল,
কোনও অজ্ঞাত কারণে, এক অতল প্রশান্তি নিয়ে সে তার চারপাশের
সমস্ত-কিছু লক্ষ ক’রে চলেছে । …

-স্বামী অসিপ মান্দেলস্থাম প্রসঙ্গে পত্নী নাদেজ্‌দা মান্দেলস্থাম

সমাজের বিশিষ্ট সদস্যরূপে একজন লেখককে আলাদা ক’রে দেখবার, আপাতদৃষ্টিতে, কোনও কারণ নেই। বস্তুত, এর বিপরীত অবস্থাই যেন চোখে পড়ে বেশি; লেখকের আচরণে কখনও-কখনও খুঁজে-পাওয়া ‘অস্বাভাবিকতা’র চিহ্ন অনুসরণ ক’রে তাঁকে উপহাস করার ও বিনোদনের লক্ষ্যবস্তুতে রূপান্তরিত ক’রে নেওয়ার সামাজিক অভ্যাসটি, ঘুরপথে হলেও, একরকম মান্যতা পেয়ে এসেছে। সমাজ তার লেখকদের সুনজরে দেখে না, স্বল্প সংখ্যক যে-লেখকদের সে সমীহ ক’রে চলে, তা তাঁদের ‘দেবত্ব’-অর্জন, অথবা পদভার, অথবা, এমন কি, মাফিয়াবৃত্তি প্রভৃতি অন্য কোনও প্রতিপত্তির কারণে, তাঁদের রচনায় মানুষকে চিনিয়ে-দেওয়া দর্পণস্বভাবের জন্য আদৌ নয়। লেখক যে-দর্পণ সকলের সামনে তুলে ধরেন তা ব্যক্তিমানুষ অথবা গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের প্রেক্ষিত থেকে সমাজের পক্ষে প্রীতিকর অভিজ্ঞতা নয়। লেখক তাঁর সমাজের হাতে যা-যা তুলে দিতে চান, তা সমাজ গ্রহণ করতে চায় না, আবার, এর বিপরীতে, সমাজ যা চায়, তা দেবার সাধ্য লেখকের নেই, সাধ্য থাকলেও স্পৃহা নেই। অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ চাহিদা আর যোগানের নিদারুণ বিক্রমশালী চালিকাশক্তির কথা আমাদের জানিয়েছেন, তার সুচিহ্ন এবং তার ক্ষতচিহ্ন, উভয়ই আমাদের দশদিকে সদাদৃশ্যমান। লেখক তাঁর দর্পণস্বভাবে অন্তর্নিহিত অপ্রিয়তার কারণে, চাহিদা-যোগানের এই চৌম্বক-ক্ষেত্রের বাইরে অবস্থান করেন, সমাজে তিনি অপাঙ্‌ক্তেয়। আমাদের বারংবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, চাহিদা-যোগানের সম্পর্কটি কেবল প্রবল শক্তিশালী নয়, বিভিন্ন স্তরে তা সক্রিয়। যেমন, ধরা যাক, গ্রামীণ সমাজে কৃষক ও কামারের মধ্যকার প্রয়োজনীয় সম্পর্কটি ভেঙে পড়লে সঙ্কট কীভাবে ঘনীভূত হতে পারে, তা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদেই ─ অনিরুদ্ধ কর্মকার আর ছুতোর গিরীশ সুত্রধর-এর উপাখ্যানের মাধ্যমে ─ সার্থকভাবে দেখানো হয়েছে। কামার লোহা পিটিয়ে যদি কাস্তে নির্মাণ না করেন, ছুতোর যদি কাঠের গুঁড়ি থেকে লাঙল তৈরি না করেন, কৃষক ধান উৎপাদন করবেন কী উপায়ে, এবং, এর বিপরীতে, কৃষক ধান উৎপাদন না করলে, কর্মকার আর ছুতোর খাবেনই-বা কী? কৃষিজীবী ও শিল্পশ্রমিকের এই সম্পর্কের মধ্যে ঐক্যের একটি মাত্রা জুড়ে দিয়েছিলেন সোভ়িয়েত রাশিয়ার বল্‌শেভ়িক পার্টি এবং কাস্তে-হাতুড়ির যুগলমূর্তি উদ্ভাবন ক’রে গ’ড়ে তুলেছিলেন ‘স্মিচ্‌কা’-র যুগপৎ অমলিন ও অধুনা-ভূলুণ্ঠিত প্রতীক। ‘স্মিচ্‌কা’-র সঙ্গে জড়িত ছিল আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, যেমন, সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে হলে কৃষিজাত পণ্য ও শিল্পজাত পণ্যের মধ্যে বিনিময়-মূল্য কোন নিয়মে নির্ধারিত হবে; চাহিদা-যোগানের আদিম ব্যবস্থার উপর তা ছেড়ে দেওয়া যাবে কি না, প্রভৃতি। সোভ়িয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বস্থানীয় শাস্ত্রজ্ঞদের মধ্যে এ-প্রসঙ্গে সবচেয়ে মনোযোগ সহকারে ভেবেছিলেন য়েভ়গেনি প্রিয়োব্রাজ়েন্‌স্কি (১৮৮৬-১৯৩৭) ও নিকোলাই বুখারিন্‌ (১৮৮৮-১৯৩৫), কিন্তু স্তালিনের নির্দেশে উভয়ের হত্যার ফলে বিতর্কটি, এবং সেই সঙ্গে, ন্যায়প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও অসমাপ্ত রয়ে যায়। বলা বাহুল্য, কৃষিজীবীদের স্বার্থ, বিশেষত দরিদ্র রাষ্ট্রগুলিতে(যেখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট কৃষিজাত পণ্যের বাইরে তাঁরা অসংগঠিত), আজও অরক্ষিত হয়ে রয়েছে। কৃষিজীবী সম্প্রদায় আমাদের বর্তমান আলোচনার মূল বিষয় নন, তবু আলাদা ক’রে তাঁদের উল্লেখ করতে হল, এইটুকু বোঝবার ও প্রকাশ করবার জন্য যে, লেখকদের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত। উদরের ক্ষুধানিবৃত্তির দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে যাঁরা তুলে নিয়েছেন তাঁদেরই যখন এই দুরবস্থা, তখন, মনের ক্ষুধানিবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থা যে হীনতর হবে, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এক কল্যাণমুখী সমাজ গ’ড়ে তোলার জন্য কৃষিজীবীদের কথা তবু কেউ-কেউ ভেবেছেন, যে-কোনও রাষ্ট্রব্যবস্থায় লেখকদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগের দ্বারা কেউ-কেউ নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে কোনও রকমে সক্ষম হয়েছেন, বাকিদের জীবন তমসাচ্ছন্ন।

একজন কৃষিজীবীর প্রতিতুলনায় একজন লেখকের অবস্থা হীনতর হবার মূল কারণ তাঁর নিঃসঙ্গতা। সমাজবদ্ধ জীব হয়েও, লেখক, নৈসর্গিক ভাবে অসংগঠিত; কোনও-কোনও পরিস্থিতিতে নিজের মনোজগতে তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ, অধিকতর ক্ষেত্রে হয়তো-বা ভগ্নদশাপ্রাপ্ত, কিন্তু প্রায় ব্যতিক্রমহীন ভাবে, তিনি ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’। কবির এই অবস্থা-বিষয়ে আমরা সকলেই কমবেশি অবহিত, কিন্তু এর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে আমরা ভেবে দেখেছি কী? লেখকের অন্তর্জীবন বিশ্বনন্দিত চাহিদা-যোগানের চৌম্বক ক্ষেত্রের বাইরে অবস্থিত; এটিই তাঁর ব্যতিক্রমী সত্তার, তাঁর নিঃসঙ্গতার অন্যতম প্রধান কারণ। একজন কৃষিজীবী যখন হাঁটু মুড়ে বেঞ্চির উপর ব’সে আকাশপানে অপলক চেয়ে থাকেন, তখন আকাঙ্ক্ষার একটা সম্পর্ক গ’ড়ে ওঠে। কৃষিজীবীর জায়গায় আমরা যদি একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে প্রতিস্থাপন করি, তা হলে ,স্বাভাবিক নিয়মে আকাঙ্ক্ষার রূপও(form)প্রতিস্থাপিত হয়ে যায় বটে, তবু আকাঙ্ক্ষা আকাঙ্ক্ষাই রয়ে যায়। কৃষিজীবী সময়মতো ও পর্যাপ্ত পরিমাণে বর্ষণ আকাঙ্ক্ষা করেন, বিজ্ঞানী তাঁর নিজ বোধশক্তি দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতিকে অনুধাবন করবার আকাঙ্ক্ষা লালন করেন; আমাদের কাল্পনিক অনুশীলনীর তৃতীয় কুশীলব, লেখকের কী আকাঙ্ক্ষা? চাইবার মতো তাঁর কিছু নেই, তিনি বিস্ময়াবিষ্ট; চাহিদা-যোগানের চৌম্বক ক্ষেত্রের বাইরে তিনি কালাতিপাত করছেন। এই বিশেষ মানসিক গঠনই লেখককে সমাজের অন্য সদস্যদের থেকে পৃথক ক’রে রেখেছে ব’লে মনে হয়। এক কথায়, একজন লেখকের জীবনে ‘স্মিচ্‌কা’ সম্পূর্ণ অচেনা এক সম্পর্ক। ফলত, বৃহত্তর সমাজে তাঁর লেখার কোনও চাহিদাও নেই।

এই রচনার প্রারম্ভে অসিপ মান্দেলস্থাম-কে (১৮৯১-১৯৩৮)স্মরণ করবার বিশেষ একটি কারণ আছে। তাঁর জীবনের উপর নিয়তির পদচিহ্ন যতটা স্পষ্ট ফুটে রয়েছে, ততটা স্পষ্ট উপস্থিতি অন্যত্র দেখা যায় না। ১৯৩৪ সালে পুলিশবাহিনী কর্তৃক প্রথমবার গ্রেপ্তারের সময়ে শাসকমহলে মান্দেলস্থাম-এর একমাত্র শুভার্থী বুখারিন-এর নিজেরই জীবন বিপন্ন, ফলত, তাঁকে রক্ষা করবার জন্য কেউ এগিয়ে আসেন নি। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে স্তালিনীয় মানসিক নির্যাতনের কোন্‌ মাত্রার সম্মুখীন হতে হবে, এই আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন তাঁর আত্মীয় পরিজন ও বন্ধুরা এক রকম নিশ্চিত ধ’রে নেন যে, এবার বুঝি তাঁকে হত্যা করা হবে। কিন্তু, কোনও অজ্ঞাত কারণে, মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাঁর কপালে জোটে তিন বছর ব্যাপী নির্বাসনের দণ্ডাদেশ। প্রথমে তাঁকে উরাল পর্বতমালায় অবস্থিত স্ত্রুনিনো, পরে শ্যরদিন এবং সবশেষে ভরোনেঝ়-এ পাঠানো হয়। পত্নী নাদেজ্‌দা তাঁর সঙ্গে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন ব’লে সে-যাত্রা কবির প্রাণহানি ঘটে নি বটে, কিন্তু তখন থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করেন। নাদেজ্‌দা তাঁকে এম. নামে সম্বোধন করতেন, লিখছেন, এম. সেই সময়ে নানাজনের চাপা কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়ার কথা তাঁকে জানাতেন। কণ্ঠস্বরগুলি যে তাঁর অন্তরের নয় সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত, কারণ নাদেজ্‌দা-কে দেওয়া ভাষ্য অনুসারে, কণ্ঠস্বরগুলি ঘন-ঘন উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এমন ভাষায় ও ভঙ্গিতে তারা কলহ করে, যা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। নির্বাসনকালে(১৯৩৪-৩৭) এবং তার পরে সশ্রম কারাবাসের সময়ে(১৯৩৭-৩৮), তিনি যা লিখেছেন তা পাঠ ক’রে আমরা প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারি, অন্য কণ্ঠস্বরও শুনতে পেতেন মান্দেলস্থাম, যা তাঁর স্ত্রীর বিবরণে লিপিবদ্ধ নেই, যে-কণ্ঠস্বর কবিতার, যে-কণ্ঠস্বর হয়তো–বা স্বয়ং নিয়তিরও। [উৎসনির্দেশ:‘হোপ এগেন্সট হোপ’/ নাদেজ্‌দা মান্দেলস্থাম]

১৯৩৭-এ নির্বাসনের মেয়াদ সমাপ্ত হবার পর নাদেজ্‌দা তাঁর স্বামীকে নিয়ে মস্কোয় ফিরে আসেন, কিন্তু ততদিনে তাঁদের থাকবার জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণ নেই, কবির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে, হৃদরোগ দেখা দিয়েছে, মস্কোর ভয়ানক শীতকাল এগিয়ে আসছে, তবু নাদেজ্‌দা পরাজয় স্বীকার করেন নি। অবশেষে এক বছরের মাথায় অনিবার্য ঘটনাটি ঘটে, ১৯৩৮-এর মাঝামাঝি সময়ে, প্রতিবিপ্লবী কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন মান্দেলস্থাম। পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড মাথায় চাপিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে কর্তৃপক্ষ উন্মাদ লক্ষণাক্রান্ত কবিকে নরকাভিমুখী একটা ট্রেনে চড়িয়ে দেন। সেই বছর অক্টোবর মাসে ভ্লাদিভ়স্তক-এর অন্তর্বর্তী শ্রমশিবির থেকে লেখা কবির একটা চিরকুট পান ভাই অ্যালেক্সাণ্ডার। সামান্য কিছু অর্থ এবং ক’টা গরম জামাকাপড়, সমাজের কাছে এর অধিক কিছু প্রত্যাশা করেন নি অসিপ মান্দেলস্থাম। এর কয়েক মাস পর, কর্তৃপক্ষের এক বার্তা থেকে অ্যালেক্সাণ্ডার জানতে পারেন যে, তাঁর দাদা, বয়স সাতচল্লিশ, ডিসেম্বর শেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। স্বামীকে পাঠানো নাদেজ্‌দা-র একটি পার্সেলও ‘প্রাপক মৃত’ চিরকুটসহ ফিরে আসে।

মান্দেলস্থাম ‘জীবন’ ও ‘অস্তিত্ব’-র মধ্যে একটি বিভাজন রেখা দেখতে পেয়েছিলেন, বুঝেছিলেন যে, একটি ফুরালে তবেই অন্যটি ডালপালা মেলতে শুরু করে। ভরোনেঝ়-এর নির্বাসনকালে একটি লেখার প্রথম স্তবকে তিনি লিখছেন:
হয়তো এইখান থেকে উন্মাদাবস্থার শুরু,
হয়তো এ তোমার নীতিবোধ,
জীবনের গাঁটছড়ায় আমরা বাঁধা প’ড়ে আছি, এবং চিহ্নিত,
এবং অস্তিত্বের জন্য বন্ধনমুক্ত।

নাদেজ্‌দা-র অনমনীয়তা যে তাঁর স্বামীর সমতুল্য, সে-আভাস পূর্বে পাওয়া গেলেও কবির মৃত্যুর পরই তার পূর্ণ পরিচয় আমরা পাই। নাদেজ্‌দা খুঁজে বার করেন, মস্কো থেকে যে ট্রেনে তাঁর স্বামীকে তোলা হয়েছিল, সেই ট্রেনেই আরও একজন বিশিষ্ট বন্দী উপস্থিত ছিলেন। ইনি পেশায় পদার্থবিজ্ঞানী এবং নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক, নাদেজ্‌দা তাঁর নাম রেখেছেন এল.। প্রসঙ্গত, কুড়ি বছর ব্যাপী বন্দীজীবন কাটাবার পর এল. অবশেষে মুক্তিলাভ করেন। নাদেজ্‌দা জানিয়েছেন, স্বামীর জীবনের অন্তিম বছরের তথ্য সংগ্রহ করার জন্য এল. এক দুর্মূল্য তথ্যসূত্র, যাঁর জবানবন্দী সংগ্রহ করবার জন্য তাঁকে ধৈর্য সহকারে কুড়ি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এল. নাদেজ্‌দা-কে জানিয়েছেন মস্কো-ভ্লাদিভ়স্তক-এর সেই ট্রেনে তাঁর সঙ্গে এম.-র সাক্ষাৎ হয় নি, কারণ এম. ছিলেন ব্যাধিগ্রস্ত ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত কামরায়, কিন্তু পরে তিনি এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সংগ্রহ করেছিলেন, যা থেকে মান্দেলস্থাম-এর তখনকার মানসিক স্বাস্থ্যের একটি চিত্র পাওয়া যায়। সেই প্রত্যক্ষদর্শী এল.-কে জানিয়েছিলেন, সারাটা পথ এম. কম্বল মুড়ি দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলেন, স্টেশনে ট্রেন থামলে কখনও-কখনও ‘ব্রেডরোল’ কিনে প্রথমেই সেটি ভেঙে এক অর্ধেক কোনও সহযাত্রীর হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের পরের অংশটি ভয়ানক। তিনি বলছেন, কম্বলের আড়াল থেকে এম. সেই সহযাত্রীকে লুকিয়ে-লুকিয়ে লক্ষ করতেন, ভাগ ক’রে দেওয়া ‘ব্রেডরোল’ খেয়ে বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হল কি না, এ-ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিজের ভাগটি তিনি স্পর্শ করতেন না।

ভ্লাদিভ়স্তক-এর ট্রানসিট লেবার ক্যাম্পে বসবাসের সময়ে এল. ও এম.-র মধ্যকার প্রাথমিক পরিচয় বন্ধুত্বে পরিণত হয়। এল. এবং অন্যান্য তথ্যসূত্র একত্রিত ক’রে মান্দেলস্থাম-এর মানসিক বিকারের দু’টি বৈশিষ্ট্য উঠে আসছে, ১। খাদ্যে বিষক্রিয়ার আতঙ্ক ─ খাবারে বিষ মেশানো রয়েছে, এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি কোনও অবস্থাতেই কর্তৃপক্ষের দ্বারা বিতরিত খাবার গ্রহণ করতেন না। উচ্ছিষ্ট এবং চুরি ক’রে আনা খাদ্যের উপর তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর ক’রে থাকতে হত। এমনও শোনা যায়, চুরি করা বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার পর, শেষ অবস্থায়, তিনি আঁস্তাকুড় থেকে খাবার কুড়িয়ে খেতেন, এবং ২। ইনজেকশনের আতঙ্ক ─ তাঁকে হত্যা করার অসংখ্য উপায় কর্তৃপক্ষের হাতে আছে, এই সরল সত্য বিস্মৃত হয়ে তাঁর মনে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, সিরিঞ্জে বিষ মিশিয়ে তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে জেলকর্তৃপক্ষ সক্রিয়। উত্তেজনার ওই মুহূর্তগুলি ছিল সাময়িক, সাধারণত তাঁকে অন্য কয়েদীদের মধ্যে শান্ত হয়ে ব’সে থাকতে যেত, পরনে হলুদ রঙের একটি চামড়ার কোট। এল. বলেছেন, মাঝে-মাঝে তিনি কবিতার লাইনও আওড়াতেন, কিন্তু সেগুলি নতুন ভাবনা, না পুরানো রচনা, তা জানা যায় না। ১৯৩৮-এর ডিসেম্বর মাসে শ্রমশিবিরে অকস্মাৎ টাইফাস রোগের মড়ক দেখা দেয়। সংক্রমণ এমন মারাত্মক আকার নেয় যে ক্যাম্পের সাধারণ প্রশাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে; সংক্রমিত কয়েদীদের আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু হতেই বন্ধুরা পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এল.-কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, এবং এম.-এর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক মাস পর, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর লোকমুখে এল. খবর পান যে এম. প্রয়াত।

অসিপ মান্দেলস্থাম-এর প্রসঙ্গ থেকে নিষ্ক্রান্ত হবার আগে, আর মাত্র একটি ঘটনার বিবরণ আমরা স্মরণ করব। ভগ্নস্বাস্থ্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এল. ও এম.-কে কোনও ভারি কাজ দেওয়া হয় নি। কয়েক খণ্ড পাথর একটা ঠেলাগাড়িতে বোঝাই ক’রে তাঁরা কয়েক শো গজ দূরে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে রাখতেন, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন দুই কয়েদী, তারপর পরবর্তী বোঝা তুলে নেবার আবার ফিরে আসতেন। এইরকমই কোনও বিশ্রামগ্রহণের সময়ে এম. একবার বলেছিলেন, ‘আমার প্রথম বই “পাথর”, শেষেও পাথর।’ এর তাৎপর্য এল.-এর তখন বোধগম্য না হলেও, বাক্যটি তিনি ভুলতেও পারেন নি। বহু বছর বাদে তিনি নাদেজ্‌দা-কে এম.-এর বিষণ্ণ উক্তিটি শোনান। বাক্যটি শোনামাত্র আমরা নিয়তির অমোঘ উপস্থিতি টের পাই , অনুমান করার প্রয়াস পাই, সবার অলক্ষে সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনবৃত্ত কি সূক্ষ্ম রেখায় আঁকা হয়, তাঁর লেখনী যেখান থেকে প্রথম ডানা মেলে উড়েছিল, বহু বহু পরিক্রমার শেষে, তা কীভাবে সেখানেই নেমে আসে! সমাজ যাকে ভিখারী এবং চোর এবং পাগল সাজিয়ে রেখে নিজে নিরাপদ বোধ করে, কীভাবে নিয়তি তাঁরই দু’হাতে মরুবিজয়ের কেতন তুলে ধরবার দায়িত্ব অর্পণ করেন। আমাদের স্মৃতি ফিরে যায় ১৯১৩-এ, যখন বাইশ বছরের তরুণ অসিপ মান্দেলস্থাম-এর প্রথম বই ‘কামেন’(শব্দার্থ:পাথর)একটি সাহিত্য পত্রিকার অংশ হিসেবে প্রথম প্রকাশের পরেই কবিতাপাঠকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছিল। বলা বাহুল্য, তিনি একা ছিলেন না, আরও তিন বন্ধুর ─ আনা আখ্‌মাতোভা (১৮৮৯-১৯৬৬), বরিস পাস্তারনাক (১৮৯০-১৯৬০), মারিনা ৎস্‌ভেটায়েভা (১৮৯২-১৯৪১) ─ প্রথম কাব্যগ্রন্থগুলিও ১৯১০ থেকে ১৯১৪ মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিল। সন্দেহ নেই, রাশিয়া-র কাব্যসাহিত্যের রৌপ্য যুগের সূচনা হয়েছিল তাঁদের অগ্রজ আলেক্সান্দর ব্লক (১৮৮০-১৯২১) লেখনীতে, কিন্তু মান্দেলস্থাম ও তাঁর তিন বন্ধুর লেখায় পুষ্ট না হলে, তা কখনই এমন কালজয়ী হয়ে উঠতে পারত না। ভাগ্যবিপর্যয়ের ভারে জীবন যতই বিষবৎ হয়ে উঠে থাকুক মান্দেলস্থাম-এর কাছে, তাঁর বন্ধনমুক্ত অস্তিত্ব যে অমৃত আস্বাদন করেছিল, এ-বিষয়ে কিছুমাত্র সংশয় নেই। কবিজীবনের প্রারম্ভে রচিত তাঁর একটি লেখার শেষ স্তবকে আমরা এই ভাবনা পাই :

গান যদি সত্যই গাওয়া হয়
পূর্ণ হৃদয়ের উৎস হতে, অন্য সবকিছু
মুছে যায় অবশেষে, বাঁচে না কেউ,
রয় বাষ্পলোক, নক্ষত্ররাজি, গায়ক।

৷৷ ২ ৷৷

পুণ্যবানেরা রচনা করেন সেইসব আশ্চর্য শ্লোক
যাঁরা শোনেন, তাঁরাই ধন্য হন।
পুণ্য কুড়ানো আর পুণ্য বিলানো
দুটো ইচ্ছেই যৌবনে আমাদের চোখে রুমাল দিয়ে ঘোরাতো,
কিন্তু সেটাই ছিল আমাদের জীবনের সেরা সময়।

শ্লোক / বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নিয়তিতাড়িত উন্মাদাবস্থার দ্বিতীয় দৃষ্টান্তের সন্ধানে আমরা গৃহাভিমুখী হলাম। আমাদের নির্বাচন কেউ-কেউ অবিবেচনাপ্রসূত ধার্য করতে পারেন, কারণ আলোচ্য ব্যক্তির কোনও লেখক-পরিচিতিই নেই। বস্তুত, এই বৈশিষ্ট্যর জন্যই আমরা সর্বত্যাগী উল্লাসকর দত্ত-কে(১৮৮৫-১৯৬৫)স্মরণ করছি। ভাবতে অবাক লাগে, এই হতশ্রী সমাজেও এমন একটা সুসময় একদা এসেছিল যখন একজন আদর্শবান মানুষের একটি বক্তৃতা, অথবা একটি ছাপাখানা, দশজন তরুণের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত। স্টার থিয়েটার প্রেক্ষাগৃহে প্রদত্ত বিপিনচন্দ্র পাল-এর (১৮৫৮-১৯৩২) একটি ভাষণ এভাবেই উল্লাসকর-কে নতুন জীবনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পরবর্তী ঘটনাবলীর সঙ্গে আমরা সকলেই আশৈশব পরিচিত; বারীন্দ্রকুমার ঘোষ-এর (১৮৮০-১৯৫৯) সহযোগী হিসেবে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে উল্লাসকর-এর যোগদান, ১৯০৮-এ মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে গ্রেপ্তার, আলিপুর আদালতের রায়ে বারীন্দ্রকুমার ও তাঁর ফাঁসির হুকুম, উভয়ের আপিল, সরকার কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড রদ ও তার পরিবর্তে, দ্বীপান্তর এবং যাবজ্জীবন(অর্থাৎ কুড়ি বছর)সশ্রম কারাদণ্ড, কারাগারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে উল্লাসকর-এর মানসিক বৈকল্য প্রভৃতি। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশের ইতিহাস যখন লেখা হয় তখন সেখানে পদাতিকদের ইতিহাসের খুঁটিনাটি লিপিবদ্ধ করার স্থানের অকুলান হয়। আমরা জানতে পারি না যে, যদিও ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আগত কয়েদীদের সাময়িক ভাবে আন্দামান সেন্ট্রাল জেলে প্রথমে দাখিল ক’রে, অনধিক ছয় মাসের মধ্যে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার প্রথা ছিল, উল্লাসকর-কে সেন্ট্রাল জেলেই আড়াই বছর কাটাতে হয়। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া পোর্ট মোয়াট, পোর্ট মোয়াট থেকে ডানডাস পয়েন্টের ইটখোলা, এবং এতকিছু আয়োজনের পরেও শরীরমনের তেজ যদি কিছু অবশিষ্ট রয়ে যায়, তার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য, সেলুলার জেল। সেলুলার জেলে প্রবেশ করার অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে জেলের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উল্লাসকর লিখছেন:

‘…হাসপাতালে প্রায় সংজ্ঞাশূন্য অবস্থায় ইনজেকশন দেওয়া হইল ইহা স্মরণ হয় এবং একবার ব্যাটারি চার্জ করা হয় তাহাও স্মরণ আছে। কেবল স্মরণ আছে কেন, এমনই প্রবল বেগে তড়িৎ চালনা করা হয় যে, আমার তখন বোধ হইতে থাকে যেন আমার সমস্ত শরীর বিদীর্ণ করিয়া, সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলীকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিয়া ঐ তড়িৎ নির্গত হইতে থাকে এবং কিছুক্ষণের জন্য আমার সমস্ত শক্তিকে পরাভূত করিয়া কতকগুলি কুৎসিত ও কদর্য গালি আমার মুখ দিয়া নির্গত হয়, যাহা জীবনে কখনও উচ্চারণ করি নাই। ঠিক বোধ হইল যেন তখনকার জন্য আমাকে দুর্বল পাইয়া একটি বিপরীত শক্তি অথবা মানস-আত্মা আমাতে অধিষ্ঠান হইয়া আমার সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ কথাগুলি বলাইয়া গেল। তারপর বাহ্য হিসাবে সংজ্ঞাশূন্য অবস্থাতেই কাটিতে লাগিল। কতক্ষণ অথবা কতদিন ঐরূপ গেল, সে সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণা নাই। কিন্তু পরে শুনিলাম যে, প্রায় তিন-চার দিন হইবে। বাহ্য হিসাবে সংজ্ঞাশূন্য হইলেও অন্তররাজ্যে কত আকাশ-পাতাল, স্বর্গ-নরক, প্রেত-পিশাচ, অপ্সর, গন্ধর্ব্ব, কিন্নর, লোক, লোকান্তর দর্শন করিলাম কে তার ইয়ত্তা করিবে!…’ [উৎসনির্দেশ:‘কারাজীবনী’/উল্লাসকর দত্ত/ পুনর্মুদ্রণ ‘র‍্যাডিকাল ইম্প্রেশন’]

নরকেও, বোধ করি, স্বল্পসংখ্যক দেবদূত চলাফেরা করেন, তাঁদেরই একজন মেডিকাল সুপারিনটেন্ডেটের রূপ ধ’রে উল্লাসকর-কে হাসপাতাল থেকে পাগলাগারদে স্থানান্তরিত করেন। প্রসঙ্গত, তিনি যেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন তাকে হাসপাতাল বলা যায় কি না, এবং পাগলাগারদ শব্দটি অধুনা বর্জিত হবার পরেও পাগলাগারদকে পাগলাগারদ নামে শনাক্ত করা যায় কি না, সে সূক্ষ্ম বিচারে আমরা প্রবেশ করছি না, উল্লাসকর দত্ত-র পরিভাষাই অনুসরণ করছি। এই সময়ে জীবনে আরও একটি শুভ যোগাযোগ উল্লাসকর-কে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে টেনে বার ক’রে আনে। খবর পৌঁছয়, কারাবিভাগের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ডিরেক্টর জেনেরাল, যাঁর সঙ্গে আলিপুর জেলেই উল্লাসকর-এর পরিচয় হয়েছিল আন্দামান পরিদর্শনে আসছেন। উল্লাসকর লিখছেন :

‘তিনি এবার আমাকে দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেলেন। পূর্বে আমাকে বেশ সুস্থ ও সবল দেখিয়াছেন, এখন আমার এরূপ অবস্থা দেখিয়া বলিলেন, “তুমি এত রোগা হইয়া গিয়াছ এবং ওজন এত কম হইয়া গিয়াছে, কিরূপে বিশ বৎসর কাটাইবে?”…’

বড়কর্তা পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুমান ক’রে উল্লাসকর-এর নিজের মুখ থেকে জানতে চাইলেন উত্তেজনার মুহূর্তে মানসিক বিপর্যয়ের কী-কী লক্ষণ দেখা দেয়। উল্লাসকর-ও তাঁর দেখা অতিবিচিত্র ‘স্বপ্নচিত্র’-র কথা, দেওয়ালে নিজের মাথা ঠোকার কথা, সবই অকপটে জানালেন। এর কিছুদিন পর, সেলুলার জেল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে, মাদ্রাজের এক পাগলাগারদে তাঁকে দাখিল করা হয়।

উল্লাসকর দত্ত-র অবশিষ্ট কারাজীবন বাস্তব পৃথিবী ও মায়াভুবনের ─ তাঁর পরিভাষা ব্যবহার ক’রে বলা যায়, ‘স্বপ্নচিত্র’-র ─ এক অত্যাশ্চর্য মিশ্রণ। বাস্তব জগতে রয়েছেন অ্যাডমিরাল রিচার্ডসন, তিন্নেভেলী মামলার অনামা রাজনৈতিক বন্দী, আত্মঘাতী তম্বীপায়ন, জন স্কট, সেই ‘মাদ্রাজী পাগল’ যাঁর জীবনধারণ মাত্র একটি মন্ত্রোচ্চারণে(‘I wish at the time of death, I, be born, and take revenge in that simple way.’) এসে ঠেকেছিল, এবং স্বয়ং উল্লাসকর দত্ত কর্তৃক রচিত ও বাউল সুরে গীত চাটাই বোনার এই গানটি :
আমার তালের পাতা, ও আমার তালের পাতা!
তোমার পাতায় চটি বুনি, তোমার পাতায় চাটাই বুনি
তোমার পাতায় পাখা বুনি, টুপি বুনি, খলতে বুনি,
তালের পাতা।

তাঁর মায়াজগতের বিবরণ এতটা সহজপাচ্য নয়। আমরা মাত্র একটি বিবরণ এখানে উপস্থিত করলাম। প্রসঙ্গত, এই বিবরণে ইউরোপে যে-যুদ্ধের উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

‘এই তো গেল আমাদের পাগলাগারদের কথা। এখন পুনরায় আমার পূর্বকথিত অতিলৌকিক কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করিব। এবার যাহা বলিব তাহা শুনিয়া সকলেই আশ্চর্য হইবেন সন্দেহ নাই।

একদিন সকালবেলায় আমি আমাদের বড় ফটকের দিকে মুখ বাড়াইয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখিতেছি, এমন সময় দেখিলাম আমাদিগের সম্মুখস্থ সার্জেন্টের বাড়ীর পাশের দিক্‌কার বাগানে একটি মহিলা, আমাদিগের দেশীয় ধরনের কাপড় পরা, আমাকে লক্ষ্য করিয়া কী যেন বলিতে চাহিতেছেন। উঁহার দেহের গঠন অতিশয় হৃষ্টপুষ্ট; এমনকী, একেবারে স্থূলাকৃতি বলিলেও চলে। গায়ের রঙ বেশ ধবধবে ফরসা, মেমেদের মতো। আমাকে দেখিয়া, আমি কে তাহা জানিবার জন্য, জিজ্ঞাসা করিলেন “Who is this?”, “এ কে?” আমি আর কী বলিব, কোনও উত্তর না দিয়া উহার দিকে চাহিয়া আছি, এমন সময় পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “Do you know me?”, “আমাকে চেন?” আমি উঁহাকে দেখিয়া আমার পরিচিত কেহ বলিয়া মনে করিতে পারিলাম না। তাই অবশেষে নিজেই আত্মপরিচয় দিয়া বলিলেন,“I am she”, “আমি তিনি”। আমি তথাপি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না দেখিয়া বলিলেন,“I am Mary, your queen”। এরূপ বলাতে আমি চাহিয়া দেখিলাম তাই তো, যেন ছবির চেহারার সঙ্গে কতকটা সাদৃশ্য আছে বলিয়া বোধ হয়, তবে এরূপ ভাবে এরূপ স্থানে অভ্যুদয়ের অর্থ কী? তখনও ইউরোপে যুদ্ধ পুরাদমে চলিতেছে, আমি মনে মনে চিন্তা করিয়া সেই সম্পর্কে একটা অর্থ করিয়া লইলাম। ভাবিলাম হয়তো এই যুদ্ধ সম্পর্কে স্বদেশে নানা প্রকার আপদ-বিপদের সম্ভাবনা এমনকী সিভিল ওয়ারের সূচনা দেখিয়া সম্রাজ্ঞী এবং মুক্তি–ফৌজদিগের ন্যায়, ভারতবর্ষে অবস্থানকালীন, ভারতীয় ধরনে আপন বেশ পরিবর্তন করিয়া লইয়াছেন। তাঁহার এই শূন্যভরণা, এক-বস্ত্র পরিধানা, নগ্নচরণা দৈন্যদশার মূর্তি দেখিয়া কেমন যেন একটু কষ্টই হইল। আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এখানে কেন? তুমি কী করিয়াছ?” আমি ইঙ্গিতে জানাইলাম যে, “রাজবিদ্রোহের অপরাধে আমি রাজদণ্ডে দণ্ডিত।” তিনি বলিলেন,“That’s nothing, এ কিছু না”, অর্থাৎ, ইউরোপে যাহা এখন হইতেছে তাহার তুলনায় তোমরা যাহা করিয়াছ তাহা একেবারে কিছুই নহে বলিতে হয়। অতএব “You are free ─ তুমি মুক্ত।” আমি কিন্তু এরূপভাবে মুক্তির অর্থ কিছুই বুঝিলাম না, তবে তাঁহার ঐ শুভ আশীর্বাদ লাভ করিয়া আপন কৃতজ্ঞতা জানাইলাম। সেদিনকার ব্যাপার সেখানেই শেষ হইল ও আমি আপন কর্মস্থানে চলিয়া আসিলাম।’ [উল্লাসকর দত্ত/ ‘কারাজীবনী’]।

প্রবল মানসিক অসুস্থতার মধ্যেও উল্লাসকর দত্ত বাস্তব ও অবাস্তবের অন্তরস্থ সম্পর্ক নিয়ে ভেবেছেন। তিনি লিখছেন:

‘মোটামুটি ভাবে বুঝিতে গেলে আমাদিগের জাগতিক আবর্তন-বিবর্তনের মূলে দুইটি শক্তি কাজ করিতেছে দেখিতে পাই ─ একটি কেন্দ্রানুগ এবং অপরটি কেন্দ্রাতিগ। কেন্দ্রানুগ শক্তির বলে পার্থিব বস্তুনিচয় পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হইতেছে এবং কেন্দ্রাতিগ শক্তির বলে বিপরীত দিকে ধাবমান হইবার প্রয়াস পাইতেছে। এই উভয় শক্তির সাম্যাবস্থাতে বস্তুনিচয় কোনও এক দিকে বিক্ষিপ্ত না হইয়া স্বস্থানে অবস্থান করিতে সমর্থ হইতেছে। সাধারণ জড়বস্তু সম্বন্ধে এই বিধিই যথেষ্ট হইলেও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন জীব সম্পূর্ণরূপে ঐ পূর্বোক্ত দুই শক্তির অধীন দৃষ্ট হয় না। জীব ঐ দুই শক্তির মধ্যবর্তীরূপে অবস্থানপূর্বক আপন ইচ্ছানুরূপ এক তৃতীয় শক্তির প্রয়োগদ্বারা যথেচ্ছ বিচরণ করিতে সক্ষম। তবে এই ইচ্ছাশক্তিকেই যদি আমরা মাধ্যাকর্ষণ, মহাকর্ষণের ন্যায় অথবা কেন্দ্রানুগ কেন্দ্রাতিগ শক্তির ন্যায় পার্থিব এবং অপার্থিব এই দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া বুঝিবার চেষ্টা করি তাহা হইলে বোধহয় আমাদিগের লৌকিক ও অতিলৌকিকের প্রক্রিয়া কতকটা পরিস্ফুট হইয়া আসিবে।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি যে, আমাদিগের পার্থিব লোকে জন্মগ্রহণ করিবার একমাত্র পথ মাতৃগর্ভবাস, অর্থাৎ ─ পার্থিব জড় প্রকৃতির সহিত এমনই ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ যদ্বারা আমরা একেবারে পার্থিব গুণসম্পন্ন হইয়া যাই। ফলে, আমাদিগের ইচ্ছাশক্তিও আপন অপার্থিব ও ব্যাপকতর স্বরূপ বিশ্লিষ্ট হইয়া পার্থিব গণ্ডির অধীনে আপন আপেক্ষিক স্বাধীনতা রক্ষা করে মাত্র, আপনাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলিয়া অনুভব করিতে পারে না। অপরপক্ষে অপার্থিব অথবা অতিলৌকিক যে ইচ্ছার কথা উল্লেখ করিলাম উহা পার্থিব সম্পর্কে জাড্যগুণ নির্ম্মুক্ত বলিয়া পার্থিব হইতে অশেষ গুণে অধিক মুক্ত ও স্বাধীন। তবে একদিকে যেমন স্বাধীন, অপরদিকে উহা পার্থিব অপেক্ষা ক্ষণস্থায়ী; কারণ পার্থিবের যে জাড্যগুণ (inertia) রহিয়াছে উহাতে তাহার অভাব। কাজেই যখনই ঐসকল আবির্ভাব লক্ষিত হইয়াছে তখনই দেখা গিয়াছে যে, উহা কেবলমাত্র অল্পক্ষণই পার্থিব আকারে অবস্থান করিতে সমর্থ হইয়াছে এবং পরক্ষণেই শূন্যে মিলাইয়া গিয়াছে।’ [উল্লাসকর দত্ত/ ‘কারাজীবনী’]।

উল্লাসকর দত্ত একজন বোমাপ্রস্তুতকারক দেশব্রতী, তিনি কী ক’রে কবিতার ভিতরের ঘরের হদিস পেলেন, এবং পেলেনই যদি, কীভাবে এতটা প্রাঞ্জল ভাষায় তা প্রকাশ করলেন, সে এক রহস্য। এমন কী ঘ’টে থাকতে পারে যে, বাঙালীর মনন ও বোধশক্তি এমন এক স্বরপর্দায় তখন বাঁধা থাকত, যেখানে দাঁড়িয়ে এই সুরমূর্ছনা সৃষ্টি সম্ভব ছিল? কবিতার বৃত্তি, অর্থাৎ, যা ‘পরক্ষণেই শূন্যে মিলাইয়া গিয়াছে’ তাকে মাটিতে নামিয়ে এনে এক স্থায়ী আকার দেওয়ার প্রয়াস যে তাঁর নিজের ‘ভবঘুরে বৃত্তি’র তুল্য এক সুকঠিন ব্রত, তা কী উল্লাসকর-কে কোথাও ছুঁয়ে গেছিল? ‘ভবঘুরে বৃত্তি’ ─ নিজের কাজের এই নামকরণও একান্ত ভাবে তাঁর; তিনি কি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে কবির কাজও, তাঁর ‘ভবঘুরে বৃত্তি’র মতোই, নিয়তিপ্রেরিত, আত্মক্ষয়ী, এবং বহুলাংশে নিষ্ফল এক প্রয়াস? কবিতা এমন এক দুর্জ্ঞেয়, রহস্যঘন শাস্ত্র যে কোনও যোগসূত্র ছাড়াই এখানকার উক্তি ওখানে ধ্বনিত হতে পারে, ওখানকার ভাবনা এখানে ভাষায় ফুটে উঠতে পারে। উল্লাসকর দত্ত এক দিকে যেমন ‘অতিলৌকিক ইচ্ছা’র কথা তুলে, হয়তো-বা অজ্ঞাতসারে কবিতার কথাই আমাদের জানিয়েছেন, ঠিক তেমনই, আলোচনার এই অংশের প্রারম্ভে উদ্ধৃত ‘শ্লোক’ শীর্ষক পাঁচ লাইনের কবিতায় নিজের কথা লিখতে গিয়ে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তুলে ধরেছেন উল্লাসকর-এর জীবনালেখ্য।

অসিপ মান্দেলস্থাম-এর কবিজীবন নিয়ে আলোচনার সময়ে আমরা নিয়তিকৃত একটি বৃত্ত রচনার উল্লেখ করেছিলাম; লেখক নিজেই লক্ষ করেছিলেন যে, পাথর থেকে শুরু ক’রে তাঁর জীবন পাথরেই এসে অবশেষে থেমেছিল। উল্লাসকর দত্ত-র জীবনেও এই রকম বৃত্ত আমরা লক্ষ করি। কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর উল্লাসকর আর-কখনও সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন নি। তেষট্টি বছর বয়সে, বিপিনচন্দ্র পালের বিধবা কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। ততদিনে ভারতবর্ষ খণ্ডিত, কিন্তু এক স্বাধীন রাষ্ট্র। উল্লাসকর দত্ত কুমিল্লার সন্তান, সেইজন্য ঘরে-ফেরা তাঁর অদৃষ্টে লেখা ছিল না, শিলচরে গিয়ে তিনি ঘর বাঁধেন। বিপিনচন্দ্র পাল-কে দিয়ে শুরু, বিপিনচন্দ্র পাল-কে দিয়ে শেষ।

৷৷ ৩ ৷৷

‘এই অর্থে, আমরা বলতে পারি, প্রতিটি অমর গ্রন্থ তার যুগকে পরীক্ষা করে;
সে-গ্রন্থের উৎকর্ষ নিজের যুগ শনাক্ত করতে পারল কি না, তা যাচাই করে।
…প্রত্যেক প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তির স্তর পরিমাপ করবার জন্য, সেই যুগে
সরবরাহকৃত উচ্চস্তরের মনগুলিকে মানদণ্ড হিসাবে প্রয়োগ করলে ভুল হবে―
কারণ উচ্চস্তরের সে-মনগুলির ধারণক্ষমতা প্রকৃতির ক্রিয়া, এবং তাদের
কর্ষণ করবার সম্ভাবনাটুকুও পরিস্থিতির নিয়মবহির্ভূত ― পরিমাপ করবার জন্য
সমসময়ের সাধারণ মনকে মানদণ্ড হিসাবে স্থাপন করতে হবে, লক্ষ করতে হবে
সাধারণ মন কী ভাবে গ্রহণ করে মহৎ গ্রন্থগুলি;…

– আর্থর শোপেনহাওয়ার (‘দি আর্ট অফ্‌ লিটারেচর’ থেকে)

লেখক-সত্তার নিঃসঙ্গতাকে বহুজন বহুভাবে বিচার করেছেন, কেউ-কেউ অতিনাটকীয়তাসহ; আর্থর শোপেনহাওয়ার-এর(১৭৮৮-১৮৬০)ভাষ্যটি একইসঙ্গে যথাযথ ও প্রাঞ্জল ব’লে মনে হয়। লেখককে তিনি তিন ভাগে বিভাজিত করেছেন; ধূমকেতু, গ্রহ এবং নক্ষত্র। ধূমকেতু-গোত্রের লেখক আমাদের অতিপরিচিতজন; তাঁর রচনা যেমনভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছট্‌ফট্‌ করতে পারে, তেমন ভাবে উড়তে পারে না, গভীরে নামতে পারে না, দূর পর্যন্ত গড়িয়ে যেতেও পারে না। আকাশে অকস্মাৎ দৃশ্যমান ধূমকেতুর মতো তিনি দ্রুত শূন্যে মিলিয়ে যান। ধূমকেতু গোত্রভুক্ত লেখকের প্রতিতুলনায় গ্রহ-গোত্রের লেখক দীর্ঘস্থায়ী। গ্রহপ্রতিম লেখক সর্বদা সঞ্চরণরত, আলোকিত ও স্পষ্টত দৃশ্যমান। বস্তুত, ভূপৃষ্ঠের নিকটস্থ হওয়ার কারণে তিনি নক্ষত্রের চেয়েও উজ্জ্বল এবং, সেই কারণে, শোপেনহাওয়ার-এর বিচারানুসারে, ‘অজ্ঞব্যক্তি’ প্রায়শ ভেবে বসেন গ্রহ বুঝি গ্রহ নয়, নক্ষত্র! ক্রমে, পুরানো গ্রহকে নবাগত গ্রহের জন্য জায়গা খালি ক’রে দিতে হয়, কারণ নিজের আলো বলতে তাঁর কিছু ছিল না, সমসাময়িক লেখকদের বলয়ের বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে তিনি অসমর্থ। কেবল তৃতীয় গোত্রভুক্ত লেখকই অক্ষত রয়ে যান, তিনি ভূনিশ্চল(geostationary) ও অপরিবর্তনশীল, স্বজাত আলোয় সমুজ্জ্বল। প্রত্যেক যুগকেই তিনি সমানভাবে প্রভাবিত করতে পারেন, লম্বনদোষে (parallax) তিনি দুষ্ট নন, সেই কারণে আমাদের দৃষ্টিকোণ পালটালেও তাঁর অবস্থান রয়ে যায় অপরিবর্তিত। কিন্তু, এত দূরে ও এত ঊর্ধ্বে তিনি অবস্থান করেন যে, মর্তলোকবাসীদের কাছে সে–আলো পৌঁছতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়।

শোপেনহাওয়ার-এর ভাষ্য বিনা বাধায় আমরা বুঝে উঠলাম; কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমতটি অত্যাশ্চর্য, এমন কি কিঞ্চিৎ দুর্বোধ্যও। তিনি বলছেন, অস্তিত্ব দুর্জ্ঞেয় ও আদিগন্ত বিস্তৃত; সে বহু অর্থবাহী, স্বপ্নবৎ, প্রেরিত সঙ্কেতগুলি সম্মুখে ভেসে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে মরীচিকার মতো সে দ্রুত মিলিয়ে যায়, এত রকম যাতনার ক্ষতচিহ্ন সে সর্বদা বহন করে যে, তার স্বরূপ নির্ণয় করা অতিদুরূহ, প্রায় অসম্ভব এক দায়ভার। তার এই বিস্তার সম্যক বুঝতে গিয়ে মানুষ নানা অপ্রধান প্রসঙ্গে অনাবশ্যক জড়িয়ে পড়েন এবং অবশেষে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। এই কারণে, মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী, এই প্রস্তাবটি সামগ্রিক অর্থে নয়, সীমিত অর্থে গ্রহণযোগ্য। মানুষ যে নিজের অস্তিত্বরহস্য বিষয়ে অবহিত, তার কোনও ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যায় না। আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে শোপেনহাওয়ার বলছেন, ইন্দ্রিয়চেতনা চিন্তার পথে এক বাধা, প্রকৃতি মানুষকে এক হাতে শ্রবণশক্তি দিয়ে অন্য হাতে হরণ করেছেন সেই অখণ্ড নীরবতা যা চিন্তার জন্ম দিতে পারত। শ্রবণশক্তি মানুষের আত্মরক্ষার পক্ষে জরুরী, এর কর্মক্ষমতার কারণে নানাবিধ বিপদ-আপদ থেকে তিনি পরিত্রাণ পেতে পারেন, কিন্তু ওই পর্যন্তই। অন্তর্জগতের বিকাশের ক্ষেত্রে তার কোনও উপযোগিতা নেই।

শোপেনহাওয়ার-এর এই দু’টি চিন্তাসূত্র একত্রে পাঠ করলে আমরা ভাবতে শুরু করি, জীবনসংগ্রামের ভয়াবহ চেহারার কারণে মানুষের চিন্তার জগৎ সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে, অধিক সংখ্যক মানুষকে চিন্তাশীল বলাই চলে না। সাধারণ বিচারে লেখকদের চিন্তাশীল মানুষ হিসাবে গণ্য করা হলেও শোপেনহাওয়ার-এর বিভাজন যদি মান্য করতে হয়, তা হলে, কেবল নক্ষত্র গোত্রের লেখকদেরই প্রকৃত অর্থে চিন্তাশীল মানুষের গোষ্ঠীভুক্ত করা যায়। অর্থাৎ, আমরা এক বিচিত্র অবস্থায় উপনীত হলাম; বৃহদায়তন এই মানবসমাজের জন্য চিন্তামগ্ন রয়েছেন মাত্র কয়েকজন, এবং যা আরও গুরুত্বপূর্ণ, চিন্তাশক্তি মানুষকে অন্য মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। স্বাভাবতই, লেখকের নিঃসঙ্গতা ও যাতনাভোগ, যুগ ও সমাজদেহে সচেতনতার অভাবের এক অনিবার্য ফল। এই আলোচনার প্রারম্ভেই আমরা প্রস্তাব রেখেছিলাম, সমাজদেহ থেকে লেখককে কর্তিত করবার অন্যতম প্রধান কারণ সমাজের সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির অসঙ্গতি ও অনৈক্য: সমাজকে তাঁর যা দেওয়ার আছে, তা গ্রহণ করার কোনও সদিচ্ছা সমাজমনে নেই। সমাজ, সঙ্গত কারণেই জীবনসংগ্রামে লিপ্ত ; সমাজ চায় ইস্কুলবাড়ি নির্মিত হোক, কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে পাকা রাস্তা পাতা হোক, উদ্যানে সরোবরে সেজে উঠুক ন্যাড়া জমি। লেখক এর কোনওটিই সরবরাহ করতে পারেন না। এক দানা শস্যও যিনি ফলাতে পারেন না, লোহা পিটিয়ে একটা পেরেকও যিনি নির্মাণ করতে পারেন না, তিনি কীভাবে সমাজকে তুষ্ট করবেন, কীভাবে সরোবরের ধারে এক মুঠো মলয় বাতাস বইয়ে দেবেন? ফলত, যুগে-যুগে তাঁর কপালে উপেক্ষা এবং তার অব্যবহিত নীচের ধাপ, অসম্মান জুটেছে।

৷৷ ৪ ৷৷

গুরু বললেন, “বছরে যখন প্রবল শীত পড়ে, তখনই স্পষ্ট
বোঝা যায়, পাইন এবং সাইপ্রাস গাছের পাতা ঝ’রে পড়তে
সব চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে।”

কনফিউশিয়াস অ্যানালেক্‌ট্‌স নবম খণ্ড থেকে

প্রবল বৃষ্টি নেমেছে নগরে, সিংহদ্বারের ওপার হতে, মেঘ, হাওয়ায় পাক খেয়ে-খেয়ে, ধেয়ে আসছে এদিকে, ঝোড়ো বাতাস আরে বৃষ্টির ছাঁটে সব কিছু এলোমেলো; কবি ভাবছেন, এতগুলো অশ্ব টগবগিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল, তাদের তুলনায়, যারা নিজেদের আস্তাবলে রয়ে গেল, তারা কত সুখী! ছিল এক হাজার পরিবারের গ্রাম, সংখ্যা কমতে–কমতে কয়েক শোয়ে এসে ঠেকেছে। ওই, দেখা যাচ্ছে, অন্তহীন শোকে মোহ্যমান বিধবাদের সারি, জনহীন প্রান্তরের এক দিক থেকে অন্য দিকে চলেছে। কে জানে, কোন্‌ গ্রাম থেকে তারা আসছে (তূ ফূ, অষ্টম শতকের মধ্যভাগ, চীন)। সন্দেহ নেই, ইনিই শোপেনহাওয়ার কর্তৃক নন্দিত নক্ষত্রপ্রতিম কবি, যিনি এক দানা শস্য উৎপাদন না–ক’রেও, একটি পেরেক নির্মাণ না-ক’রেও, এমন কিছু রেখে গেলেন, যার খবর, আমাদের দেশের প্রাচীন রসবেত্তাগণ পর্যন্ত পৌঁছলে তাঁরা নিশ্চিত রূপে তাঁকে ‘লোকোত্তর’ অভিধায় সম্মানিত করতেন।

সাহিত্যের এই অনুপম গুণ, সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা অসম্ভব হলেও, রসবেত্তাদের আলোচনা থেকে অস্পষ্টতা অনেকটাই দূর হয়। ‘রমণীয়তা’র প্রবক্তা জগন্নাথ (সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ, ভারত)বলছেন ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিক অনুভব আর কবির নিঃস্পৃহ আবেগ এক নয়, এবং এটিই উত্তরণের একটি আবশ্যিক শর্ত। এই উপলব্ধি, আর কিছুক্ষণ পূর্বে উল্লিখিত শোপেনহাওয়ার-এর সেই উক্তি, যেখানে তিনি নীরবতায় ঘেরা এক অখণ্ড চিন্তাজগতের উল্লেখ করছেন, প্রকৃতপক্ষে, একই উৎস থেকে উঠে এসেছে। নিঃসঙ্গতার এই গোপন মন্ত্র, ধূমকেতু এবং গ্রহ, উভয় গোত্রের কবিদের অজ্ঞাত, সেইজন্য, একদা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করা কবিতার পঙক্তির ধীরে–ধীরে লোকস্মৃতি থেকে ঝ’রে পড়ে। কবির দুয়ার-খিলান ভেঙে না পড়লে, লোকসান তাঁকে গ্রাস না করলে, এখানে কিছু না হারালে, ওখানে কিছু জমা হবে না, এই কথাটি বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বোঝা যতটা সহজ, জীবনে পালন করা ঠিক ততটাই কঠিন।

নক্ষত্র গোত্রভুক্ত লেখকরা ব্যতিক্রমহীন ভাবে আত্মবিশ্বাসী হলেও, তাঁদের অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অনুচ্চারিত রয়ে যায়। সৌভাগ্যবশত, কোনও-কোনও বিরল ক্ষেত্রে, সংযম রক্ষিত না হলে, লেখকের ওজঃ প্রকাশ পায়। ‘লে মিসারাব্‌ল্‌’–এর ভূমিকায় ভ়িক্টর-মারী ঊগো (১৮০২-১৮৮৫) লিখছেন:

‘আইনব্যবস্থা ও কুপ্রথার জোরে সামাজিক দণ্ডবিধি যতদিন মানবসভ্যতার বুকে এই পৃথিবীকে কৃত্রিম উপায়ে নরক বানিয়ে রাখবে, যতদিন মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে পবিত্র মহানিয়তি দুর্ভাগাদের জন্য হয়ে থাকবে বক্র ও জটিল, যতদিন এই তিন যুগসঙ্কটের ─ দারিদ্র্যের দ্বারা প্রলেতেরিয়ৎ জনগোষ্ঠীতে পুরুষের অবমাননা, ক্ষুধাপিপাসার দ্বারা নারীত্বের নাশ, এবং দৈহিক ও আত্মিক নিশাকাল দ্বারা শৈশবের হানি ─ মীমাংসাসূত্র উদ্ভাবিত না হচ্ছে; যতদিন, কোনও না-কোনও অঞ্চলে, সমাজের শ্বাসপ্রশ্বাস রুদ্ধাবস্থায় থেকে যাবে; অর্থাৎ, বিস্তৃততর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে, যতদিন অজ্ঞতা ও পরিবেদনা রয়ে যাবে এই জগতে, ততদিন এই গোত্রের গ্রন্থ মূল্যহীন হয়ে পড়বে না।’

এই গদ্যরচনাটি যদি অতিপ্রসিদ্ধ না হত এবং লেখকের নাম যদি আমরা মুছে দিতে পারতাম, তা হলে এটি অনায়াসে কোনও রাজনৈতিক ইস্তাহারের ভূমিকা হয়ে উঠতে পারত। বস্তুত, বিশ্বের সাহিত্য-ইতিহাসে এমন একটা সুসময় ছিল, যখন লেখকরা, নিজেদের সৃজনকর্মের প্রয়োজনে নিজেরাই তত্ত্বস্রষ্টা হয়ে উঠেছিলেন; যিনি কবি তিনিই দার্শনিক, যিনি কথাসাহিত্যকার তিনিই সমাজবিজ্ঞানী। বিশ শতকের ষাটের দশকে এসে সাহিত্য সমালোচক ও ভাষাবিজ্ঞানীরা পাশ্চাত্য দর্শনশাস্ত্রের মূল অঙ্গন দখল ক’রে এই সজীব ধারাটিকে অস্ত্রাঘাতে জখম করলেও, মানুষ এখনও বিস্মৃত হননি যে ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী-দার্শনিক। কবিতার জগৎ থেকে মাত্র দু’টি দৃষ্টান্তের উল্লেখ ক’রে আমরা এই নেপথ্যচারী মাষ্টারমশাইদের স্মরণ করব, স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ(১৭৭২-১৮৩৪) এবং জীবনানন্দ দাশ।

কলকাতায় সংগঠিত কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাত্র কয়েক মাস পূর্বে জীবনানন্দ দাশ, বরিশাল থেকে ২৬.১২.১৯৪৫-এ তাঁর অনুগত পাঠক অধুনাবিস্মৃত তরুণ কবি দিবাকর সেন-কে একটি চিঠিতে লিখছেন:

‘…সুস্থিরতা লাভ করবার চেষ্টায় আত্মতৃপ্তি নেই, রয়েছে হয়তো কবির ভাবনাপ্রসাদ; কোনও কিছুকে ‘চরম’ ভেবে আঁকড়ে থাকার ভিতর নির্ব্বাণ-অনির্ব্বাণেরও সমন্বয়স্বপ্নও আছে, শান্তি আছে, মাত্রাচেতনা আছে, উত্তেজনাও যে নেই তা নয়, কিন্তু তা ‘নিরিখে’র সান্ত্বনায় ফিরে আসে। আমিও সাময়িকভাবে কোনও-কোনও জিনিষকে চরম মনে ক’রে নিয়েছি জীবনের ও সাহিত্যের তাগিদে, মনকে চোখঠার দিয়ে মাঝে-মাঝে,― temporary suspension of disbelief হিসেবে। কিম্বা কখনও-কখনও মনকে এই ব’লে বুঝিয়েছি যে যাকে আমি শেষ সত্য ব’লে মনে করতে পারছি না তা আমাদের আধুনিক ইতিহাসের দিকনির্ণয়সত্তা; আজকের প্রয়োজনে চরম ছাড়া হয়তো আর কিছু নয়। তবুও সময়প্রসৃতির পটভূমিকায় জীবনের সম্ভাবনাকে বিচার ক’রে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা লাভ করতে চেষ্টা করেছি ;(অনেকদিন ধ’রেই পরিপ্রেক্ষিতের আবছায়া এত কঠিন যে) এর চেয়ে বেশি কিছু আয়ত্ত ক’রে কবিদের পক্ষে পাওয়া অসম্ভব না হলেও কিছুটা সুদূরপরাহত।…’

প্রভাকর সেন জীবনানন্দ-র কবিতার দুটি বৈশিষ্ট্যের ― কালচেতনা ও ইতিহাস-দর্শন ― উল্লেখ ক’রে তাঁর কাব্যপ্রেরণার উৎস-বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। জীবনানন্দ-র উত্তর প্রাঞ্জল নয়, এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় সদ্য পাশ-করা ভক্তটি তা সম্যক বুঝতে পারেন নি, এটা ধ’রেই নেওয়া যায়, কিন্তু এতগুলি বছর পার হয়ে আসার পর, পরবর্তী ঘটনাবলীর সূত্র ধ’রে আমরা কবির দুর্জ্ঞেয় মনের কিছুটা কাছে আসতে পেরেছি ব’লে আশা জাগে। তিনি তাঁর গুণগ্রাহীকে নিজের লেখার কিছু ভাবনাসূত্র ধরিয়ে দিচ্ছেন বটে কিন্তু আসল বাক্যালাপ হয়ে চলেছে অন্তরের সঙ্গে, নিজের পতনোন্মুখ বিশ্বাসের জগৎ নিয়ে কী ভাবে বাঁচা যায়, ভেবে আকুল হচ্ছেন। তাঁর ব্যক্তিজীবনের ডিসেম্বর ১৯৪৫-পরবর্তী ঘটনাগুলি বিচার করলে অনুমান করা যায় যে, আসন্ন দাঙ্গা, ভাতৃহত্যা, পূর্ববঙ্গের সঙ্গে স্থায়ী বিচ্ছেদ, প্রভৃতি, তিনি যেন সবই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন এবং একইসঙ্গে এই বাস্তব অবস্থাও তাঁর সম্মুখে স্বচ্ছ হয়ে উঠছে যে, এত বড় সঙ্কটের মোকাবিলা করবার উপযুক্ত রসদ তাঁর নেই। এ-অবস্থায় যাঁকে স্মরণ করার আপাতদৃষ্টিতে কোনও কারণ নেই, জীবনানন্দ দাশ তাঁকেই স্মরণ করছেন, স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ। কী আশ্চর্য, জীবনানন্দ মনে করছেন, অবিশ্বাসকে অন্তত সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখতে না পারলে সমস্তই চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে! স্বয়ং স্বপ্নদ্রষ্টা কোলরিজ-ও কি দূরতম স্বপ্নেও তাঁর ‘বায়ো- গ্রাফিয়া লিটারেরিয়া’-র এমন ব্যাখ্যা পূর্বানুমান করতে পারতেন?

জীবনানন্দ-র জীবন ও কাব্যভুবনের সঙ্গে কোলরিজ-এর জগতের কিছুমাত্র সাদৃশ্য নেই। ‘বায়োগ্রাফিয়া লিটারেরিয়া’-য় (১৮১৪/১৫-১৮১৭) তিনি লিখছেন, তিনি এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থ, একসঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত ক’রে এবং দীর্ঘ আলোচনা সেরে, নতুন কাব্যধারার দু’টি পথের সন্ধান পেয়েছিলেন।

‘Our conversations turned frequently on the two cardinal points of poetry, the power of exciting the sympathy of the reader by a faithful adherence to the truth of nature and the power of giving novelty by the modifying colours of the imagination. The sudden charm, which accidents of light and shade, which moon-light or sun-set diffused over a known and familiar landscape appeared to represent the practicability of combining both. These are the poetry of nature. The thought suggested itself that a series of poems might be composed of two sorts. In the one, the incidents and agents, were to be, in part at least, supernatural; and the excellence claimed at was to consist in the interesting of affections by the dramatic truth of such emotions, as would naturally accompany such situations, supposing them real. And real in this sense they have been to every human being who, from whatever source of delusion, has at any time believed himself under supernatural agency. For the second class, subjects were to be chosen from ordinary life; the characters and incidents were to be such, as will be found in every village and its vicinity, where there is a meditative and feeling mind to seek after them, or to notice them, when they present themselves.

In this idea originated the plan of the ‘Lyrical Ballads’; in which it was agreed, that my endeavours should be directed to persons and characters supernatural, or at least romantic; yet so as to transfer from our inward nature a human interest and a semblance of truth sufficient to procure for these shadows of imagination that willing suspension of disbelief for the moment, which constitutes poetic faith.’

প্রথম পন্থাটি অপার্থিব জগতকে কবিতার ভাষায় নামিয়ে আনার, যে-গুরুদায়িত্ব, দুই কবির সম্মতি অনুসারে, তিনি নিজের উপরে নিয়েছিলেন; এবং দ্বিতীয় পন্থাটি পার্থিব জগতকে, বিশেষত গ্রামজীবনের মানুষ এবং আপাততুচ্ছ দৃশ্যবলীকে সুধীর আবেগে রঞ্জিত ক’রে ― emotion recollected in tranquility ― কবিতায় সম্মানের আসনে বসানো, যা হয়ে উঠেছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর অনুশীলনের কেন্দ্রবিন্দু। কোলরিজ অতিপ্রাকৃত জগতেই বসবাস করতেন, ফলত, নিজেকে নিয়ে তাঁর কোনও সমস্যা ছিল না, সেই অদেখা জগতই তাঁর মানসচক্ষে বাস্তব। কিন্তু, পাঠক, যিনি বাস্তব জগতের অধিবাসী, কবি কী ভাবে তাঁর কাছে পৌঁছবেন? এই সমস্যা মীমাংসার লক্ষ্য নিয়েই কোলরিজ তাঁর তত্ত্ব ― ‘willing suspension of disbelief for the moment, which constitutes poetic faith’ ― উদ্ভাবন করেছিলেন। কবি তাঁর গভীর বিশ্বাস দিয়ে অপার্থিব জগৎ সম্পর্কে পাঠকের অবিশ্বাস সাময়িকভাবে স্থগিত ক’রে রাখবেন এবং সেই ফাঁকে পাঠকের চিত্তে কবিতা প্রবেশ করবে! আমরা অবাক হয়ে ভাবি, কেবল প্রাতঃস্মরণীয় একজন কবির পরিকল্পনাই এমনভাবে দুই ডানা মেলে উড়তে পারে।

এই তত্ত্বে জীবনানন্দ দাশ-এর স্থান কোথায় ? বলা বাহুল্য, তিনি তত্ত্বটিকে চূর্ণবিচূর্ণ ক’রে, ধ্বংসাবশেষ থেকে দু’টি ধারণা তুলে আনেন, ‘suspension of disbelief’ ও ‘faith’, এবং দু’টিই নিজের উপরে প্রয়োগ করেন। জগৎসংসারের কেউ এই ব্যাপক ভাঙচুরের কথা জানতেই পারতেন না, যদি কোনও-এক দুর্বল মুহূর্তে, জীবনানন্দ, তাঁর সন্ত্রাসময় কার্যকলাপের বৃত্তান্ত প্রভাকর সেন-কে জানিয়ে না যেতেন। জীবনানন্দ দাশ-এর কবিজীবনের অন্তিমপর্ব ‘suspension of disbelief’ ও ‘faith’-এর দিব্য আলোয় আলোকিত।

নিঃসঙ্গতা, যুগের ঔদাসিন্য, এ-সবই কালজয়ী লেখকের শান্তিবিঘ্নের কারণ এবং নিয়তিলিখন হলেও কেবল আত্মশক্তির সহায়তা গ্রহণ ক’রে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি অবিচল থাকতে পারেন। আর পাঠক? তাঁর কথা কি কেউ ভেবেছেন? পাঠক প্রচ্ছন্ন লেখক, লেখকের লাঞ্ছনার ভার বহন করেন তিনিই; কিন্তু তিনি শক্তিহীন, অসিপ মান্দেলস্থাম-এর মতো মুখে এক গাল দাড়ি নিয়ে শ্যরদিন-এর জেলের হাসপাতালে শুয়ে-শুয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জগতসংসারের কল্যাণ–অকল্যাণ দেখে যাওয়া তাঁর সাধ্যাতীত।

পাঠকের কাছে লেখক দুর্জ্ঞেয়ই রয়ে যান, বোঝা না-বোঝার আলো-আঁধারে পাঠকের দিন কাটে। ‘আবার পুরী সিরিজ’–এ গ্রন্থিত একটি কবিতার তল খুঁজে না পেয়ে আমি বার-বার সেটি পড়তাম আর আকাশ পাতাল ভাবতাম, কিন্তু বিশেষ কোনও ফল ফলত না। তারপর একদিন লেখাটির জন্মবৃত্তান্ত স্বয়ং লেখক উৎপলকুমার বসু-র কাছ থেকে সংগ্রহ করার পর হৃদয়ঙ্গম করি, পাঠকের পক্ষে যতদূর ভেবে ওঠা সম্ভব, লেখক তার চেয়েও দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। লেখক অনুগ্রহ ক’রে আমাকে যা জানিয়েছিলেন তা সংক্ষেপে এই : সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র চীনের সামরিক আক্রমণে তিব্বতের সুপ্রাচীন বৌদ্ধ সমাজ যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত, শরণার্থীরা যখন দলে-দলে ভারতে চ’লে আসছেন তখন ভারত সরকার হিমাচল প্রদেশের কাংগ্রা জেলার অন্তর্গত ধর্মশালায় তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। তরুণ উৎপলকুমার কিছুদিন সেই উদ্বাস্তুশিবিরের ইস্কুলে, বাচ্চাদের ইংরেজী ও গণিত শিখিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমিও যে তাদের কাছে কিছু-কিছু শিখেছিলাম, এই লেখাগুলি তার প্রমাণ’। এই ঘটনার অনেক বছর পরে, লেখকের ব্যক্তিগত চিঠিপত্র যখন একে-একে প্রকাশিত হতে থাকে, তখন, ১৫.৬.১৯৬৪-তে শৈলশহর ডালহৌসি-র নিকটস্থ ক্যাম্প থেকে প্রেমিকাকে (পরবর্তীকালে পত্নী) লেখা কবির এই চিঠিটি খুঁজে পেয়ে বিপুল হর্ষ অনুভব করি:

‘ আজ সকালে [ছাত্ররা] অনুপস্থিত ― তারা হাসপাতালে রুগীদের দেখতে গেছে। সেই অবকাশে চিঠি লিখছি। এখানে পড়াশোনার খুব একটা উদ্যম আছে ― তা নয়। প্রায়ই ছুটি থাকে ― বা বন্ধ হয়ে যায়। আমি লামাদের মতো অলস এবং শ্রমবিমুখ হয়ে পড়েছি। ডালহৌসি এখান থেকে মাইল চারেক। প্রথম প্রথম যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করতাম। এখন নিরর্থক মনে হয়। …

… এই ছোট্ট চিঠি লেখার মধ্যেই চারিদিকে মেঘ উড়ে আসতে লাগল এবং বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। জানলা দিয়ে সাদা বাষ্প ঢুকে পড়েছে ঘরের ভিতর। আমার বারবারই মেঘদূতের কথা মনে পড়ছে ― হিমালয় সেই দেবতা ও কিন্নরদের বাসভূমি, সেই ঝর্না ও বনপথ, সেই … উড্ডীন মেঘ, যেখানে মানুষ নিশ্বাস নিতে পারে না, অথবা মানুষকে পরিবর্তিত হতে হয় দেবতায় ।…’ ( উৎসনির্দেশ: ‘ডিয়র এস এম’ / উৎপলকুমার বসু)

আকাশযান : ৩ / উৎপলকুমার বসু

প্রহরি, যে-সব স্ত্রীলোক আজ রণভূমি
অতিক্রম ক’রে যেতে চায়
─ বিনা শর্তে ছেড়ে দিয়ো
দেখো যেন কবুতর লুকিয়ে না নেয় তারা
প্রহরি, যে-সব ভিক্ষুক আজ নগরভ্রমণে
শুধু যেতে চায় তাদের আহ্বান কোরো
─ বোলো পশ্চিম দুয়ারে
রাজহস্তি বাঁধা আছে ।
প্রহরি, ফটকে কেল্লার দ্বারে
যে-সব আতুর আছে
─ এনে দিয়ো তাদের বাদাম, বসন্তকালীন ফল
এনে দিয়ো জল।
প্রহরি, যে-সব ঘাতক ছিল এতদিন, সান্ত্রী ছিল
─ বোলো আর প্রয়োজন নেই
যদি আমাকে সন্ধান করে
বোলো কেল্লার বাজারে
অন্যায় বেদনাহত মুচি ও সন্তানহীন পরিবার
পাদুকা নির্মাণ করে
তাদেরই তৃতীয় জন অথবা চতুর্থজন আমি বা আমার ভাই
ওখানেই আমাদের পাওয়া যাবে।

 

পুনর্লিখন:২০২০

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (3)
  • comment-avatar
    AMIT SARKAR 1 year

    আমাকে আকর্ষণ করল না। অত্যন্ত ছড়ানো ভাবনা মনে হয়েছে।

  • comment-avatar
    উজ্জ্বল ঘোষ 1 year

    অদ্বিতীয় গৌতম বসু। মনে দুকলম বিরোধিতা যদিও-বা জাগে, তাকে ভাষায় প্রকাশ করতে আরও এক যুগ পড়াশোনা করতে হবে।

  • comment-avatar
    Anup Sengupta 11 months

    গৌতমদা যেভাবে কবি ও সমাজের বহুমাত্রিক সম্পর্ককটি উপস্থাপিত করলেন, তা তাঁর পক্ষেই সম্ভব।