এক জনপদের বিশ্বরূপ দর্শন <br /> অনুপ সেনগুপ্ত

এক জনপদের বিশ্বরূপ দর্শন
অনুপ সেনগুপ্ত

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর বুনো স্ট্রবেরি এক অতি পরিচিত উপন্যাস। তার নামকরণের মাধ্যমে বার্গমানের ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ়’ –এর ঋণ স্বীকার করে। নামকরণ অবশ্যই ওই মহৎ চলচ্চিত্রস্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। স্ট্রবেরি যে কালীঘাটে কখনোই ফলত না, তা লেখক, পাঠক কোনও পক্ষেরই অজনা নয়। কিন্তু রাণুদি যখন স্ট্রবেরি জংশনে নেমে নেবুতলা থেকে শর্টকাট ধরে ভাইফোঁটা দিতে বাপের বাড়ি আসে, তখন দেখি স্বপ্নকে কীভাবে স্মৃতি প্রতিস্থাপিত করছে। স্ট্রবেরি জংশন আমাদের মনে করায় স্বপ্নের ভূগোল পাঠ্যবইতে খুঁজতে যাওয়া পণ্ডশ্রম। ক্যালিফোর্নিয়া কখন কালীঘাট হয়ে উঠবে কেউ জানে না। প্রকৃতপক্ষে এই উপন্যাসে স্বপ্ন বা দিবাস্বপ্ন, স্মৃতি এবং জাগ্রত সাম্প্রতিক এক ত্রিভুজ তৈরি করে। লেখক একটা থেকে অন্যটায় অনায়াসে চলে যান। কখনও কখনও দুটি শীর্ষাবস্থা আলোছায়ার মতো মিশে থাকে। ঘটনাপ্রবাহের এই ভঙ্গি ও ত্রিভুজ সম্পর্ক দেখা যায় বার্গমানের উক্ত চলচ্চিত্রেও। স্বর্গ থেকে বিচ্যুতি, তজ্জন্য অতীতচারণ সেখানেও। কিন্তু দুটি শিল্পকর্মের মধ্যে মৌলিক তফাত আমার মনে হয়েছে – বার্গমানের ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ়’ ব্যক্তিমানুষের, ইসাক বরিয়ে (Isak Borg)-র মন্ময় (subjective) অন্বেষণ – অন্যান্য চরিত্ররা এই আত্মানুসন্ধানে সহযোগী আর সেখানে ‘বুনো স্ট্রবেরি’র উপন্যাসকারের লক্ষ্য হল তন্ময়তা (objectivity)।

যদি ‘আরণ্যক’ উপন্যাস হয়, তবে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ‘বুনো স্ট্রবেরি’ও উপন্যাস। স্মৃতিকথা, ইতিহাস, রম্যরচনা ইত্যাকার ফাঁদ এড়িয়ে এই কথন আমাদের উঠোনে উড়ে আসে। জানলাগুলো খুলে দেয়।

প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘বুনো স্ট্রবেরি’ একরকম ‘open work’. এর প্রথম বা শেষ বলে কিছু নেই। যে-কোনও পরিচ্ছেদ থেকে পড়া শুরু করা যায়। স্বপ্নবৎ ‘মহাপ্রস্থানপর্ব’বোধহয় ছদ্ম সমাপ্তি – প্রকরণগত কৌশল। এখানে ‘work in movement’ এক সময়গহ্বরের অভ্যন্তরে ঘটে – যে কালখণ্ড লেখকের স্পর্শে হয়ে ওঠে এক হারিয়ে যাওয়া অনন্ত। প্রকরণগত কারণে উপন্যাসের উত্তমপুরুষের পক্ষেও অদ্বৈত হয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। আমরা দু-জনের চোখ দিয়ে সব প্রবাহ দেখি। পোপোল আর রসিক প্রাজ্ঞজন। প্রথমজন বয়সজনিত কারণেই সবকিছু বিশ্বাস করে। কিন্তু সভ্যতার অভিজ্ঞতা অন্যজনকে সন্দেহ করতে, পরীক্ষা করতে শিখিয়েছে। চাক্ষুস ও বৌদ্ধিক ভাষ্য এখানে একইসঙ্গে ক্রিয়াশীল। বাস্তবতার অসংখ্য প্রবণতা, ভঙ্গি, সম্ভাবনা তখন অন্তর্প্রবিষ্ট (interpenetrated)। কালীঘাটও নিজেকে দুই সত্তায় ভাঙে। উপন্যাসে পরবর্তীকাল যেন সেই হারিয়ে যাওয়া অনন্তের ‘কাউন্টার পয়েন্ট’। বলতে চাইছি, এই দ্বিরালাপ, আর তার ফলস্বরূপ সংশ্লেষ থেমে যেতে পারে না। ত্রয়োদশীতে অমাবস্যা হলেও না। ক্রিকেট খেলার মধ্যাহ্নবিরতির টুকরো ঠিক জেগে ওঠে। ওই সময়গহ্বর, উপন্যাসে যা সমুদ্ররূপে প্রতিভাত, তার মধ্যে সংলাপ অন্তহীন – আমরা শুনি বা না শুনি। ‘মহাপ্রস্থানপর্ব’কে প্রকরণগত কৌশল বলেছিলাম এই কারণে, প্রলয়ের এই কল্পদৃশ্য আসলে সমাপ্তিরেখা টানে না, গোটা উপন্যাসের আধার হয়ে ওঠে।

সদানন্দ রোড থেকে নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিটে বাঁক নিতেই তা অতীতের সরণি হয়ে উঠতে পারে। তখন উপন্যাসের উত্তমপুরুষ অবশ্যই শৈশব বা কৈশোরের পোপোল। কালীঘাটের পুনরুত্থান ঘটলে চরিত্র-সব আসে, কিছুক্ষণ দাঁড়ায়, তারপর অন্তর্হিত হয়। কোনও কোনও চরিত্রের আরও তাড়া থাকে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই মুখোশ নয়, চরিত্রের মুখোশ্রীকে প্রকাশে উদ্যোগী লেখক। বিবেকের দ্বারা প্রতিস্থাপিত নয় তাদের আত্মা। তারা ‘love life more than the meaning of it.’

শুধুমাত্র অতুলনীয় গদ্যভাষার জন্যেও এই উপন্যাস বারবার পড়া যায়। এর পরতে পরতে ‘উইট’, বিশুদ্ধ ‘হিউমর’, শ্লেষ। তবে অসংখ্য তির্যকরেখার কাটাকুটির মধ্যেও যখন বড়দির প্রসঙ্গ আসে, কিংবা সাধুচরণের মা মিনতিবালা দাসীর কথা, তখন মমত্বের গোপন প্রস্রবণগুলি আমাদের চোখ এড়ায় না ।

উপন্যাসটি নামকরণের মাধ্যমে বার্গমানের ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ়’ –এর ঋণ স্বীকার করে। নামকরণ অবশ্যই ওই মহৎ চলচ্চিত্রস্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। স্ট্রবেরি যে কালীঘাটে কখনোই ফলত না, তা লেখক, পাঠক কোনও পক্ষেরই অজনা নয়। কিন্তু রাণুদি যখন স্ট্রবেরি জংশনে নেমে নেবুতলা থেকে শর্টকাট ধরে ভাইফোঁটা দিতে বাপের বাড়ি আসে, তখন দেখি স্বপ্নকে কীভাবে স্মৃতি প্রতিস্থাপিত করছে। স্ট্রবেরি জংশন আমাদের মনে করায় স্বপ্নের ভূগোল পাঠ্যবইতে খুঁজতে যাওয়া পণ্ডশ্রম। ক্যালিফোর্নিয়া কখন কালীঘাট হয়ে উঠবে কেউ জানে না। প্রকৃতপক্ষে এই উপন্যাসে স্বপ্ন বা দিবাস্বপ্ন, স্মৃতি এবং জাগ্রত সাম্প্রতিক এক ত্রিভুজ তৈরি করে। লেখক একটা থেকে অন্যটায় অনায়াসে চলে যান। কখনও কখনও দুটি শীর্ষাবস্থা আলোছায়ার মতো মিশে থাকে। ঘটনাপ্রবাহের এই ভঙ্গি ও ত্রিভুজ সম্পর্ক দেখা যায় বার্গমানের উক্ত চলচ্চিত্রেও। স্বর্গ থেকে বিচ্যুতি, তজ্জন্য অতীতচারণ সেখানেও। কিন্তু দুটি শিল্পকর্মের মধ্যে মৌলিক তফাত আমার মনে হয়েছে – বার্গমানের ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ়’ ব্যক্তিমানুষের, ইসাক বরিয়ে (Isak Borg)-র মন্ময় (subjective) অন্বেষণ – অন্যান্য চরিত্ররা এই আত্মানুসন্ধানে সহযোগী আর সেখানে ‘বুনো স্ট্রবেরি’র উপন্যাসকারের লক্ষ্য হল তন্ময়তা (objectivity)।

সেই কবে, বারোক যুগে, কবি কেবেদো (Quevedo) লিখেছিলেন: ‘… waters of the abyss / where I was falling in love with myself.’ আজ তো সেলফিশাসিত পৃথিবীতে প্রত্যেকের অনেক মুখ। কিন্তু আমাদের আলোচ্য উপন্যাসে জলের অতলে কোনো ‘হাইপাররিয়ল’ নার্সিসাসের ছিন্নভিন্ন মুখবিম্ব নেই, পক্ষান্তরে এক জনপদের বিশ্বরূপদর্শন।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (1)
  • comment-avatar
    Shatanik Roy 4 months

    বহুদিন পরে এরকম অসাধারণ একটা আলোচনা পড়লাম। আলোচকের রক্তমাংসের থেকে উচ্চারিত সমস্ত বাক্য।