অবচেতনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ  <br /> কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং (অনুবাদ- রিনি গঙ্গোপাধ্যায়)

অবচেতনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ
কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং (অনুবাদ- রিনি গঙ্গোপাধ্যায়)

" যদি আমি একবারও বাইরের দিকে না তাকিয়ে একটি গাড়িতে বা ট্রেনে চলমান থাকি তাহলে একমাত্র থেমে যাওয়া, গাড়ি চালু হওয়া, বা আচমকা কোন বাঁক নিলে তবে আমি বুঝতে পারব যে আমি শেষ পর্যন্ত চলমান।" কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর রচনার ধারাবাহিক অনুবাদে রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

বেশিরভাগ মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে কীভাবে ক্রমান্বয়ে পৃথিবী ও তার নিজের সম্পর্কে অবহিত হয়ে ওঠে তার ওপরে নির্ভর করে তার যৌবনকাল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। শৈশবকালে আবেগের তীব্রতা খুব বেশি থাকে, শিশুর প্রাথমিক স্বপ্নগুলো সাধারণত প্রতীকের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, যা গড়ে ওঠে তার মানসিকতার মূল কাঠামো দ্বারা, যা পরবর্তীকালে সাংকেতিত করে ঐ বিশেষ শিশুটির ব্যক্তিক চিন্তাপদ্ধতির আকার কেমন রূপ লাভ করবে সে বিষয়ে। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে বোঝানোর জন্য ইয়ুং একদল ছাত্রকে একজন যুবতীর কথা বলতেন যে তার উদ্বিগ্নতা দ্বারা তাড়িত হয়ে ছাব্বিশ বছর বয়সে আত্মহত্যা করে। শিশুবেলা থেকে সে স্বপ্ন দেখত যখন সে বিছানায় শুয়ে আছে তখন একটি তুষার-মানব তার ঘরে প্রবেশ করছে ও তার পেটে খিমচে দিচ্ছে। সে জেগে উঠত এবং আবিষ্কার করত যে সে নিজেই তার পেটে খিমচে দিয়েছে। এই স্বপ্নটি তাকে আতঙ্কিত করত না, সে ক্বচিৎ মনে রাখতে পারত সে এমন একটি স্বপ্ন দেখেছে; কিন্তু সত্যিটা হল, সে বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়ার দ্বারা এই তুষার-রাক্ষসের মুখোমুখি মোকাবিলা করতে পারেনি, তাকে জীবনের জঞ্জাল ভাবতে পারেনি, নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে সুনিশ্চিত হতে পারেনি। এবং এই পুরো বিষয়টা ছিল অস্বাভাবিক। শুধুমাত্র একটি ঠান্ডা, জড় হাতের জন্য সে পরে তার জীবন শেষ করে দিল। এই একটি মাত্র স্বপ্ন থেকে স্বপ্নদ্রষ্টার দুর্ভাগ্যজনক নিয়তি অনুমান করা সম্ভব, যা তার শিশুবেলার মানসিকতা থেকেই প্রত্যাশিত ছিল।
কখনো কখনো হয়তো তা স্বপ্ন নয়, কিন্তু ভীষণই হৃদয়স্পর্শী একটি বাস্তব ঘটনা হতে পারে, বা একটি ভবিষ্যত বাণী যা প্রত্যাশিত ভবিষ্যতের একটি সাংকেতিক রূপ। এটা সুজ্ঞাত যে বড়রা যে হৃদয়স্পর্শী ঘটনাটি মনে রেখে দেন, শিশুরা অনেক সময়ই তা ভুলে যায়; কিন্তু এমন অনেক ঘটনার জ্বলন্ত স্মৃতি তাদের স্মরণে থাকে যা তারা ছাড়া অন্য কেউ আর লক্ষই করেনি। যখন সে এরকম কোনো শৈশব স্মৃতির দিকে ফিরে তাকায় ও বর্ণনা করে ( যদি তার সাংকেতিকতা ব্যাখ্যা করা যায়) আমরা সাধারণত খুঁজে পাই যে, এটিই তার শৈশব কালের মানসিকতা সংগঠনের মূল সমস্যা।
যখন একটি শিশু স্কুলে যেতে শুরু করে তখনে থেকেই তার ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার এবং বাইরের পৃথিবীকে গ্রহণ করার পর্যায়টি শুরু হয়। এই পর্যায়টি সাধারণতঃ বহু সংখ্যক দুঃখজনক চমক নিয়ে আসে শিশুর জন্য। ঠিক একই সময়ে কিছু শিশু অন্যান্যদের থেকে নিজেকে আলাদা ভাবতে শুরু করে এবং এই অনন্য অনুভূতি তাদের মধ্যে সুনিশ্চিতভাবে একটি বিষন্নতা আনে যা তাদের একাকিত্বের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। পৃথিবীর অসম্পূর্ণতা এবং যে অশুভ ভাব শিশুর অন্তরে বা বাইরের পৃথিবীতে আছে তা একটি সচেতন শিশুর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শিশুটি খুব দ্রুত ( যদিও তখনও পর্যন্ত না বুঝে) তার ভিতরের প্রবৃত্তি ও বাইরের পৃথিবীর চাহিদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

যদি চেতন মনের স্বাভাবিক উদ্ঘাটন বাধাপ্রাপ্ত হয় শিশু তখন ঘনঘন বাইরে পৃথিবী এবং ভিতরের অসুবিধে থেকে নিজেকে তার ভিতরের একটি দুর্গে সরিয়ে আনে; এবং যখন এটা ঘটে তখন তাদের অবচেতন মনের স্বপ্ন ও সাংকেতিক ছবি প্রকাশ করে একটি বিশেষ বৃত্তের অস্বাভাবিক মাত্রা, চতুর্ভুজাকার, এবং এটি একটি কেন্দ্রিয় মোটিফ। আগে যে কেন্দ্রীয় মানসিকতার উল্লেখ করা হয়েছে এটা তাকে এই বোঝায়, ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র যার ওপর ভিত্তি করে চেতনের সম্পূর্ণ সাংগঠনিক গড়ন দাঁড়িয়ে থাকে। এটা খুব স্বাভাবিক যে যখন কেন্দ্রিয় মানসিকতার ছবি এমন মারাত্মক ভাবে হাজির হয় তখন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য ভয়ের মুখে পড়ে। এই রকম একটি কেন্দ্রিয় মানসিকতা থেকে যখন সরাসরি ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠতে থাকে ( যতটা অন্তত আজকের দিনে জানা যায়) তখন ব্যক্তিত্ব স্পষ্টতই একটি বৈকল্পিক অথবা মূল কেন্দ্রের একটি সাংগঠনিক প্রতিরূপ তৈরি করে।
এই প্রাথমিক পর্যায়েটিতে বহু শিশু যারা জীবনের যেসব অর্থ উপলব্ধি করে সত্যি সত্যিই অসুস্থ তা তাদের ভিতরের বিশৃঙ্খলা ও বাইরের বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সমঝোতা করতে সাহায্য করে। কিন্তু অন্য শিশুরাও আছে যারা তখনও পর্যন্ত অচেতনভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং প্রবৃত্তিগত সক্রিয়তার আর্কেটাইপ বা আদিরূপাত্মক আদর্শকে বহন করে; কারণ প্রেম, প্রকৃতি, খেলাধুলা এবং কাজ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা তাদের জন্য তাৎক্ষণিক এবং সন্তোষজনক অর্থ বহন করে। ফলে তারা কখনোই অতিমাত্রায় সচেতন নয়। সাধারণত তারা যে জীবনপ্রবাহ বহন করে তা কম ঘর্ষণযুক্ত এবং কম ব্যাঘাতযুক্ত। অন্তর্মুখী চরিত্রদের সেই তুলনায় অনেক বেশি ঘর্ষণযুক্ত জীবনপ্রবাহ বহন করতে হয়।
যদি আমি একবারও বাইরের দিকে না তাকিয়ে একটি গাড়িতে বা ট্রেনে চলমান থাকি তাহলে একমাত্র থেমে যাওয়া, গাড়ি চালু হওয়া, বা আচমকা কোন বাঁক নিলে তবে আমি বুঝতে পারব যে আমি শেষ পর্যন্ত চলমান।
চেতন গড়ে ওঠে ব্যক্তির নিজস্ব অন্তর সংগঠনের কেন্দ্র থেকে (কেন্দ্রিয় মানসিক সংগঠন) বা নিজের থেকে, যা সাধারণত শুরু হয় ব্যক্তিত্বের কোনো ক্ষত থেকে এবং তাকে কেন্দ্র করে কষ্টভোগ চলতে থাকলে — এটাই হল স্বাতন্ত্র নির্মাণের প্রকৃত পদ্ধতি। এই প্রাথমিক চমক পরিমাণ অনুসারে অন্ধকারের প্রকার। যদিও তা প্রায়শই চেনা যায় না। এর বিপরীতে অহং এর ইচ্ছে অথবা আকাঙ্ক্ষা সাধারণতঃ বাইরের বাধার দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হলে অহং আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
তখনই অহং ঈশ্বরকে দোষ দিতে থাকে অথবা অর্থনৈতিক অবস্থাকে অথবা অফিসের বসকে বা বিবাহ সঙ্গীকে যাতে সে অহং মুক্তির পথের বাধাগুলো সম্পর্কে আরো দায়িত্ববান হতে পারে।
অথবা কখনো বাইরে থেকে সব ঠিক আছে মনে হলেও চেতনের পৃষ্ঠতলের নিচের স্তরে একজন মানুষ মারাত্মক একঘেয়েমিতে ভুগতে পারে যা তার কাছে সব কিছুকেই অর্থহীন ও শূন্য করে তোলে।

অনেক মিথ এবং রূপকথার গল্প সাংকেতিকভাবে বর্ণনা করে এই প্রাথমিক পর্যায়টির যা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র গড়ে তোলে।
যেমন একজন রাজা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বা বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। অন্য পরিচিত গল্পের নমুনাটি হলো একজন রাজদম্পতি সন্তানহীন অথবা একজন রাক্ষস একটি রাজ্যের মহিলা শিশু, ঘোড়া এবং সমস্ত সম্পদ চুরি করে অথবা এক রাজার যাত্রাপথে এক রাক্ষস তার সমস্ত সৈন্য, জাহাজ আটক করে রেখে দেয়। অথবা অন্ধকার ছায়া ফেলেছে একটি ভূমির ওপর; জলের কূপগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে অথবা বন্যা দেখা দিয়েছে বা খরা বা তুষারপাত কষ্ট দিচ্ছে একটি দেশের মানুষকে– এইভাবে প্রাথমিক মুখোমুখি মোকাবিলা হয় নিজের সঙ্গে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি কালো ছায়া নিক্ষেপ করতে থাকে অহং-এর উপর অথবা এই আভ্যন্তরীণ ‘বন্ধু’ প্রথমে এইভাবে ফাঁদ পাতে অসহায় দুঃখভোগরত অহংকে ধরার জন্য।
রাজার অসুখ এর মিথটিতে আমরা দেখি একজন জাদুকর বা একজন ফকির রাজার দুর্ভাগ্যকে দূর করে অথবা তার দেশ সব সময় বিশেষ কিছু প্রমাণ করে। আরেকটি গল্পে রাজার স্বাস্থ্য ফেরানোর জন্য একটি সাদা কালো পাখি বা একটি মাছ যে তার কানকোয় একটি সোনার আংটি ধরে আছে তাদের প্রয়োজন হয়। আরো কতগুলো মিথে রাজা চান জলের জীবন বা শয়তানের মাথা তিনটি সোনালি চুল অথবা এক নারীর বিনুনি এবং স্বাভাবিক ভাবেই পরে সেই নারীকে। রাজার চাহিদা যাই হোক না কেন এটা অবশ্যই বেরিয়ে আসে যে অশুভকে খুঁজে পাওয়া সবসময়ই স্বতন্ত্র ও কঠিন।
ব্যক্তির প্রাথমিক সংকটের সঙ্গে এর যথেষ্ট মিল পাওয়া যায় । কেউ একজন এমন একটি জিনিস খুঁজছে যা পাওয়া সম্ভব নয়, অথবা তার সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। এইসব মুহূর্তে ভালো করে বোঝান ও সংবেদনশীল উপদেশ একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। যেসব উপদেশ ব্যক্তিকে আরো দায়িত্ববান হতে বলে, ছুটি কাটাতে বলে, বেশি কাজ না করতে বলে, অথবা আরও বেশি করে কাজ করতে বলে, কমবেশি মানুষের সঙ্গ করতে বলে অথবা কোন শখ পূরণ করতে আগ্রহী করতে চায় —- এগুলো কোনোটিই ব্যক্তিকে সাহায্য করে না বা খুব কম সাহায্য করে। একটি মাত্র ব্যাপার এ বিষয়ে সাহায্য করতে পারে বলে মনে হয় তা হল কুসংস্কারমুক্ত ও পাপবোধমুক্ত হয়ে সরাসরি মনের অন্ধকার কে প্রশ্ন করা এবং এর গোপনীয়তা কে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা অথবা এই অন্ধকার ব্যক্তির কাছে কি দাবি করছে তা খুঁজে বের করা।
এই অন্ধকারের গোপন উদ্দেশ্য সাধারণত খুবই অস্বাভাবিক, স্বতন্ত্র এবং অপ্রত্যাশিত। কোন সূত্রের দ্বারা স্বপ্ন বা কল্পনার মাধ্যমেই অবচেতন থেকে যা উঠে আসছে তার ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যদি কেউ একাগ্র মনোনিবেশ করে অবচেতনে, কোনো হঠকারী অনুমান না করে বা আবেগময় পরিবর্জন না করে তাহলে অনেক সময় সংকেতময় ছবির সহায়তায় এই অন্ধকার রহস্য ভেদ করা যেতে পারে। হয়তো সব সময় নয় ,কিন্তু কিছু সময় এই অন্ধকারের প্রস্তাবনায় থাকে ব্যক্তির সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু যন্ত্রণাজাত উপলব্ধি এবং সেই ঘটনাগুলোর প্রতি সচেতন মনোভাব। এরপর ব্যক্তি অবশ্য এই বিষাক্ত সত্যগুলোকে গিলে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)