অজিত সিং বনাম অজিত সিং<br />  ত্রিশতম পর্ব <br /> তৃষ্ণা বসাক

অজিত সিং বনাম অজিত সিং
ত্রিশতম পর্ব
তৃষ্ণা বসাক

অজিত সিং বনাম অজিত সিং দ্বাবিংশতি পর্ব তৃষ্ণা বসাক অজিত সিং প্রথমে ছিল বঙ্গলক্ষ্মী চানাচুর, তারপর এল আজাদ হিন্দ চানাচুর, তারপর একের পর এক বিপ্লব চানাচুর, সর্বহারা চানাচুর, উন্নততর সর্বহারা চানাচুর, এখন চলছে বিশ্ববাংলা। এখানেই কি ভাবছেন গল্প ফুরিয়ে গেল? এবার আসছে একে ফিফটি সিক্স চানাচুর। নাম যাই হোক, সোল এজেন্ট আমি।’ ‘বেওয়ারিশ’ গল্পের চানাচুরওলা এবার ঢুকে পড়েছে বাংলার শিল্পক্ষেত্র থেকে শিক্ষাজগতের ক্ষমতার অলিন্দে।খুন, যৌনতা, প্রতিশোধ, নিয়তিবাদের রুদ্ধশ্বাস সুড়ঙ্গে সে টের পাচ্ছে- -বহুদিন লাশের ওপর বসে বারবার হিক্কা তুলেছি আমরা -বহুদিন মর্গের ভেতরে শুয়ে চাঁদের মুখাগ্নি করেছি আমরা -অন্ধ মেয়ের মউচাক থেকে স্বপ্নগুলো উড়ে চলে গেছে (জহর সেনমজুমদার) এই সবের মধ্যে বাংলার কি কোন মুখ আছে আদৌ? থাকলে কি একটাই মুখ? না অনেক মুখ, সময়ের বিচিত্র রঙে চোবানো? বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দী জুড়ে বাংলার অজস্র মুখের ভাঙ্গাচোরা টুকরো খুঁজে চললেন তৃষ্ণা বসাক, তাঁর নতুন উপন্যাস ‘অজিত সিং বনাম অজিত সিং’-এ । সব কথনই রাজনৈতিক, সেই আপ্তবাক্য মেনে একে কি বলা যাবে রাজনৈতিক থ্রিলার? সিটবেল্ট বাঁধুন হে পাঠক, ঝাঁকুনি লাগতে পারে। প্রকাশিত হল উপন্যাসের ৩০ তম পর্ব। এই উপন্যাসের সব চরিত্র কাল্পনিক।

৩০

‘তোর সঙ্গে কি একদিন স্কাইপে কথা হতে পারে দোলন?’
‘স্কাইপ? সেটা কী?’ লিখতে গিয়েও লিখল না।
সে তো দোলনচাঁপা ধর, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, গোল্ড মেডেলিস্ট, সিংহ মরে গেলেও সিংহ। সে বুঝতে পারল, কোন একটা অ্যাপের কথা বলছে বিদিশা, যা তাকে ইন্সটল করতে হবে ল্যাপটপে। সেটা এখন তার নেই বটে, কিন্তু ইন্সটল করা হাতিঘোড়া কিছু ব্যাপার নয়, কয়েক মিনিটেই হয়ে যায়। তাছাড়া ফোনেও তো এটা নিয়ে নেওয়া যায় নিশ্চয়, যায় না? কিন্তু তার জন্যে তাকে একটা সেল ফোন কিনতে হবে, যেমন তেমন নয়, অ্যান্ড্রয়েড ফোন। তার তো নিজস্ব কোন ফোনই নেই। তার এখন প্রাথমিক কাজ একটা স্মার্ট ফোন কেনা। সত্যিই কি সেটাই প্রাথমিক কাজ? এর থেকেও জরুরি কাজ কাল রাতে শুয়ে শুয়ে ভেবেছিল। কী যেন, সেটা এই মুহূর্তে তার মনে পড়ল না। এইরকমই হচ্ছে। একটা সংকল্প করছে মনে মনে, পরমুহূর্তেই ভুলে যাচ্ছে, খুব উৎসাহে নতুন দিন শুরু করতে যাচ্ছে, তারপরেই ঝিমিয়েপড়ছে, শুধু মানসিক ভাবে নয়, শারীরিক ভাবেও। নার্ভের এই ওষুধগুলো তাকে শেষ করে দিয়েছে। সে কি আর কোনদিন আগের জীবন বাঁচতে পারবে?
ছোট থেকে খুব সুরক্ষিত জীবন বেঁচে এসেছে সে। স্কুল, বাড়ি, টিউশন। টুয়েলভ অব্দি মা স্কুল গেট অব্দি ছেড়ে আসত, টিউশনও নিয়ে যেত। মা না পারলে বাবা। কখনো সে একা যাতায়াত করেছে বলে মনে পড়ে না। ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে বিদিশাকে পেল। অল্প যা এদিক ওদিক, কোন স্যারের বাড়ি বা লাইব্রেরি-সব বিদিশার সঙ্গে। তারপর তো প্রদীপ্ত এল ওর জীবনে। বিদিশার সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে লাগল। ঝিলপাড় থেকে ভিক্টোরিয়া, কিংবা নিউ এম্পায়ারে সিনেমা দেখা সব প্রদীপ্তর সঙ্গে। সেই যে ব্যাকগ্রাউন্ডে সুমনের গান বাজছিল –শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই। হয়তো বিদিশা খুব কষ্ট পেয়েছিল, একা হয়ে গিয়েছিল। সেসময় এসব ভাবেই নি দোলন। শুধু নিজের কেরিয়ার আর প্রদীপ্ত ছাড়া আর সব কিছু মুছে গেছিল মাথা থেকে। ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ে সে আর বিদিশা দুজনেই চাকরি পেল। মাইনে আর গ্ল্যামার দুয়ের হিসেবেই দোলন এগিয়ে, সেই নিয়ে কি বিদিশা কোন হীনমন্যতায় ভুগতে
শুরু করেছিল? সেটাও খেয়াল করেনি দোলন। খেয়াল রাখার কথাও নয় সে সময়। তার সামনে তখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইশারা। আসল ধাক্কাটা খেল ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে। ন্যাশানাল টাইমসের প্রেসে তার জন্যে একের পর এক মোহভঙ্গ অপেক্ষা করে ছিল। মেশিন ফ্লোরে যথেষ্ট হেনস্থা আর অপমানের পর তাকে কম্পিউটারে ঠেলে দেওয়া হল। স্রেফ ডেটা এন্ট্রি, চিঠিচাপাটি করানো হচ্ছিল একজন ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে।প্রতিদিন বাড়ি এসে মার কাছে কাঁদত সে, চাকরি ছাড়বেই, কিন্তু ঠিক কবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে সেটা স্থির করতে পারছিল না। আর সেই প্রথম ও একা একা যাতায়াত করছিল।সেই প্রথম ও নিজের যন্ত্রণাগুলো একা একা গিলতে শিখছিল। কেন সে দাঁতে দাঁত চেপে ওখানেই পড়ে থাকল না? কেন সে ভাবল অ্যাকাডেমিক লাইন তার জন্য ঠিক? কেন সে ভাবল শিক্ষাজগতটা পবিত্র তপোবনের মতো, পঠন, পাঠন আর শান্তির আবাসভূমি? আর ইন্ডাস্ট্রি খুব মাচো আর হিংস্র একটা জায়গা?
নাহ এবার থেকে তাকে টু ডু লিস্ট বানাতে হবে। ইনশাল্লাহ। ইস, সেও দেখছি বিদিশার মতো বলছে। লগ আউট না করেই কম্পিউটার বন্ধ করে দিল দোলন। ওর মনেও থাকল না যে বিদিশার মেলের উত্তর দেওয়া হল না।এখন কি খেয়ে নেবে সে? নাকি খাওয়া হয়ে গেছে? মনে পড়ল না তার। অবশ্য এটা কোন সমস্যা নয়। রান্নার মাসী রাতের রান্না ঠান্ডা করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে যায়। প্রদীপ্ত খেয়ে বেরিয়ে গেলে টেবিলে শুধু তার দুপুরের খাবারই পড়ে থাকার কথা। দোলন ডাইনিং টেবিলে দেখল তার থালাতে ভাত, মাছ, তরকারি বেড়ে জাল দিয়ে ঢাকা দেওয়া আছে। ঢাকা খুলে দেখল উচ্ছে বেগুন বড়ি দিয়ে ঝাল, সর্ষে বাটা দিয়ে পারসে ধনেপাতা ছড়ানো আর ঝিঙ্গে পোস্ত। এগুলো একসময় তার খুব প্রিয় খাবার ছিল নিশ্চয়, এখনো আছে কি? বুঝতে পারল না। তবু সে হাত ধুয়ে খেতে বসে গেল, পাশে একটা বই, ইলুমিনেশন টেকনিকস। খাবার সময় বরাবর পাশে একটা বই থাকে দোলনের। আর সেটা পড়ারই বই।পড়ার বইয়ের বাইরে ফেলুদা ছাড়া আর কোন বই পড়েছে কিনা মনে পড়ল না তার। কেন পড়েনি? বিদিশা প্রচুর পড়ত এইসব বই। নাটক দেখতে যেত অকাদেমিতে, যেতে বলত দোলনকে, দোলন, কলকাতার মেয়ে হয়েও যায়নি কোনদিন।তার মনে হত সময় নষ্ট হবে। আচ্ছা, সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে, জীবনের সব রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ বাদ দিয়ে শুধুই বেশি বেশি নম্বর পেয়ে ফার্স্ট হয়ে কী লাভ হল তার আখেরে? প্রদীপ্ত, তার চেয়ে সামান্যই সিনিয়র, পড়াশোনায় অনেক মামুলি, কিন্তু খুব ফোকাসড, সেভেন্টি ফাইভ পারসেন্ট রেখে গেছে বরাবর, ওটাই অনার্স মার্ক্স ছিল।নিজে সক্রিয় রাজনীতি না করুক, ইউনিয়নের ছেলেদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে গেছে। অবশ্য প্রদীপ্তর একটা সুবিধে ছিল, ও তো সুদূর মফস্বলের ছেলে, আলিপুরদুয়ার, তাই হস্টেলে ছিল, এর ফলে অনেক এক্সপোজার বেশি।
এক্সপোজার, এক্সপোজার। শব্দটা ভাবতে ভাবতে ভাত নাড়াচাড়া করছিল দোলন। পার্সে মাছটার দারুণ স্বাদ, ডিমও হয়েছে একটু। তবুও সেই স্বাদ যেন দোলনের ভেতরে পৌঁছচ্ছিল না। আজ এই প্রথম ওর খুব একা লাগছিল। এত বছর ও বাড়িতে আছে, প্রদীপ্ত বেরিয়ে গেলে বেশিরভাগ সময়টা তো ওকে একাই থাকতে হয়। ওর কিছুই মনে হয়না কখনো। বরং ওর ভালো লাগে। অন্য লোক, সে প্রদীপ্ত হলেও তার উপস্থিতি সে সহ্য করতে পারে না। ওর সেই ওভাল টেবিলটার কথা মনে হয়, ওই যে রোগা, চশমা পরা, সাইকেলে চক্কর কাটা
লোকটা, ওর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলেছিল ‘আই নো হার’। সেই কথাটা মনে পড়ে যায় আর নিজেকে মনে হয় যেন মর্গের টেবিলে পড়ে থাকা ঠান্ডা লাশ। চশমা পরা লোকটা, যেন একটা মরা ইঁদুর দেখছে, এইভাবে নাক কুঁচকে বলছে ‘আই নো হার’। গা গুলিয়ে উঠল দোলনের। তবু সে জোর করে বাকি ভাতটুকু খেয়ে নিল। মার শিক্ষা। ভাত হচ্ছে লক্ষ্মীর দানা, একটুও নষ্ট করা যাবে না, নষ্ট করলে কষ্ট পেতে হয়।যত বাজে কথা। কিছুই নষ্ট না করে সে এত কষ্ট পেল কেন?

আগে আগে খেয়ে ভাতের থালা ডাইনিং টেবিলেই রেখে যেত দোলন।ওর কিছু মনেই হত না। বিষয়টা যে ভালো দেখায় না, সেই বোধ তার মধ্যে থেকে চলে গেছিল।এটা ঠিক, মা বরাবর তাকে মুখে মুখে সব জুগিয়ে গিয়েছে, কিন্তু কয়েকটা বেসিক কাজ তাকে করতেই হত। নিজের বিছানা তোলা, খেয়ে নিজের এঁটো থালা বেসিনে নামিয়ে আসা, বাবার অফিসের কেউ এলে মার পাঠানো জল, মিস্টি, চা দিয়ে আসা।বহু বছর সেসব অভ্যেস চলে গেছিল তার, আর কেউই আসে না তাদের এখানে। কাগজ, দুধ, কুরিয়ার ছাড়া বহু দিন কেউই আসেনি এখানে। বাবা মা পরপর চলে গিয়ে লৌকিকতা করার পাট চুকে গেছে, কোথাও যাবার জায়গাও নেই তার। ভালই হয়েছে। বাবা, বিশেষ করে মাকে একদম দেখতে পারত না সে, দেখলেই ভায়োলেন্ট হয়ে উঠত। ছোট থেকে মা তাকে খেলাধুলো, বন্ধুবান্ধবের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে যেভাবে ইঁদুর দৌড় করিয়েছে, প্রদীপ্তকেও মেনে নিয়েছে সে নেহাত অধ্যাপনায় ঢুকতে পেরেছে বলে, সেইসব কী কাজে দিল তার? মাকে দেখলে সে হাতের কাছে যা পেত ছুঁড়ে মারত।মা আসত না তারপর থেকে। মা তো প্রদীপ্তকে কোনদিনই দোলনের জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি, আর ইউনিভার্সিটিতে তার ব্যর্থতার জন্যে প্রদীপ্তকেই দায়ী করত, বারবার বলত, ও ভেতরের খবর ঠিকমতো রাখতে পারলে অবশ্যই দোলন ঢুকে যেত। বউয়ের জন্যে একটু তদবির তো দূরের কথা, সামান্য খোঁজ খবরটাও রাখেনি প্রদীপ্ত। নিশ্চয় এর পেছনে ওর সেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাই কাজ করেছে, বউকে উঠতে দেব না। এইসব কথাগুলো মা আড়ালে আবডালে নয়, প্রকাশ্যেই বলতে শুরু করেছিল। প্রদীপ্তর সামনেও এসব বলতে মার মুখে আটকাত না। তাতে আরও অসহ্য লাগত দোলনের। যদিও সেই সময় ও প্রায় অন্য জগতে চলে গেছিল। ওর কানে প্রায় এসব কোন কথা যেত না। কিন্তু তবু যখন যখন ও বাস্তবে ফিরে আসত, মায়ের কথাগুলো শুনতে পেত, ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত। এই মহিলা ছোট থেকে তার জীবনটা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন, সে নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করেছে, এটাও উনি সহ্য করতে পারছেন না। ও মাকে দেখলেই তাই রেগে যেত। মা ওর রাগের কারণ বোঝার চেষ্টা করেনি, উল্টে মহা অসন্তুষ্ট হয়ে এ বাড়ি আসাই ছেড়ে দিয়েছে। বাবা আসত তবু। কথা বলত না দোলন, বাবা চুপ করে বসে থেকে থেকে চলে যেত। একদিন বাবার আসাও বন্ধ হয়ে গেল। দোলন তো কিছু বলেনি বাবাকে। বরং বাবাকে দেখলে ওর ভেতরে একটা পরম নিশ্চয়তার বোধ জাগত, সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু বাবা আর এল না এক বিকেলের পর। সেটা কবে, কত বছর আগে? মনেও পড়ে না দোলনের। বাবা কেন আসছে না সেটা জানার ইচ্ছেও হয়নি তার। সবসময় একটা ঘুমের পর্দা তাকে ঘিরে রাখত। খুব সম্প্রতি ও জানতে পেরেছে, বাবা আর নেই, বাবা যাবার এক বছরের মধ্যে মাও চলে গেছে। মেয়েকে নিয়ে সব যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে তাদের, সেটা ঠিক কবে সে অনেক বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে পারে না, সব কেমন ঘোলাটে লাগে। কিন্তু আজ এতদিন পরে সেই বিগত শোক তাকে পেড়ে ফেলল। চিৎকার করে কাঁদল দোলন, কাঁদতে আরাম লাগছিল তার।

কান্না থামল একসময়। তখন সে থালা বাসন গুছিয়ে তুলল। এঁটো বাসন পড়ে থাকত তার আগে। বিকেলে রূপা এসে তুলত। কখনো রূপা না এলে প্রদীপ্ত তুলত। আজকাল এঁটো থালা পড়ে থাকতে দেখলে খারাপ লাগছে দোলনের। সে সব সিংকে নামিয়ে আসছে কদিন ধরে, তারপর ডাইনিং টেবিল মুছে রাখছে। প্রদীপ্ত ফিরলে একেকদিন চা করেও দিচ্ছে। কিন্তু প্রদীপ্তর মুখে তাতে খুশি ফুটছে না কেন? কত রাত তো প্রদীপ্ত দোলনকে জড়িয়ে হুহু করে কেঁদেছে, ‘কবে, কবে তুমি আবার আগের মতো হবে দোলন? কবে আবার আমরা আগের জীবন ফিরে পাব?’
এই প্রদীপ্ত তার জন্য প্রমোশন নেয়নি, বিদেশে যাবার অফার ফিরিয়েছে, সে কিনা তার একটু একটু করে ভালো হয়ে ওঠার খবরে খুশি নয়, না কি সেটা দোলনের বোঝার ভুল, হয়তো কোন ব্যাপারে খুব চিন্তায় আছে সে। পি এইচ ডি কি? বুকের মধ্যে একটা খাঁ খাঁ শূন্যতা তৈরি হল মুহূর্তের জন্যে, তারপর দোলন ভাবল, প্রদীপ্তর তো পি এইচ ডি করেই ফেলা উচিত ছিল। তার বেদনা তো তাকেই বইতে হবে। এবার থেকে তার সঙ্গে যা ঘটেছে তার প্রতিশোধ সেই নেবে। সোফায় বসে জানলা দিয়ে তাকাল দোলন। রোজই এক দৃশ্য। তবু অনেকখানি আকাশ দেখা যায় এখান থেকে, আর গাছ অনেক এদিকটায়। দোলন কদমগাছটাকে দেখতে পেল সোজা তাকিয়ে। প্রচুর ফুল ফুটেছে আর পাগল করা একটা গন্ধ আসছে এখানেও। প্রাণ ভরে ঘ্রাণ নিল সে। এই তো সে কদমের ঘ্রাণ পাচ্ছে পুরো। আর কী চাই জীবনে? কে কী করল তার সঙ্গে, তার জন্যে জীবন নষ্ট করবে কেন সে? সে আবার নতুন করে শুরু করবে জীবন। কিছু একটা করবেই। হয়তো বাঁধা গতের দশটা পাঁচটা চাকরি নয়, অন্যরকম কিছু। এখনো ভেবে উঠতে পারেনি। তার মাথা বেশি চাপ নিতে পারে না। সে সেন্টার টেবিল থেকে প্যাড আর পেন টেনে নেয়, আর রিমোট নিয়ে টিভিটাও চালায়। হাবিজাবি খবর হয়। বারোটা ব্রেকিং নিউজ। বাব্বা, ব্রেক করে যাবে তো।
বাজে খবর যত। সে কাগজে এক দুই করে বুলেট দ্যায়। চার, চারটে নাম ছিল। এদের দেখে নেবে সে। কিন্তু নামগুলো মনে পড়ে না তার। পরে পড়বে নিশ্চয়। সেইসময় একটা খবরে চোখ চলে যায়। চকচৌধুরী তলায় খুন হয়েছে বিবস্বান ভটচায ওরফে বুকো, তার পাশে একটা বই পড়ে ছিল। লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরা।গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। এর নামটা শোনা শোনা লাগে তার। বইটা কার? যে খুন করেছে না যে খুন হয়েছে? এর পরের খবরটা সোজা তাদের ক্যাম্পাসের। একটা ছিপছিপে লোক মেন বিল্ডিঙ্গে ঢুকছে, পেছন পেছন বুম হাতে সাংবাদিক একটা মেয়ে, ‘সিংজী, হস্টেলের ব্যাপারটা একটু বলুন’ লোকটা এক ঝলক তাকাল, তারপর ঢুকে গেল উত্তর না দিয়ে। তাকানোটা কীরকম চেনা চেনা। কোথাও কি দেখেছে একে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন সিংজীর কথা শোনেনি তো প্রদীপ্তর মুখে? অবশ্য প্রদীপ্ত অনেক বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কথা তাকে বলে না। একবার বলে ফেলে সাংঘাতিক কাণ্ড হয়েছিল। দোলন প্রায় হিস্ট্রেরিক হয়ে উঠেছিল, সে সময় তাকে কড়া সিডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হত।সেই থেকে কিছু বলে না প্রদীপ্ত বাড়িতে। কিন্তু কোন ফোন এলে কিছু কিছু কথা তো কানে আসেই। এই ছোট কোয়ার্টারে কিছু লুকনো যায় না তার কাছ থেকে।তবে আজকাল এসব কানে এলে কিছুই মনে হয় না দোলনের। এই তো, ও তো নামগুলোই মনে করতে পারল না। কোন ফুলের আবিরের সুগন্ধ হঠাৎ ঘিরে ফেলল ওকে। দোলের কথা মনে পড়ে গেল, সেই যে এক ভোরবেলা, দাঁড়িয়ে থাকা সেতুর ওপর। দোলের পরের দিন ছিল সেটা। রাস্তায় আগের দিনের আবির পড়েছিল। ওকে ঘুম ভেঙ্গে না দেখতে পেয়ে পাগলের মতো ছুটেছিল প্রদীপ্ত, ওকে কোথাও দেখতে পায়নি প্রথমে, ঝিলের জলের দিকেও চেয়েছিল হয়তো, অতল কালো জলের মধ্যে ও আছে ভেবেছিল। কিন্তু দোলন তো দাঁড়িয়েছিল আর্টস আর সায়েন্সের মাঝখানের সেই সাঁকোটার ওপর। এই সাঁকোয় বিকেলে অনেকে আড্ডা মারে, গান গায়, প্রেম করে। কিন্তু ছুটির ভোরে কি নির্জন আর পবিত্র ছিল সেই সাঁকো। তার ওপর দাঁড়িয়ে খুব আনন্দ হচ্ছিল দোলনের। সে নিজেও ঠিক জানত না কেন সে বেরিয়ে পড়েছিল। সেদিন আসলে ভোরে তলপেটে চাপ লাগতে বাথরুমে যায়। ফেরার সময়, জানলার পর্দা সরিয়ে দেখে আধো অন্ধকার ভোর, সেই ভোরে নাকে আবিরের গন্ধ পেয়েছিল, গন্ধ নয়, সুগন্ধ। ফুল দিয়ে তৈরি আবির, তার সুগন্ধ। ও যেন দেখতে পেয়েছিল শুখনো ফুল গুঁড়িয়ে চূর্ণ করা হচ্ছে। সত্যি তো তা নয়। ট্যালকম পাউডারে কৃত্রিম সুগন্ধি ছড়িয়ে তৈরি সে সব আবির বাজারের থেকে বেশি দামে বিক্রি হয়।ভোরের আবিরের গন্ধে তার ঘুমিয়ে থাকা প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠেছিল। কেমন যেন মনে হয়েছিল, বেরিয়ে পড়লেই ও আততায়ীর দেখা পাবে। যে, যারা তাকে খুন করেছে, তাদের সঙ্গে ওর দেখা হওয়া দরকার।
কিন্তু কে ওকে খুন করেছে? সে কি বেঁচে আছে না মরে গেছে, বুঝতেই পারল না দোলন।সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? এক একদিন চরম হতাশায় প্রদীপ্ত বলেছে ‘শালা পাগল নিয়ে ঘর করি’ যদিও ও নিজেই প্রথম থেকে বলে আসছে নার্ভের অসুখ জ্বর সর্দি কাশির মতো একটা অসুখ। নার্ভের রুগী মানে পাগল নয়। এই প্রদীপ্ত একসময় তাকে নিজে কাউন্সেলিং করেছে। প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছে ‘ইটস নট এন্ড অব দা ওয়ার্ল্ড’। অনেক কিছু করার আছে দোলনের। ওর মত এত ব্রাইট রেজাল্ট, আর কিছু না হোক, আই টি তে জয়েন করতে পারে যেকোন সময়। কিছু কিছু কম্পানি সেকেন্ড কেরিয়ার স্কিম শুরু করেছে, যাদের পরিবার, মাতৃত্ব বা অন্য কারণে কেরিয়ারে ছেদ পড়েছে তাদের একটা সুযোগ দিতে। দোলনের অন্য কারণটা কী বলবে সে? তাকে খুনের চেষ্টা করেছে এই চারজন?

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes
410 Gone

410 Gone


openresty